পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়-অসুখের ছবি

Spread This

পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়

অসুখের ছবি

অনাড়ম্বর লেটার প্রেসে ছাপা কয়েক পাতার একটা বই। প্রকাশিত হয়েছিল বিগত শতাব্দীতে, বেশ কয়েক দশক আগে। লেখকের এরপর আরও একটি বই প্রকাশিত হয়েছে কৌরব প্রকাশনী থেকে। লিখেছেন যত, ছবি এঁকেছেন তত বেশি। জীবন, যাপন করেছেন তার থেকেও অধিক বেশি। সংসারী হয়েও তিনি ছিলেন আপাদমস্তক বাউন্ডুলে। অতএব তাঁর আঁকা সব ছবি পোস্টার, বই-এর প্রচ্ছদ একসঙ্গে একত্রিত করা যাবে- এ আশা বা চেষ্টা না করাই ভালো। সত্যজিৎ রায়, পূর্ণেন্দু পত্রী-র পাশাপাশি সমগোত্রীয় কিংবা গুণগত মানের দিক দিয়ে তিনি ছিলেন একটু বেশিই পূর্ণমাত্রায় একজন প্রচ্ছদ অলংকরণ শিল্পী। একটা ছোট্ট নমুনা পেশ করলেই তা অনুমান করা যাবে; বিনয় মজুমদারের ‘ফিরে এসো চাকা’-র প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন তিনিই। সেই সময়ের বহুরূপীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেখানে কাজ করেছেন চুটিয়ে। এঁকেছেন বহু বহু প্রতিবাদের চিত্রসম্বলিত পোস্টার। সে সব আজ কোথায়, কেউ জানে না। লেখক বাসুদেব দাশগুপ্তের মুখে শুনেছি চটজলদি তাঁকে কিছু আঁকতে বলা হলে, মাটির চায়ের ভাড় গুঁড়ো করে রঙ বানিয়ে হাতের কাছে যা সহজলভ্য তাই জোগাড় করে ছবি এঁকে দিতেন। বেঢপ বাঙালি, অধিক শিল্পসাহিত্য মনস্ক বাঙালি, তাঁকে মনে রাখেনি। কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের অন্তরঙ্গ ছিলেন। জীবনের শেষ বছর গুলো বড়োই নিঃসঙ্গ ভাবে কাটিয়েছেন। তাঁর মৃত্যু হয় ২০০৭ সালে।
অসুখঃ আমাদের রক্তের সঙ্গে, জিনের সঙ্গে মিশে আছে। সেই অসুখ কালের স্রোতে প্রবহমান। সেই অসুখের ছবি এঁকেছিলেন অনেকদিন আগেই পৃথ্বীশ গঙ্গোপাধ্যায়। আরও একবার সেই ছবি উন্মোচিত হল, যারা আজও অসুখী… তাঁদের উদ্দেশ্যে।
সন্দীপ কুমার

অসম্ভব। আর পারা যায় না…দেরী হয়ে যাচ্ছে। বুঝে দ্যাখো, বড্ড দেরী হয়ে যাচ্ছে। এরপর … এরপরই সেই চূড়ান্ত অপমানের মুখোমুখি হতে হবে। পাহাড়ের চূড়া থেকে পড়ে যেতে হতে তোমায়। বাঁচার উপায় একটাই। আর পারবে না। বাঁচবে না আর । আর পথ নেই। কোন পথ নেই আর। আর একটু জোর চাপ দিতে হবে আরও একটু জোরে চাপ দিতে হবে। আরও একটু জোরে। যতটা জোরে পারা যায় শেষ কাজের জন্য শেষ শক্তিটুকু দিতে হবে। কোন দিকে কিছু নেই। শুধু ড্রিম ড্রিম তালে বেতালে প্রবল এক শব্দ চারপাশে ছড়িয়ে যাচ্ছে শরীর থেকে তোমার। শতগুণ প্রবলো হয়ে ফিরে এসে আবার তোমাকেই বেঁকিয়ে দুমড়ে মুচড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছে। উথালপাথাল পাগল এখন তুমি। শেষ হয়ে যেতে হবে তোমায়। আঃ ! শেষ হয়ে যেতে হবে দেখে আমারও বড় কষ্ট। তবু শেষ করতে হবে সব তোমার। শুধু শেষ শক্তিটুকু সহায়। তারপরেই শেষ হবে। সব শেষ হয়ে যাবে। আর কোনও জ্বালা নয় যন্ত্রনা নয় – পরিতৃপ্ত – তোমার মুখে হাসি মাখানো থাকবে, বেঁচে যাওয়ার তৃপ্তি। পালিয়ে যেতে পারার মজাটুকু মুখের রেখায় , ঠোঁটে সর্ব শরীরে ধরা পড়ে যাবে। এইভাবে শেষ হবে সব অবশ্যম্ভাবী রুপে। সহজ কৌশলে। সরল প্রয়াসে। কঠিনতম সিদ্ধান্তের সফলতায় তুমি তখন দূরে চলে যাবে। দেখে নাও কেউ জেগে আছে কিনা। কেউ দেখছে কিনা। নীরবে সকলের অগোচরে তুমি সরে যাবে সব ছড়িয়ে ফেলে রেখে। সবাই যখন আসবে তখন তুমি কারুর কাছে থাকবে না। তোমার কাছেও কেউ থাকবে না। শুধু তুমি একা। সকলের ধরা ছোঁয়ার বাইরে গিয়ে তুমি আমাকে – আমাদের-তোমার মিমনিকে – তোমার বর্ণমালাকে –দিশাকে – কাউকে দেখবে – দেখতে পাবে কিনা আমাকে জানিও। আমি বসে থাকব। বসে থাকব তোমার দেহের খাঁচায় রাঙা টুকটুকে ঠোঁট নিয়ে সবুজ শরীরে। হিসেব মেলাব। কে আসে কে যায়। আর কোন অপমান তখন তোমাকে স্পর্শ করবে না। করতে পারবে না। তোমার সাফল্য-অসাফল্য। সুখ – সুখহীনতা সব অপমানের ম্লানতা বা দীনতার দায় সব থাকবে অন্য কারুর। তোমার সব অপমান থাকবে তাদের জন্য পড়ে। তুমি থাকবে না। শুয়ে থাকবে সুন্দর শরীরে । মানুষের শরীর নিয়ে, বিশ্বাস করো , কেউ তোমার মুখে থুতু দেবে না । থুতু দেবে না সবাইকে ছেড়ে যেতে পারলে। এইভাবে নিজেকে সেই চূড়ান্ত অসম্মানের হাত থেকে বাঁচালে। সব মৃত্যু তুমি তুমি শেষ করে দিলে। আমি জানি, বেলালের কথা তোমার মনে পড়বে। বেলালের ছবি চোখের সামনে থেকে দ্রুত একবার এসেই পিছলে সরে যাবে অন্ধকারে। প্রবলো শব্দের ভিতরে তুমি তবু একবার হাসতে পারবে শেষ বারের মতো। যেহেতু একসাথে পথ চলতে চলতে বস্তুটি কিনেছিলে। ভাল লাগবে। খুশিই হবে তুমি। শেষ শক্তি প্রয়োগের আস্থা ফিরে পাবে শুধু এই ভেবে যে, যে-জিনিসের দরকার ছিল না – কী কাজে লাগবে স্থির করতে পারোনি তবু কিনেছিলে শুধু লালের ওপর সোনালি জড়ির কাজটুকু চোখে ভাল ধরেছিল বলে। বেলাল এখন কাছে নেই। দূরেও আছে কিনা জানো না। সোনালি জড়ির কাজটুকুও মলিন এখন। কালচে হয়েছে। লালটাও ঘনতর। এতটাই অর্থবহ হয়ে গেল দেখে বাড়তি কিছুটা আস্থা ফিরে পাচ্ছো তুমি। পিছুটান কি রইল ? লেস লাগানো সাদা ফ্রক পরা ছোট্ট একটা পরীকে রেখে গেলে । আরও কত কিছুই তো রইল। তোমার শব্দ গন্ধ বর্ণ প্রিয় স্বাদ সবকিছুর স্মৃতি তুমি ফেলে গেলে আমার কাছে। দেখো, আমি যত্নে রাখব। সব ভার দিয়ে যাও। দাও…তোমার ঘরের চাবি…সামান্য অসামান্য… যা কিছু তোমার আছে । তোমার ভাল মন্দ এবং ব্যর্থতা সব দিয়ে যাও আমাকে। আমি আগলে বসে থাকব সবুজ শরীরে তার জন্য — তাদের জন্য – যাদের কাছে যত্ন পাবে সব কিছু। স্নেহ মমতায় ভিজে আবার যখন চোখে তোমার জল আসবে আমিও ফিরে যাব তৃপ্তি নিয়ে আবার তোমার কাছে। জেনো, এটুকু সুখ তোমার পাওনা আছে। কারণ মানুষের সেটুকু প্রাপ্য হয়। বলো, মনে করে বলো…আর কী আছে। পোড়া কাঠের টুকরো –ঝকঝকে হাজার বাতিতে উজ্জ্বল সাত মহলা বসতবাটি আর… আর কী আছে বলো। আমি সব মনে রাখব ঠিক ঠিক। নাও, এই নাও জল। তোমার গলা শুকিয়ে গেছে। তোমাকে সবাই মারছে, জলটুকু খেয়ে নাও। চার পাশে থেকে বিরাট হয়ে শত সহস্র দৈত্য হয়ে তোমাকে মারতে আসছে। সবাই মিলে তোমাকে কাটগোড়ায় দাঁড় করাবে। তোমাকে সবাই মারতে চায়। কী করবে তুমি ? কীই বা বলতে পারো তুমি এখন ? উফ্‌ দম যে একেবারে বন্ধ হয়ে আসছে। আর পারবে না নিজেকে বাঁচাতে । শেষ করে দাও – সব ফেলে রেখে চলে যাও।
তোমাকে কেউ চায় না- তুমি থাকবে না। দয়া চেয়ো না। ভিক্ষে চেয়ো না ! তোমার বাঁচা হল না। নিজের মতো করে বাঁচা তোমার হবে না। নিজের মতো করে বাঁচা তোমার হবে না। আমি তোমার আরও কাছে থাকব। তোমার রক্ত দেখতে পাচ্ছি। শরীর থেকে সব রক্ত বেরিয়ে গেলে তুমি আর থাকবে না। মাথায় চুলগুলি ছিঁড়ে ফেলছ। মাথা কুটে কুটে রক্ত বেরুচ্ছে। হাত পা কাঁপছে। তোমার জ্বর হয়েছে। ভীষণ জ্বর। কে আর তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেবার জন্য বসে আছে ? কেউ তোমাকে দেখছে না। বকছে না। বলোছে না কিছু। রাস্তার দিকে ঘরের দেওয়াল ধ্বসে পড়েছে। দ্যাখো ভাল করে চোখ পরিষ্কার করে দ্যাখো, বর্ণমালা, মা দিশা একা দাঁড়িয়ে আছে হাত বাড়িয়ে। কিন্তু জানো না তুমি যে, সিঁড়ির দরজা বন্ধ । বন্ধ হয়ে আছে। প্রচন্ড বেগে বাতাস ধেয়ে আসছে। তোমাকে উঠিয়ে নিয়ে যাবে। তোমার শরীর কৌটো থেকে প্রাণ পাখিটি উড়ে গেলেই তোমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে এই প্রবল বাতাস। দ্যাখো তোমার মায়ের চুলের ফিতে বাতাসে উড়ছে। বাতাসে মায়ের চুলের গন্ধ। সুডৌল দুই হাতে চাল ধোওয়া জলের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। দ্যাখো, মা তোমার, হাতে ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে। কোথায় পেল বলোতো ? একটু তবে দেরীই করে যাও। ফুলগুলি ছুড়ে দেবে মা। তারপর চলে যেও। তারপর রক্ত শুধু রক্ত আর রক্ত। দেহ অসার হয়ে গেল। সঙ্গে তোমার কেউ নেই। একা ভীষণ একা। আবারও মাথা কুটছ তুমি। মাথা কুটে কুটেই মরছ। ভালোবাসা না পেলে বাঁচবে কী করে ? বলো ? তুমি বাঁচবে না। দম বন্ধ হয়ে যাবে। গলার কাছে কীসের একটা দলা যেন আটকে আছে। তুমি কাঁদছ। একা বাড়িতে রাতের অধকারে কাঁদছ। এ জন্মে শেষ বারের মতো কেঁদে নাও। কাঁদলে ভালো লাগবে। বুকের ভার ক’মবে। সকলের ঘৃণার কাছ থেকে সরে যাচ্ছ তুমি কেঁদে কেঁদে।

মা তোমার, বর্ণমালা তোমার, চোখের জল মুছিয়ে দিতে এল না। পারল না কাল পুলিশ আসবে – তুমি জানো। তোমার অসার শরীর তাদের জন্য অপেক্ষা করবে। সবাই জানবে। জেনে যাবে। আমি থাকব তোমার বুকের ভিতরে লুকিয়ে। সব দেখব। দরজাও খুলে রেখেছি। সব আলো জ্বালিয়ে দাও। অন্ধকার দেহ বিনাশ ভালো নয়। তোমাকে মানাবে না। অন্ধকার হলেই সকলে জেরা করতে এগিয়ে আসবে। ভয় দেখাবে। সবই তো ঠিক করে ফেলেছ তুমি। আর ভয় পাবে না তুমি। শেষ বারের মতো প্রাণ খুলে কেঁদে কেঁদে সকলের কাছ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যাও নিজেকে। আমি থাকব। থাকব তোমার বুকের ভিতরে। থাকব তোমার জন্যই। তোমার কি কেউ আছে ? কেউ কি বোঝে – কার জন্য তুমি এ কটা দিন বেঁচে গেলে? চিন্তা কোরো না। সবাই ভাল থাকবে। সুখে থাকবে। সবাই এই সময়ে একটু ভালবাসলে তুমি বর্তে যেতে। ভালবেসে ধন্য হতে। সকলের ভালবাসা যাঞ্চা করো। তোমার ইচ্ছে মতোই সব আমি ব্যবস্থা রাখব। কেউ কখনও তোমার কোনও ছবিতে মালা দেবে না।
তুমি ডুবে যাচ্ছ। ডুবছ। হাত পা সব সহ। একা ডুবে যাচ্ছ। তোমাকে কেউ বাঁচাল না। গলার কাছে কষ্টটা দলা পাকিয়ে উঠছ। কী ঘটতে যাচ্ছে তুমি জানো না প্রভু ! শরীর তোমার রক্তে রক্তে ভেসে যাচ্ছে। এখন শুধু অবধারিত সময়ের অপেক্ষা। বুকের ভিতরে আমার পাশে সামনে উপরে নীচে ধূপ ধাপ দ্রুম দ্রুম সময়ের চাকা এগুচ্ছে। শেষ সময়ের তালে। এই চাপ চাপ সময়টুকু পার হয়ে যেতে হবে চোখ বূজে। তোমার যা করণীয় ছিল নিজেকে নিয়ে-সব তো সাঙ্গ হোল। তোমার শরীরের বিভক্ত প্রদে’শে একা বসে আমার কাঁদনই বাকি থাকবে।
সকালে জ্ঞান ফিরে এল। দিনের আলো দেখলে তুমি। আমিও দেখলাম। সূর্যের আলোয় চাপ চাপ রক্তের স্রোত তোমাকে ঘিরে শুকিয়ে গেল। এখন তুমি কি করবে ? কোথায় যাবে ? আমি জানি না, আর কে আছে তোমার ? কেউই যদি তোমাকে না চায় কোথায় যাবে তুমি ? আমি বসে বসে দেখলাম – জেনে গেলাম – এবারও পারলে না। তোমার কেউ থাকলে তারাই তোমাকে মারুক। চেষ্টার যেন আর ত্রুটি না থাকে তোমার। তুমি তৈরি হয়ে থাক। সকলে মিলে তোমাকে মারবে। সকলের হাতেই তোমার মৃত্যু।
কিছু লোক এসে তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। কেন ? কী দরকার ছিল তার ? শরীর তোমার দুর্বল। দাঁড়াতে পারছ না। কিছু রক্ত এখনও শরীরে থেকে গেল। আবার তোমার ভয় করছে। রক্ত আছে তাই ভয় করছে। কানের পাশে মাইক বাজছে, তুমি মরতে পারো না ? তুমি মরতে পারো না ? শীত করছে তোমার। সমস্ত শরীর কাঁপছে। সকলে জানল – দেখল একা তুমি তোমার ঘুরে ঘুরে ঘুরে ঘুরে কেঁদেছ। মাথা কুটে মরার চেষ্টা করেছ। নিজেকে শেষ করেছ। তবু পারলে না। তরী ডুবলো এবারও । ভালবাসা পেলে হয়তো মনের জোর পেতে কিছুটা। এখন কেউ নেই – কিছু নেই তোমার নিকটে বা পাশে । ডাক্তারদের তোমার ভাল লাগে না। কী জিজ্ঞাসা করতে কী জিজ্ঞাসা করবে তা তুমি জান না। কী হয়েছে তাই হয়তো জানতে চাইবে। মামনি তোমার কাছে নেই। কী করে বলবে তোমার কী হয়েছে ? তোমাকে বুঝতে পারছে না কেউ। জ্ঞান ফেরার পর থেকে তোমার চোখে সেই ঘোলাটে ছায়াটা আটকে রয়েছে। কী করে বোঝাবে মামণিকে যে, প্রতিটা রাত্রি তোমাকে মারতে আসে ? করাতের মতো কাটে ? শাসন করতে আসে ? তোমাকে কেউ পছন্দ করে না। চায় না। একা একা তিনটে ঘরের আলো জ্বালিয়ে ঘুরে মরছ। ঘরগুলো বড় হয়ে যায় তোমার কাছে। একটু বেশি বড় হয়ে যায়। ঘুরতে ক্লান্তি আসে। ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছ তুমি। কত কথাই বলেছে ডাক্তার ! ডাক্তারের ওষুধ, ডাক্তারের কথা তোমার কী করবে ? এখনও চোখ দুটো তোমার ঘোলাটে হয়ে ঘুরছে। ঘরের মধ্যে ঘুরে মরছে। যা খুঁজছ তা পাচ্ছ না। পেলে না। কাউকে বোঝাবে কী করে তোমার দম বন্ধ হয়ে আসছে ? অনেক ওষুধ পেলে তুমি। ঘুম। ঘুম। অনেক ঘুমের ওষুধ বিশ্রামের ওষুধ। আবারও ক্লান্ত হওয়ার ওষুধ। ট্রামে বাসে দোকানে অফিসে সবাই তোমাকে এখনও তাড়া করে ফিরছে। ভয় পাচ্ছ তুমি। হাত পা কাঁপছে। ডাক্তারের কথায় লজ্জা পেলে ? কেন তোমাকে জিজ্ঞাসা করল যে বিয়ের আগে প্রেম করেছ কিনা ? মেয়েদের ছুঁয়েছ কিনা, বুকে টুকে হাত চালিয়েছিলে কিনা ? বউকে ভালবাস কী না বা এসবের কারণ কী ? বুঝি আমি, এসব কথা জিজ্ঞাসা করার সময় এটা নয়। যে যা বলে বলুক আমি তো জানি, তোমার একটু আদর দরকার ছিল। একটু বেশি প্রশ্রয় দরকার ছিল। লুকিয়ে রাখবে এমন গভীর বুক তুমি পেলে না কেন ? বেঁচে মরার এক অসহ্য যন্ত্রণায় জ্বলছ।
তোমাকে জ্বালাচ্ছে সব কিছু। জ্বালিয়ে রাখছে। অনেকেই তোমাকে দেখতে পেল না। এল না। জানল না কী ভীষণ রক্তক্ষয়ী ভালবাসার অধিকার তুমি রাখ। জানল না কেউ। এ কষ্ট বড় কম নয়। বুঝত হয়তো মা তোমার। ছোট ছোট হাত দুটো একটু তোমার চুলে ছুঁয়ে দিলে তুমি বর্তে যেতে। চারপাশে ঘুরে মরতে। মরতে আহ্লাদ হোত। সুখের চেহারা কী রকম ? রেডিমেড জামায় সুখ কতটা ? দুঃখ কী ততটাই অবাঞ্ছিত ? সুখহীনতা মানুষের জীবনে কতটা কঠোর বিষয় ? কারুর বিরুপতা তোমার সহজে সহনীয় হয় না। তুমি তোমার থেকে বড় নয়। বেশি নয়। বা কমও তো নয়। তোমার তাই এখনও ভয় করে। রাতে আলো জ্বালিয়ে শুতে হয়। ঘুম আসে না তোমার। ঘুম হয় না। সব অদরকারী কাজ শেষে ছটফট করতে হয় তোমাকে। জ্বলতে হয়…. পুড়তে হয় একা। সে যন্ত্রণা অন্যদের নয়। অন্যদের যন্ত্রণা কেমন ? ডাক্তারো জানে না । তোমাকে বাঁচানোর কেউ থাকে না তখন। তুমি ভেসে যাও। ভাসিয়ে দিতে থাক সব কিছু। অসহ্য জ্বালায় সরে সরে যেতে থাকো। প্রতি রাত্রে একবার তোমার মৃত্যু হয়। সেইভাবে প্রতিদিন মৃত্যু হয় তিনটে ঘরের কাছে গিয়ে। টালমাটাল তুমি সমস্ত রকম সুখের কাছ থেকে , সমস্ত রকম দুঃখের আছ থেকে অনেক দূরে একা একা অনাচারী মানুষ। ঘরের দিকে তাকিয়ে না কেঁদে ভয় না পেয়ে নিঃস্বতায় শরীর ছড়িয়ে দাও যেখানে সেখানে। ছুঁড়ে দাও যেমন তেমন ভাবে। তুমি জানো, সেদিনের লাল ঠোঁট সবুজ শরীরে তোমার সব কিছু ধারণ করেছি আমি। তোমার সব সাফল্য সব ব্যার্থতা অন্যথায় তোমাকে বাঁচতে পারতাম না। কী ঘটল মামণি জানে না। ঘরের দেওয়াল ধ্বসে পড়েছে তোমার। মামণি দাঁড়িয়ে আছে এখনও সেখানে। বাতাস পেলেই চুলের ফিতে উড়বে, ফুল তুলে নেবে হাতে। রক্তে মাংস একাকার তোমার দিকে ভিক্ষের মতো ছুঁড়ে দেবে। আর কোনও ভিক্ষা তুমি নিও না। যে আর তোমাকে দেবে বলো ? আর কোনও ভিক্ষে তুমি পাবে না। সাহস কত হবে অন্য কারুর ? জানো তুমি, সিঁড়ির দরজা বন্ধ। ওপরে যেতে পারবে না।
তোমার দীনতা এখন অশেষ। সকলকেই আমি বলোব তোমার হয়ে। বেঁচে বর্তে থাকার মতো সহায় সম্বল কী আছে তোমার ? শুধু কালযাপন। সব গ্লানি দূর করতে আশ্রয় খুঁজে পাও তুমি – আমি তাই চাই। দোরে দোরে আবার তুমি ঘুরে দ্যাখো সেই সুখের সন্ধানে। সেই প্রাপ্তিটুকুর অধিকার তোমার থেকে গেছে এখনও। কেউ তা অস্বীকার করলে মেনে নিও না। সকলেই তো আর তোমাকে তাড়া করে ফিরছে না ! অনেকেই তোমার আশায় বেঁচে থাকছে। কেউই যে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখবে না ? একা কে আর বাঁচে বলো ? ডাক্তার জীবনী লিখে দিতে বলেছিল। গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তোমার কী আছে ? কিছু আছে ? পৃথিবীতে এসে চলে যাওয়ার মতো সাধারণ ঘটনাই তোমার জীবন। তোমার জীবনী। হেসে কেঁদে দিব্যি চলে যাবে। আর তুমি যেও না ডাক্তারের কাছে। ডাক্তারদের কাছে। চিঠির জবাব তুমি আর কীভাবে দেবে? দিতে পারো ? সব চিঠির উত্তর হয় না। কোনও দুঃখই তো নয় শেষ কথা। তা তুমি মেনেই যদি নেবে তো মিছেই প্রত্যহ পথে পথে ঘুরছ।
মিছেই প্রত্যহ পথে পথে ঘুরছে। এমন করে প্রত্যহ আর ফিরো না। মানায় না তোমাকে। বুকে বাজে আমার । বুকের ভিতরে বসে বসে আমি অস্থির হই তোমার জন্য। মোচড় দিতে থাকে। সাত সতেরো হাসিতে আমি ভুলি না। শোন, তুমি মন দাও, একটু শান্ত হও। দস্যিপনা ছেড়ে মন দাও কিছুতে। আবদ্ধ কর। আবদ্ধ রাখো। ঘুরে ঘুরে তোমার ক্লান্তি বাড়েনি ? বয়স ? বয়স বলে না কিছু ? বয়সের কোনও কথা নেই ? শুধুমাত্র দৃশ্য বর্ণ শব্দ ও গন্ধের স্মৃতি ? স্মৃতির এই ধনদৌলতই কালে একদিন পাগল করবে তোমাকে । তুমি পাগল হয়ে যাবে। দেখবে মন বসাতে পারলে না বলে পাগলের সাহস এবং সাহসের পাগলামি নিয়েও তুমি অবাঞ্ছিত পড়ে থাকবে নিজস্ব স্মৃতির স্তুপে একাকী। তাল ঠুকবে সমস্ত ঘৌড়দৌড়ের বাইরে মরকুটে ঘোড়াটির মতো । তাই নাকি চেয়েছিলে ? বকুল গাছের পাতা গুনে গুনে তোমার বিকেল কাটবে। সন্ধ্যা ও কেটে যাবে। সময় গড়াতে গড়াতে রাত বাড়লে স্মৃতির নেশায় টালমাটাল তুমি তোমার ঘরগুলির নিঃস্বতায় আরও… আরও করুণ… আরও ম্লান হতে হতে অবশেষে শরীর ছাড়িয়ে দেবে যেমন তেমন অগোছালোভাবে – অসহায়ভাবে।
পাগলের অসহায়তায় বয়সের দরকারী যা সব শুনতে পাবে তখন । এমন সব সময়ে দেরী হয়ে গেছে জেনে শেষ সম্বল দক্ষিণের বারান্দায় বসে আবার হয়তো দীর্ঘশ্বাসের মধ্যে বৃহৎ তারকাখচিত আকাশ অথবা লেপা মোছা কালো মধ্যরাত্রে জানবে – বাস্তব সকল গাছপালা – অতি বিস্মৃত জলাভূমি – এবং নিস্তব্ধতা এইসব কিছুর মধ্যে কোথায় তোমার সাধের বকুল গাছটি সব কীছুর সঙ্গে মিশে গেছে। একবার এই ছবিতে কুকুরের ডাক অথবা কোন গাড়ির গতিশব্দ তোমাকে শুধু আর একবার অতি নিস্তব্ধতায় সরিয়ে নিয়ে যাবে। তুমি জানবে সঙ্গীতের নিস্তব্ধতা সেটা নয়। বকুলের কচি পাতাগুলো গুনে রাখার ব্যস্ততাও তোমার এক সময় যাবে। অনেক সময়ের ভারে ধীরে ধীরে সকলের অগোচরে সেইসব মধ্যরাত্রে চন্দ্রের অদৃশ্য প্রভাবে সকল সঞ্চয়ের ঝাঁপি খুলে ফিরে পাবে শুধু কিছু বিবর্ণ ছবি – শব্দ কিছু রঙ ও কয়েকটা পুরানো চাবি ও বিভিন্ন বিস্মৃত গন্ধ, কিছু প্রিয় সুখী-অসুখী মুখের স্মৃতি। বা দীর্ঘ সময় মজে থাকতে চাইবে। তোমার অধিত বিদ্যা সকল এবং বুদ্ধির সুচিক্কন প্রভাবও তুচ্ছতায় হারিয়ে যেতে থাকবে। হারিয়ে যাবে। আসলে সে সময়ের অসহায়তা তুমি জানছ না। মানছ না। অথচ বুকের ভিতরে থেকে তোমাকে বেরুতেই হবে। কারণ সব নিরাপদ স্থানই নয় ততটা নিরাপদ। তুমি জেনে নাও। সময় খুবই কম দেওয়া আছে তোমাকে। বুকের ভিতরে সাতমহলা বসতবাটি সাজিয়ে গুছিয়ে পোড়া কাঠ দিয়ে এঁকে রাখ ইচ্ছামতো। সেই হবে তোমার দুর্গ বিশেষ। সেই আত্মার একমাত্র নিরাপত্তা। তুমি যখন থাকবে না – দুহাতে আগলে রাখবে তোমার সমস্ত অস্তিত্ব। সমস্ত স্মৃতি এবং বিস্মৃতি।
শোন, এখন একটু হাওয়ায় বেড়িয়ে এসো। ভাল লাগবে। লাগতে পারে। তুমি জানো, অক্লান্তভাবে অপেক্ষা করতে হবে মৃত্যর পরও। সে-ই তো তোমার কাজ। হয়তো শত সহস্র স্বপ্নের গন্ধ মন কেঁদে উঠবে। উঠবে যখন তখন। চাবিগুলোতে জঙ ধরে যাবে। দরকারী কাজ পন্ড করবে। তবু ধীর স্থির পক্ককেশ তোমাকে সময় অসময়ে চড়ে বেড়াতে হবে। বেড়াতেই হবে। জেনো, কোর্ট-কাছারি বা পুলিশ বা অফিসের কোনও সাহেব জানবে না। কেউ জানবে না কেন বেড়াতে হবে তোমাকে। এতদূর পর্যন্ত বুঝে তুমি আরও অনেকক্ষণ তোমার ঝাঁপি খুলে বসে থাকবে। অবশেষে এক তিক্ত নিঃস্বতার কবলিত হবার আগেই ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকবে সব ছড়িয়ে ফেলে রেখে। তোমার জন্য আমার ব্যথা বাজে বুকে !
অস্বাভাবিক ত্রস্ত ভীত শঙ্কিত স্বপ্নাকুল দিনগুলো এ এক করে ক্রমশ পিছিয়ে যেতে থাকল। বরং পিছলে পিছলে সরে যেতে থাকল। সপ্তাহ-মাস সব পার হতে হতে বছর ঘোরার সমস্ত দিনগুলি-রাতগুলি তোমার তবু ছোট্ট হাতের কয়েকটা ফুলের প্রত্যাশায় অসহনীয় রূপে কাতর হয়ে রইল। দীন তোমাকে ম্লান করে রাখল সদা সর্বদা। ভাঙা ঘরে ফুল হাতে সেই ছবি এই এক বছর অহর্নিশ দামামার মতো বেজে চলল বুকের ভিতরে সমস্ত শরীরে। প্রচন্ড বাতাসের মাঝে একা দাঁড়িয়ে থাকার ছবি – চুলের উড়ন্ত ফিতে – লেস লাগানো সেই জামা। আহা ! ভাবতে ভাবতে – আমি জানি – এইভাবে ভাবতে ভাবতেই তুমি, দক্ষিণের বারান্দাটি, অনেক আপন ও প্রিয় সম্বল হওয়ার বয়স পেয়ে যাবে। তুমি বসে থাকবে সূর্য ওঠার সময় –সন্ধ্যায় –রাত্রে। নিজেই বুঝবে, সব ছিল, সবাই ছিল তোমার-। তোমার বাবাও ওইরকম একা একা বসতেন। বসে থাকতেন। কথা বলার সুযোগ পেতেন কখনও সখনও । তুমিও পাবে সেরকম । আবার কোনও দিন বা বসে বসে বকুলের পাতায় বাতাসের নাচন দেখে কচি পাতাগুলো গোনা হলে ভেবে যেতে থাকবে – কারে যেন এইগুলো দেবে বলে বসে আছ তুমি। সকলেরই কৌতুহল থাকবে – তোমার কী আছে। – কী ছিল ? কী-ই বা আর থাকবে ! কিন্তু শুধু, এইসব – এইটুকু দিয়ে যাবার জন্যই কী তুমি বসে থাকবে বাঁধানো দাঁত পরে এক মাথা শাদা চুল দাড়ি নিয়ে ?

_______________