সমীরণ ঘোষ-এর কবিতা

Spread This

সমীরণ ঘোষ

শূন্যস্থানের দৃশ্যাবলি

আর কথাবার্তা হল না,
দূরে দাঁড়িয়ে মনে হল দূরত্বটুকু ছাড়া দৃশ্যের মুক্তি নেই।
ট্রেন রেখে প্ল্যাটফর্ম চলে যেতে থাকল
শতরঞ্জী মোড়া বিছানা বাগিয়ে পাহাড়ের কোল ঘেঁসে
ঘুমিয়ে পড়বে বলে। চারদিকে কী শীত আর কুয়াশা,
যেন মুলক রাজ আনন্দ যাচ্ছেন দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশে।
সবুজ প্রাণের সবগুলি মহল্লায় বিনাবাঁধায়
ঢুকে পড়েছে মেঘ বৃষ্টি,-
তবু কিঞ্চিৎ বিব্রত ভঙ্গিতে আগুন জ্বলছে কোনও নিঃসঙ্গ টিলায়।

স্বপ্ন দেখার জন্য কোনও প্রস্তুতির দরকার নেই
আমরা ব্যবহৃত হতে থাকব স্বপ্নে ও জাগরণে
শূন্যস্থানে যথাযথ পূরণ করা হলে
অতৃপ্তি হাত ধরে সজীব দৃশ্যের, কখনও বিভ্রমবশত
কুয়াশার চাদর সরিয়ে দুহাতে তুলে ধরি লাবণ্যমুখ
জলের ভাষায় বলি রণরক্ত, বলি চুম্বন,
পরক্ষণে বুকের মধ্যে গড়িয়ে যায় পাথর, পাথর।

 

 

খবরদার দুঃস্বপ্ন দেখবেন না

চতুষ্পদ হৃদয়ের তিন পা ডুবে যায়
ত্রিকাল অমাবস্যার কালিন্দী পাথারে
তারপর আর জীবনের কথা অবশিষ্ট কিছু থাকে
হাটের পেন্সিল ছাড়া ! অতএব শুরু হোক
ইস্পাত দিয়ে কংক্রিট দিয়ে কিংবা
পুতুলমহিষীর পমটেম আর চিকেন বিরিয়ানি ভক্ষণ দিয়ে

কথাবার্তা দিয়ে কিছু চিঁড়ে ভিজানোর প্রস্তাব আছে
অসুবিধা কিছু নেই কাছে এসে পরখ করতে পারেন
একপেয়ে বকধার্মিক নাকি বকচ্ছপ
আহা উহু-র প্রয়োজন নেই মহিলারা পোশাক পরবেন
স্ব-ইচ্ছায়
আর তাদের যদি ঠাণ্ডা না লাগে, আপনার কী গা?

আপাতত কোথা থেকে শুরু হতে পারে তারই জল্পনা
কী ভাবে এগোলে গতি সর্বোচ্চতর এবং কেমন লাফালে
মহকাশে দুই কামরা, লাগোয়া বাথরুম ।
স্বপ্ন দেখুন , খবরদার দুঃস্বপ্ন দেখবেন না ।

 

 

পর্যালোচনা

মুখোমুখি অনেক বসেছি আমরা
(জীবনানন্দ হলে বলতেন ঢের বসাবসি)
সখ্যতা ঘন হয়ে রাঙা হয়ে ক্রমে কালচে ছায়াছন্ন,
ঘাসের চাদর থেকে গড়িয়ে বরফের শতরঞ্চিতে
মদ মাংস আগুনের কাছে জিহ্বার খসখসে শব্দে
চামড়ায় শিহরণ বয়ে যাওয়াকে শরীরের সার্বিক বোধ বিবেচনা
যা-ই বলি না কেন, বুকের মধ্যে খাঁচা, খাঁচায় জলপাত্র,
আগুনের আঁচে আধপোড়া পাখি, বাকি কথা
যেমন গেয়েছে বাংলার বাউল। আর
যেভাবে ছড়িয়েছি আমরা শরীর থেকে শরীরে,
জীবন থেকে প্রাণে, প্রাণ থেকে মৃত্যুতে,

কত হাস্যকর উপকরণ দিয়ে তৈরি হয়েছিল
একেকটি প্রস্তাব !

ডোরবেল

একটা সবুজ ভোরবেলা, ডোরবেল বাজল।
হতচকিত ছড়ানো অন্তর্বাস, নৌযান নোঙর তুলেছে,
কুকুরের ভৌ, তোমাকে স্যালুট করে বাথরুমে ঢুকে পড়ল
সবগুলি ব্যাপার, তুমিও পিছু পিছু সেই ছোটঘরে গিয়ে দেখলে,
কী দেখলে যেন? উচ্ছসিত জল, আর তাতে সাঁতার কাটছে
তিন খণ্ড মল। এছাড়া কমোড টাওয়েল আয়না ইত্যাকার
সামগ্রী সব যথাযথ।
ভাবছ কোন সুজনের সুবর্ণ পশ্চাদভূমির
এই ফসল, সুর তোলা নূপুর!
তারপর কতদূর চলে গেল সবুজ ভোরের ডোরবেল।
এবার একটু অন্যভাবে পিছু নেওয়া যাক, –

ডোরবেল ছিল না যেদিন,
দরজায় কড়া ছিল, অধৈর্য খটখট খটখট,
তোমার দোদুল্যমান দু’পায়ের নীচে
উল্টে পড়ে আছে কেঠো চেয়ার।
সমস্ত রকম প্রসাধন সামগ্রী, যৌনতা, এমনকি
আকাশবাণীর মুখবন্ধ রাগ, -সব
নানারকম গর্ত ও গর্ভগৃহে ঢুকে পড়ল।
কেবল চেয়ারটা তোমার ঝুলন্ত পায়ের নাগালের বাইরে
কাত হয়ে, দে দোল দোল,-

 

কোথাও না পৌঁছানোও একটা সুসংবাদ

মুহূর্তের জন্য একবার থেমেছি, ভোর হচ্ছে
পৃথিবীতে, সরু ও দীর্ঘ ওভারব্রিজের ওপর
যথার্থ কারণ ছাড়াই থমকে দাঁড়াই। মনে হল,
কোথাও না পৌঁছানোও একটা সুসংবাদ।

স্থির চিত্রে সাঁটা হয়ে আছে আলো অন্ধকারের
সমন্বয়। কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকা কুকুরের প্রাণে
চিত্রপট নড়ে ওঠে, আর ত্রাহি চিৎকারে ভেঙে যায়।
পাশ কাটায় বস্তা জড়ানো পাগল।

চুপ করে দাঁড়িয়ে এইমাত্র জেগে ওঠা সুসংবাদটি নিয়ে
নাড়াচাড়া করছি, যেন আমার পূর্বাশা দ্বীপ,
হতভম্ব কুকুর আর পাগলের কাছে দাঁড়িয়ে
পেট খালি করে একচোট হেসে নেবার – সুযোগ হল
ভোরের বাতাসে বরফ কুচির মতো ঝরছে
কোথাও না পৌঁছানোর সুসংবাদ।

 

অন্তহীন সাদা কালো

বহুদিন যাওয়া হয় না
সুন্দর আর অসুন্দরের ঘোরদোর বাগান পুকুর ছাড়িয়ে;
পথটা মাঝে মাঝে বুকের মধ্যে এসে হামাগুড়ি দেয়
তর্জনী তিরতির করে কাঁপে
মধ্যমার সঙ্গে টেবিলে তাল ঠোকে কখনও ।
একটানা বৃষ্টি, জল, একটানা বিষোদগার করতে করতে
ঘুমিয়ে পড়ছে সবাই-
শান্ত ও নির্বিকার, অন্তহীন, সাদা আর কালো।

এক জীবনের মুরগি জবাই,
আমার চোখের সামনে, আমি সেই দৃশ্যের ভিতরে রয়েছি,
কখনও বাইরে, – শরীরের ধারালো দিকটায় রক্ত লেগে আছে,
ভোঁতা দিকটায় অপ্রত্যাশিত ব্যথা।
ম্যালেরিয়ার কুইনাইনের মতো গিলে ফেলছি ভালোবাসা ।

 

লাজুক হাত ধরা

অবিরল বৃষ্টি বিচ্ছুরণ আর আলোর ধারাপাতে মরে যাচ্ছিলাম।
পথের উপর দাঁড়িয়ে নোখ খেলাম, কব্জি ডুবিয়ে ঘড়ির কাঁটা।
আঙ্গুল দিয়ে রগড়ে দিয়েছো মাথার ঘা,
ভালোবাসার জন্মদিনে কী করে মৃত্যুর কথা উঠে!
পকেট চৌচির করে ভুলতে চাইছিলাম অনামিকা নদী
আর দুর্বলতায় হলুদ বর্ণ ঝিঙে ফুল পাপড়ি খুলছিল
আর তুমি দেখছিলে বসন্তের নীল নীরক্ত মাতলামি,
গোড়ালি–ছোঁয়া পাঞ্জাবির তলায় চুনোপুঁটি প্রাণের
প্রাণান্তকর লাফ।–
তুমি সমস্ত দেখেছো বলে
মৃত্যুর কী ভীষণ লাজুক হাত ধরা-।

সমীরণ ঘোষ (১৯৫৩ – ২০১২)

দেশভাগ শৈশব আর কৈশোরের মাঝ দিয়ে আড়াআড়ি চলে গিয়েছে। কৈশোর থেকে প্রথম যৌবন শিলিগুড়ি শহর। কবিতা লেখার শুরু শিলিগুড়ি থেকেই। দেশভাগ, দারিদ্রতা আর রাজনৈতিক টালমাটালের সেই প্রথম সত্তর দশকে দাঁড়িয়ে প্রথার বিরুদ্ধে সাঁতার দেবার চেষ্টা। দুই দশক আগে শুরু হয়ে থিতিয়ে পড়া হাংরি সাহিত্য আন্দোলনকে উত্তরবঙ্গের বুকে প্রতিষ্ঠার কাজে নেমে পড়লেন। বাড়ির অমতে বাংলায় সাম্মানিক স্নাতক কোর্সে পড়া হয় নি। দিনে শিলিগুড়ির কোর্টমোড়ে চা দোকান আর বিকাল থেকে রাত অবধি শিলিগুড়ি নাইট কলেজে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি। ২১ বছরের আগেই ডাক বিভাগে পিওনের চাকরি। শিলিগুড়ির অভিজাত হাকিম পাড়ার একাধিক গলিতে চিঠি বিলি করতেন। ভয় পেতেন রক্ত, কুকুর আর মিথ্যাকে। সিনেমার দৃশ্যে রক্ত, চিঠি বিলি করতে গিয়ে প্রাপকের সারমেয় আর বাংলা সাহিত্য জগতে মিথ্যার আস্ফালন দেখে শারীরিক ভাবে অসুস্থও হয়ে পড়েছিলেন বেশ কয়েকবার। সাহিত্যের আড্ডায় মশগুল সমীরণ ঘোষ একদিন আলো নিভে আসা বিকালে খেয়াল করেছিলেন যে তার সাইকেলে থাকা চিঠির ব্যাগ রাস্তায় ফেলে দিয়ে গরু সমস্ত চিঠি খেয়ে নিচ্ছে। কবির এমন ছেলেমানুষি ডাক বিভাগ সহ্য করে নি। ততদিনে ডাক বিভাগের আভ্যন্তরীণ পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছেন। পোস্টাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। প্রমোশন আর ট্রান্সফার তাই ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট হয়ে দেখা দিল। শিলিগুড়ি থেকে ৮০ কিমি দূরে জঙ্গল পাহাড় ঘেরা নাগরাকাটাতে। ৮০র দশক শুরু হচ্ছে। যে মানুষটি তার শৈশব ময়মনসিংহের কংস নদীর পাড়ে ঝুলিয়ে চলে এসেছিল। সেই এখন মহানন্দার পাড় থেকে তিস্তা পেরিয়ে বহুদূরে পাড়ি দিচ্ছে। কলকাতা তো নয়ই, শিলিগুড়িতেও আর ফেরা হয় নি কবির। থিতু হন ডুয়ার্সের মালবাজার শহরে। কিন্তু কবি যে পরিস্থিতিতেই থাকুন না কেন কলকাতার প্রতিটি প্রতিষ্ঠানবিরোধী কাগজের সঙ্গে তার আত্মার সম্পর্ক ছিল। কবিতায় কবির রাগ, হতাশা কখনই সরাসরি ভাবে উঠে আসে নি। কিন্তু কবিকে বুঝতে হলে তার জীবনের গতিপ্রকৃতি অবশ্যই বুঝতে হত। কলকাতার চাঁদনী এলাকার বিখ্যাত সাদা বাড়িটা আর দশতলার ফ্ল্যাটে থাকা কবিকে অধীশ্বর যারা মানেন নি তাদের মধ্যে সমীরণ ঘোষ অন্যতম। আর সেকারণেই তিনি এখনো অনেকের কাছেই অপঠিত।

কবির কাব্যগ্রন্থ
প্রতিভূমিকা, রক্তবীজ, রহস্যবৃষ্টি, মুষলগর্ভ, এক অন্ধ আরেক চক্ষুষ্মাণ, দারিদ্র বিক্রি আছে, হোঁচটনামা।