জয়দীপ সেন-কানহা কুতুমসার ও অন্ধ মাছেরা

Spread This
Joydeep Sen

জয়দীপ সেন

কানহা কুতুমসার ও অন্ধ মাছেরা

হাওড়া – (মুম্বই মেইল) – জব্বলপুর – কানহা

কাঠফাটা রোদ মাথায় নিয়ে জব্বলপুর থেকে প্রায় ৫ ঘণ্টা গাড়িতে করে এসে বিকেলে হোটেলে ঢোকার পর থেকেই ঝমঝম করে বৃষ্টি হয়ে চলেছে। বিরা চা পকোড়া এর কাপ প্লেট নিয়ে যেতে যেতে শুধু নিয়ম মাফিক ৮ টার সময় রাতের খাওয়া সেরে নেওয়ার কথা বলে চলে যাচ্ছিলো। আমার সে নিয়ে কোনও মাথাব্যথাই ছিলো না, তবু ওকে খপ করে ধরে বললাম, “ভাই এইরকম বৃষ্টি হলে কাল বাঘ দেখতে পাবো তো?” বিরা হেসে বললো, ” থোড়া তো মুশকিল হ্যায় পর আপ লোগোকে ড্রাইভারকা জুগার হ্যায়। ইয়ে বিন মওসম বারিশ হ্যায়, জঙ্গল খোলনে কে বাদকে মৌসমমে এইসা হোতা হ্যায় কভি কভি। আওর একঘন্টা দেখ লিজিয়ে, ফির আসমান অচানক সে সাফ।” আমি কারেন্ট কখন আসবে জিজ্ঞেস করতে ও বললো “এক ঘন্টা মে”। বলে বা’হাতে লাঠি আর ডান হাতে কাপ প্লেট নিয়ে গুনগুন করতে করতে উল্টোদিকের একটা লালটেন জ্বালা ঘরে ঢুকে গেলো। আমার মনের মেঘ ওকে জিজ্ঞেস করার আগেও যতটা ছিলো ততটাই ঘন হয়ে থাকলো। জয় এতক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলে উঠলো, “ভাই ফোনে নেটওয়ার্ক আসছে এদিকের জানলার সামনে এলে, কিন্তু কল লাগছে না।”

(তথ্য সূত্র: গুগল ম্যাপ)

জয় তো জব্বলপুর এরই ছেলে, ওখানেই জন্ম। সেই কোন কালে ওর বাবা গান এ্যান্ড শেল এর চাকরি নিয়ে এসেছিল এই শহরে। কিন্তু কেরিয়ারিস্ট ছেলে স্কুল কলেজ সরকারি অফিসের আমলা হওয়ার চাকরি বিয়ে এসব নিয়ে তুমুল ব্যস্ত থেকে এই প্রথম সময় করতে পেরেছে বাড়ি থেকে মাত্র ৫ ঘন্টা দূরে অবস্থিত ভারতের অন্যতম সিগনিফিকেন্ট জাতীয় উদ্যান কানহা দেখতে আসার। ঠিক আটটায় এলো কারেন্ট আর তার ঠিক মিনিট দশেক পরে ৬ ফুট এরও বেশি লম্বা কালচে গরন এর একটা মানুষ পরনে কালো জ্যাকেট জলপাই প্যান্ট আর মুখে হাসি নিয়ে ঢুকলো হোটেল এর খাবার ঘরে। একতোড়া চাবি পকেট থেকে বের করে টেবিলে রেখে হ্যান্ডশেক এর জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে নিজের নাম বললো ঝাম সিং। আমি আর জয় দুজনেই উঠে দাড়িয়ে নিজেদের পরিচিত করালাম ওনার কাছে আর নিজেদের আশঙ্কার কথাও জানালাম। ঝাম সিং বললো, “প্রমিস কিজিয়ে সুবহা জলদি রেডি হোকে সব সে পেহেলে নিকলেঙ্গে বাকি ড্রাইভার লোগ কে আগে, তো ম্যায় আপকো বরাবর দিখায়গা।” আমাদের সঙ্গে খাওয়া শেষ করে ঝাম সিং বেরোনোর পরেই আমরা টর্চ আর লাঠি নিয়ে আমাদের থাকার জায়গার দিকে পা বাড়াতেই দেখি বৃষ্টিও চলে গেছে।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো কেমন একটা অস্বস্তিতে, আর উঠেই পাশের কালো ডায়াল এর টেবিল এলার্ম ক্লক এর দিকে চোখ যেতেই চমকে উঠলাম। ৫ টা বেজে গ্যাছে। অথচ, বাইরে ঝিঝি জ্যোৎস্না আর সিল্যুটেড নিঝুম। একবার ভয় হলো, তবে কি বেশি মদ খেয়ে ঝাম সিং আমাদের ডাকতে আসতেই ভুলে গেলো? তবে কি এবার আমাদের বেরিয়ে কিসলি এর ফরেস্ট অফিস থেকে আবার নতুন গাড়ির বুকিং নিতে হবে? আজকে গাড়ি নিয়ে না ঢুকতে পারলে তো কাল সকালে বেরোতে হবে, তখন কি আর বাঘ বেরোবে? তাও সন্দেহকে বিশ্বাস এর সমতুল্য করে উঠে হেঁটে গিয়ে ঘরের লাইট জ্বালালাম। ঘড়িতে ১২:৩০ বাজে। জয় চোখ কচলে বলে উঠলো, “মুতে এসে লাইট বন্ধ করে দিস।” আমি হেসে সিগারেট বের করে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ওই জানলার পাশে গিয়ে দেখলাম নেটওয়ার্ক আছে কিনা। সিগারেট জ্বালিয়ে ভাবলাম একবার ট্রাই করে দেখি ঝাম সিং কে ফোনে পাই কিনা, সন্দেহ যখন একবার হয়েছেই…

ধুর্ভাদের গ্রামে সকালের বস্তার ময়না

ছত্তিশগড়ের কবীরধাম জেলার এক ছোট্ট গ্রাম বালসমুদ্র। শাল সেগুন ডলোমাইট এর কোষাগার এই গ্রামে মানুষের দাম এখনও বড় সস্তা। গাছপালা নদী ঝরনা পাখির মতো এখানকার মানুষও জানে না সীমান্ত কাকে বলে, কাকে বলে পার্লামেন্ট। নেহাতই সখের বসে তায় রোববার ছিপ হাতে পাঁচ কিলোমিটার দূরে বস্তার পেরিয়ে গভীর কানহার জঙ্গুলে নদীতে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়েছিলো ঝাম সিং ধুর্ভা বন্ধু নঈম এর সাথে। বেরোনোর সময় এক ছেলে দুই মেয়ের ছোটটা বলেছিলো পরের বার হরিণ দেখাতে নিয়ে যেতে। নঈম বলেছিলো ওর বিয়ে দেবে আর্মি অফিসারের সাথে, তারপর তার সাথে যত ইচ্ছে গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে হরিণ বাঘ বাইসন এসব দেখবে। মেয়েটি চোখে সন্দেহ নিয়ে বলেছিলো, “আমাদের ঘরে তো বন্দুক নেই ওরা আমাকে বিয়ে করবে কেন!”

যৌথতার সংগ্রহশালা

ঘড়িতে ঠিক ৫ টা ২০, দরজায় “বাবু টাইগার নেহি দেখনা হ্যায়? সির্ফ ডিয়ার দেখনে সে কেয়া হোগা?” আমি আধঘুমেই শুয়ে ছিলাম বোধহয়। উঠে দেখলাম জয় অলরেডি বাথরুমে চলে গেছে। তাড়াতাড়ি চা আর কেক খেয়ে ঝাম সিং এর গাড়িতে উঠে পড়লাম সময় নষ্ট না করে, ফার্স্ট ইনিংসে বাকিদের থেকে লিড দিতে পারলেই বাঘ আমাদের। ক্যাম্প দেব নিবাস থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের গেটে পৌঁছতে লাগে প্রায় মিনিট কুড়ি যেখান থেকে পাস সংগ্রহ করতে হয়। যাওয়ার পথে ক্যাম্প কেমোফ্লাজ বলে একটি ট্রি হাউজ চোখে পড়ে যেটাতে না থাকতে পারার আফসোস এখনও বর্তমান। এই প্রসঙ্গে বলে রাখা যাক, দিনে দুবার কিম্বা তিনবার জঙ্গল সাফারির উইন্ডো খোলা থাকে তবে প্রথমটা টার্গেট করাই বুদ্ধিমানের কাজ যদি না মানুষের উপদ্রবে পালিয়ে যাওয়া বাঘের পায়ের ছাপ এর ছবি তুলে ফিরে আসতে বেশি পছন্দ করেন। জঙ্গলের অনিশ্চয়তার জন্য একটা দিন অতিরিক্ত রাখাই হাতের পাঁচ। রাতে থাকার জন্য খাটিয়া বা বিছিয়া এর জনবসতিতে অবস্থিত একাধিক হোটেল লজ রিসর্ট রয়েছে, যেগুলো মোটামুটি টিকিট কাউন্টার থেকে ৮ কিলোমিটার থেকে ৩ কিলোমিটার এর মধ্যেই অবস্থিত। কমফোর্ট এর থেকে নিরিবিলিতে থাকা বেশি পছন্দ করলে আপনার লাভ দ্বিগুণ হয় যেতে পারে। টিকিট নিয়ে গাড়িতে এসে স্টার্ট দিয়েই ঝাম সিং জিজ্ঞেস করলো, “তো কাল কোনসা ডিয়ার দেখা? বারাসিংহা? ইয়াহা বহুত দিখেগা আপকো কোর মে। আপ আঁখে খুলা রখিয়ে। জিয়াদাতর কাপল দিখতে হ্যায়, বহত পেয়ারা জানোয়ার হ্যায়, লেকিন একবার নজর সে নিকল গয়া তো ফুররর…” বলেই মুখে একটা হাসি নিয়ে চাপলো এক্সিলটরে পা।

(ছবি সুত্র: নিজস্ব)

বল চললো, “ইয়ে জানোয়ার পুরা একদম সে গায়েব হোনে লাগা থা ইয়াহা সে। সালা ইয়ে অফসর লোগ হারামী পোচার ঘুষা দেতে হ্যায় ছত্তিশগড় সে, বো লোগ সালা সিং কাটকে লে যাতে হ্যায়, স্কিন লে যাতে হ্যায় কুছ বাকি নেহি রাখতা। খাস কর যব জুন সে সেপ্টেম্বর জঙ্গল বন্ধ রেহতা হ্যায় তব নকশলি মারনে কি বাহানে জঙ্গলকা পুরা নিয়ম তেহেস নেহেস কর দেতে হ্যায়। ও তো বাহার সে আতে হ্যায় উনকা ক্যায়া যাতা হ্যায়, উজরতা তো উনকা হ্যায় জঙ্গল জিসকা ঘর হ্যায়।” একটানা বলে গেলো ঝাম সিং। ওর গলায় কেমন যেন এক কথক ঠাকুরের মায়া আছে, যেন যা বলছে খুব বিশ্বাস করে বলছে, একটা কনভিকশন আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম জঙ্গল বন্ধ থাকলে ও কি করে। তাতে ও বললো বস্তার এর জঙ্গল এর ভেতরে একটা ছোট গ্রামে ওর বাড়ি। বাড়িতে এক ছেলে আর দুই মেয়ে আছে। গ্রামে গেলে তাদের সঙ্গে সময় কাটায়, তাছাড়া সমবয়সী দু-তিনজন বন্ধু রয়েছে তাদের সঙ্গেও সময় কাটায়। আরোও অনেক বন্ধু ছিলো ওর, হয় গুলিতে মরেছে নয়তো দূরে দূরে থাকে কাজের জন্য। সে বাবার সঙ্গে এখানে এসে এসে গাড়ি চালানো শিখে নেওয়ায় এখানে ডিপার্টমেন্ট এর গাড়ি চালানোর কাজ পেয়ে যায়। “স্যার আপ কো পাতা হ্যায় ইস জঙ্গল সে আগার আপ নর্থকে তরফ সির্ফ ৮ কিলোমিটার যাও তো আপ মধ্যপ্রদেশ বর্ডার ক্রস কারকে ছত্তিশগড় পৌছ যাওগে। বহিপে হ্যায় মেরা ঘর। আপ বতাও ইন পঞ্ছিও কো ঘন্টা পাতা হ্যায় ইয়ে বর্ডার অর্ডার…” কথাটা শেষ হওয়ার আগেই আমি জয় কে একটা ধাক্কা দিয়ে আঙ্গুল নির্দেশ করে বলি, “ওই দ্যাখ ধনেশ”। ঝাম সিং আমাদের দেখার সুবিধার জন্য গাড়িটা একটু ধীরে করে দিয়ে বলে, “নেহি স্যার ইসে মালাবার পাইড হর্নবিল বোলতে হ্যায়। ইয়ে বাকি ইন্ডিয়া মে বহোত কম মিলতা হ্যায়”। আমিও নিজের পাণ্ডিত্য জাহির করে বললাম, “হাম বাঙ্গালী লোগ ইসিকো ধনেশ বোলতা হ্যায়”।

ঝাম সিং একটু হেসে বলে, “আচ্ছা কাল আপনে রাত কো মুঝে কল করতে ওয়াক্ত যাহা ডিয়ার দেখা ওয়াহা এক থা ইয়া দো?” আমি একটু ভেবে নিয়ে বললাম, “তা ৮-১০ বোল সাকতা হ্যায়”। চোখ বড় বড় করে আশ্চর্য্য হয়ে তারপর একটু হেসে ঝাম সিং বললো, “এক বাত বাতাউ স্যার, আপনে না কাল ঢোল দেখা হোগা মতলব ওয়াইল্ড ডগ, ইতনে বড়ে ঝুন্ড মে ওয়াহি রহতে হ্যায়। বাড়াসিংহা একসাথ ইতনা কভি নেহি দিখতা। আউর বাফার এরিয়া মে কুল মিলাকে ভি ইতনা সারা নেহি মিলেগা।” আমি ওর কথা শুনে খানিকটা মিইয়ে গেছি দেখে আমাকে মজা করে বললো, “কোই নেহি সাব, আপনে ধানুশ কো তো দেখ লিয়া, আব সোনার হরিণ চাই আর বাঘমামা হামি দিখাবো”। আমার কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম ঝাম সিং আর জয় তেড়ে হাসতে শুরু করেছে নিজেদের মধ্যে যেন কত বছরের বন্ধুত্ব দুজনের।

(ছবি সূত্র: নিজস্ব)

কিসলি পেরিয়ে জঙ্গলে ঢোকার পর গাড়িটা প্রথম থামলো এসে কানহা মিউজিয়ামে। জঙ্গলে এসে এসব ঢুকে দেখার কোনোও ইচ্ছে আমার কখনোই থাকে না, তবু রুটিন খেলাফ করতেও বলতে ইচ্ছে হলো না। আর জয়কেও দেখলাম সোজা পিছু নিয়েছে ঝাম সিং এর। টিকিট কেটে ঢুকতে হয়, তারপর কিছু ভোলাটাইল মেমোরি বাড়িয়ে বেরিয়ে আসতে হয়। তবে পাঠকরা এমন নাই ভাবতে পারেন। বিলুপ্তপ্রায় জন্তুর আর্টিফিসিয়াল স্কেলিটন, বাঘের গায়ের লোম এর ঘনত্ব, বর্ষার মাটিতে বাঘের পায়ের ছাপ, হরিণের সিং এর প্রকারভেদ, বাইসন এর খুলি ইত্যাদি ইত্যাদি। আমার সিনিক মাথা, এসব দেখে বিশেষ সুবিধা করতে পারে না। মিউজিয়াম দেখতে হলে জঙ্গলে আসা কেন ভাই? অবশ্য সুবিশাল সমুদ্রের সামনে এসেও আজকাল ট্যুরিস্টদের রিসর্ট এর সুইমিং পুলে সলমন খান সাজতে দেখি। এরকমই কিছু একটা কথা গজগজ করতে করতে জয়কে বলছিলাম। দেখিনি আমার সামনে তখন একটা বারাসিংহার সিং আর পেছনে সলমান খান নামে রুষ্ট ও সন্দিগ্ধ নজরে এক বাঙালি কো-ট্যুরিস্ট। বুঝতে একটু দেরী হলেও নিজের অস্বস্তির কারণেই ঝামকে ইশারায় খালি কব্জি তে ঘড়ি বুঝিয়ে এবার বেরোতে বললাম। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর ফান্ড এর একটা ব্যাপার জড়িয়ে তো আছেই এই ধরনের আয়োজন এর সাথে। তবে কথা হলো এই ধরনের সাফারির আয়োজন করার দরকারও বা তাহলে কি! সরকারি উপার্জনের টাকায় যত না কনসারভেশন এর কাজ হচ্ছে তার থেকে অনেক বেশি মাত্রায় হচ্ছে ফরেস্ট এরিয়া ডিগ্রেডেশন আর তার সঙ্গে ট্রাইবাল লাইফ ডিগ্রেডেশন। রাষ্ট্র সঙ্ঘের বিশেষ প্রতিনিধি ভিক্টোরিয়া তাওলি কর্পাজ একটি সমীক্ষাতে জানান যে শুধুমাত্র ২০১৪ সালে ৪৫০ টি বাইগা ও গোন্ড গোষ্ঠীর আদিবাসী পরিবারকে সরকার বিনা সহযোগিতায় উৎখাত করেছে ব্যাঘ্র সংরক্ষণের নামে। তিনি তার রিপোর্ট আরোও লেখেন যে জঙ্গল ভালোবাসার নামে আর এক্সোটিক জন্তুর সংরক্ষণের নামে এই ফোর্সড এভিকসন আমাদেরও কি খানিকটা দায়ী করে দেয়না? যখন সাফারি ছিলো না ট্যুরিস্ট ছিলো না সরকার ছিলো না তখনও কি বাঘে-মানুষে একসাথে ঘর করেনি? এই জল জমি জঙ্গল আর জঙ্গলের আগুন ঘিরে বসে আছে তারা হাজার হাজার বছর ধরে। সূর্য মোটামুটি এবার ঝলমলে হতে শুরু করেছে, যেন আগের দিনের বৃষ্টির পর আকাশে বাংলার শরতের মত মেঘ। ঝাম সিং বললো, “আব কোর এরিয়া মে এন্ট্রি করেঙ্গে, বাত ওয়াত থোড়া কম করনা। বাঘ দিখায়েঙ্গে হি আজ আপকো”। আমি ভাবলাম সেকি এ তো আমি মনে মনে কি ভাবছি সব বুঝে যাচ্ছে।

যক্ষপুরীর অন্ধ কুতুমসার

রায়পুর এর এক বন্ধুর কাছে কুতুমসার গুহার কথা শুনেছিলাম, প্রাচীন সে গুহা লম্বায় প্রায় ৩৩০ মিটার। যাওয়া হয়নি। জয় একবার অফিসের কাজে বস্তার গিয়ে সেখানে ঢু মেরেছিল বললো। সেখানকার বিশেষত্ব অন্ধা মছলি বা ব্লাইন্ড কেভ ফিস। বেশ সাররিয়াল লেগেছিলো ব্যাপারটা, মানে মাছটা অন্ধ বলে নয় একটা গোটা কমিউনিটির কেউ কাউকে কখনোও দেখেইনি অথচ চেনে (আদতে চেনেওনা) বলে। শুধু নিজের চাহিদা মতো আকার দিয়েছে নাম দিয়েছে একে অপরকে। ঝাম সিং ধুর্ভে নাঈমকে চেনে ছোট থেকে, ওর দাদা বছর দশ আগে বাড়ি থেকে মজদুরদের সাথে কাজ করতে গেছিলো তারপর থেকে নিখোঁজ। বাবা নেই তার ছোট থেকে। বউ মা আর এক মেয়ে। উড়িষ্যা গেছিলো বছর দুই আগে, মাছের বাজারে কাজ করবে বলে। পারেনি, ফিরে এসেছে। কিন্তু বস্তারে সে পারে, তার হাত থেকে মাছ পিছলোয় না। বন্ধুর ছিপ এর সঙ্গে সে একটা বাঁশ এর মাছ ধরার ফ্রেম ও এনেছে, যার মাঝখানে তিনকোনা বরাবর সূক্ষ্ম জাল। সদিয়া, বিসার, দান্দর থেকে লো স্ট্রিম ঝরনায় পেলনা পদ্ধতিতে মাঝ ধরতেও সে ওস্তাদ। কানের পাশ দিয়ে ঝিরি ঝিরি একটু বৃষ্টির ছাঁট যেতেই ধুর্ভে একটা শিশুসুলভ হাসি হেসে নঈম কে বললো, “ইরম পুঙ্গার”, নঈম নিজের খুশি একটু সংযত করে বললো, “পইলি ওনার” তারপর হাঁটতে হাঁটতেই বললো, “ঠাণ্ডো এ পুটার বেহে”। শুনেই ঠোঁট চওড়া করে দুই আঙ্গুল দিয়ে লাঠি খেলার মতো ছিপটা ঘোরাতে ঘোরাতে বন্ধুর পেছন পেছন এগিয়ে চললো ঝাম সিং ধূর্ভা। গাছের ওপর দিয়ে কয়েকটা হনুমান লাফ দিতে দিতে চলে গেলো খেলার ছলে কিম্বা ভয় পেয়ে নয়তো স্রেফ জায়গা বদলের খেলায় মেতে।

উর তাং তাং / ধনুকে জোর দেরে টান

ঝাম সিং অনেকক্ষণ চুপ করে অর্জুন সুলভ দৃঢ়তা নিয়ে গাড়ি চালাতে চালাতে নজর রাখছে চারদিকে। এদিকে জয় ওর এস এল আর দিয়ে ছবি তুলে যাচ্ছে গাছ পাতা ফুল ফলের। হঠাৎ যেন একটা কুমিরের মুখের মতো সংকীর্ণ জংগুলে রাস্তা ধরে সোজা পেটে পৌঁছে গাড়ি থামালো ঝাম সিং। সুবিশাল এক প্রান্তর। বুঝতে পারলাম কেন দাঁড়িয়েছে। প্রান্তর এর মাঝের দিকে একটা বিশাল ন্যাচারাল সল্ট পিট। ঝাম সিং আগেই সতর্ক করে দিলো, “উতরনা মাত, নিশান হ্যায়”। তারপর নিজেই নেমে গিয়ে আমাদের গাড়ির মধ্যে থেকেই দেখার নির্দেশ দিলো। মনে তখন ক্রাউচিং টাইগার হিডেন ড্রাগন নামটা মাথায় এলো, সম্ভবত বাঘ এলে ওরকম কোনও পোজ ঝেড়ে পরাস্ত করবো ভেবেছিলাম। এসব (ঝামের ভাষায় অনাব সনাব) ভাবতে ভাবতেই একটা এনিম্যাল হার্ড ছুটে যাওয়ার শব্দ। আমাদের গাড়ি থেকে প্রায় মাইলআধেক দূরে একপাল বাইসন, কানহা অলিম্পিক্স এর গোল্ড মেডেল এর জন্য ছুটছে। যেন ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলাম যেন বুদ্ধিমানের মতো অবজার্ভ করলাম যেন দার্শনিক এর মতো জীবন এর সম্পৃক্ততা নিয়ে এককাঠি উন্নীত হলাম। ঝাম বললো, “ইয়ে আপকে বেঙ্গল মে ভি মিলতা হ্যায়, ইসে গাওর কহেতে হ্যায়”। জয় ও একটু ফুর্তি নিয়ে বললো, “হুমম… গাওর সে দেখনে কি চিজ হ্যায়।” আর মিনিট পাঁচেক ছিলাম ওখানে, যতক্ষণ না ঝাম একটু চোখ বন্ধ করে কিছু একটা মন দিয়ে শুনে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়। আমি আর জয়ও শুনেছিলাম কাছের লম্বা ঘন গাছের সারির ওপর পাতার ছটফটানি এর শব্দ, হনুমান বই আর কিছু মনে হয়নি যদিও। তবে তার পেছনের কারণ বোধহয় যে বোঝার সেই বুঝেছিলো। কিছুটা এগোতেই একটা ময়ূর দেখে গাড়ি দাঁড় করাতে বলবো ভেবে মুখ ঘোরাতেই ঝাম কথা কেড়ে নিয়ে বলে উঠলো, “থোরি আগে যাকে রোকতা হু। আতে ওয়াক্ত পিকচার লে লেনা। তব তক দুসরে সাফারি ভি আ যায়েঙ্গে।” দুজনেরই ‘খুব একটা কিছু বুঝতে পারলাম না’ মুখ দেখে একটু নিচু স্বরে ঝাম সিং বললো, “সবসে পহেলে আনেকা কুছ তো ফায়দা বানতা হ্যায় স্যার”। জঙ্গলে এভাবেই সিগন্যাল কাজ করে। জয় শ্রী ঝাম।

হমেল সিং পট্টভি একজন রংচঙে মানুষ, ভোর হলেই বেরিয়ে পরে জঙ্গলে, ঠোঁটে হাসি আর গলায় পুরনো হিন্দি গানের গুনগুন। হমেল সিং পট্টভি একজন দুর্দান্ত সাহসী বনরক্ষী, থাকে জঙ্গলের ভেতরেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এর ঘরে। তার সঙ্গী সহদেব সিং বঞ্জারা, পদে সে বন্দপ্তরের চৌকিদার। এই দুজন মিলে যেন একটা অদৃশ্য থ্রেড তৈরি করে রেখেছে ট্যুরিস্ট আর বন্যপ্রাণীদের মধ্যে। ঝাম সিংকে দেখে দূর থেকে অল্প হাত তুলে সিগন্যাল দেয় হমেল। আমাদের গাড়ি দাঁড়ায়। আমাদের সাথে হাত মিলিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেয়া কেয়া দেখা? বাইসন দেখা? আজ পুরা ঝুণ্ড নিকলা হ্যায় শপিং করনে।” আমরা হেসে সম্মতির ঢঙে জানালাম যে ওনার সেন্স অফ হিউমার আমাদের ভালো লেগেছে। অ্যাপ্রিসিয়েশনে আনন্দ পেয়ে তিনি বলে চললেন, “ঝাম সিং আপনা আদমি হ্যায়, আপ লোগ উসকে সাথ আয়ে হো মতলব হামারা গেস্ট।” বলে সরল একটা হাসি দিয়ে রাস্তা তৈরি করে সাফারি ট্রেইল ছেড়ে ঘন জঙ্গলের মধ্যে হেঁটে চললো, ঝাম সিং আর জয় ও দেখলাম কিচ্ছু কথা না বাড়িয়ে ওনাকে ফলো করছে। হমেল সিং সততই খুব মজার মানুষ, টুকটাক মজার কথা সে ক্রমাগত বলে চলেছে আমাদের খুশি করতেই বোধহয়, হয় তো এটাই দস্তুর। তবে ওনার কথাগুলোর থেকেও আমার যেটা দেখে মজা লাগছিলো সেটা হলো তার মাথার হেলমেট। না ঠিক ভয় না, তবে একটা প্রশ্ন তো আসছিলই যে আমরা যাচ্ছি টা কোথায়। ভয়টা হয় তো সেটা ওই হেলমেটের জন্যই। জয় কে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করলাম, “স্যার আমরা কোথায় হাঁটছি, মানে আপনি তো মনে হচ্ছে সবই চেনেন… তাই…” জয় কিছু বলার আগেই সহদেব সিং বলে উঠলো, “আরে হমারা ঘর চলিয়ে থোড়া, চায় বিস্কুট আন্ডা খাইয়ে। ম্যায়নে হাতি বোল দিয়া হ্যায় আপ লোগোকে লিয়ে, ও আতা হি হোগা।” আমি বললাম হাতি লেনে সে বাঘ ভয় পাকে ছুপ তো নেহি জায়েগা?” এবার হমেল আবার তার একটা শিশুসুলভ হাসি হেসে বললো, “হাতি কো সবসে আচ্ছা পাতা হ্যায় কে শের কাহা হ্যায়, আউর অপকো রাইড ভি মিল জায়েগা।” বলতে বলতে একটা আধা কংক্রিট আধা কাঠের ছোট ফরেস্ট হাউজে পৌঁছলাম। সহদেব আগে ঢুকে ঘরের দরজা খুললো।

(ছবি সূত্র: নিজস্ব)

আমরা বসলাম, ঘড়িতে তখন ১০টা ২০মিনিট। আমি ঝাম সিংকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা হাম ইয়াহ টাইম ওয়েস্ট করেঙ্গে তো বাকি ট্যুরিস্ট পেহলে আকে ভাগা নেহি দেগা শের কো?” জয় বললো, “আমার মনে হয় আমরা একটু সিলেকটিভ হসপিটালিটি পাচ্ছি, ওরা কোনও বেটার প্ল্যান রেখেছে আমাদের জন্য”, বলে হমেল সিং এর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “হ্যায় না স্যার?” এর উত্তর টা আবার হেসে দিলো ঝাম সিং, “আপ লোগো কো স্পেশাল জিনিস দিখাবো হামি”। আগেই জানতাম যে ঝাম সিং বাংলা ভালই বোঝে আর ভাঙ্গা ভাঙ্গা বলতেও জানে। এর মাঝেই হমেল সিং পাশের ঘর থেকে ইউনিফর্ম এর শার্টটা চাপিয়ে আমরা যেখানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম সেখানে ঢুকলো। এবার আর মাথায় হেলমেট টা নেই, আর তাতেই বুঝলাম তার এই বনজঙ্গলের মধ্যে মোটর বাইক ছাড়াও হেলমেট পরে হাঁটার কারণ। ভদ্রলোকের আসলে মাথা আর কপালের অনেকটা অংশ টোল খাওয়া আর খাবলানো গোছের। যেন উত্তরটা দিতে প্রস্তুতই ছিলেন তিনি, আমাদের চোখে কৌতূহল দেখে নিজেই শুরু করলেন, “২০১০ মে বাঘ অ্যাটাক কিয়া থা। ম্যায় তব বাহার সে আ রাহা থা মেরে সাইকিল সে, আচানক এক স্পটেড ডিয়ার ট্রেইল কে বিছ মে পড়া হুয়া হ্যায় দেখকে উতরা। সোচা, বুখার উখার হ্যায়। বাস উসকে পাশ যাতে হি পিছে সে… ফির ম্যায় মেরে প্যান্ট সে টর্চ নিকালকে উসকো দে মারা…” বলে একটু হেসে নিয়ে বলে “ফির হোস আয়া তো ম্যায় ক্যাম্প মে থা আউর…” “মুঝে থোড়া দের হোতা পৌঁছনে মে তো উনকো তো পরমবীর চক্র মিল গ্যায়া হোতা” বলতে বলতে একটা টেবিল টেনে তার ওপরে পাঁচ কাপ চা আর পাঁচটা অমলেট সমেত ট্রে টা তার ওপরে রাখে সহদেব। তারপর একটা বিস্কুট রাখার প্লাস্টিক এর কৌটো খুলতে খুলতে বলে, “মেরে গান সে ফির হাওয়া মে দো ফায়ার কিয়া আউর ফির ওয়ারলেস কল কিয়া ক্যাম্প মে। আচ্ছা থা ট্যুরিস্ট সিজন নেহি থা, নেহি তো আউর বাওয়াল হো যাতা।” ঝাম সিং বলে, “উসকা ইনজুরি এইসা থা যো ঠিক তারাহ সে রিকভার হোনে কা চান্স হি নেহি থা। সালা আর্মি মে থা না ইসিলিয়ে ইতনা জিগরা হ্যায়। আমি চায়ের কাপ টা তুলে বললাম, “আরে আর্মিম্যান? রিটায়ারমেন্ট কে বাদ ফরেস্ট? কেয়া বাত হ্যায়!” হমেল সিং গলা দিয়ে মুখে একটা ধাক্কা দিয়ে হেসে বললো, “হামারে আর্মি মে তব রিটায়ারমেন্ট নেহি হোতা থা, ইয়া তো পাকরে যাতে থে ইয়া ফির মারে যাতে থে। আগার পাকরে গ্যায় তো ভি ইয়া তো মারে যাতে থে ইয়া তো শুধরণে কে লিয়ে জেল ভেজে যাতে থে। মুঝে মাওত সে বেটার ট্রিটমেন্ট মিলা, ফির লোকাল জঙ্গলী ইনসান হোনে কে ওয়াজাহ সে ৬ হাজার পাগার মে ইয়াহ নৌকরি মে লাগা দিয়া”। ঝাম সিং বলে, “আপ লোগ শঙ্কর বাবু মতলব শঙ্কর গুহ নিয়োগী কা নাম তো শুনে হি হোঙ্গে?” বলতে বলতে সহদেব আবার ঘরে এসে ঢোকে আর ঝাম সিং এর দিকে তাকিয়ে গোন্ডি ভাষায় জানায় যে এবার আমাদের বেরোতে হবে। জেশ্চার দেখে বুঝলাম যে বলছে হাতির মাহুত ওয়ারলেস এর মাধ্যমে তাকে জানিয়েছে। চায়ের শেষটুকু চুমুক দিয়ে আমরা উঠে দাঁড়ালাম। ঝাম সিং বললো, “আপকো পাতা হ্যায় ইয়ে যো হাতি লেকে আ রাহা হ্যায় ইয়ে মেরে গাও সে হ্যায় ঠিক ইয়ে হমেল কি জ্যায়সা। ইসকো ম্যায় সুবাহ হি নিকালনে সে পাহলে ফোন করকে আনে কে লিয়ে বোল দিয়া থা। ডিপার্টমেন্ট কে হাতি অউর ডিপার্টমেন্ট কে লোগ উতনা কোশিস নেহি করতে, ১০ মিনিট মে শের দিখ গেয়া তো ঠিক নেহি তো নেহি। ইশিলিয়ে ম্যায়নে হমেল সে বাত করকে ট্যুরিস্ট রুট ছোড় কে ইয়ে রুট লিয়া, আউর ইস লরকে কো বুলায়া।” গলার স্বর একটু নামিয়ে বললো, “ইসসে ইসকো থোড়া পয়সা ভি মিল জায়গা।” আমি মনে মনে ভাবলাম আমরা একে কত টাকাই বা আর দিতে পারবো যে তার জন্য এ এত মাইল হাতি নিয়ে চলে আসছে?
আমি একটু আশ্চর্য হলাম, অযথা কৌতূহল দেখাবো না ভেবে জিজ্ঞেস করলাম না। কিন্তু জয় দেখলাম আমার প্রশ্নটাই করে ফেললো, “আচ্ছা ইয়ে তো ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট কা হাতি নেহি হ্যায়, আগার ইয়ে বস্তার সে আ রাহা হ্যায় মতলব ইয়ে ছত্তিশগড় কা হ্যায়। ইয়ে ইললিগাল নেহি হ্যায়?” উত্তরে হমেল সিং বললো, “স্যার আপকো ক্যায়সে পতা যো শের আজ আপ দেখোগে ও ভি ছত্তিসগড় কা নেহি হ্যায়?” লাগসই উত্তর না পেয়ে জয় বললো, “ও লোগ অভি কিতনে দূর হ্যায়?” এবার আর কেউ উত্তর দিলো না, খুব কাছ থেকে শোনা গেলো তার ডাক। আর ওপর থেকে কিছু ডানা ঝাপটানোর শব্দ।

সারো মান, পুর্বহা নেত – আজ মাছ ধরার দিন

বর্ষা আসবে আসবে কিম্বা সেপ্টেম্বর মাস, এই সময়গুলোতে প্রচুর মাছ আসে কানহার এই লেকে। তবে একটু অপেক্ষা করতে হয় ঝাঁক এর জন্য। ঝাম সিং ধূর্ভা এর ছিপ তাই বিশেষ জুত করে উঠতে পারছিলো না। নঈম এর বুদ্ধিটা এখানে বেশি কাজে এলো। ওই বাঁশের তিনকোনা ফ্রেমটা লেকের অগভীর পারে গেঁথে দিয়ে মুরগির ছাঁট জলে ছড়িয়ে দিলো নঈম। যেন এক আসন্ন বিজয় এর হাসি ফুটে উঠলো দুজনের মুখে। যদিও বন্ধু ঝাম তখনও ছিপ দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। নঈম ইশারায় কিছু একটা বের করতে বললো তাকে। ঝাম ইশারায় উত্তর দিলো পাশে রাখা ব্যাগটা থেকে বের করে নিতে। একটা ঘোলাটে জল ভর্তি প্লাস্টিকের বোতল বের করে চুক চুক করে অল্প চুমুক দিলো নঈম, তারপর আবার ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে একটা মোড়ানো শালপাতা বের করে সেখান থেকে একটু ঝালনুন তুলে মুখে দিয়ে নিলো। ছিপটা এবার গোটাতে শুরু করে ঝাম সিং ধুর্ভা, দেখে একটা ছোট সাইজের রসবোরা জুটেছে তার কপালে। সে মুখ বেঁকিয়ে সেটা বের করে ওই শালপাতার মধ্যে বিরক্তি সহকারে ঢুকিয়ে রাখে। নঈম হেসে বোতলটা এগিয়ে দিয়ে বাঁশের ফ্রেমটা ধরে বুঝতে চায় কিছু উঠলো কিনা। ঝাম ততক্ষণে হাফ বোতল শেষ করে নঈম এর কাছে যায়। তারপর সেটা হাতের কায়দায় নিজে টেনে তোলে। শুধু একঝাঁক রসবোরা নয় সাথে বেশ অনেকগুলো বড় আর মাঝারি সাইজের চান্না স্ত্রিয়াতা ও উঠেছে। দুটিই স্থানীয় মাছ তবে এই চান্না স্ত্রিয়াতা বা স্নেক হেড জাতীয় মাঝ উত্তর ভারতে পাহাড়ী নদীতেও দেখা যায়। অতীব সুস্বাদু ও পুষ্টিকর মাছ। আজ দুজনের এখানে আসাই যেন সফল। দেরী না করে সব মাছ ঢুকিয়ে ফ্যালে সাথে আনা ব্যাগের ভেতরে রাখা মাটির হাড়ির মধ্যে। দুজনে ঠিক করে নেয়, এখুনি কাঠ জ্বালিয়ে শালপাতায় মুড়ে পুড়িয়ে নেবে বেশ কিছু রসবোড়া। তারপর সেগুলো তাদের বোতলে রাখা বাকি সালফির সাথে সদ্ব্যবহার করা যাবে। সালফি স্থানীয় একধরনের পানীয় যা মূলত তৈরি হয় স্থানীয় সালফি গাছ থেকে। যারা মহুয়ার সাথে পরিচিত তারা জানবেন (খাটিয়া বা বিছিয়া তে খোঁজ করলে ট্যুরিস্টরা পেতে পারেন)। তারা আরও ঠিক করে যে, স্নেক হেড মাছ গুলো নিয়ে যাবে বাড়ির জন্য। অনেকদিন পর বাড়িতে বেশ আয়োজন করা যাবে বাচ্ছাদের সাথে। ঝাম একটু চড়াই ধরে ওপরে উঠে যায় কিছু কাঠ জোগাড় করে আনতে, নঈম আবার জালের ফ্রেমটা আরেকটু সরে গিয়ে অন্যপাশে প্রবেশ করিয়ে দেয়। তারপর মাটিতে বসে আবার একটু চুমুক দেয় সালফিতে। হঠাৎ দূর থেকে আকাশ চিরে প্রথমে একটা তারপর পরপর দুটো তারপর টানা গুলি চলার শব্দ। গাছের ওপর পাখি আর হনুমান যেন দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে পড়েছে। নঈম এর কানের পাশ দিয়ে বয়ে যায় আসন্ন বিকেল এর ঠান্ডা হাওয়া, কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাত থেকে বোতলটা পড়ে যায় মাটিতে।

শের খান ভিলেন যুদ্ধে আমার কোন ফ্রন্ট?

নানা প্রশ্ন এতক্ষণ মাথার মধ্যে কিলবিল করছিলো, কিন্তু বাঘ দেখার আশা আর হাতির পিঠে করে তথাকথিত জঙ্গলের ইললেজিটিমেট ভ্রমণ এর থ্রিল মিলিয়ে সেসব দূরে সরিয়ে রেখেছিলাম। এমন ভাবে বাঘ দেখবো ভাবিনি অন্তত আমরা যারা ইউটিউব বা ব্লগ দেখে ঘুরতে যাই সাধারণত। কোথাও যেন সেসব ঘোরার মধ্যে তাদেরকে অনুকরণ করার প্রবণতা থাকে। যেন সেই ফিল্টারটাই ব্যবহার করতে চাই। ওই যাকে বলে FOMO না হওয়ার চেষ্টা করা। আমি বলরাম কে খুব ভয়ে ভয়েই একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম। ইয়াহা সে পিকচার লু তো ও লোগ বুড়া তো নেহি মানেঙ্গে? বলরাম হচ্ছে ঝাম সিং এর গ্রামের সেই বন্ধু, হাতির পিঠে আমাদের সামনে বসেছিলো। শব্দ না করে হাতের ইশারায় বুঝিয়ে দিলো নিশ্চিন্তে নিতে। তবু হাতের কাঁপুনি সহজে বন্ধ হচ্ছিলো না, আসলে সামনে ১২ ফুট দূরত্বের মধ্যে যদি চারটে বাঘ আপনার দিকে তাকিয়েই বসে থাকে তাহলে আপনারও মনে হতে পারে সঙ্গে একটা সাপ্লিমেন্টারি পেসমেকার রাখলে ক্ষতি নেই। যদিও এদের মধ্যে দুটো ছোট। মানে একটা গোটা পরিবার আর কি অন্যান্য দিনের মত লাঞ্চ ফাঞ্চ সেরে একটা অলস দুপুর কাটাচ্ছে। জয় দেখলাম আমার থেকে বেশি সাহসী, ফ্ল্যাশ চালিয়ে টুক করে একটা ছবি তুলে নিলো। আমি ওকে হাতজোড় করে ফ্ল্যাশ মারতে বারণ করলাম। বলরাম কে কিছু বলতে হলো না, ও এখনও প্যাকেজ মানে জানে না। আমাদের কে নিয়ে এগিয়ে চললো, বললো “চলিয়ে ইনকে দুশমন কো ভি দিখাতে হ্যায় আপকো”। আমার তো দুশমন শুনেই কেমন একটা খলচরিত্র মাথায় এলো। তাহলে কি মুন্না আসলে শের খান? ভাবলাম সে যদি আমাদের সাথে অতটা ভালো ব্যবহার না করে! এরপর বেশ কিছুক্ষণ এগোলাম বলরাম এর সাথে, জিজ্ঞেস করলাম তার হাতির নাম কি? বললো “শঙ্কর হ্যায় ইসকা নাম, মহাদেব কা ভক্ত হ্যায়।”

শঙ্কর এর পিঠে বসে বাঘিনী, পরিবার পাশেই ক্যামেরার ফোকাস এর বাইরে (ছবি সূত্র: নিজস্ব)

চোখের সামনে দিয়ে অনেক পাখি উড়ে যেতে দেখলাম। আরোও একবার ধনেশ দেখলাম, ময়ূর বেশ কয়েকবার। বাকিদের মধ্যে স্কারলেট মিনিভেট এর রূপে সম্মোহন করার ক্ষমতা দেখে চিনতে পারা ছাড়া আর বিশেষ কাউকে শনাক্ত করার মত জ্ঞান আমার ছিলো না। পাঠকদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। বেশ ঘুরপথে হলুদ থেকে একটু লালচে হতে থাকা সূর্য দেখতে দেখতে আমরা এসে পৌঁছলাম কানহা ওয়াচ টাওয়ার এর কাছে। দেখলাম দূর থেকে ঝাম সিং তার জিপসি নিয়ে আমাদের দিকে আসছে। বলরাম বললো, “আউর নেহি জয়েগা হাম”। বলতেই শঙ্কর হাঁটু মুড়ে বসে পরলো আর আমরাও নেমে পড়লাম। বলরাম বেশ ছোট, তাই আমি খুব সঙ্কোচ করেই দুটো হাজার টাকার নোট ঝাম সিং এর হাতে দিয়ে বললাম ওকে ওটা দিয়ে দিতে। যদিও জানতাম, ও যে পরিশ্রম করে এসেছে আর আমাদের যেভাবে ঘুরিয়েছে তার তুলনায় সেটা খুবই নগণ্য। ঝাম সিং ওটা ভাঁজ করে আমার পকেটে ঢুকিয়ে দিলো। বললো, “স্যার ইয়ে মেরে তরফ সে থা। আপ কিউ দোগে? খানিকটা ইতস্তত করেও লাভ হবে না বুঝে শেষ পর্যন্ত বলরাম কে আমরা সবাই বিদায় জানিয়ে গাড়িতে চেপে বসলাম। বলরাম সূর্য অস্ত যাওয়ার বিপরীত দিকে শঙ্করকে ঘুরিয়ে নিয়ে রওনা দিলো তার বাড়ির পথে। তার গ্রাম বালসমুদ্র। আমরা কিছুটা এগিয়ে ওয়াচ টাওয়ার পৌঁছলাম যেখানে তখন ইতিমধ্যে ফরেস্ট গাইড ও ব্যক্তিগত কৌতূহল সহকারে এদিক ওদিক জিজ্ঞাসু খিদেমাখা আঠারো বিশ জোড়া চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছে। যেন আমার মনের কথাই বুঝে নিয়ে ঝাম সিং বললো, “চলিয়ে ইয়াহ নেহি রুকতে হ্যায়, আপকো দুশমন টাইগার দিখাতে হ্যায়।” বলে হেসে উঠলো। আমি ভাবলাম শের খান এর চরিত্র তার মানে জঙ্গলের খুব জেনেরিক ব্যাপার।

টাইগার মুন্না (ছবি সূত্র: indianwildlife.wordpress.com)

ফেরার সময় কিস্লি পেরিয়ে বিছিয়ার দিকে যাবো বলেছিলাম ঝামকে। সেই পথে ঢুকতেই ব্যাগ এর মধ্যে থেকে ডিক্যান্টার বের করে একটু গলা ভিজিয়ে ঝাম সিং কে এগিয়ে দিলাম। ঝাম সিংও অপরিচিতের মতো লজ্জা না পেয়ে গোতগোত করে সেটা গলায় ঢেলে জয়কে দেয়। আরেকটু এই সিলসিলা চলার পর ঝাম সিং গাড়ি থামায় এক পরিচিতের বাড়ির সামনে। তাকে বাইরে থেকে গোণ্ডি তে কিছু একটা বলে, তাতে ভেতর থেকে উত্তরও আসে সেই ভাষায়। এতক্ষণে ঝাম সিং অনেকখানি আমাদেরই একজন হয়ে উঠেছে মনে হয় আমাদের দুজনেরই। সেই সুযোগে সাথে খানিকটা নেশার আর ঘুটঘুটে অন্ধকারে লাইসেন্স নিয়ে প্রশ্নটা এবার করেই ফেলি ঝাম সিং কে যে সে কেন বলরাম কে আমাদের টাকা দিতে দিলো না। ঝাম সিং স্বভাবসিদ্ধ হেসে নিয়ে উত্তর দিলো, “আরে ওকে ডেকেছিলাম তো আমার কাজে। বাড়িতে বেশ কিছুদিন টাকা পাঠাবো ভাবছিলাম, এদিকে যে গিয়ে দিয়ে আসবো সে ছুটিও পাচ্ছিলাম না। তাছাড়া অনেকদিন গ্রামের কাউকে দেখিওনি তাই একটু দেখা করার লোভও ছিলো।” এর উত্তরে সত্যিই আমাদের দুজনেরই কিছু বলার ছিলো না। জয় বললো, “আই নেভার ফেল্ট দিস ফর্চুনেট বিফোর ঝাম দা। আপ মেরে সাথ জবলপুর চলো।” বুঝলাম জয়ের নেশা হয়েছে বেশ। নেশা আমারও কম হয়নি সেটাও বুঝতে পারছিলাম। সময় সম্পর্কে তেমন ভাবার ইচ্ছে করছিলো না, খুবই প্রেমে পড়ে যাওয়া একটা দিন যেন শেষের দিকে পা বাড়াচ্ছে মনে হচ্ছিলো। বাড়ির ভেতর থেকে একজন সাদা চুল বয়স্ক লোক হাতে দুটো ঘোলাটে জলের বোতল, তিনটে স্টিলের গ্লাস আর একবাটি মুরগীর মাংস দিয়ে গেলো আমাদের গাড়িতে। ঝাম সিং কথা না বাড়িয়ে তিনটে গ্লাসে সেটা ঢেলে আমাদের দুজনের দিকে এগিয়ে দিলো। জয় দেখলাম একটু শুঁকে এক ঢোকে মেরে দিলো পুরোটা। তারপর জিজ্ঞেস করলো, “ইয়ে মহুয়া হ্যায় না?” ঝাম সিং নিজের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বললো, “এটা সালফি, গোন্ডদের মদ। আমরা বানাই এটা।” অন্ধকারেও তাকে চাঁদের আলোতে বেশ সপ্রতিভ লাগছিলো এটা বলার সময়। আমি বললাম, “একটু মহুয়ার মতো খেতে কিন্তু গন্ধটা অন্যরকম।” ঝাম সিং বললো, “কিছুই অন্য রকম না, সবই এক শুধু সীমানা গুলো আলাদা হলে গেছে।” নেশাটা হাওয়ায় ভর করে বাড়তে থাকে। আমি জিজ্ঞেস করি “সব জঙ্গলেই কি শের খান এর মতো একজন ভিলেন বাঘ থাকে যার উদ্দেশ্য প্রতিশোধ নেওয়া?” জয় পাশ থেকে বলে, “যাই বলিস ভাই মুন্নার চেহারা আগের মেল টাইগার টার থেকে আরোও ভালো। বেশ একটা কিং ব্যাপার আছে।” ঝাম সিং ঘাড় নেড়ে বলে “একা বাঘ এর থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর শাবক নিয়ে বাঘিনী। তাই টেরিটরি ভাগ করা। একদিকে এদের আর্মি আরেকদিকে ওদের আর্মি। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলবে খালি। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা…।

একটু ক্লান্তি আর নেশাতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম তিনজনেই। ওই বৃদ্ধ মানুষটি এসে ডাকাডাকি করাতে উঠে বসলাম। ঝাম সিং কব্জির ঘড়িটা দেখে বললো, “নও বাজ গ্যায়া, চলো আপকো হোটেল ছোড়না হ্যায়। নেহি তো বীরা ডিপার্টমেন্ট মে মেরা শিকায়েদ কর দেগা। আপ চাচাকো ইয়াহাকা বিল দে দো। আউর যো দুসরা বোতল হ্যায় বো হামে দে দো। ইয়ে মেরা গিফট হ্যায়। অভি ঠিক হ্যায় না স্যারজি?” বলে হাসতে হাসতে চাবি ঢুকিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়। বুঝলাম, ঝাম সিং আবার কাজের জীবনে ঢুকে পড়েছে। হোটেলে নামানোর সময় বলে, “জঙ্গল আউর জানোয়ার সে তো আজকাল সব পেয়ার করতে হ্যায়। সব আতে হ্যায় জঙ্গল ঘুমনে, সব বড়ি বড়ি বাতে করতে হ্যায় ফরেস্ট কনজারভেশন স্পিসিস কনজারভেশন ইয়ে বো… এক হাতি মরতা হ্যায় তো চারো তরফ কোহরাম হো যাতা হ্যায়। বস্তার মে হার রোজ কিতনে লোগ মরতে হ্যায়, কিস কিস তারাহ সে মরতে ইসকা কিসি কো কোই ফরক নেহি পরতা। আদিবাসী কে জান কা কোই কিমত নেহি হোতা হ্যায় ইস দেশ মে।” আমি আর জয় তাকিয়ে একজন রক্ত মাংসের মানুষকে দেখি, দেখি চাঁদটা তাকে জ্যোৎস্নায় ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে আমাদের থেকে দূরে। অনেকটা পথ সে এভাবেই এসেছে যাবেও এভাবে আরোও অনেক দিন। ঝাম সিং ধ্বংস হয়ে যাবে তার প্রিয় বস্তার এর মতো, তবে তার আগে অবধি হার মানবে না। লড়াই চলবে..

চাঁদের মাটিতে মৃত্যু ঘিরে আগুনের পরব

গ্রামের ছ’জন যখন খবর পেয়ে পৌঁছলো তখন প্রায় রাত হয়ে গেছে। আজ আর লাশ নিয়ে ফেরা সম্ভব নয়, তার থেকে আরোও কাঠ এনে আগুন জ্বালিয়ে রাতটা জেগে সা খেতে খেতে কাটিয়ে দেওয়াই ঠিক মনে হলো সবার। নঈম গিয়ে আরেকবার জালের ফ্রেমটা জলে ফেললো, সবার জন্য একটু খাবার এর ব্যবস্থা করতে। গ্রামের লোকেরাও সঙ্গে করে আলু আর চাল এনেছে। ক্রমেই বালঘাট জেলার এই লেকটা যেন কয়েক সহস্র জ্যোৎস্না পিছিয়ে চলে গেছে, যেখানে মানুষ মৃতদেহ পাশে রেখে আগুনে সেঁকে নিচ্ছে রাতের খাবার টুকু। কুতুমসার গুহার অন্ধ মাছগুলোও যেন আজ চোখে দেখতে না পেয়ে ভিড় করেছে নঈম এর জালে। কাল আবার নতুন করে শুরু হবে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা।
সকাল হতে নঈম এর জালের বাঁশ গুলো দিয়েই বানানো হয়েছে ধুর্ভা কে নিয়ে যাওয়ার খাট। একহাতে খাটের একপ্রান্ত আর অন্য হাতে মাছের হাঁড়ির ব্যাগ ধরে বাড়ি ফিরতে ফিরতে নঈম এর দুটো চিন্তা ছিলো। ধুর্ভার ছোটমেয়েকে মাছগুলো দেওয়ার সময় কি বলবে আর নিজের ভাগের মাছ গুলো কোথায় বেচলে একমাস মোটামুটি সংসার চালানোর টাকা উঠে আসবে।

(তথ্য সূত্র: hindustantimes.com)

গ্রন্থপঞ্জী:
1. https://www.downtoearth.org.in/blog/forests/tribal-communities-suffer-when-evicted-in-the-name-of-conservation-64376

2. https://www.hindustantimes.com/bhopal/chhattisgarh-minister-demands-probe-in-death-of-tribal-man-killed-in-encounter/story-5l5Ys6mKPCd4lZr0uU1viO.html

3. https://indianwildlife.wordpress.com/category/kanha-tiger-reserve/

4. https://www.flickr.com/photos/190515093@N05/albums