সজল আহমেদ-এর কবিতা

Spread This
Sajal Ahmed

সজল আহমেদ

কাঁচা ব্লেড ও একটি প্রাচীন আয়না

কেউ কেউ বাড়ি না ফিরে অন্য কোথাও ফিরতে চায়। গতজন্মের আকাশের কাছে অথবা ভবিষ্যতের কাঁচা রোদের কাছে। একটি আমলকির ঘ্রাণে যে ঘুম ভেঙ্গে যায়, তাঁর নির্দিষ্ট দূরত্বে একটি পাঁচ বছরের বালক নুনু ঝাঁকিয়ে নগ্ন মানচিত্রকে কাঁপানোর ব্যর্থ আদিম চেষ্টা করে। কিন্তু রৈখিক সমাজ শেষপাতে একটু ঘন দই পেতে চায়। মিথ্যে রাখালের গল্প- সত্য ভেবে ভেবে বাঘেরা ফিরে যায়। হরিণমুখী কিছু বানর চেঁচিয়ে ওঠে তখন মনে হয় একটি সস্তা ব্লেড দিয়ে পৃথিবীর সমস্ত ভ্রু ছেঁটে ফেলি। তখন প্রিয় কুকুরছানা আমাকে মনে করিয়ে দেয়, শোবার ঘরে একটা বড় প্রাচীন আয়না আছে। যা থেকে বছরে বছরে পালানোর যথেষ্ট চেষ্টা করেছি। সফল হয়নি। তাই আজও বাড়ি ফেরা হোলও না। কাঁচা ব্লেড দিয়ে আয়না কেটে ফেলা হল না।

লোহার জাহাজ

শৈশবে একটি আস্ত লোহার জাহাজ কিনবো বলে সেই যে বাড়ি থেকে পালালাম তারপর আর ফেরা হল না। পাড়ার মুদি দোকানে বিক্রি করে দিলাম গতজন্মের গোলাকার রঙিন চশমার ফ্রেম। এরপর খুব সস্তায় কিনে ফেললাম একটি লোহার পাহাড়। দিনরাত লোহা পেটাতাম, কিন্তু জাহাজ আর তৈরি হলো না। অবশেষে একটি নৌকা নিয়ে শহরে ফিরলাম। একজন বয়স্ক ভিক্ষু আমার পরিচয় জানতে চাইলো; আমি প্যান্টের দীর্ঘ চেইন খুলে একটি লম্বা পেঁচানো আয়না দেখিয়ে দিলাম। কিন্তু ভিক্ষুকটি আমাকে চিনতে পারল না। দূরে দাঁড়িয়ে ছিল একটি ন্যাড়া পাগল। সে তার কুৎসিত হলুদ দাঁত বের করে হাসলো আর বিড়বিড় আমাকে জন্মের মতো গালাগাল করতে লাগলো। আমি সম্পূর্ণ প্যান্ট খুলে দৌড় শুরু করলাম। মাঝে মাঝে পেছনে ফিরে দেখছিলাম পৃথিবীর মানচিত্রটা শেষ হলো কিনা! মানুষ বলে আমি আর এগুতে পারলাম না।

শীত ও বৃষ্টির আয়নাদূরত্ব

মেয়েটি একটি গলি দিয়ে হাঁটছিল। মেয়েটি একটি শরীর নিয়ে হাঁটছিল। মেয়েটি একটি অন্ধকার রাত মাথায় নিয়ে হাঁটছিল। একটি সাইকেল, দুটো চাকা নিয়ে ঘুরছিলো। একটি কাককে কালো বলায় সে তার ডানা দুটো কেটে ঘুমিয়ে পড়লো। বাবলুর মন খারাপ, তার প্রিয় কুকুর টমি আজ বমি করেছে। নিচতলার বাড়ির কাজের মেয়ে মহুয়াও আজ ভীষণ বমি করেছে। তাই শুনে তিনতলার মানিক কাকা, চারতলার গণেশ মামা ও দোতলার গিটারের শিক্ষক অনিমেষ খুব চিন্তায় পড়েছে। পাড়ার সবচেয়ে বড় (হারানের) মুদি দোকান সকাল সকাল খুলে যাচ্ছে। পাটের দড়ি না কিনে আধুনিক প্লাস্টিকের দড়ি কেউ কেউ যত্ন করে কিনছে। রাত গভীর হলে দু’একজন মাতালেরা সরু রাস্তা দিয়ে টলতে থাকে। ডাস্টবিনের ভিতর আজ পল্টুর মা ময়লা ফেলতে গিয়ে দেখল টমির বদলে মহুয়া গোল হয়ে, ভাঁজ হয়ে ঘুমিয়ে আছে। এই শীতের সকালে একটূ বৃষ্টি হলে ভালো হতো। আয়নার ভিতরের ছবিটি আর একটু পরিষ্কার হতো।

কুকুর জীবন

প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে একবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দেখে নিই মানুষ চেহারাটি। তারপর ঘুমোতে যাই সকালে। ঘুম থেকে উঠে পুনরায় আয়নার সামনে দাঁড়াই। আমার মানুষ চেহারাটি দেখে ভীষণ মন খারাপ হয়ে যায়। প্রতিদিন ভাবি একদিন সকালে উঠে আয়নায় দেখব আমি একটা কুকুরছানা হয়ে গেছি। হায়! বোবা ঈশ্বর আমাকে একটি কুকুর জীবন তুমি দিতে পারোনি। এই মিথ্যে মানুষ জীবন আমার আর ভালো লাগে না। ভিতরে কুকুর বাহিরে মানুষের নকল চেহারা নিয়ে অভিনয় করতে আর ভালো লাগে না। আমি সবসময় একটি কুকুর জীবন চেয়েছি। মানুষগুলো প্রায় আমাকে ভুল করে মানুষ ভেবে বুকে জড়িয়ে ধরে। আমিও জোরে কামড় বসিয়ে দিই। আবার পাড়ার কুকুরেরা আমাকে মানুষ ভেবে প্রায় কামড়ে দেয়। মানুষের মতো কুকুরও আজ মানুষ আর কুকুরের পার্থক্য বুঝে উঠতে পারে না। বোবা ঈশ্বর, একটু আগুন হবে শেষবারের জন্য একটি সিগারেট ধরাব অবিকল মানুষের মতো করে!