নীল মুখার্জী-র গল্প

Spread This
Neil Mukherjee

নীল মুখার্জী

পিকলুদের এন্টেনা

১।

‘নিকষ কালো মেঘ ক্লান্ত নিশ্বাস ফেলিয়া নীপবনে বিলীন হইয়া যায়, তখনও রৌদ্রের প্রভাত হয়নি, অধিকতর সভ্যতার বিবেক হয়নি, চপলিনি তখনও যৌবনের রুধির স্পর্শ করেনি। এক মহামারীর কাকভোরে নিদ্রাভঙ্গের মতো স্বপ্নাতুর চপলিনির অপলক দৃষ্টি, চোখ ফিরাইয়া লই তবু দেহ ফিরাইতে পারি নাই।’

নিশিকান্ত ভৌমিকের সঙ্গে কলেরার দেখা হয়েছিল আঠেরোশো ছেচল্লিশের শেষের দিকে, তারা দীর্ঘদিন একসঙ্গে সংসার করেছিল, কিন্তু অজ্ঞাত কারণে নিশিকান্তকে বাঁচিয়ে রেখেই একদিন সকালে কলেরা তার শরীর ছেড়ে চলে যায়। নিশিকান্ত কিছুটা হতাশ হয়েছিল হয়তো, এমন ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়া মৃত্যুর সুযোগ বহু শতাব্দীতে একবার আসে। অবশ্য নিশিকান্তর মৃত্যু এমনি হারিয়ে যাওয়ার কথা, চার কাঁধে মাদুর বাঁধা অচেনা লাশ হয়ে শেষযাত্রা হবার কথা, কিন্তু হারিয়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে এই অছিলা হয়তো একটু মৃত্যুকালীন স্বস্তি দিতে পারতো। নিশিকান্তর হাতেগোনা পাঠককুল মনে করে কলেরার সঙ্গে বেঁচে থাকার দিন গুলোয় নিশি প্রেমে পড়েছিল বাড়িওয়ালার নাবালিকা ছোটমেয়ের। ‘মহামারী চতুর্দশী’ উপন্যাসের বেশ কিছু পাতায় সে পরোক্ষ উল্লেখ আছে, আর সেই উপন্যাসের নাকি অনেকগুলো ব্যাখ্যাও আছে, তার মধ্যে একটা ব্যাখ্যা অনুযায়ী নিশিকান্ত এই চপলিনীকেই দায়ী করেছিলেন, কলেরার এরকম হঠাৎ বিরাগভাজন হবার কারণ হিসেবে। মজার ব্যাপার গ্যাব্রিয়েল মার্কেস প্রায় দেড়শো বছর পর লিখেছিলেন ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কলেরা’। নিশিকান্ত নিজেকে ফ্লোরেন্টিনো হিসেবে দাবি করার সুযোগ পাননি, অবশ্য কখনো চপলিনীকে নোঙরহীন জাহাজে চাপিয়ে হলুদ পতাকা উড়িয়ে চিরন্তন সমুদ্রযাত্রায় পাড়ি দেবার স্বপ্নও দেখেননি, তবে হ্যাঁ, বাড়িওয়ালাকে একটি চিঠি দিতে গিয়ে প্রথম ফার্মিনা থুড়ি চপলিনীকে দেখে ফেলেছিলেন।

নিভৃত কয়েকদিন আগেই নিশিকান্তর সেই হাতে গোনা পাঠকগোষ্ঠীর মধ্যে একজন হয়েছে। কলেজ স্ট্রিটের বাতিল বইয়ের দোকানে খুচরো না থাকায় অগত্যা ছেঁড়া খোঁড়া নিশিকান্তকে হাতে নিয়ে ফিরে এসেছিল। স্কুল সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবার পর মাঝের অনেকটা সময় নিভৃত ভেবে কাটিয়েছে যে ওর গ্রাডুয়েশনের ডিগ্রিটা নিয়ে লড়াই করা উচিৎ, না এই লড়াই না করার মানসিকতাটাকে নিয়ে আরেকটু লড়াই করা উচিৎ। আসলে সম্পূর্ণ অনিশ্চয়তার মধ্যে নিরুদ্যোগী হবার একটা অদ্ভুত মজা আছে, যেটা নিশ্চয়তাবিলাসী সমাজ ভাবতেই পারেনা। একদিন ঝড় জলের দুপুরে বাড়িতে একমাত্র না পড়া বই ছিল ‘মহামারী চতুর্দশী’। মুখবন্ধের প্রথম বাক্যটা পড়ে একটু আগ্রহ হয় নিভৃতর, ‘খবর পাইলাম হেনরি ডিরোজিও পরলোক গমন করিয়াছেন কিছু দিন আগে। হেনরি বা তাঁর মৃত্যুর সহিত আমার সরাসরি কোন যোগাযোগ নাই। তবু তাঁর দুরারোগ্য আমার পরিচিত এবং আত্মীয়সুলভ। সকাল থেকে এই তৃতীয়বার শোক পালনের চেষ্টা করিতেছি, অথচ ওই মহান মানুষের এতো অল্প বয়সের চলে যাবার ব্যাথা যথাযথ অনুভব করিতে পারি নাই। এই অপারগতার চিকিৎসা প্রয়োজন।’

নিভৃত নিজের জীবনেও একই রকম অনুভব করেছে নিজের বাবার মৃত্যুতে। ঠিক যতটা কষ্ট পাবার কথা, পায়নি । মৃত্যু যেন একটি অনুষ্ঠানের মত, অনুভূতিহীন। ভালো অনুষ্ঠানে যেমন আসার আনন্দটাই সবথেকে বেশি ও ক্রমবর্ধমান, এক্ষেত্রে তেমন যন্ত্রনা। অথচ সেই পরম মুহূর্ত চলে এলে নিভৃত কেমন জড় পদার্থের মত দর্শক হয়ে যায়, সমস্ত অপেক্ষার অবসানটাই যেন অনুভূতির পরিসমাপ্তি।

২।

যেকোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ছবি মনে মনে ভাবলে, সেই ছবিতে আকাশ কালো বা মধ্যরাত, বজ্র-বিদ্যুৎসহ বৃষ্টিপাত থাকে, নিশিকান্ত লেখার সময় এই গতানুগতিকতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেনি। অথচ তিনি জানতেন এটি বহুল প্রচলিত ও ভীষণ পূর্বনির্ধারিত। একদিন সকালে হাল্কা নীলচে আকাশ, তাপ-হীন রৌদ্রে খেলা করছে ভ্রমর, জুঁই ফুলের ফুলসজ্জা, অসহায় গাছ পরাগমিলনেও পরনির্ভরশীল, ভ্রমরের অপেক্ষারত, এমন সময় নেমে এলো মহাপ্রলয়। মাটি দু-ভাগ হয়ে ভূগর্ভের লাভা উপচে পড়ল। এভাবে লিখলে মানুষের মহাপ্রলয়ের ভীতি কমে যায়, আর মহাপ্রলয় আসার আগে একটা পরিবেশ লাগে বৈকি। তবু বৃষ্টির মতো এতো সুন্দর প্রাকৃতিক ঘটনার এরকম বাধ্যতামূলক ব্যবহার নিভৃতের ভালো লাগতো না। নিভৃত একটি দীর্ঘ যৌবনের পর উপলব্ধি করেছে বৃষ্টির জন্য আলাদা কোন ঋতু লাগেনা। বর্ষাকালটা অবিলম্বে ঋতুচক্র থেকে সরিয়ে ফেলা উচিৎ। বর্ষা ছাড়া অন্য কোন ঋতু একে অন্যের জায়গা দখলের চেষ্টা করেনা। অথচ বঙ্গোপসাগরের দাক্ষিণ্যে মাস ঘুরতে নিম্নচাপ আর বছরের যেকোনো সময়ে একটা করে মহিলা সাইক্লোন এসে পরে। যেমন এখন হিমসাগরের গরম লু-বাতাসে জানালা বন্ধ থাকার কথা, অথচ গত চারদিন আকাশ কালো, ছাড়া ছাড়া বৃষ্টি, মৃদুমন্দ বাতাস। সাইক্লোনের পূর্বাভাস আছে, তবু নিভৃতের এই সময় জানলাধারটাই ঘরের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হয়ে ওঠে। নিজের খাটটিকে জানালার নিচে লম্বালম্বি করে টেনে নিয়েছে কাল সকালেই। যেদিক ফিরে বাতাস বইবে, নিভৃত থাকবে তার বিপরীত মুখে শুয়ে, এটা প্রাচীন খেলা।

কাল মনে হচ্ছিলো, অনেকদিন হয়ে গেছে, নিভৃত কিছু লেখেনি। বাইরের মহামারী পরিস্থিতিতে প্রচুর মানুষ কাজ হারিয়েছে, তাদের মধ্যে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগও আছে, তারা লেখেনা বা লিখতে পারেনা বা হয়তো লিখে তৃপ্তি পাবার জন্য যে মানসিক উৎসব লাগে, সেটা তারা অনুভব করতে পারেনা। নিভৃত তাদের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছে, সবাই একই পরিস্থিতিতে নেই। জীমূত পুরোনো মেসে থাকতো, বেসরকারি বীমাকর্মী, এমাসে কাজ হারাতে পারে জানতো, তাই ঘরে স্যানিটাইজার বানিয়ে লোকাল বাজারে বসছে। অভীক গভর্নমেন্ট কন্ট্রাক্টারি করতো, ও গতবছরেই বিয়ে করেছে, বাবাও হতে চলেছে, এখন অনির্দিষ্ট কাল কোন কাজের খবর নেই, আর্থিক অবস্থা বেশ খারাপ হবার কথা। পাড়ার বিকেলবেলার চপওয়ালা আর ফুচ্কাওয়ালা গুলো এখন কি করছে কে জানে। যাহোক এসব মিলিয়ে একটা শক্তিশালী কিছু লিখে ফেলা যায়।

‘মানুষ যেকোনো নতুন সমস্যাকেই উৎসব হিসেবে নেয়। প্রথম প্রথম জনশূন্য রাস্তাঘাট, শব্দহীন শহর ভালোই লাগছিল, যে মানুষটা রোজের খাবার যোগায়, সেও হয়তো ছুটির আনন্দে কয়েকদিন হাসি মুখে শ্রমহীন পারিবারিক ভাবেই কাটিয়েছে, তবে কোন উৎসবই দীর্ঘদিন মানুষের আগ্রহ ধরে রাখতে পারেনা। একসময় প্রয়োজন হারিয়ে দেয় জনপ্রিয়তাকে, আসলে মানুষের ভালোলাগা অনুভূতিটাই খুব সাময়িক, প্রখর মহামারীতেই নিশিকান্ত চপলিনির প্রেমে পড়েছিল।’

নাহ, জমলোনা, এখানে দৈনিক রুজি মানুষদের ব্যাপারটা গুরুত্ব হারাচ্ছে, মহামারীর এই দীর্ঘ যাপনের প্রত্যক্ষ ক্ষতি কিন্তু সেই রোগে মৃত্যু না, শ্রমহীনতা আর অপচয়, সেই অপচয়ের সঙ্গে জুড়ে থাকা মানুষ, গোষ্ঠী ও রাষ্ট্র। নিভৃত লেখাটা ছিঁড়ে দিয়ে, পিকলুদের এন্টেনার দিকে মনযোগ দিয়েছিল। যেকোনো ভাবনার বিরতিতে ও এটাই করে। খুব মনযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকলে একসময় এন্টেনাটা আবছা হয়ে আসে আর একটা টাইমট্রাভেল করা যায়।

‘শোন দাড়িটা দু-দিন আগে কাটবি, ওই হালকা গজানো ব্যাপারটা বেশ লাগে।’ পিকলু ব্যাগের জিনিসপত্র ঠেলেঠুলে একটা ছোট স্কেল বার করে একমুখ হাসি নিয়ে এগিয়ে এল।

– এটা কি হবে? নিভৃত এন্টেনার হেলান থেকে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

পিকলু গালের ওপর স্কেল বসিয়ে সরু নখ দিয়ে একটা দাড়ি তুলে মন দিয়ে দেখে বলল, ‘এই পয়েন্ট থ্রি সেন্টিমিটার মত, যখনই পয়েন্ট ফোর হয়ে যাবে, দাড়ি কেটে ফেলবি আর দু-দিন দেখা করবি না, তাহলে প্রেমটা থেকে যাবে, বুঝলি?

– আমার দাড়ি রাখতে ভালো লাগে।

– ধুস, ওসব মেয়ে দেখানি, দুটো কি লিখিস, আর নিজেকে ইন্টেলেকচুয়াল দেখাতে চুল দাড়ি রাখিস, আর সারাদিন চুলকাস, এর থেকে একটু পড়াশোনাই করনা, চুলকুনি থেকেতো বাঁচবি।

– এর মানে কি, আমি প্রিটেনসাস?

– আবার কি? বল লাস্ট কোন বইটা পড়েছিস?

– পান্ডব গোয়েন্দা।

– সেই জন্যইতো বললাম দাড়ি কেটে মিষ্টি লাগিস, কেটে ফ্যাল।

– হোয়াট ডু ইউ মিন? পান্ডব গোয়েন্দা পড়লে ইন্টেলেক্ট কমে যায়?

… তা কখন বললাম…না বললিতো কেটে দে দাড়ি বইটার নাম শুনে….ওই পড়ে এই দাড়ি রাখলে ম্যাক্সিম গোর্কি পড়লেতো রবীন্দ্রনাথ..

কথোপকথনগুলো আবছা হয়ে আসছিল, কিছুটা নিভৃত নিজেই করছিল, কারণ পিকলুকে তর্ক করতে শুনতে না দেখতে ভালো লাগে, এই সময় মনে মনে একটা গান ভাবলে, সেটা আবহে বাজতে থাকে।

এন্টেনাটা বহুদিন থেকেই বিপর্যস্ত, পাখিদের অস্থায়ী বিশ্রাম নেওয়ার জায়গা হিসেবেই ব্যবহার হয়। ওটা হয়তো পিকলুদের নয়ও, তবে এন্টেনাটার ঠিক নিচের ফ্ল্যাটে পিকলুরা ভাড়া থাকতো।এন্টেনাদের সাধারণত স্বেচ্ছা মৃত্যু হয়, মানুষ নিজে থেকে খুলে ফেলেনা। ভাগ্যিস।

৩।

আমায় বস্তুবাদী বলিলে, গৃহে অনুপস্থিত সকল বস্তুকেই অপমান করা হয়। তবে কিছু বস্তুর উপর আমার সাময়িক আধিপত্যপ্রবণতা প্রশ্নাতীত। আমি পিতৃপ্রদত্ত নামখানি ছাড়াও যৌবনে এরূপ বহু নামকরণের অধিকারী হইয়াছি, যাহা আমার সামগ্রিক প্রতিরূপের অপব্যাখ্যা করিয়া থাকে, যেমন আমি সমবায় প্রেমে বিশ্বাসী, যে প্রেমের কোনো স্বত্বাধিকারী হইতে পারেনা, অথচ তাহার সহিত আমার কিঞ্চিৎ পদস্খলনের কোনরূপ সম্পর্ক নাই।

নিশিকান্ত অতি-কাব্যিক। মহামারী চতুর্দশী উপন্যাস হিসেবেও বেশ ছোট অন্তত তৎকালীন উপন্যাসগুলির সঙ্গে তুলনা করলে, এটাকে উপন্যাসিকা বলা যায়। পড়ার সময় নিভৃতের অনেক সময় মনে হয়েছে যেন উনি কবি হতে চেয়েছিলেন এবং বকা খেয়ে উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছেন। প্রচুর গুরুচন্ডালি দোষ দেখে বোঝা যায় সেরকম মানের কোন প্রুফরিডার তিনি জোটাতে পারেননি। তবু কোথাও যেন নিশিকান্তের দুর্বলতাই একটা বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গা তৈরী করে।

কলেরা থেকে বেঁচে যাওয়ার পর নিশিকান্ত হয়তো আর কোন বই প্রকাশ করেননি, করলেও সেটা জানা যায়না। কিছু পাঠক অবশ্য মনে করে নিশিকান্ত পরে ‘যুযুৎসু’ ছদ্মনামে কিছু ম্যাগাজিনে লেখালিখি করেছিলেন। এটা শুনে নিভৃত বেশ মজা পেয়েছিল, মহাভারতের যুদ্ধে কৌরবদের একমাত্র বেঁচে থাকা ভাই-এর নাম ছদ্মনাম হিসেবে নেওয়া নিশিকান্তর কৌতুকরসের সঙ্গে মানিয়ে যায়, তবে লেখাগুলি পড়ে বুঝতে হবে, সেই ব্যাখ্যা কতখানি সত্যি।

নিশিকান্তর নাম পিকলু নিশ্চয়ই জানে না। জানলে লেখাগুলি পড়ার থেকেও ওর আগ্রহ তৈরী হত, এই সম্ভাব্য মহাভারতীয় ছদ্মনাম নিয়ে। পিকলুর ভালো নাম যাজ্ঞসেনী হলেও, দ্রৌপদী সম্পর্কে ওর ধারণা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ছোটদের মহাভারতেই সীমিত।

– শোন পাঁচটা কেন, সাতটা বিয়ে করবো, তবে শাশুড়ির কথায় করবোনা।

– ওয়ার ব্রাইড কাকে বলে জানিস? পিকলু হেসে বলল।

– মম, যে স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর যুদ্ধ হয়, জানিনা বল, পিকলু অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিল।

– তাহলে পৃথিবীর সব স্ত্রী ওয়ার ব্রাইড। হেসে এন্টেনাটায় হেলান দিয়ে নিভৃত বলল, যুদ্ধক্লান্ত, ভেঙে পরা দেশের নারীরা যখন, বিপক্ষ সৈনিকদের বিবাহ করে তাদের ওয়ার ব্রাইড বলে।

– সেতো এক প্রকার যুদ্ধবন্দি হল।

– না, ব্যাপারটা সেরকম না, অনেকটা বলতে পারিস, একটা ব্রোকেন কান্ট্রিতে থেকে যাওয়ার যন্ত্রনা থেকে মুক্তি পাবার জন্য নারীরা কনসেন্সুয়ালই বিয়ে করতো, আবার প্রেমে পরেও করতো।

– কিন্তু সেসব সেনার জন্যইতো দেশের ক্ষতি হয়েছে।

– সেটাও কি কনসেন্সুয়াল না? রাষ্ট্রকি জানতোনা যুদ্ধ হবে, বা তার ফল কি হতে পারে? সামান্য সৈনিকরাতো তাদের কাজটুকুই করেছে।

– এর সঙ্গে আমার সাতটা বিয়ের রেলেভেন্স কি?

– নেই, এমনি বললাম।

– দ্যাখ, আমি ওতো উদার নই, আমার বাড়ি যে ভেঙে দেবে আমি একশোটা বিয়ে করলেও তাকে বিয়ে করতে পারবো না।

– আচ্ছা বেশ, যদি একই দিকে থাকি? মানে থাকে? যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটেন আর আমেরিকা একই দিকে ছিল, অনেক ব্রিটিশ আমেরিকান সোলজারদের বিয়ে করে, যুদ্ধ শেষে আমেরিকা চলে যায়।

– নাহ, এবার দাড়ি রাখতে পারিস, ইউ আর্নড ইট।

মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হল অবহেলা। যেকোনো প্রতিকূলতায় মানুষ প্রথমে ভয় পাবে, সচেতনতা গড়ে তুলবে, প্রয়োজনে লড়াই করবে, প্রতিরোধ গড়ে তুলবে আর অবশেষে ব্রহ্মস্ত্র – হাল ছেড়ে দেবে। এই অসম্ভব ক্ষমতাটির জন্যেই বিপর্যয় মানুষের কাছে অসহায়। পৃথিবী কয়েক লক্ষ প্রাকৃতিক বিপর্যয়, মহামারী, যুদ্ধ, গণহত্যার সাক্ষী, তবু খুব সহজেই কয়েককোটি মানুষের মৃত্যুদিয়ে সব ঋণ শোধ করা সম্ভব এবং এতে সমগ্র প্রজাতির প্রায় কিছুই যায় আসেনা।

নিশিকান্ত প্রায় দুশোবছর আগে কলেরার সঙ্গে সংসার ভাঙার পর ঠিক কি করেছিল? নিজের নাম পুনর্ব্যবহার না করার কারণ কি শুধুই শখ, অমন অখ্যাত মানুষের কি সে শখ মানায়? পিকলু বাড়ি বদলের পর কি তার প্রথম বিয়ে সেরে ফেলেছে? সেরে ফেলাই উচিৎ কারণ, সাতটি বিয়ে ঠিক করে উপভোগ করতে সময় লাগে। জানলা ধরে বৃষ্টির উল্টো দিকে লম্বা লম্বি শুয়ে নিভৃতর প্রচুর প্রশ্ন পায়। উত্তর এখানে খুব জরুরি বিষয় নয়, কারণ প্রশ্নগুলি নিয়েই অনেকটা সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়। পিকলুদের এন্টেনাটা আজীবন কেমন পিকলুদের এন্টেনা হয়ে থেকে গেল। অবশ্য সেটা হয়তো নিভৃতের কাছেই, অন্য কোন জানালার মানুষ নিশ্চয়ই তাকে রিঙ্কুদের বা বান্টিদের এন্টেনা বলে ডাকে। গতকাল লেখাটা ছিঁড়ে ফেলার পর, আবার একটা কেমন খাপছাড়া গোছের লেখা লিখেছিল নিভৃত, সেটা ঠিক শেষ হলো কিনা ও নিজেও বুঝতে পারছেনা, কেমন যেন একদিক থেকে বিবেচনাহীন, গল্পহীন, পরিকল্পনাহীন একটা লেখা, যেন কিছু একটা লিখে যেতে হবে যতোক্ষণ না ভালো কিছু মাথায় আসছে। ভাষাটাও মনে হয় প্রয়োজনের থেকে বেশি আঁটোসাঁটো হয়ে গেছে, নাহ, একটু জল ঢালতে হবে, গল্পে মোচড় আনতে হবে, তার ওপর বৃষ্টিটা যদি না কমে তাহলে হয়তো বিপর্যয়ের সঙ্গে বৃষ্টির এই যোগাযোগের প্রতিবাদটাও টিকিয়ে রাখা যাবেনা।

– পড়লাম, কিন্তু বুঝলাম না।

– মানে? না বোঝার কি আছে, কঠিন তো কিছু লিখিনি।

– আরে, ধ্যাৎ কঠিন কিছু না, মানে কি সব, যা-খুশি একটা লেখা, মনে হচ্ছে তুই নিজেই ঠিক করতে পারছিস না কি লিখতে চাইছিস।

– বুঝলাম, তোর প্যারালাল লেখা পছন্দ না।

– প্যারালাল লেখা আবার কি, সাদা কাগজে তিনটে আঁচড় কেটে দেওয়া মডার্ন আর্ট টাইপ কিছু তো?

– বলতে পারিস। এটা অনুভব করতে হয়, বুঝতে হয়, কিছুটা কনক্লুশন নিজের মতো সাজিয়ে নিতে হয়।

– তাহলে বই কেন? এর থেকে একটা খাতা দিয়ে দে না, লিখেও নেবে, যত্তসব। শোন।

– কি?

– তুই দাড়ি রাখিস না। কেটে ফ্যাল।

পিকলুদের এন্টেনাতে তখন একটা কাক বাসা বেঁধেছে, বলে হেলান দেওয়া যাচ্ছেনা।

নিভৃত মনে মনে হাসলো, হয়তো এই জন্যই নিশিকান্ত নাম বদলেছিল, কারণ ও স্বাধীন, যা খুশি লিখতে পারতো, এডিটর, প্রুফরিড ছাড়াই ছাপতে পারতো, নাম বদলাতে পারতো, কারুর যায় আসেনা, এবং সেই জন্যই নিশিকান্তরও যায় আসে না। পিকলুদের এন্টেনার পেছনে আস্তে আস্তে ভোর হয়ে এলো, বৃষ্টি থেমে এসেছে, সামনের কচুবনের পাতা গুলোর ফাঁক দিয়ে কিছু একটা ছুটে বেড়াচ্ছে, তবে একটা ভ্রমর বা জুঁইফুল হলে একশোয় একশো। নিভৃত শুনতে পেল তার ঘরের দরজা ভাঙার শব্দ। আমেরিকার সেনারা ব্রিটেনে ঢুকে পড়েছে, এবার ওয়ার ব্রাইড বা ওয়ার গরুমকে পছন্দ করতে হবে, পক্ষের সেনা, নাকি বিপক্ষের। না পূর্বনির্ধারিত, পক্ষের সেনা পিকলুর। কিছুক্ষনের মধ্যে ধোঁয়ায় ঘরটা ঢেকে গেল, পেছনে চাপা তদারকির আওয়াজ। পিকলুদের এন্টেনাটায় যুযুৎসু বসে আছে। নিভৃত প্লাস্টিকের প্যাকেটে ঢোকার আগে মুচকি হাসলো, যাহ ! এসব করতে গিয়ে গল্পটার গতি করা হলোনা, একটা যুৎসই নাম দেওয়া হলোনা, গল্পের নামকরণটাই সব, এমন একটা নাম খুঁজতে হত যার সঙ্গে গল্পের সম্পর্ক নেই বা ধরা যাবেনা। হায় রে, এখন কেউ পিকলুদের এন্টেনা নাম না রেখে দেয়।