মোস্তাফিজ কারিগর-এর কবিতা

Spread This

মোস্তাফিজ কারিগর

১। বীজ ও শস্যক্ষেত্র

নদীর নির্জনে পথ, গহীন, গুল্ম-বৃক্ষময়; ছিলো সাপের শ্বাস
বাতাসে উড়ন্ত আঁধারে, প্রেতভয় নয়– ডাকাতের ছায়ারা
হাঁটার প্রতিযোগী ছিলো, রাত হয়েছিল জ্যোৎস্নাদি নিয়ে;

বন্ধুর সাথে সেই পথ হেঁটে এসেছো সেদিন, বিঘ্নহীন; বালিচকের
বাবলার দাঁতে রেখে এসেছিলে মৃত্যুর পরিচিত নাম

আজ এই অবরুদ্ধ ঘড়ির শব্দের ভেতরে বসে
সেই পথের কথা ভাবছো তুমি
আর ছিঁড়ে যাওয়া রঙিন মোজা রিফু করে যাচ্ছো

রিফু হতে হতে অবলুপ্ত সূর্যভ্রমণের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছো
আঁধার হয়ে, আধেয় হয়ে

সেই নির্জন পথ, প্রমগ্ন নদী, বালিচকের অনন্তমূলে
কোনো বন্ধু নেই, তুমি একা, বীজ ও শস্যক্ষেত্র;
বাতাসে অবিরাম দুলছো সূর্যের নিত্য ডানার দিকে

২। পরমহংস

দুই নদীর মাঝখানে মায়ের জন্ম
নক্ষত্র থেকে খসে পড়া আকাশের বিরাট ভেতরে
রাতের মতো গভীর বৃক্ষের নীচে;
এক নদী মাকে জাগিয়ে যায় পৃথিবীর চোখে,
পাহাড়ের সংগুপ্ত গুহার আঁধারে আর এক নদী
মাকে নির্জন ঝিনুকের নাম ধরে ডাকে;

মুক্তোর নদী চারিদিকে টলমল
মা জলে দুধ রেখে দেয়

একই স্রোত একই গান
আমাকে ভাসিয়ে রাখে, উজানের দিকে;
জল আলাদা করে মায়ের মুক্তোদানা
দুধের মতো খেয়ে নেবো

মায়ের এই আবহমান দুটো নদী –
সূর্যের মতো জাগে, রাতের শীতল আঙরাখায়
রেখে দেয় আমাদের নিশ্চিন্ত বালিশ

৩। অতলান্ত মুকুর

নির্জন দুপুর হয়, আরও–অগাধে অন্তর্লীন;
এজমালি পুকুরের একান্ত সিঁড়িদের সুষুপ্তি ছুঁয়ে
নামো জলের বিহ্বল মুকুরে সন্তর্পণে 
নিজেরই ছায়ার অতলান্তে, দীপ্ত দীপকে
ভেসে যেতে যেতে আকাশ যেভাবে মেঘ খুলে
ধ্রুবকলার জ্যোৎস্না জাগায়–
আমঝুম ফলের মতো ব্লাউজের বোতাম
খুলতে খুলতে নেমে যাও জলের শীতল দিকে

রোজ রোজ খুলে ফেলে জলের কপাট
আশ্চর্য নেমে যাও সোনার ঘট থাকা গভীরে!

দেখার নিমগ্ন ঢেউয়ে কেঁপে আমিও দুপুর হই নিঝুম
তমালের নুইয়ে পড়া ডাল যেখানে জলপ্রার্থী;
উপচানো সোনা নিয়ে কে তুমি উছল জেগে
টিপে দাও দুপুরের তৃষ্ণাতুর বোতাম!!!

৪। ঢেউ

সজারুকাঁটার মতো বৃষ্টি ঢোকে আমাদের নাঙা ঘরে
মায়ের ভেজা শাড়ির পাড় ধরে দাপিয়ে
বাবার পোষা সর্দি- কাশির দিকে

মা স্মৃতিলগ্ন হয়ে গড়িয়ে পড়ে তার রিঙ্গনকালে–
মায়েদের ছোট্টঘর ছিলো, তালপাতার ব্রাত্য সেলাই
আকরির ভেতর থেকে ভাত বেছে খেতে খেতে
মায়ের বয়স জ্যোৎস্নার অতল হয়েছে

ছোট্ট তাদের গ্রাম, নদী ছিলো, অনেক নৌকা
দুপুরের মতো সারি সারি তালগাছ, বড়ইবন;
মায়ের দেহলি জুড়ে সেইসব ঘন নির্জন রেখা
এখনো আকাশের দিকে উঠে যায়

সেইসব রেখার উপরে আমাদের শুইয়ে রাখে মা
আদর করে, চোখের ঝিনুকে থাকা মুক্তো দেখায়–
গলে গলে পড়ে, পাহাড়ের ঋজু খাঁজ বেয়ে

মায়ের শরীরে মিশে আমরা ঢেউ
উপত্যকা থেকে ছড়িয়ে পড়ছি গভীর সমুদ্রশঙ্খনাদে