হাসান মোস্তাফেজ-স্রষ্টার ভিতর বান্দা

Spread This

হাসান মোস্তাফিজ

স্রষ্টার ভিতর বান্দা

১.
— “এই সৃষ্টির কী মূল্য যা নিজের ভিতরটা ধ্বংস করে?”
মিঠে পুষ্পিতা হেসে উঠে। এই প্রশ্ন কবে ছিল না? তবে আর উষ্ণতা নেই। মাদকতা থাকবেই
“মেল্টিং ক্লক” এর সৌজন্যে।
আমি তার ঠোঁটের দিকে একটা সিগারেট এগিয়ে দেই।
ও আবার বলে — তোমাকে আমি এইমাত্র কী বললাম?
— “আহা,এমন করছো কেন? আমার এখনই যেতে হবে” বললাম।
— তো যাও। আমার কাছে এখনো বসে আছো কেন?
আমি এই অভিমানে বিড়ালপশমের স্নিগ্ধতা পাই।হাতটা নিশপিশ করে ওর বুকে হাত দেবার জন্য।
ও বোধহয় বুঝতে পেরে একটু দূরে সরে গেল।জানালা দিয়ে রচনারাতের বৃহৎ কাঁঠালগাছের পাতা দেখা যায়। বলল — আমার ছেলেটা ইদানীং খুব আবদার করছে। থামাতে পারি না।
আমি আবার সৃষ্টির দিকে মন দেই। বুক না ছুঁতে পারলেও দৃষ্টির নিবেদন কেউ অবজ্ঞা করতে পারে না। আমি আমার সৃষ্টিকে বিক্ষিপ্তভাবে নগ্ন করি। কৌশলে এই তৃপ্ত হ্যাশট্যাগ আমার চরিত্রে মিশে যায়।
ও আবার কর্কশ গলায় বলল — শুনো না? আমার ছেলে আবদার করছে।
— ও।
— বাবার কাছে থাকতে চায়।
আমি মুষড়ে পড়ি। আমি বাবা বটে কিন্তু একটু বদ্ধতা আছে। ছেলে তা বুঝবে? ঘরে ঢোকার সময়ে ছেলেটাকে আদর করেছি, চুমু খেয়েছি, কোলে নিয়ে ওকে বারান্দায় হেঁটে গুনগুন করে লিমেরিক শোনালাম। কিন্তু এসব যথেষ্ট নয়। সবার খালি চাহিদা আর দাবি। কেন যে এই সৃষ্টির দিকে ঝুঁকলাম।
ও এবার গা ঘেঁষে আমার চুলে হাত বুলাতে লাগল। আমার বিতৃষ্ণা জাগে। আমি এসব চাই? আমি সৃষ্টির প্রাথমিক স্তরটা চাই।
আমি ওর নাভিতে বুড়ো আঙ্গুলের নখ দিয়ে আলতো একটা ভর্ৎসনা দিলাম। এটা আমি শিখেছি বাবার থেকে। বাবা এভাবে শুইয়ে মাঝে মাঝে আমাকে শাস্তি দিত। বৈধ শাস্তি। প্রক্রিয়াটা দুই দিকেই যেতে পারি।আরামে আদর, জুলুমে শাস্তি। বাবার কথা ভাবলেই মনে পড়ল আমি কিশোর বয়সে বাবাকে নগ্ন দেখেছিলাম। বাথরুমে পড়ে ছিলেন মুখ থুবড়ে। আমি জীবনে বহু নগ্ন পুরুষ দেখেছি কিন্তু সেদিন আমার বাবাকে প্রচণ্ড সুপুরুষ লেগেছিল। বাবা ছিলেন আল্লাহর মতো সুন্দর।সেই থেকে আমি সৃষ্টির দিকে ঝুঁকেছি।কিন্তু আমার সৃষ্টিটা শিল্প নয়।
অনেকক্ষণ কথা বলিনি। এবার বললাম — নিজের যত্ন নিচ্ছো?
এখনো ও মোটা হয়ে উঠেনি। তবে আস্তে আস্তে জয়গানটা জেগে উঠছে।
ও বলল — এবার মেয়ে হোক।
হার্টবিট শ্লথ হয়ে যায়। আমি এখনো কোনো মেয়ের বাবা হইনি।
বললাম — না দরকার নেই।
— তোমার ভয় হয় ওর ভাগ্যেও আমার সেই অভিশাপ আছে?
— “ফালতু কথা বলবে না” বিছানা থেকে উঠে গেলাম। বাথরুমে ঢুকে বেসিনের কল ছেড়ে দিতেই মিনি সমুদ্রস্রোত বইতে শুরু করলো। ওয়ালের তাকে ওর শ্যাম্পু, টেম্পন, সাবান আর এক জোড়া কানের দুল দেখলাম। এই দুল আমি দেইনি। আমার সৃষ্টিকে আমি অহেতুক সাজাই না। ও কি নিজেই কিনেছে? নাকি কেউ দিয়েছে?
থাক, ওর চেতনাভিত্তিক স্বাধীনতা ওর কাছেই থাক। যেভাবে আমার আছে।
দরজায় নক পড়লো। যেন দরজায় নক করে ও আমাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। এই দুল কি ও ইচ্ছা করেই এখানে রেখেছে? আমাকে সাময়িক বিভ্রান্ত করার জন্য? বোধহয় ও বোঝাচ্ছে ও আর পারছে না। ছেলেটাকে নিয়ে গিয়ে আমি যেন ওকে মুক্তি দিই।
বের হতেই দেখলাম ও আমার সিগারেট খাচ্ছে। আমি এসিটা বন্ধ করে দিলাম। ও নিজেই বলল — দুলটা দেখেছো?
— হু।
— কে দিয়েছে জানতে চাও?
— না জানতে চাইলেও কি বলবে? ও সামান্য হকচকিয়ে গেল। আমি এবার নিশ্চিত হলাম ও আসলেই চেয়েছে ওটা দেখে আমি উত্তেজিত হই। ওকে চাইলে প্রহার করে শেষে সূক্ষ্ম আদর দিয়ে সরলীকরণে অভ্যস্ত করি ।আমি মনে মনে হাসলাম। স্রষ্টাকে বান্দারা যে কেন এরকম সস্তা পরীক্ষা করে।
ও সিগারেট ফেলে দিয়ে বলল — যে আসছে সে তোমার।
আমি এবার সামান্য বিভ্রান্ত হলাম। মনে মনে কি আমি এটা অস্বীকার করেছিলাম? নাহ, তাহলে ও এটা বললো কেন?
আমার আর থাকতে ইচ্ছা করছিল না। কক্সবাজারের গোল্ডেন পয়েন্টে একটা সমস্যা হয়েছে। প্রায় কয়েক কোটি টাকার খেলা। এখান থেকে বিদায়পর্ব শেষ হলেই আমাকে একজন বিশিষ্ট সমাজব্যক্তিত্বের রূপ নিতে হবে।এর মধ্যে আবার এসব ভাববো?
আমি এবার কড়া গলায় বললাম — তোমাকে যে কেউ চাইলে ব্যবহার করতে পারে। তবে জেনে রেখো, তোমার ভেতর থেকে যা সৃষ্টি হবে তা আমার জন্যেই হবে। আর কারোর জন্য না।
কথাটা বলে খুব ভালো লাগল। ও এখন মুখ ঘুরিয়ে ফেলেছে।
প্যান্ট পরার সময় ফোন বেজে উঠলো।
— হ্যালো?
— স্যার, ওরা রাজি হইসে। টেন্ডারটা দিবে।
— আচ্ছা।
— টাকাও দিসে স্যার। এখন করব কী?
— জানোই তো কী করতে হবে? আবার মূর্খের মতো প্রশ্ন করো কেন?
জবাব পথ হারিয়ে ফেলল। আমি ফোন রেখে দিলাম। ও এখন শাড়ি পরতে শুরু করেছে। বুঝে ফেললাম শাড়িটাও আমি দিইনি।
ও এবার হাসিমুখে বলল — টব এনে দিও তো। আর কিছু সার। কিছু ফল আর ফুলের গাছ লাগাবো।
এসব ঢং। ও জানে আমি এসব কিনে দিব না। শুধু টাকাটা বুঝিয়ে দিব। থাক বলুক।
আমি চশমা পরে বললাম — আজ যাই।
— শুনো।
মেধা এবার এসে আমার হাতটা ধরে ওর বুকে ছুঁয়ালো। আমি বিরক্ত হলাম। ও মানলো না। বলল — আবার কবে আসবে?

২.
বাসায় ফিরলাম দুপুর বারোটার দিকে। আশান আমাকে দেখেই ছুটে এল। আনন্দিত গলায় বলল — বাবা, আজ আমাদের না সাভার যাবার কথা?
আমি শান্ত গলায় বলল — হু সন্ধ্যার দিকে।
আশান আর কিছু বলল না। ওর চুলে হাত বুলিয়ে আদর করে বললাম — তুমি রেডি থেকো। আমরা যাব ঠিকই।
প্রিয়তি দূর থেকে আমাদের দেখছিল, কাছে আসলো না। রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
ক্ষুধাটাকে চেপেই চলে গেলাম অফিসে। আরিফ অপেক্ষায় আছে। দেখেই বোঝা যায় দুশ্চিন্তায় ও আতঙ্কিত।
— স্যার,মিরপুরের রোগীটা মারা গেছে।
— কীভাবে?
— কী করব স্যার? টাকা দিতে দেরি করলো। আবার মেডিসিনের ডোজটা ডাক্তার শালা বেশি দিয়ে দিসে।
— রোগীর বাপ মাদের কী বলেছো?
এইবার আরিফ হেসে বলল — বিরাট ঠাস দিসি স্যার। বলসি রোগীর আগেই হার্টের সমস্যা ছিল।রিপোর্টও দেখাইসি। সমস্যা হবে না।
আমি এবার সুরু গলায় বলল — সমস্যার কথা না, টাকাটা পেয়েছো কিনা সেটাই আসল কথা।
আরিফ এবার দ্রুত বলল — স্যার, চিন্তা করবেন না। নিয়েই ছাড়বো।
আমি হেঁটে চলে গেলাম আমার সেই বিশেষ রুমটায়। নিজে লো পাওয়ারের লাইট লাগিয়েছি। ফ্যান নেই। ইচ্ছা করে দুর্গন্ধের প্রবেশ প্রাধান্য দিয়েছি। চেয়ারে যে বসে আছে তার হাত, পা, চোখ বেঁধে ফেলে রাখা। লোকটাকে আমি চিনি। আমার হসপিটালের অনিয়ম নিয়ে একটা ফিচার করতে এসেছিল। ওকে চাইলেই আমি অন্যভাবে শায়েস্তা করতে পারতাম।
লোকটা ভয়ে ক্ষুধার্ত কাকের মতো উড়তে চাচ্ছে। আমি ওনার সামনে চেয়ার নিয়ে বসে চোখের বাঁধন খুলে দিলাম। লোকটা সাথে সাথে কেঁদে দিল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল — প্লিজ আপনি থানায় মামলা দিবেন না।আমি কোনো ফিচারই লিখব না। আমাকে ছেঁড়ে দিন।
আমার ক্লান্ত লাগল। সবাই কেন এমন বলে? একটু সাহসিকতা দেখালে কী হবে? আমি যখন পায়ে গুলি খাই আমি তবুও চিৎকার করে বলেছিলাম — কোনো….. আমাকে কিছু করতে পারবে না।
লোকটা কেঁদেই চলেছে।ওদিকে আরিফ এসে দরজায় টোকা দিয়ে বলল — স্যার,লাঞ্চ রেডি। ঠান্ডা কোকও আনসি।
আমি বললাম — রডটা নিয়ে এসো।
— সাথে কাউরে আনবো স্যার? দুলাল আসুক? ও নাকে ভালো ঘুষি মারে।
আমি রেগে উঠে বললাম — যা বলছি তাই করো।
রড আনতেই আমার ভিতরকার বন্দি কল্পনা ছড়িয়ে গেল। লোকটাকে এখন তুলার বালিশ লাগছে।
বিকালের দিকে পাথর গবেষণাকেন্দ্রের প্রফেসর ড.জামান এলেন।
মৃদু গলায় বললেন — কেতাব সাহেব,আমার সাপ্লাইটা?
আমি হাসিমুখে বললাম — আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। শীঘ্রই পেয়ে যাবেন। আপনি বাকি পেইমেন্টটা করে দেন।
উনি এবার দিশেহারা গলায় বললেন — আবার কীসের টাকা?
— দেখুন পাথর উত্তোলন, সাপ্লাই নিয়ে তো আপনার কোনো ধারণা নেই। কিছুদিন আগে একটা দূর্ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ ইন্টারফেয়ার করেছে। ওদের তো ঠান্ডা করতে হবে।
— কিন্তু গ্র‍্যান্টের সব টাকাই তো আমি দিয়েছি।
আমি এবার চেয়ারে হেলান দিয়ে বললাম — আপনি এখন যান।
ড.জামান ইতস্তত করে বললেন — দরকার লাগলে আমি দিব। কিন্তু দেখুন ওগুলো যেন আমি পাই। আমার জীবনের সাধনা।
সন্ধ্যায় বাসায় ঢোকার সময়ে বাড়িওয়ালার বাসায় বেল দিলাম। ভদ্রমহিলা আমাকে দেখেই যেন গুঁড়োদুধের মতল গুলিয়ে গেলেন। আমি বললাম — কী ঠিক করেছেন?
ভদ্রমহিলা বললেন — আমি এই বাড়ি বিক্রি করব না।
— ডিমান্ডটা তো বাড়িয়ে দিয়েছি।তাও কেন না?
ভদ্রমহিলার কপালের রেখার জমে যাওয়া ঘৃণা আমি দেখতে পেলাম।
— আপনি অসভ্য। আপনি অমানুষ।
— বাড়িটা আমার চাই। আমার স্ত্রীকে আপনার ডিমান্ড জানিয়ে দিবেন। মনে রাখবেন, এরপরে আমি নিজে আসবো না।
আশানকে নিয়ে আমি চলে গেলাম সাভারের সেই রিসর্টে। সম্পূর্ণ পুলিশ প্রোটেকশনে এসেছি। প্রথমে যদিও ওরা দিতে চায়নি, কিন্তু কোনো এক এসপির নাম বলতেই প্রটেকশন পাঠিয়ে দিয়েছে।
আশান এখন সুইমিং পুলে নেমে গেছে। চিৎকার করে বলল — বাবা,আসবে না?
আমি মাথা নাড়লাম। আমি পানি ভয় পাই। পাপীরা পানিতে ডুবে মরে।
মধ্যরাতে আমি বারান্দায় বসে আছি। একটু আগে ও ফোন দিয়েছে। ছেলের হঠাৎ জ্বর এসেছে।
সিগারেটের প্যাকেট প্রায় শেষ। কাউকে বলতে ইচ্ছা করছে না। রাস্তার কুকুরগুলো এখন মূত্রত্যাগে ব্যস্ত। এই দৃশ্যতেও আর্ট আছে।
প্রিয়তি এর মধ্যে এসে আমার পাশের চেয়ারে বসে বলল — আজও ওর কাছে গিয়েছিলে?
আমি ওর দিকে তাকালাম। ও মুখ নামিয়ে ফেলল। স্রষ্টা কখনো বান্দার কাছে জবাবদিহি করে না।