গৌতম গুহ রায়-এর কবিতা

Spread This
goutam Guharoy

গৌতম গুহ রায়

১। হাত

ঐ তালি দিতে দিতে নেমে আসছে আমার হাত
ঐ তো, আমার সাদা হাত, রক্তশূন্য, নিবিড় আলিঙ্গনে জড়াতে চাইছে উষ্ণ কপাল
নখের গভীরে লুকিয়ে থাকা ঘাম ও রক্ত, ধাপে ধাপে নামছে সে
দোতারার ছেঁড়া তারের থেকে, ইজেলের ছেঁড়া ক্যানভাস থেকে
ডাংগুলি শৈশবের ছক্কার উল্লাসে নেচে ওঠা হাত
কিশোরীর মেহেন্দী অলংকৃত হাত নেমে আসছে এক অলৌকিক পিয়ানোর দিকে,
মাংস রিড তার টিং টং করে বেজে ওঠে, কেঁপে ওঠে চার দেওয়াল
ঝম ঝম করে ভেঙে পড়ে জমে থেকে দীর্ঘকালের নৈঃশব্দ ।
আমার সাদা হাত, রক্তশূন্য, আঙ্গুলের স্মৃতি গুলো এগিয়ে দেয় স্বরলিপির দিকে

ঐ হাত জানালা দিয়ে ডেকে আনে বন্ধুর ভয়, শত্রুর হিংসা ও লোভ
দু-হাতে খেলতে থাকে জিঘাংসার নীল বল ।
হাতের নির্দেশ অমান্য করার দায়ে সদর দরজা দিয়ে ছুড়ে ফেলে সে
প্রভুভক্ত মাছিদের । বুড়ো আঙ্গুলের দাপুটে ছাপ ধাপে ধাপে
নেমে আসে দখল করে বাজার ও সিংহাসন ।

একটি হাত আর একটি হাতের দিকে এগিয়ে দেয় নিজস্ব এ্যালবাম
একটি মুষ্টিবদ্ধ হাত ভয়ানক ভাবে গুঁড়িয়ে দেয় অন্যজনের চেয়ালের হাড়,
একটি কলম ধরা হাত তখন সহস্র মুখে কথা দেয়,
একটি তর্জনি লংমার্চ হয়ে ওঠে, অজস্র পায়ের দাপটে ভেঙ্গে পড়ে নিখুঁত প্রাসাদ

 

২। মাদুর

একটি গুটিয়ে রাখা বাদামী মাদুর আছে আমার,
একটি ব্যক্তিগত ছায়া, তোমারও আছে ।
সেই ছায়া ও মাদুরের গোপনে রাখা ছিলো একটি জংধরা ছোরা,
আর একটি আদিরসাত্মক ছবির এলবাম ।

এই মাদুরেই সারাদিন ছায়ার দৈর্ঘ প্রস্থ মাপি,
এখানেই যৌন ছবির সঙ্গে রাত কাটাই, তুমি চুপ করে দেখো
একক ছোরা ও স্খলনের নিজস্ব সুখ ।
টিকটিক করে হাসে আন্তরিক টিকটিকি,
ছায়াও তার মতো দেয়ালে লেপ্টে ওঠানামা করে ।

আমি দেখি সেই ব্যক্তিগত গহ্বর, আত্মগোপন করে থাকা আদি কীট
দেয়ালের গোপন থেকে ডানা মেলে উড়ে আসে । ভয় পাও তুমি
ছায়া আর তুমি আলো হয়ে যাও, মাদুর আর আমাদের উষ্ণ আশ্রয় থাকেনা
ক্রমশঃ একটি মাংসপিণ্ডের মতো গহ্বর দিয়ে গড়িয়ে যাচ্ছো,
আর তোমার যাবতীয় অহংকার ছায়াদের গায়ে দাউ দাউ জ্বলে উঠেছে

 
৩। চিয়ার্স

এই কাঁধ থেকে, বুকের ছাতির একটা দিক থেকেও কিছুটা মাংস কেটে নাও
টুকরো টুকরো করে তা গেঁথে নাও আয়রন স্টিকে,
লাল উনানের তাপে মালার মতো ঝুলিয়ে দিও সেই খন্ড খন্ড মাংস ।
আমার কাঁধ ও বুকের জমাট ঘাম আগুনের তাপে বাষ্প হবে প্রথমে
ভেতরের জমাট চর্বি টপ টপ করে গলে পড়বে,
বনভোজনের লালাভ স্মৃতি নিয়ে আপনারা
পরিচর্যা করবেন ক্ষুধার, আগুন ঘিরে আদিম মানুষের মতো
চামড়ার কৌপিন পড়ে ঘুরে ঘুরে নাচছেন ।
তিলে তিলে জমানো আমার দেহের চর্বি
ফোঁটা ফোঁটা করে আগুনের গায়ে এসে
উসকে দেবে আগুনের ভেতর, কাঠ ও কয়লার মধ্যের তাপ ।
মৃত, আদিম কোনো গাছের ভেজা বল্কল ছুঁয়ে কেউ হয়তো
পাখিদের উড়িয়ে দিয়েছিলে, দাবানলের আগে ।

আগুনের তেতে ওঠা ক্রূর সন্ধ্যায়, এই মাংসের পোড়া গন্ধে
আপনাদের মতো আমিও বলছি, ‘চিয়ার্স’

৪। কর্ণ ২

পাঞ্চালীর কপালের লাল মুছে দেবে মৃতের মধ্যমা,
তোমরা কি জানো? সারিবদ্ধ চিতার আগুনে ঘিরে ফেলা রণক্ষেত্র থেকে
আমাকে বলে গেলো একটি পুড়ে যাওয়া জলপাই পাতা, আর
আকাশ মাথা নিচু করে, গভীর বিষাদে
ধূসরতার মধ্যে আবেগের আঁচ নিয়ে
আগুনের শিখা গুনিতে থাকো একক অশ্বারোহী তুমি

তোমার ব্যক্তিগত চাকাগুলো ভেঙ্গে পড়লে
লাগাম এনে দেবে নিজেরই শরীর,
আর মৃত অশ্বের খুর থেকে তুলে আনবে ধাতব চিহ্নের চাঁদ

হে সূতপুত্র, দগ্ধ রণক্ষেত্রেরও আগে তোমার আস্তাবলের স্ফুলিঙ্গ গোপন করে
রেখে ছিলে অচেনা আনন্দের শলাকা,
সাপের মণির মতো সেই চক্ষুহীন বীজ আজ আকাশের ছুঁয়ে আগুনের কথা বলছে