সম্পাদকীয়

Spread This

“দু-বিঘা ‘চটুইমুখী’ ধান বুনেছি কত্তা এবার…” অনন্ত বললো, খুশি মুখে। “এবার লবানটো খানিক ভালো করেই করবো। বিষ্টিও হয়েছে ঝোরোল। ধান একেবারে লকলকিয়ে উঠেছে। আসতে হবে কিন্তু কত্তা লাবানে।”
দু-বিঘা চটুইমুখীর পায়েস! সে যে অনেক অনন্ত। সারাবছরে খেয়ে শেষ করতে পারবি!
“সারাবছর কেনে কত্তা? এখুন দু-তিন বছর ওটো আর বুনবো না! আর তাছাড়া কিছু বিচব! লবানের আগেটো তে। খানিক পয়সা এলে লবানটো জুত করে করা যাবে।”
‘লবান’ মানে ‘নবান্ন’। বীরভূমের গাঁয়ে গঞ্জে ‘লবান’! দুর্গাপুজো, কালীপুজোর পরে সবথেকে বড় উৎসব। অঘ্রানের নবান্ন! হেমন্তের নবান্ন।
মাঠ থেকে খামার, খামার থেকে ভাঁড়ার পর্যন্ত যার গন্ধ ছড়িয়ে থাকে। গরুরগাড়ির চাকা, বয়ে আনে নবান্ন। মাঠ থেকে খামারের দিকে। ভাঁড়ারের দিকে।
এও এক অনন্ত যাত্রা। সমৃদ্ধির যাত্রা। যৌথথার যাত্রা। সারা অঘ্রান জুড়ে চলে এ উৎসব। একে অপরকে খাওয়ানো, একে অপরকে নিমন্ত্রণের মধ্যে দিয়ে!
“জমি চাষের বড্ড জ্বালা কত্তা…!!!” কোনো একদিন বলেছিলো মধুসূদন। মোদো!
কখনো অতিবৃষ্টি, কখনো খরা। আবার কখনো অকাল বৃষ্টি। শরতে শিশির না পড়লে ধানে দুধ আসেনা। আলোধান বেশি হয়। আশ্বিনে শিশির পরলে ধানে দুধ আসে। সেই দুধ জমেই তো ধান!
কচি ধান চিবালে ঠোঁটের কোনে দুধ জমে সাদা সাদা!
“কিসি বিলটো কি বটে কত্তা?”
মোদো শুধায় সেদিন সন্ধ্যা বেলা! চণ্ডীমণ্ডপের চাতালে তখন হলুদ বাল্বের আলোয়, দুর্গার খড়ের কাঠামোর ছায়া পরেছে। সাদা কাপড় জড়ানো একচালির দুর্গা।
সমস্ত বিসর্জনের পরে কি বিজয়া আসে? নাকি সমস্ত বিসর্জনের পরে বিষন্ন ছায়া পরে মন্দিরের চাতালে চাতালে!
অথচ কিছু বিসর্জনের পরেও তো আসে নবান্ন। ঘরে ঘরে। চাল কুটতে বেলা বয়ে যায় সংসারে সংসারে। শীত আসতে শুরু করলে, বেলা এমনিতেই কত ছোটো হয়ে যায়!
গেলোবছর রবিকে তার তিনবিঘা জমি টুকুও বেচে দিতে হয়েছে, ঋণ মেটাতে। রবি আলু চাষ করেছিলো দু-বিঘা । দুবিঘা আলুর অনেকটাই মাঠেই পচে গিয়েছে…! রবির কি এবার লবান হবে!
“যার হাল তার জমি!”
“না না মোদো! এখন তো যার পয়সা তার জমি! আসলে যার ঋণ তার জমি তার ফসল!”
“তাহলে কত্তা হালের গরু যি বাগে খাবে..!!”
তাতে কি মোদো? পিঁপড়ে তো আছে! মই টানবে পিঁপড়ে! মোদো, ধান যে শুধুই বুলবুলিতে খায়না হে! না খেলেও, ভেবে দেখো খাজনা কিসে দেবে!!!”
“কিন্তু, বর্গীরা তো গেইছে অনেকদিন হোলো কত্তা…!!!”
“তাই কি মোদো? বর্গীরা কি সত্যিই গিয়েছে???”
“কে জানে বাপু…সন্ধে তো হোলো অনেকক্ষন!!!
ছেলে ঘুমোলো, পাড়াও জুড়োলো বটে…
ইবার??”

বিসর্জন, বিজয়া সব সারা। নবান্ন আসছে। চণ্ডীমণ্ডপের হলুদ বাল্বের আলোর আবছায়ায় বসে আছে কিছু মানুষ। “রাত্রি ক্রমে আসিতেছে…”! একে একে ঘরে ফিরবে সব। কেউ কেউ সঙ্গী পাবে। কেউ কেউ একা! আবার উৎসবের তোড়জোড়… লবান আসছে। আসছে নবান্ন… নতুন চালের গন্ধ নিয়ে!!!
এভাবেই আসুক ‘চলভাষ’ পত্রিকার প্রথম বছরের, তৃতীয় সংখ্যা ‘নবান্ন’। চলভাষ ছুঁয়ে থাকুক আপনাদের ।
গত দুটো সংখ্যা ‘মেঘদূত’ ও ‘অকাল বোধন’ পাঠকের কাছ থেকে অভূতপূর্ব সমাদর লাভ করেছে। আমাদের উৎসাহিত করেছে। সঙ্গে সাহস জুগিয়েছে আমাদের আরও এগিয়ে যাওয়ার। সেই সঙ্গে বেড়েছে দায়িত্ব। ‘চলভাষ’-কে আরও সমৃদ্ধ ও সুন্দর করে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব। আশা রাখি এই সংখ্যাও পাঠকের কাছে সমান সমাদর পাবে।
বাংলার সমৃদ্ধির উৎসব রইল আপনাদের ছোঁয়ায়… রইল ‘নবান্ন’।