শান্তা মুখোপাধ্যায়-এর গল্প

Spread This

শান্তা মুখোপাধ্যায়

অমোঘ

বাক্স পেঁটরা কাচ্চা বাচ্চা নিয়ে মারুতি ভ্যান বাদুড়ঝোলা হয়ে মাধোগঞ্জের সীমানায় পৌঁছাতেই একদল লোক থামিয়ে দিল ভ্যানটাকে। “এই! রোককে! রোককে! আগে মত জানা!” নেমে পড়ে বাবুলাল। দলে সেই মাতব্বর। একগাল হেসে দেশোয়ালী ভাইএর দিকে এগিয়ে যেতেই শশব্যস্তে পিছিয়ে যায় দলটি। মহেশ বলে, “আরে, বাহারসে আয়ে হো, অব এইসে ক্যায়সে মিলোগে!” একে একে সবাই নামতে থাকে। সবাই বুঝে যায় গাড়ি আর এগোবে না। গ্রামের সীমায় পৌঁছে গেছে যখন, যে যার ঘর চলে যেতেই পারবে, সে আর কতটুকু! কিন্তু গাড়ি ভাড়া দিতে হবে তো! যে যার ঘরে পৌঁছে ঘর থেকে টাকা নিয়ে গাড়িভাড়া মিটিয়ে দেবে ঠিক ছিল, এবার কি হবে? বাবুলাল সেকথা দলের লোকেরদের বলে। ভিখু বলে, “অব ত তুম লোগোঁকো ইস্কুলমে কোরেন্টিনপে যানা হোগা। ঘর ক্যায়সে যাওগে ইস হালতপর?” বাবুলাল দমে যায় খুব। ঘর আসবে বলে পুরো দেড়দিন দলটাকে নিয়ে হেঁটেছে বাবুলাল। তারপর বালবাচ্চা আছে, মা বননেওয়ালী লেড়কি আছে, তাদেরকে নিয়ে আর হাঁটা সম্ভব হচ্ছিল না। তখন এই ভাড়ার গাড়িতে বাদুড়ঝোলা হয়ে এসেছে। ভেবেছে ঘরে পৌঁছে সবাই দু চারশ করে টাকা জোগাড় করে ভাড়া মিটিয়ে দেবে। এখন? ড্রাইভার হাঁকছে, “জলদি করো!” অসহায় বাবুলাল আর তার দল দাঁড়িয়ে যায়। লখনের বৌএর কোলের বাচ্চাটা ট্যাঁ ট্যাঁ করে কান্না লাগায়।

অসহায় বাবুলাল গ্রামের লোকদের কাছেই সাহায্য চাইল। বলল, “উধারমে দো না! পায়দলহি তো আ রহে থে, লেকিন ইয়ে লেডিস লোগ, বচ্চে, বিকাশকা ঘরওয়ালী মা বননেওয়ালী হ্যায়, কিতনে সারে রাস্তে পায়দল চল পায়েগী। ইসি লিয়ে তো পুরা একদিন ঔর আধা দিন পায়দল চলনে কি বাদ ইয়ে ভ্যান লিয়া। প্যায়সা তো সারে খর্চ হো চুকে থে। শোচা কি ঘর ওয়াপস আয়ে তো উধার লেকে ভি ড্রাইভারকো দে দেঙ্গে।“ গ্রামের লোকরা এ ওর মুখের দিকে তাকাতে থাকে। ঠাকুরসাহাবের কাছে খবর চলে যায়। মুখিয়াজী। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে বাবুলাল, লখন, ছগন, বিকাশদের দলটা। ড্রাইভার বিরক্ত হয়। বলে, “এক প্যায়সা সাথ মে হ্যায় নেহি, চলে আয়ে গাড়িমে! শালে কুত্তাকে বচ্চে!” ছগন তেড়ে যায় ড্রাইভারের দিকে। সারা রাস্তা গালি খেতে খেতে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে। বলে, “যব পায়দল চল রহে থে, পোলিসনে রোক দি, বোলি কি “লকডাউনমে কাঁহা যা রহে হো? ভাইরাস ফ্যাল যায়েগা! বুড়বক কাঁহিকা!’ হামলোগ হাথ জোড় কর বিনিতি কি, হামে এক বাস দে দো ঘর জানে কে লিয়ে। না খানা মাঙ্গা, না পিনা, সাথমে বালবাচ্চা। অফসর বোলে কি “বাস কাঁহাসে মিলেগা ইস লকডাউনকা টাইমপে! নিকলি কিঁউ শালে কুত্তাকে বচ্চে!” হামলোগ মজদুর হ্যায়। মজদুর। এক ভি রাস্তা ইয়া ফ্যালাট ইয়া দুকান বন শকতে হ্যায় হামলোগোঁকে বিনা? অব সারে কে সারে লোগ হামে কুত্তাকে বচ্চে বোল রহে হ্যায়!“ তেড়ে গেলেও দীর্ঘ পথশ্রম, অনাহারে তেজ নিভে গিয়ে কান্না বেরিয়ে আসে। হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়ে ছগন।

ততক্ষণে মুখিয়াজী পয়সা পাঠিয়ে দেয়। ড্রাইভার পয়সা নিয়ে হাত তুলে কপালে ছোঁয়ায়, বলে, “মাফ করনা…” তারপর ধুলো উড়িয়ে ফিরে যায়। সূর্য তখন গা এলিয়ে দিয়েছে। বাবুলাল বলে, “অব ঘর যাউঁ?” গ্রামের লোকেরা বলে, “নেহি। কোরান্টিন ছেন্টারপে থাকতে হবে চোদ্দদিন। ইস্কুলে। খানাপিনা হাম দে দেঙ্গে।“ আর কথা বাড়ায় না বাবুলাল। দেখাদেখি লখনও পিছন পিছন হাঁটতে থাকে, তার পিছনে লখনের বৌ বাচ্চা, তার পিছনে ছগন…গোটা দলটা…
স্কুলঘরে পৌঁছে দেখে থাকার কোন ব্যবস্থাই নেই। চৌকি তো দূরস্থান, একটা মাদুরও বিছানো নেই। লখন বলে, “ঘর আসব বলে কিতনে পথ পায়দল চলে এলাম। এই ঘর!” লখনের বৌ লছমী বিনবিন করে কি বলতে বলতে কাঁদে। একদল টিউকল টিপে হাত পা ধুতে যায়। বিকাশ এসে বলে “পিসাবঘরের অবস্থা তো খুব খারাব! আওরতলোগ কি করবে!” স্কুলঘরের হলুদ ফ্যাকাশে আলোয় বাবুলাল হাতের গামছা দিয়ে মশা তাড়ায়। একটু পরে গ্রামের থেকে কিষণ খাবার নিয়ে আসে। মুখে গামছা বাঁধা। হাতের থলিটা স্কুলের বারান্দার সামনে রেখে হাঁকে, “খানা” তারপর কোনও কথা না বলে চলে যায়।

লখন বলে, “সারে লোগ এমন ব্যবহার করছে যে আমরা আসামী। আমাদের বিমারি হয়েছে কিনা তারই ঠিক নেই, অথচ ভাব দেখাচ্ছে যেন আমরা অচ্ছুত!” কথাটা বলেই লখনের মনে পড়ে গেল শহরের কথা। শহরে বস্তিতে গাদাগাদি করে থাকা, কিন্তু কে কি জাত সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলে না কেউ। গ্রামে জাত আর জাত! অচ্ছুত হবার ব্যাপার কি আজকের? লখন শহরের অন্যজাতের মেয়ে বিয়ে করেছিল বলে দাদা রামবিলাস ঘরে ঢুকতে দেয় নি বৌকে। সালিশি সভা বসেছিল। তারপর অবশ্য মোটা টাকা দিয়ে ব্যাপারটা মিটিয়ে নিয়েছিল। তখন লখনের রোজগার কত! ফি মাসে বাড়িতে পাঁচহাজার টাকা পাঠাত। হোলিতে বাড়ি এসে কি মস্তি! দাদা আর মনে রাখে নি বৌএর জাত! টাকা কথা বলে! লখন সুযোগ পেলেই টাকা পাঠিয়েছে দাদাকে। জমি কিনে রাখার জন্য। দাদা নিশ্চয়ই কিনে রেখেছে। এখন এই লকডাউনের বাজারে টাউনে কাজ নেই। কবে কাজ পাবে জানা নেই। জমিজমা থাকলে পেটভাতে টান পড়বে না। সরকার নাকি রেশনের ব্যবস্থা করেছে…চলে যাবে। এই নিশ্চিন্ততার জন্যই ত এতকষ্ট করে ঘর ওয়াপস আসা।

ছগন, বিকাশের উত্তেজিত গলা শুনে বাবুলাল বেরিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করে, “ক্যা হুয়া?” বিকাশ জানায় মাথাপিছু মোটে দুটো করে রুটি দিয়েছে, আর এক খুরি আচার। কাজ যতদিন ছিল, খিদের কষ্ট জানাছিল না এদের। হঠাৎ লকডাউনে সব হিসাব গোলমাল হয়ে গেছিল! হাতের পয়সা শেষ! রেশন কার্ড দেশে। রেশন মিলছিল না। সরকারি ত্রাণের অনেক হিসেব! সবাই পায় না! চল্লিশদিন টানার পর আর পারে নি ছগন, লখনরা। ঘর। ভেবেছিল ঘর এলে ভুখা মরতে হবে না। অভাব থাকলেও ভাগজোগ করে গুজরান হয়ে যাবে! তাছাড়া যারা বাড়িতে বৌবাচ্চা রেখে গেছে, তারা কোন প্রাণে বাইরে পড়ে থাকবে যখন রোজগার নেই, খাবার নেই! খাবারের নিশ্চয়তার জন্য ঘরে ফিরে মাপের খাবার আত্মসম্মানে লাগে। ভুখা পেটের বিদ্রোহ আছড়ে পড়ে মস্তিষ্কের অলিতে, গলিতে। বাবুলাল গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে! মনেমনে বলে, “এইভাবে চোদ্দদিন!”

চোদ্দদিন পেরোতে মাধোগঞ্জে ঢোকার অনুমতি পেল লখনরা। বাবুলাল বলল, “শুক্কর হ্যায় কি কিসিকো বিমারি না হুয়ি!” লখন ঘরে আসে। বৌ বাচ্চা সহ। রামবিলাস যেন দেখেও দেখতে পায় না। লখন বলে, “এলাম।“ রামবিলাস বলে, “হাঁ, দেখ রহা হুঁ, লেকিন থাকবি কোথায়?” ছুটিতে বাড়ি এলে লখন যে ঘরে থেকেছে, এখন সে ঘরে দাদার দুই ছেলে থাকে। বড় হয়েছে তারা। কিছু তো বলা যায় না! বাড়িতে দুটো ঘর এখন পাকা। বাকি একটা মাটির ঘরে লখনরা জায়গা পায়। দু একদিন পরে লখন কথাটা পাড়ে। জমিজমার কথা। টাকা লখন পাঠিয়েছে, জমি কেনা হয়েছে, তাতে লখনের ভাগ থাকবে নিশ্চয়ই! কথাটা বলতেই রামবিলাস আকাশ থেকে পড়ল! জমি! জমি তো রামবিলাস মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চাষ করে ফসল ফলিয়ে বিক্রি করে সেই টাকায় কেনা হয়েছে। সেখানে লখনের নাম থাকবে কেন? লখন অবাক হয়ে বলে, “ম্যায়নে যো রুপেয়া ভেজা থা?” রামবিলাস বলে, “তু ক্যায়া হিসাব মাঙ্গ রহা হ্যায়? ঘরমে কিতনা খর্চ হ্যায়, তেরা ভাবি বিমার হ্যায়, তুঝে পাতা? লখন কি বলবে বারো বছরের বড় দাদার মুখের উপর? বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “কিতনে সারে প্যায়সে…” রামবিলাস চিৎকার দিয়ে ওঠে, “কোই সবুত হ্যায়, তুনে প্যায়সা ভেজা?” না কোনও প্রমাণ নেই লখনের কাছে। যা কিছু ছিল রক্তের টানে, ভালবাসার টানে। এই বেজন্মা সময় সেসব গিলে খেয়েছে, লখন বুঝে গেল। পায়ের তলার মাটিটা, বুকের ভিতরের আগলানো সম্পর্কটুকু পিছলে যেতে যেতে খাদের দিকে নামছে। রামবিলাস চিৎকার করে চলে, “ঘর ওয়াপস আয়ে! কিঁউ? চলে গয়ে তো শহরমে বড়া কামাইকে লিয়ে! অব কাম নেহি তো ঘর ওয়াপস! কোন চালায়েগা তেরা ঘরখরচ? খুদ খিলানা আপনে বহু বচ্চাকো।“

দুদিন পরে লখন রামবিলাসকে বলে, “মানা কি জমিন আপকাই হ্যায়, লেকিন আমাকে ভাগে চাষ করতে দাও!” রামবিলাস বলে, “উসকা জরুরত নেহি হ্যায়। দো লেড়কে ঘরমে হ্যায়, উও কর লেতে হ্যায় খেতি কা কাম!” লখন একটুও আলো দেখতে পায় না কোথাও! তবু মরীয়া হয়ে বলে, “তব তুমহারা খেতকা আলু, সবজি দো , ভ্যানে করে আমোদপুরে নিয়ে গিয়ে বেচি! যা পাব, আধা তুম লোগে,, আধা মেরা!” রামবিলাস রাজি হয় না। পরদিন দেখে ভাবির ভাই ভ্যানে করে সবজি চাপিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। শুনতে পায় ভাবি পরিচয় দিচ্ছিল লখন সবজি ফেরি করতে চেয়েছিল সেই কথা। ভাবির ভাই দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “সম্পত্তির লোভে ভননাচ্ছে! শালা কুত্তার বাচ্চা!”

চোয়াল শক্ত হয় লখনের। ভাবে মেরে দাঁতগুলো ভেঙে দিই! কিন্তু বাস্তবে করে উঠতে পারে না। প্রবল অনিশ্চয়তার কালো জল ঠেলে ঠেলে এগোতে থাকলে আর যাই হোক, মারামারি করার জিদটা আসে না। পথে পুলিশ অফিসার যখন বলেছিল, “কুত্তার বাচ্চা,” তখন লখন হাত উঠিয়েছিল, বাবুলাল নামিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, “অব ঘর ওয়াপসি পহেলা কাম হ্যায়। দিমাগ ঠান্ডা রাখ!” আরো এগিয়ে নাকা চৌকিতে পুলিশ আবার ধরেছিল। থানার বাইরে পুরো দলটাকে বসিয়ে রেখেছিল। তারপর ঠান্ডা খিচড়ি শালপাতার থালায় খেতে দিয়েছিল। অত বিস্বাদ খাবার লখন সারা জীবনেও খায় নি! দলের প্রায় সবাই খাবারটা একগ্রাস খেয়েই ফেলে দিয়েছিল। পুলিশ কনস্টেবল বলেছিল, “নবাবজাদাদের খানা পসন্দ হয় নি! লখন বলেছিল, “পছন্দ হয় নি তো! ভিখিরি নাকি?” কনস্টেবল বলেছিল, “রোয়াব কত! শালা কুত্তার বাচ্চা!” লখন মনে মনে কনস্টেবলটার জিভ ছিঁড়ে নিয়েছিল! কিন্ত এখন ঘোলা কালো জল ওকে ডুবিয়ে দিতে চাইছে…… কি করবে লখন?

অনেক দোনামনা করে লখন মুখিয়াজীর কাছে যাওয়াই স্থির করে। যদি কোনও কাজ জোটে… কি এক বিমারি এল! বিমারিতে না মরলেও মানুষ না খেয়ে মরবে! অবশ্য মানুষের আর কিই বা দাম! না, সব মানুষের নয়। ওদের মত মানুষের। লকডাউনে কাজহীন শহরে বসে, তারপর ফিরতে চেয়ে লখন এই সারসত্যিটা বুঝে গেছে। ওদের কথা কেউ ভাবল না? তাহলে ওদের ছাড়াই দেশটা চলতে পারে? তাহলে ওদের ভোট দিতে হয় কেন? ভোটের সময় এত খাতির কেন? লখন ভাবে ওরা কাজ না করলে দেশ চলবে কিনা ভাবাটা বিলাসিতা হয়ে যাবে না? কাজ না করলে ওদের পেট চলবে কেমন করে? শহরে আবার কবে যাবে, কাজ পাবে কিছুই জানা নেই! নিশ্চিন্ততার জন্য ঘর আসতে চেয়েছিল। ঘর ত এসেই গেছে, শুধু নিশ্চিন্ততাটা খুঁজে বেড়াচ্ছে লখন।

মুখিয়াজীর বাড়ি বিরাট। বাইরের ঘরে উঁচুজাতের লোকেরা বসে, মুখিয়াজীর সঙ্গে দেখা করে। ছোটজাতের জন্য কাঁচা মাটির উঠোন বরাদ্দ। ঘরের কাজ হলে মুখিয়াজী দালানে এসে বসবেন। তখন ছোটজাতের লোকজন তাদের আর্জি জানাবে। বেশ কিছুক্ষণ পরে মুখিয়াজী বাইরে আসেন। ঘরের মধ্যে থেকে সরকার কি কি ভালো কাজ করেছে এই সময়ে, সেই আলোচনা চলছিল। লখন শুনেছে। লখন বোঝে নি। লখন আশা করে থেকেছে, হয়ত মুখিয়াজি সেইসব কথা বলবেন। লখন আবার একটু ভালো থাকার স্বপ্ন দেখবে।

মুখিয়াজি বাইরে আসেন। ঘরের মেহমানরা একে একে পরনাম জানিয়ে চলে যায়। মুখিয়াজি খাটিয়ায় বসেন। পায়ের কাছে বসে মুখিয়াজির প্রিয় কুকুর ডন। কালো আলশেসিয়ান। মুখিয়াজি ওকে বিস্কুট খাওয়ান। লখন ভাবে ছেলেটা কতদিন বিস্কুট খায় না। আলশেসিয়ানের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মুখিয়াজি বলেন, “বোল” আলশেসিয়ান গরগর করে। নিন্দুকেরা রটিয়ে দিয়েছে মুখিয়াজীর সঙ্গে কারো শত্রুতা থাকলে ডন তাকে শায়েস্তা করে। লখনের গলার কাছটা শুকিয়ে ওঠে। মুখিয়াজি একটু অধৈর্য গলায় বলেন, “আরে বোল না!” লখন বলে, “কোই কাম…” মুখিয়াজি বেশ চওড়া হাসেন। বলেন, “কাম তো হ্যায়। অগলেমে ঢের সারে মওকা! কোই শোচা কি আলু পেঁয়াজ ভি এক্সপোর্ট হোগা? জমিন চাহিয়ে, জমিন! ঢের সারে জমিন…।“ লখন বলে, “জমি তো সারে দাদাকে নাম পর। আমি টাকা পাঠিয়েছি…… কিন্তু এখন বলছে সারে কে সারে জমি ওর নামে…” হা হা করে হেসে ওঠে মুখিয়াজি। ডন লেজ নাড়ায়। মুখিয়াজি বলে, “ ও তেরা দাদার নামেও জমিন থাকবে না। সারে কে সারে আমি খরিদ করে নেব। ভাল দামে। চাষ করতে আদমী লাগবে তো! চাষ করবি! তেরা দাদাভি আমার জমিতে চাষ করবে। ঢের সারে ফলন চাহিয়ে নেহি তো এক্সপোর্ট হোগা ক্যায়সে? বেশি খাটতেও হবে। শ্রম আইন বদল হো চুকে হ্যায়, শুনা? অব বারোঘন্টা ডিউটি!” লখন ঘাড় নাড়ে। শোনে নি। কিন্তু এখন শুনে মনে মনে দেখতে পেল মাইলের পর মাইল জমি সব ঠাকুরদের। একটু জমির জন্য আবার হাঁটবে লখন? আরো কত পথ পেরিয়ে গেলে একটুকরো জমি মিলবে লখনের? একটা গোটা দেশ? জানে না, লখন জানে না। ছগন, বিকাশ, বাবুলালও জানে না। ওরা আর হাঁটতে পারবে না। বড় খিদে। ছোট বাচ্চাটা কাঁদে, লছমী কাঁদে… আইনের কথা কিতাবেই থাকে। ও শুনেই বা কি হবে! ভর পেট খাবার যোগাড় করতে গেলে মালিক যা বলছে না শুনলে চলবে কেন!

মুখিয়াজি বলে, “রুপেয়া চাহিয়ে তো? লে লো আজহি। রামকেও আসতে বলিস। বলবি, গ্রামের সবার জমিই ম্যায় খরিদ লুঙ্গা। মু মাঙ্গা দামে। ফির সারে লোগ আমার জমিতে চাষ দিয়ে কামাই করবে! ঔর ম্যায় এক্সপোর্ট করুঙ্গা! ব্যাংকসে আসান লোন মিলেগা । তোদের বেতন দিতে কোন অসুবিধাই হবে না।
লখন দ্যাখে মুখিয়াজির চেহারাটা লখনের সামনের গোটা জায়গা দখল করে আকাশ ফুঁড়ে উঠেছে। পাহাড়ের মত বিশাল, ঈশ্বরের মত অমোঘ। ঈশ্বর টাকার বন্দোবস্ত করে দিতেই লখন গরম রুটির গন্ধ পায়। কত দীর্ঘ রোদ ঝলসান পথ পেরিয়েছে এই গন্ধের জন্য! আর তখনই লালাজড়ানো রুটির পরতে পরতে চাপা পড়ে যায় পথচলতি অপমান। আকাশসম মুখিয়াজীর সামনে ও পোষ মেনে হাত দুটো মাটিতে রেখে দু পা মুড়ে বসে। ল্যাজ নাড়তে নাড়তে বলে ওঠে, “ভৌঃ”