হিরণ মিত্র-নিবারণ গলুই-এর রাত

Spread This

হিরণ মিত্র

নিবারণ গলুই-এর রাত

হাসনাবাদের সন্ধে। এখন পূর্ণিমা। নীলাম্বরী আকাশ। পিচ্ছিল নেমে গেছে। ওই গাছ-গাছড়া পিছনে ড্রপসিনের মতো, জোনাকির মতো তারারা টিপ টিপ করছে ওর কপাল জুড়ে। যেন কনে সাজানো। ওই সাজানো কপালে কালো কালো অন্ধকার ডাল চুলের মতো ঝুলে আছে। আকাশের গায়ে সেঁটে আছে। জায়গাটা প্রায় নিস্তব্ধ। একটা শূন্যতার, সাজের ভেজা- গন্ধ- মাখানো শব্দ জেগে আছে। খুব মন দিয়ে কান পাতলে ধীরে ধীরে সিঁধিয়ে যায় শব্দ। ব্রহ্মতালুতে ভোঁ ধরায়। নিবারণ সেই ঠায় বসে আছে। কেন কে জানে? একটা ঢিপির মতো জায়গাটা। শীতকালের শুরু। সাপখোপের এখনও তেমন ভয় নেই। কিন্তু নানা জাতের পোকারা জেগে উঠেছে। হয়তো পূর্ণিমা দেখতে চায়। অথবা অত আলোতে দিশেহারা। যেমন কাকেরা। ভেবে নেয় ভোর হয়েছে। কা কা করে ওই ড্রপসিন চিরে উড়ে যায় সাঁ করে। আস্তে আস্তে চাঁদ উঠছে। এখনও বেশ লাল আভা তার গায়ে। লজ্জা মাখানো লাল আভা। একটু নোয়ানো ভাব। ও যেন ধীরে আকাশের কোলে কপাল তুলছে। কোনো-এক সময় ওটা আবার কপালের মধ্যে টিপের মতো, তৃতীয় নয়নের মতো, দৃষ্টি মেলে ধরবে। নিবারণের সাত পাঁচ ভাবার শেষ নেই। ও যে কেন এইসব কথা খামোকা ভাবে। ভেবে ভেবে মরে। ভেবে আস্থির হয়। একটা ছটফটানি পেট বুক মাথা গুলিয়ে দিতে থাকে ওর। অকারণ মনে হয়। এই সাঁজে। এই আঁধারে। এই চাঁদ-সহবাস । তবুও এর একটা নেশা আছে। মনস্কতা আছে। তাই নিবারণ ওখান। থেকে ওঠে না।

নিবারণের বাড়ি কাছেই। খাটো ধুতি পরা। গায়ে সাদা ফতুয়া। একটা বিড়ি ধরায় নিবারণ। হঠাৎ তার এই বিড়ির গন্ধে এক পোটোর কথা মনে পড়ে। সেই পোটো কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওই রকম গুন গুন করতে করতে ফস করে একটা বিড়ি ধরাত। একটা পোড়া পাতা ও তামাকের গন্ধে জায়গাটার সময়-গন্ধ বনে যায়। সন্ধেগুলো রঙ, আঠা, সব মিলিয়ে বহুকাল আগের দৃশ্যে মিলিয়ে যায়। নিবারণের ধর পোটোগিরি করার শখ ছিল। কিন্তু না তা আর হয়ে ওঠেনি। তাই হাতে পায়ে রঙ মাখিয়ে ও বেশ আমোদ পায়। এসবের কারণ হয়তো ওর এই খামখেয়ালি বিচরণের। নিবারণ তেমনভাবে শহর দেখেনি। দু-একবার এধার ওধার ঘোরাফেরায় শহর ঘেঁষে গেছে মাত্র। কিনারা দিয়ে চলে এসেছে। এই এতবড়ো চাঁদ-ধরা প্রান্তর। যত সাপখোপ ভূতপ্রেত লুকিয়ে থাকুক এই আঁধারে- তা-সহ মোহময় হয়ে যায় যখন এই চন্দ্রালোক, মিঠে প্রলেপে ঢেকে দেয় তখন এইসব বনভূমি। আলো ছাপিয়ে যেতে থাকে বিপদ সীমা। কোনো শব্দ নেই। তবু অত আলো হু হু করে প্রতিটি ঝোপ, ঝাড়, পাতার খাঁজ ধরে, বুনো গর্তে সিঁধিয়ে যায়। সবাই একটা আবেশে ক্রমশই নেশাতুর হয়ে যেতে থাকে। এটা কি মহুয়ার নেশা। হাওয়ায় ভেসে আসা মহুয়া ফুলের গন্ধ। যেমন এই সময় জেগে ওঠে ছাতিম। কী তার মৌতাত। ফুসফুস ফুলের মতো পাপড়ি মেলে ধরে। ওই ছাতিম ফুলের গন্ধে। কেউ কেউ শহুরে লোক বলে ওই গন্ধে নাকি সাপ আসে। সাপ কি গন্ধ পায়? এইবার চাঁদ উঠছে। শালবনের‌ ‌‌পাশ‌ ‌‌থেকে‌,‌ ‌‌স্নান‌‌ ‌ ‌সেরে ওঠা রমণীর মতো, শালবনেরা চাঁদ-স্নান সেরে ধীরে ধীরে পাড়ে উঠছে। জলের ফোটার আলোর প্রান্তর ভিজিয়ে দিতে থাকে। বিশাল গোলাকার চাঁদ সাদা ডানা মেলবে। সাদা পালক আলো হয়ে নেমে আসবে নিবারণের ছড়ানো পায়ের কাছে। এখনও এইসব সাত-পাঁচ ভাবনা নিবারণের মাথায় চক্কর মারে। নিবারণ কি এই চাঁদের আলোয় ঘুমিয়ে পড়ল। ও নিবারণ, নিবারণ ! ওঠ ওঠ হিম পড়তে শুরু করেছে। কী করিস এখানে। এই সাঁজে, চাঁদ তো তোদের ঘরের খড়খড়ি খুলেও দেখা যায়। যা-না ওখানে মাদুরে গা এলিয়ে একটু উকি দিয়ে, মাথাটা তুলে দেখগে-না চাঁদ, ওই বাঁশের গরাদের ফাঁকে। এত কাব্যির কী আছে? যা যা, বাড়ি যা। কে একজন এইসব বাতাসে ফিসফিস করে বলে যায় নিবারণের কানে। নিবারণ ধড়মড়িয়ে ওঠে। কে, কে রে? আমায় জ্ঞান দিছিস? কোন গাঁয়ের রে? না, কাউকেই ঠাওর হয় না। হয়তো ভুল শুনছিল। এই নির্জনতা কথা বলে। এর আগেও কয়েকবার এইরকম অভিজ্ঞতা ওর হয়েছে। নিবারণ ঘাবড়ায় না। হয়তো আরেকটা নিবারণই কথা বলছিল। সে তো কিছুতেই ওর পিছু ছাড়বে না। নিবারণ এবার এদিক-ওদিক তাকায়। কোথায় একটা পেঁচা ডেকে উঠল। তার সাথে একটা বাচ্চার কান্না। ওই একটা পাখি। ডাকলেই বাচ্চার কান্না মনে হয়। নিবারণ চাঁদ দেখায় মন দেয়। ওর বাচ্চাটার আবার একটু অসুখ। হঠাৎ মনে পড়ল ডাক্তারবাবুর কাছে যাওয়ার কথা ছিল। ওষুধ আনতে। ওষুধটা বানানোই থাকবে। নিবারণের চাঁদ-দেখা মাথায় উঠল। ও ভাবল পরের দিন এখান থেকেই শুরু করবে। যেমনভাবে ও স্বপ্ন দেখে। প্রতি  রাত্রে একটু একটু করে। আজকের ঘটনা পরের রাতের ঘটনায় এসে মিশে যায়। যেমন স্বপ্নের ভিতর স্বপ্ন দেখা। সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। তুমি স্বপ্ন দেখছ তুমি স্বপ্ন দেখছ। এবার আসল স্বপ্ন তার গল্প বলে চলে । মাঝে মাঝে ভেসে থাকে ঘুম দৃশ্য। এভাবে যদি আমরা সবসময়ে, সব সময়ে থাকতে পারি। এই ধরো অমাবস্যায় পূর্ণিমা দেখা। যখন চরাচর আঁধারে ঢাকা, ঘোর অমাবস্যায় গাছগাছালি তাদের নাম ঠিকানা ভুলে কালো আকাশে, কালো সেপ্টে আছে। একটা আভাস আছে মাত্র। তখন তুমি, তোমার আকাশে পূর্ণিমা, পূর্ণিমার ভরা কোটাল। সে কী পূর্ণিমা ! অত আলো, অত রঙ তুমি দেখোনি কখনও। এইরকম ভাবনার তোড়ে ভাসতে ভাসতে নিবারণ ডাক্তারের দরজায় কড়া নাড়ে ! – না তেমন ভয়ের কিছু নেই, এটা খাইয়ে দে, একটু গরম জলে মিশিয়ে। মাঝে মাঝে জ্বরটা হাত দিয়ে দেখিস। হ্যাঁ, মাথাটা ধুয়ে দিস ভালো করে। রমলাকে বলিস ম্যালা চিন্তা না করতে। কাল সকালে খবর দিস। হ্যাঁ রে, তোদের ওই হাইওয়ের পাশের ক্ষেতটা কী হল রে? বেচে দিয়েছিস? ওটার তো ভালো দাম পাওয়ার কথা। – না ডাক্তারবাবু, ওসব আর আমার দিয়ে হলো নাই। ওসব শিবেনের, বড়দার কাজ, ও-ই সামলায়। আমার ইধার উধার করে চলে যায়। অত ভাবতি পারি না। -ঠিক আছে ঠিক আছে। শিবেনের সাথেই কথা বলব | ওর শরীরটা খুব জুত যাচ্ছে না শুনলাম। দেখা করতে বলিস। একটু দেখে দেব – নিবারণ ডাক্তারের দাওয়া থেকে নামতে যায়। দুম করে মাথাটা একটা গুঁতো খায়। যেমন ও চাঁদে চাঁদ-ভাসি হয়ে ছিল আধা ঘুমে আধা জেগে, কে একজন হঠাৎ ঠেলা মারে। ও ধড়মড়িয়ে জেগে ওঠে। উঠে এদিক-ওদিক তাকায়। প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। তারপর আস্তে ধীরে ধাতস্থ হয়। চোখ গড়িয়ে চৌকি থেকে নামে। ধুতিতে পা-টা আটকে পড়ে। এই সময় প্যালাটা যে কোথায় যায়। পকেট হাতড়ে বিড়ি খোঁজে। না, বিড়ির কাগজটা পড়ে আছে। তাই খড়মড়িয়ে ওঠে। ভাবে, যদি একটা বেঁচেবর্তে থাকে। ওই আশার-আওয়াজটা হয়তো না হলেও হত। হাতে শুধু কাগজটা উঠে আসে। লাল-সবুজ রঙের সোনার বাংলা বিড়ির মোড়ক। একটা চশমা-চোখের মালের ছবি মাঝখানে। ও ব্যাটা মালিকের ছবি। ও মুখটা ভেংচায় ওই ছবি দেখে। ব্যাটা মালিক দেখানো হচ্ছে। কিন্তু ব্যাটার বিড়িটা ভালো। এর মাঝে—বিড়ি সেঁকার মৌ মৌ গন্ধ ওর নাকে ছুঁয়ে যায়। ও একটা তৃপ্তি নিয়ে আবার দ্রুত পা চালায় ডাক্তারের বাড়ির উল্টোদিকে। গাঁয়ের একধারে ওই মোদক ডাক্তারের বাড়ি। কবে থেকে যে এখানে ডাক্তারি করছে কারও আর তা মনে নেই। ডাক্তারি পাস কিনা কেউ যাচাই করে নি। আরে রোগ সারলেই হল। ওর মিকচারে বেশ জাদু আছে। লম্বা শিশিতে কাগজ ভাঁজ করে কেটে দাগ ফেলা। চেম্বারের পাশে ঘুপচি মতন ঘরে আধো আঁধারে ওই মিকচার তৈরি চলে। লাল মতন। টেবিলে ডাক্তারের কালো ছেঁড়া ছেঁড়া ডাক্তারি ব্যাগ। উপরটা চ্যাপ্টা মতন। একটা দোচালা খেলনাঘরের মতো দেখতে ওই কালো ব্যাগ। পাশে লাউ লতার মতন পড়ে আছে স্টেথো। কখনো চালায় লতা। ঝোলার মতো ব্যাগের চালায় স্টেথো ঝোলে। গোল গোল বাইফোকাল চশমা নাকের ডগায় রেখে মোদক ডাক্তার মন দিয়ে কানের শব্দতে মন দেয়। বুক পিঠ গলা টিপে টিপে পরীক্ষা করে। জিভ লম্বা করে বের করিয়ে কী দেখে যায়। চোখের কোল টেনে নামায়। আর মাঝে মাঝে হু হু করে যায়। মাথা দোলায়। — শরীরটার বারোটা বাজিয়েছিস। একটু ভালো-মন্দ খা গা। – কোথা পাব ডাক্তাবাবু এই মাগ্যি গণ্ডার দিনে। ছেলেপুলের হাঁ ভরতে ভরতে দিন যায়। -হু! ডাক্তার বিরক্তি দেখায়। -এই ব্যাটা, লণ্ঠনটা একটু তুলে ধর ভালো করে। একটু বাড়িয়ে দে না। দেখিস যেন কালি না পড়ে। আরে আরে সোজা করে ধর, আহাম্মক, তেল গড়াবে যে। হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক আছে। নিবারণ এসব থেকে আরও দুরে চলে যেতে থাকে। ঝোপঝাড়ের পিছনে কথা, আলো, সব মিলিয়ে যেতে থাকে। আঁধারে কে যেন একজন হেঁটে আসছে। এই দিকেই আসছে মনে হয়। হ্যাঁ, তাই তো। ও-পাড়ার নিদেন খুড়ো। নিদেন পক্ষে একটা খুড়ো। একটু ঝুঁকে। ধীরে এগিয়ে আসে। কী গো? কে যায় ? ও, হারাধনের ছেলে। বল নিবারণ, কোথা থেকে আসিস। নিবারণ সংক্ষেপে জানায়। ও যা তাড়াতাড়ি পা চালা। দেখিস ওদিকে কী যেন একটা গোল বেঁধেছে। কে জানে এইসব পঞ্চায়েতগুলো একটা দু-নম্বরির আড়া হয়েছে। খালি মাল কামাও। মাল জমাও। তা তোর ক-পুরুষের মাল জমল রে? ক-পুরুষ ধরে খাবি? আর গাঁ-গঞ্জ গুলোর চেহারাটা একটু ভেবে দেখেছিস? তা কে শোনে কার কথা। যে যার ধান্দায় আছে। তুই বরং বাগদি পাড়াটা ঘুরে যা। একটু দূর পড়বে। কিন্তু ঝামেলায় জড়াস না। তোকেই হয়তো। ঠেঙিয়ে দিল দু-ঘা। এদের কি কোনো বিশ্বাস আছে। তা কে কাকে রাখে? যা যা। নিবারণ বোতলটা একটু চাপ দিয়ে ধরে। হেঁবোটার শুকনো মুখ মনে পড়ে। চিত হয়ে শুয়ে আছে। একটু যেন কাতরাচ্ছে। রমলা পাশে নিয়ে মাথার কাছে ভ্রু কুঁচকে বসে আছে। হাঁটু মুড়ে। তেলচিটে বালিশের ধারে। –মা একটু জল দেবে? -হ্যাঁ গো বাছা। ঘটিটা উপুড় করে দেয় রমলা। -বাবা কখন আসবে? -এই এল বলে। বেরিয়েছিল তো কোন বিকেলে। আলো নামার আগেই। তা কী যে হয় এই মানুষটার। আজও ওকে বুঝে উঠতে পারে না রমলা। কেমন উদাস তাকায়। কোথায় দৃষ্টি চলে যায়। কত দূর। তার আর ঠাওর হয় না। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছে। কী দ্যাখো গো ওই দূরে? কী আছে ওই ঝোপঝাড় বনবাদাড়ে? তেমন জুৎসই উত্তর পায় না। হু করে একটা আওয়াজ বের হয় মুখ আর নাকের মাঝখান থেকে। ঠিক কী যে বোঝাতে চায়। রমলা আর ঘাঁটায় না, যদি কখনও নিজের থেকে বলে। মাঝে মাঝে আনমনা পাড় বরাবর হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় ওই বাদাড়ে। কোথায় যেন ঢিপির মাথায় মাঝ রাত কাটিয়ে ফিরে আসে। উশকো-খুশকো চুল। ওরে কি ডাইনে পেল? ওঝা ডাকতে হবে নাকি শেষ পর্যন্ত ?- না রে না, ভয় পা না। ওসব কিছু না। দে একটু মুড়ি গুড় দে, খাই। কোন বেলায় বেরিয়েছি। তা ননী জ্যাঠা কিছু বিষয় সম্পত্তি বেচার কথা বলছিল। আমি বাপু ওসবে নেই। কী বলতি কী হয় | তা বড়দাকে দেখিয়ে দেব। ও যা ভালো বুঝবে করবে। তুই কী বলিস? – তোমার যেমন বুদ্ধি। হেঁবোটার ভবিষ্যি আছে, তার কথা ভাবতি হবে না? তোমার আকাশ-ফাকাশ নিয়ে থাকলিই হবে? সব বড়দা ! দাদা একদম ধরম-পুত্তুর | যুধিষ্ঠি। না বাবা, ছোটো মুখে বড়ো কথা বলব না। তোমরা যা ভালো বোঝো করো। রমলা কোমর দোলাতে দোলাতে ঝামটা দিয়ে চলে যায়। নিবারণ দাওয়ায় এসে পা-টা ছড়ায়। একটু আরাম বোধ হয়। | এখনও গণ্ডগোলের আওয়াজ ভেসে আসছে। ওই কয়েকদিন ধরে চলছে। আওয়াজ কালো কালো গাছের পাতা সিঁধিয়ে ছাঁকনি দিয়ে কিছু কিছু দাওয়ার সামনে চলে আসে। নিবারণ কানটা খাড়া করে বুঝে উঠতে চায়। মাঝে মনে হল কিছু লাঠিসোটার, ভাঙচুরের আওয়াজও পাওয়া যাচ্ছে। না বাবা, ওদিকে বেশি চিন্তা করে লাভ নেই। আজকের চাঁদটাও বেশ আকারে বড়ো। গোলের বিশেষ তারতম্য নেই। ওই অত বড়ো চাঁদে কতটা টোল পড়ল বুঝতে বুঝতেই অমাবস্যা এসে যায়। কেমন আস্তে কালো হয়ে আসে শরীর। আর ওই অন্ধকার অংশটায় যে কিছু আছে তার কোনো হদিশ থাকে না। আশ্চর্য! আবার চাঁদের গায়ের ওইসব নকশা কাটা। বসন্ত কি চাঁদের মুখেও দাগ দিয়েছে ? আমাদের ও-পাড়ার বসন্তের মতো। বসন্তের নামটাই বসন্ত হয়ে গেল। কেননা ওর ছোটোবেলায় বেশ বড়োরকম জল বসন্ত হয়েছিল। মুখটাও গেল পাল্টে। তার সাথে নাম। আবার আশ্চর্য ওই বসন্তের হাওয়া যখন এসে | বিকেলের পুকুর ধরে গায়ে ছুঁয়ে চলে যায়, তখন যেন বয়সটা এক লাফে কমতির দিকে চলে যেতে থাকে। কেমন শরীর ফুরফুর করে। ভার চলে যায়। তা ওই বসন্ত চাঁদের গায়ে। তাই নিবারণের মেখলা-মেখলা পড়া চাঁদ বেশ ভালো লাগে। একটা আবছা আলো। অস্পষ্টতায় রহস্য আনে। ভেজা চাঁদ। আলো হয়ে আকাশে গড়ায়। তখন ওই কাদা মাটিতে পা ডুবে যায়। এঁটেল মাটিতে চিট ধরে। গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসতে বেশ লাগে। ডালের ছাল গায়ে দাগ বসিয়ে দেয়। দুটো ডালের ফাঁকে পা ঝুলিয়ে একহাতে ডাল ধরে থাকা। পাতাগুলো ঝুলে ঝুলে কুমিরডাঙা খেলে চাঁদের সাথে। মেঘ উড়ছে। মনে হয় চাঁদটা তীর বেগে আলোর পিণ্ডের মতো ছুটে যাচ্ছে। নিবারণের কী একটা মনে হতে ঝুপ করে গাছ থেকে লাফিয়ে নামল। একটা খসখসানি শোনা যাচ্ছে। নিবারণ দ্রুত শরীরটাকে পাশের ঝোপে সিঁধিয়ে দিল। জায়গা একটু নেড়া মতোন। চারিদিকটা বড়ো বড়ো ঝোপে আড়াল করা। এই সময় মেঘটা চাঁদ ঢেকে দেয়। একটা আবছা আঁধার। জায়গাটা ভুতুড়ে করে তোলে। নিবারণ চোখ বড়ো বড়ো করে দেখতে যায়। কিছু ঠাওর হয় কিনা। একটা ধস্তাধস্তির আওয়াজ পাওয়া যায়। কয়েকজন লোকের মাথা কালো মাথা গাছের মাথার সাথে মিশে মিশে গাছ-মানুষ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছু মাথা দ্রুত নড়ছে। তেমন বাতাস দিচ্ছে না। তাতেই বোঝা যায় ওগুলো নির্ঘাত মানুষ। নিবারণ দম বন্ধ করে চুপচাপ গুঁড়ি মেরে বসে। নিজের নিশ্বাস ওকে চমকে দেয়। একটা বাদুড় জাতীয় ফড়ফড় করে উড়ে পালায়। নিবারণ আর কোনো দিকে দেখছে না। পালাবে কি না ভাবছে? যদি ধরা পড়ে যায়, সাক্ষী হয়ে যাবে। আবার সাত-পাঁচ ভাবনায় ওর পা-টা ও বুঝতে পারে সাতমন ভারী। এমন সময় মূর্তিগুলো আরও স্পষ্ট হয়। এবার দেখা যায় একটা অসহায় লোককে কয়েকজন টেনে হেঁচড়ে ওই পুকুরের পাশে এনে ফেলছে। লোকটার মুখ বাঁধা। একটা গামছা দিয়ে। এতদূরেও বোঝা যাচ্ছে। হাত দুটোও পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা। পা-দুটো ছাড়া। অ্যাঁ! ওকে কি ওরা জবাই করবে নাকি ? এখন আর ভাবার কোনো সুযোগ নেই। একা নিবারণ কোনো নিবারণই করতে পারবে না। নিবারণদের এইরকম দেখে যাওয়া চোখ বুজে) কাজ। কান চেপে ধরে আর্তনাদ শুনে যেতে হয়। বলাই খুন হল- বলাই প্রধান। চাঁদনি রাতে, ভেজা চাঁদের পুকুরপাড়ে। শামুক-গুগলির, ব্যাঙাচির পাশে বলাই-এর শরীরটা পড়ে থাকে। স্পন্দনহীন। এখনও কিছু মাছ পুকুরে খাবি খায়। জলগুলো গোল হয়ে হয়ে ভাঙা চাঁদের আরশি হয়ে পুকুরময় ছড়িয়ে পড়ে। গুবগাব আওয়াজ ওই ঝিঁ ঝিঁ ভরা সন্ধেতে অবিরত ঝরে ঝরে যেতে থাকে। কালো আকাশ, কালো পুকুর, কালো একটা শরীর কাত হয়ে রক্তমাখা উপুড় হয়ে রাতকাটার অপেক্ষায় পড়ে থাকে। নিবারণ গুটি গুটি ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসে।