কৃষ্ণেন্দু পালিত-আহিরণ বিল পাখিরালয়

Spread This
Krishnendu palit

কৃষ্ণেন্দু পালিত

আহিরণ বিল পাখিরালয়

ডিসেম্বর ২০০৯। বিশেষ কাজে মুর্শিদাবাদ গিয়েছিলাম৷ সেখানেই জানতে পারি পক্ষী প্রেমীদের নতুন ঠিকানা প্রস্তাবিত পাখিরালয় আহিরণ বিলের নাম৷ স্বাভাবিকভাবেই কৌতুহল হয় একজন ভ্রমণপিপাসু মানুষ হিসাবে। খোঁজখবর নিয়ে পরদিন বিকালে পৌঁছে যাই৷ যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল৷ জলে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি৷ এতো হীরের খনি৷ তাড়াতাড়ি ক্যামেরা বের করে জলাভূমিতে নামার উদ্যোগ নিতেই কোথা থেকে খাকি উর্দি পরা একজন পাহারাদার এসে পথ আটকালো৷ জানতে চাইলো পরিচয়৷ সাধারণ পর্যটক শুনে বনদপ্তরের পারমিশন দেখতে চাইল। নেই শুনে স্পষ্ট জানিয়ে দিল আগে পারমিশন নিয়ে আসুন, তারপর বিলে নামবেন৷ দেখছেন না অকারণে পাখিদের বিরক্ত করা বারণ৷ সামনের প্রকাণ্ড সাইনবোর্ডের দিকে নির্দেশ করে বললেন৷ পারমিশন ছাড়া এখানে নামতে দেওয়া হয় না৷
-কোথায় গেলে পারমিশন পাবো?
-রঘুনাথগঞ্জ৷ জঙ্গিপুর রোড স্টেশনের পাশে৷
পরদিন সকালে ঠিক দশটায় পৌঁছে গেলাম বনদপ্তরের অফিসে৷ দিনটি ২০০৯-এর শেষ৷ অর্থাৎ ৩১শে ডিসেম্বর৷ অফিস খুঁজে পেতে বিশেষ অসুবিধা হল না৷ অসুবিধা হলো অন্য জায়গায়, ছোট্ট অফিসঘরে তখন মানুষ বলতে একজন মাত্র চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী৷ বন আধিকারিক কাশীনাথবাবু গেছেন কৃষ্ণনগর, অফিসের কাজে। ফিরবেন দু তারিখ, একেবারে মাইনে তুলে। এখন উপায়? অফিস থেকেই তার ফোন নাম্বার পেলাম৷ সদাশয় ভদ্রলোক ধৈর্য ধরে শুনলেন আমাদের আবেদন৷ টেলিফোনেই অনুমতি দিলেন৷ বিল সম্পর্কিত অনেক তথ্যও মিলল তার কাছ থেকে৷

বিলের মোট আয়তন ৬৫ একর বা ২০০ বিঘার কাছাকাছি৷ এর মধ্যে সরকারের সম্পত্তি ৪১.৩৮ একর৷ বাকি সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি৷ প্রতিবছর প্রায় সাত থেকে আট হাজার পাখি আসে এখানে৷ ১৭/১৮ প্রজাতির পাখি৷ উল্লেখযোগ্য রেড টেস্টেড পোচার্ড, ফ্যারুজিনান পোচার্ড’, লেসার হুইসলিং ডাক, গডওয়াল, গরজেনি, কমন নুরহেন, ডেনহার, গ্রে হেডেড লাফারি ইত্যাদি৷ এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি, আমি পক্ষীপ্রেমী নই৷ পাখিও চিনি না, নামও জানি না৷ আমার আগ্রহ একজন ভ্রমণপাগল মানুষ হিসাবে, একটি নতুন স্পট সম্পর্কে কৌতূহল৷ আহিরণ বিল একেবারে ভার্জিন স্পট৷ পর্যটকদের কাছে একেবারে অপরিচিত৷ এমনকি কোন পত্রিকায় বা সংবাদপত্রে আজ অবধি এ বিষয়ে এক কলম লেখা দেখেছি বলেও মনে পড়ে না৷
পারমিশন হতেই ঘণ্টাখানেকের ব্যবধানে পৌঁছে যাই আহিরণ বিল৷ আবার সেই উর্দিধারী পাহারাদারের খপ্পরে৷ ভদ্রলোকের নাম জেনে এসেছি, দীপক অধিকারী। তাকে সবকিছু জানিয়েও বিশ্বাস করাতে পারলাম না৷ ভদ্রলোকের দায়িত্ববোধ প্রশ্নাতীত৷ পাখির প্রতি অসম্ভব মমত্ব৷ বাধ্য হয়ে আবার কাশীনাথবাবুর সঙ্গে যোগাযোগ করলাম মোবাইলে। তারপর ছাড়পত্র মিলল৷

ঘাটে তিনটি মাত্র ডিঙ্গি নৌকা৷ তার মধ্যে দুটি মেরামতের কাজ চলছে৷ নৌকা তিনটিকে ঘিরে কিছু বাচ্চাকাচ্চার মজলিশ৷ তাদের কাছে মাঝির খোঁজ করতেই দুজন ছুটলো৷ দেখতে দেখতে আমাদের ঘিরে একটা ভিড় জমল ছোটখাটো৷ পথচলতি মানুষও দাঁড়িয়ে গেল কেউ কেউ৷ আমাদের কাছে তাদের নানান প্রশ্ন, এই জায়গার উন্নতি হবে? আমরা কাজ পাব? সরকার কী কী করবে এখানে? বিলের ধারের জমিগুলো সরকার কিনবে তো? আমার ন’বিঘে জমি রয়েছে৷
আমি সরকার কিংবা বনদপ্তরের মানুষ নই৷ এমনকি সাংবাদিকও নই৷ সাধারন একজন পর্যটক৷ নতুন নতুন স্পটের প্রতি আগ্রহ আছে, খুঁজে বের করতে ভালো লাগে৷ মাঝে মাঝে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখি৷ আহিরণ বিলের কথাও লিখব৷ মানুষ জানবে এই পাখিরালয়ের কথা৷ পাখি দেখতে আসবে৷ গড়ে উঠবে পর্যটনকেন্দ্র। আর পর্যটনকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে নতুন নতুন জীবিকার সুযোগ। বনদপ্তর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে৷ সরকারের হাত থেকে বনদপ্তরের হাতে বিলটা হস্তান্তর হতে এখনো বাকি৷ কিছু আইনি সমস্যা মিটে গেলেই ত্বরান্বিত হবে পাখিরালয়ের কাজ৷ সেসব কথা তাদের বোঝাই। তারা তাতেই খুশি৷ ততক্ষণে মাঝি এসেছে৷ নাম মামলোদ শেখ৷ সারাদিনের জন্য ভাড়া চাইলো একশো টাকা৷ আমাদের দুজনকে নিয়ে নৌকা জলে ভাসাল মামলোদ। সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলল সে নৌকাবিহার৷ সারাদিন পাখি দেখা, পাখি চেনা, অবশ্যই মাঝির চোখ দিয়ে৷ আগেই বলেছি আমি পাখি চিনি না, নামধাম জানিনা। এখানে এসেছি বেড়ানোর তাগিদে৷ মামলোদ ভাই আমাদের পাখি চেনায় তার নিজের ভাষায়, স্থানীয় নামে৷ একই পাখির ভিন্ন ভিন্ন নাম ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে৷ পাঠক সেসব নামে চিনবেন না৷ আমি বরং পাঠকের সঙ্গে পাখিদের পরিচয় করানোর দায়িত্ব নিই ক্যামেরার মাধ্যমে৷ ছবি দেখেই চিনবেন তাঁরা। মন দিয়ে ছবিটা তোলার চেষ্টা করি৷ ধীরে ধীরে বেলা পড়ে আসে। সূর্যদেব পাটে বসেন৷ রাখাল ঘরে ফেরে গরুর পাল নিয়ে৷ কুয়াশা ভেদ করে দূরে তাদের অবয়ব যেন জলরঙে আঁকা এক -একটা বড় ক্যানভাস৷ রং বদলায় জলের৷ চরাচর জুড়ে গোলাপি আভা৷ ধীরে ধীরে কমতে থাকে পাখির সংখ্যা৷ উড়ে যায় ঝাঁকে ঝাঁকে৷ কোথায় যায় তারা? মাহলোদ ভাই জানায়, রাতে বিল ফাঁকা থাকে৷ আস্তে আস্তে সব উড়ে যাবে। সকালে ফিরে আসবে আবার৷ সারারাত চরে বেড়াবে ক্ষেতে-খামারে, খাবারের সন্ধানে৷ মাছ ছাড়াও পোকামাকড় এবং শস্যদানা এদের খাবার।

দূরে ছবির মত গ্রামগুলোকে কিছুক্ষণের জন্যে সিলুট করে অস্ত যান সূর্যদেব৷ ঠান্ডাটাও জাঁকিয়ে পড়ে, কামড় বসায় শরীরে। হঠাৎ করে ছাই রঙা আঁধারে ঢেকে যায় চরাচর৷ বিলে ততক্ষনে পরিযায়ী পাখিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে৷ পরিযায়ী তো আমরাও৷ এবার আমাদেরও ঘরে ফিরতে হবে৷

পুনশ্চঃ প্রায় এক দশকের ব্যবধানে, ২০১৮ সালে আবার সুযোগ হলো আহিরণ যাওয়ার৷ পূর্বের স্মৃতি মাথায় ছিল৷ পারমিশন করানোর জন্য ঠিক দশটাতেই উপস্থিত হয়েছিলাম বনদপ্তরের অফিসের সামনে৷ বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরেও অফিসের তালা খুললো না৷ কে জানে বর্তমান বনাধিকারিক কৃষ্ণনগরে অফিসের কাজে গিয়েছেন কিনা! হয়তো মাইনে তুলে একেবারে সামনের মাসে ফিরবেন৷ কারণ এবারও ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে এসেছি৷ এরপর আর অপেক্ষা করার অর্থ দিনটাই নষ্ট৷ ওমরপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সেরে দুটো নাগাদ আহিরণ বিলে পৌছালাম পারমিশন ছাড়াই৷ আগাছা ভর্তি বিল, অনেক দূরে পরিষ্কার জল৷ অসংখ্য জেলে নৌকা মাছ ধরে বেড়াচ্ছে। পাখি সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম৷ অন্তত আগেরবার এসে যেরকম দেখেছিলাম তার চার ভাগের এক ভাগেরও কম৷ সব মিলিয়ে কিরকম যেন মন খারাপ করা পরিবেশ৷ আমাদের দেখে কয়েকজন মানুষ এগিয়ে এলেন, ঘুরতে এসেছি শুনে নৌকা লাগবে কিনা জিজ্ঞাসা করলেন৷ ৪০০ টাকায় রফা হলো একজনের সঙ্গে৷ তিন ঘন্টা ঘোরাবেন৷ পারমিশনের প্রসঙ্গ তুললে একগাল হেসে বললেন,ওসবের এখন ওজন হয় না বাবু৷
-বিল পাহারা দেওয়ার জন্য কেউ নেই?
পূর্বের অভিজ্ঞতার কথা মাঝি ভাইকে বলতে দুঃখ করে বললেন, সেসব অনেক আগেই উঠে গেছে৷ এখন জঙ্গলের রাজত্ব৷ মানুষ ইচ্ছা খুশিমতো পাখি মারছে, বিক্রি করছে৷ কেউ দেখারও নেই, বলবারও নেই।
-তোমরা তো বাধা দিতে পারো৷
-সে চেষ্টা আমরা করছি৷ কমিটি করেছি৷ বিলে কাউকে পাখি মারতে গিয়েই না৷ কিন্তু হলে কি হবে, জাতীয় সড়কের এপাশে বিল, ওপাশে চাষের জমি৷ আমরা বিল পাহারা দিতে পারি, অন্যের জমিতে গিয়ে তো মাতব্বরি করতে পারি না৷ সেখানে পাখি ধরার জন্য জাল পেতে রাখা হয়।
-তোমাদের অনেকের জমিই তো এই বিলের মধ্যে আছে৷ বছরে অর্ধেকের বেশি সময় সেসব জলের তলায় থাকে, চাষাবাদ হয় না৷ সরকার যে তোমাদের জমি কিনে নেবে বলেছিল, নিয়েছে?
-না বাবু, সে সব হবার নয়। আমরা আর সে স্বপ্ন দেখিনে।
-কেন?
– পাখিরালয় হবে সে বিশ্বাসটাই যে নেই৷
-তাহলে বিলের ভবিষ্যৎ? তোমাদের ভবিষ্যৎ?
মাঝি ভাই উদাস চোখে আকাশের পানে চায়৷ সেখানে তখন বেলা শেষের শেষ অস্তরাগ৷ একটু পরেই অন্ধকার নামবে৷ ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকিয়ে হতাশ গলায় বললেন, আল্লাহ জানে৷
একরাশ মন খারাপ নিয়ে নৌকাবিহার শেষ করি৷ ছবি তুলতেও ভালো লাগে না৷ তাছাড়া কমন কিছু পাখি ছাড়া বিরল প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এবছর নেই বললেই চলেI কিসের ছবি তুলব? একটা স্বপ্নের অপমৃত্যুর?