সৌগত ভট্টাচার্য-চুনী ফটোকের গল্প

Spread This
Sougata Bhattacharya

সৌগত ভট্টাচার্য

চুনী ফটোকের গল্প

চান করার আগে কুল গাছের নীচে রাখা টিয়া সবুজ স্কুটারটাকে মোছে আর গুনগুন করে গান গায় চুনী। সেই গান কেউ কখনো শোনে নাই। চান খাওয়ার পর ঘরের দেওয়ালে টাঙানো সব কয়টা ছবিকে অনেকবার কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করে সে। বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় আলো ঘোমটা টেনে বাড়ির বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। এক কিকে স্কুটার স্টার্ট দেওয়ার পর চুনী আলোর দিকে তাকিয়ে স্কুটারের এক্সেলটর দাবায়। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা কোনো সময়ই চুনীকে স্কুটার স্টার্ট করতে দুইবার কিক করতে হয়নি। স্কুটারটি অনেকদিন বুকিং করে অপেক্ষার পর এসেছিল সিকিম থেকে। স্কুটারে তাই সিকিমের নম্বর লেখা। এই পাড়ায় এটাই প্রথম স্কুটার। এখন পাড়ায় আরো দুটো স্কুটার হয়েছে। সাদা জামা কালো প্যান্টের ভেতর গুঁজে স্কুটার নিয়ে চুনী বেরিয়ে গেলে “দুগ্গা দুগ্গা..” বলে আলো বঙ্কুকে নিয়ে ঘরে ঢোকে।

বড় লাঠির মধ্যে গুটিয়ে রাখা একটা কাপড় স্কুটারের পেছন দিক থেকে অনেকখানি বেরিয়ে থাকে। ঘাড়ের একদিকে ক্যামেরার ব্যাগ ঝোলানো অন্যদিকে চামড়ার কভার পরানো একটা রেডিও, চোখের সানগ্লাসের রঙের সঙ্গে মুখের রোদ পোড়া চামড়ার রং মিশে গেছে চুনীর। স্কুটারের ব্রেকের কাছে ছোট চৌকো টিনের সাইনবোর্ড রাখা। বহুদিনের চেনা এই রাস্তা, রাস্তাটাও যেন চিনে ফেলেছে চুনীকে। কাল পরশু বাড়ি থেকে বের হওয়া হয়নি তাঁর। বঙ্কুর শরীর ভালো ছিল না। আজ ছবি গুলো ডেলিভারি দিলে কিছু কালেকশন হয়। কয়েক দিন হল ছবিগুলো শিলিগুড়ি থেকে বাড়িতে এসে পড়ে আছে। স্কুটারের চাকা শিমুল গাছটার সমানে ভাঙা গর্তে পড়লে চুনী হিসেব করে আর তের কিমি হেমকুমারী হাট। বড় রাস্তা থেকে ডান দিকে স্কুটারটাকে ঘুরিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে চুনী। বড় রাস্তা থেকে হেমকুমারী দেড় মাইল। বর্ষা শেষে এখন চারিদিকে সবুজ ধান। ক্ষেতের মাঝ বারবার সিঁথির মত রাস্তা রাস্তা চলে গেছে হেমকুমারীর হাটের দিকে। স্কুটারের শব্দে ক্ষেতে কাজ করা মানুষ একবার রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে, “ও চুনী ফটোক আইসে!” বলে আবার ক্ষেতের কাজ শুরু করে। এই রাস্তায় সপ্তাহে একটা গাড়িও আসে কী না সন্দেহ! নদীর হাওয়ায় ঢেউ ওঠে সবুজ ধান গাছে। যদিও চুনীর সেই দৃশ্য দেখার সময় নেই।

ধীরেনের চায়ের দোকানে স্কুটার স্ট্যান্ড করতে করতে চুনী বলে, “ধীরেন চা দে.. আজ কি অজিত মাস্টারের চা খাওয়া হয়ে গেল?” চুনী হাটের দিন ছাড়াও সপ্তাহে এক দুই দিন হেমকুমারীতে আসে। হেমকুমারী হাটের আশপাশের গ্রামে চুনীর ফটো তোলার কারবার। ইন্দিরা গান্ধীর আমল থেকেই মানুষ শুনছে এই গ্রামে ভোটের পর কারেন্টের লাইন আসবে। ইন্দিরা মারা যাওয়ার কয়েক বছর হয়ে গেল এই এলাকায় এখনো কারেন্ট আসেনি। হেমকুমারীর অনেক মানুষ বিজলি বাতি কি তা দেখেনি। মাঝে মাঝে চুনীর মুখে শহরের হালচালের গল্প শোনে হেমকুমারীর লোকেরা। চুনী ফটোকই হেমকুমারীর সাথে জেলা শহরের একমাত্র যোগসূত্র।

ধীরেনের দোকানটা হাটের শুরুতেই। বট গাছের তলায় বাঁশ দিয়ে তৈরি মাচা। সানগ্লাস খুলে রেডিও আর ক্যামেরাটা বাঁশের মাচার ওপর রাখে চুনী। রেডিও ক্যামেরা আর স্কুটারের উপর শরতের নরম রোদ পড়ে। চুনী কোমড় ধরে শরীরটাকে এদিক ওদিক করে বলে, “আর শরীর চলে না, বুঝিস কি না ধীরেন…” খড়ির ধোঁয়ায় দোকানের খড়ের চালের রং কালো হয়ে আছে। দোকানের ভেতরে খড়ির ধোঁয়া তাই বাইরে মাচাতে বসে চায়ে চুমুক দিয়ে ব্যাগ থেকে খবরের কাগজ বের করে চুনী। “জ্যোতি বোস কয় সামনের সপ্তাহে সুভাষ ঘিসিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় বসবে, কি বুঝলি ধীরেন!”
“পাহাড় হেমকুমারী থেকে কত মাইল দূরে হবে চুনীদা?…” ধীরেন জিজ্ঞেস করে। কলকাতা থেকে ছাপা হয়ে একদিন পর খবরের কাগজ আসে হেমকুমারীতে। হেমকুমারী থেকে শরতের শুরুতে ধানক্ষেতের ওই পারে পাহাড় দেখা যায়। চুনী চায়ের কাপ হাতে খবর কাগজের রাশিফল থেকে মুখ তুলে সবুজ ধানক্ষেতের ওপারে দূরের নীল পাহাড়ের দিকে তাকায়। ওই পাহাড় নিয়েই ঘিসিং বাবুর সঙ্গে জ্যোতি বাবুদের সমস্যা। ধীরেনকে চুনী বলে, “মাস্টার আমাকে ছাইড়ে আজ চা খেয়ে নিল, কেস কী! কই গেল রে মাস্টার?”

অজিত মাস্টারের দেখা না পেয়ে চুনীলাল মল্লিকপাড়ার দিকে রওনা হয়। সেখানে চুনীর আজ বায়নার কাজ। মল্লিকপাড়ায় স্কুটার দাঁড় করালেই বাচ্চা বুড়োরা ঘিরে ধরে চুনীর স্কুটারকে। মেয়েরা দূর থেকে তাঁকে কালো চশমা খুলতে দেখে! কেন যে সে কালো চশমা পরে বুঝেই উঠতে পারে না চশমার রং কী করে কালো হতে পারে! “একদিন আমার একটা ফোটক তুলি দিবা নাগিবে চুনীলাল!” শৈলেন বলে। “কইলেই না তুলি দিই…” চুনী বলে। “যে টাকা ধরি নেন। কই পামু!” শৈলেন বলে। চুনী আজ মল্লিক পাড়ার সুখেন রায়ের বাড়ি এসেছে ছবি তুলতে। সুখেনের নাতির আজ মুখেভাত। শহর থেকে গ্রামে এসে ছবি তোলে চুনী, আলাদা কদর তাঁর এই গ্রামে। “একটু সাইড, আরো একটু ডানদিকে, হাসি… হাসি…” সুখেনকে বলে সে। চুনীর কথা মত এদিক ওদিক করে সুখেন। “দেখিবেন রেডিওখান যেন বাদ না যায়।” “সে কি আর আপনাকে কইতে হবে, রেডিওর সঙ্গে ছবি তুলবেন বেশি টাকা দিবেন আর ছবিতে রেডিও থাকবে না তাই হয় নাকি!” টেবিলের ওপর চুনীর নিয়ে আসা এরিয়াল দেওয়া রেডিও রাখা। ছবির আলাদা টাকা, রেডিওর ভাড়া আলাদা। রেডিওকে ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে সুখেন রায়। হেমকুমারী গ্রামে রেডিওর সিগন্যাল থাকলেও কোনো রেডিও নাই। জামার আস্তিন তুলে সে ঘড়ি দেখে, হাটে যাওয়ার সময় হয়ে গেল। অজিত চুনীর জন্য অপেক্ষা করবে।

“…অতএব হেমকুমারীবাসী আপনাদের বারংবার কহিয়াছি, আবারও বলিতেছি ইহা এক গভীর ষড়যন্ত্র। যাহার পাশ্চাতে রহিয়াছে ভারত তথা আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ। আমি সেই কথা পূর্বাপর প্রমাণ সহযোগে অন্তর্ধান বিষয়ক গঠিত সকল তদন্ত কমিশনের সম্মুখে তুলিয়া ধরিয়াছি। সেই সাক্ষ্যর বয়ান এই কাগজে লিপিবদ্ধ রহিয়াছে। নেতাজির মৃত্যু বিমান দুর্ঘটনায় হইয়াছে ইহা শিশুতেও বিশ্বাস করিবে না। কারণ, বিমান দুর্ঘটনায় সুভাষ বোসের মৃত্যু হইয়াই থাকে তাহলে আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানাই, আমার সহিত সুভাষ বোসের গত বৎসর যে সাক্ষাৎ হইয়াছিল তাহা হইলে সেই সাক্ষাৎ মিথ্যা প্রমাণিত হয়। প্রিয় হেমকুমারীবাসী তিনি হেমকুমারীর পার্শ্ববর্তী কোনো স্থানেই অবস্থান করিতেছেন…” হাটের মাঝে উঁচু করে ইট দিয়ে ঘেরা বটগাছের গোড়ায় দাঁড়িয়ে বলে যাচ্ছিল অজিত মাস্টার। রোদের তাপে অজিতের কপালে টাকে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সাদা হাফ পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে ঘাম মোছে সে। অজিতের ঢোলা সাদা পায়জামা আর হাফ সাদা পাঞ্জাবিতে হেমকুমারী হাটের ধুলো লেগে থাকে, গলায় অনেক কয়টা রং চটা মেডেল ঝোলানো। মেডেলগুলোকে একটু ঠিক করে নিয়ে আবার বলতে শুরু করে অজিত। প্রতি হাটের দিন সে নিজের বক্তব্য পেশ করে। অজিত বিশ্বাস হেমকুমারী আপার প্রাইমারী স্কুলের ওয়ার্ক এডুকেশনের শিক্ষক ছিল। একযুগ হয়ে গেল সে স্কুলে যায়নি। অজিতের বক্তৃতা প্রতিদিন চুনীর কানে আসে। সে জিজ্ঞেস করেছিল, সাধু ভাষায় সে কেন বক্তৃতা দেয়? চুনীর উত্তরে বলেছিল, “এরকম গুরুত্বপূর্ণ ভারী বিষয়ে কখনো মুখের ভাষায় বলতে নেই তাহলে তা গুরুত্ব হারায়!” চুনী কখন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে অজিত খেয়াল করেনি।

স্কুটার থেকে বাঁশে জড়ানো কাপড়টি টাঙিয়ে দেয় গাছতলায়। কাপড়ের এপার থেকে ওপার পর্যন্ত একটা শহরের ছবি আঁকা। যে শহরে অনেক দোতলা তিনতলা দশতলা বাড়ি, রাস্তায় গাড়ি চলছে। এটাই চুনীর গ্রামের হাটের ছবি তোলার ব্যাক স্ক্রিন। প্রতিদিন সে স্কুটারের পেছনে বেঁধে একটুকরো শহরকে হেমকুমারী হাটে নিয়ে আসে। এ যেন রেডিওহীন গ্রামের এক শহরকে ছোঁয়ার স্বপ্ন। অজিত ভাবে এমনই এক শহরে কি নেতাজি থাকেন, যেখানে প্লেন ঘাঁটি থাকে। হাটের ভেতর সুশীলের চায়ের দোকানে একটা টুল আর ছোট্ট টেবিল রাখা আছে। টুলের ওপর বসে হাটে আসা মানুষ ছবি তোলে। রেডিওটা থাকে টেবিলের ওপর। গাছতলায় স্টুডিও সাজানোর সময় অজিত মাস্টার চুনীকে হাতে হাতে সাহায্য করে। শেষে সাইনবোর্ডটিকে দাঁড় করানো হয়। সাইবোর্ডে কালোর ওপর সাদা দিয়ে লেখা –
চুনীলাল সাহা
ফোটোগ্রাফার

রঙিন ১৫ টাকা।
সাদাকালো ১০ টাকা।

যেকোনো অনুষ্ঠানে রঙিন ও সাদাকালো ছবি তোলার অর্ডার নেওয়া হয়।

বি:দ্র: রেডিও লইয়া ছবি তুলিলে রেডিওর ভাড়া বাবদ ৫ টাকা অতিরিক্ত।

অজিত বিশ্বাসের গলায় যে মডেলগুলো ঝোলে সেগুলো সবই তাঁর বাবার। কিসের মডেল কেউ জানে না। এই মডেল আর কিছু সার্টিফিকেট গলায় ঝুলিয়েই সে স্কুলে যেত। স্টুডিও সাজানোর সময় অজিতের মেডেল গুলো ঠোকাঠুকি লাগে। টুলের তলায় পাথর দিয়ে গ্যাটিজ দিতে দিতে অজিত চুনীকে জিজ্ঞেস করে,
“আজ কোনো খবর পেলে?”
” শুনলাম আসতেসে!”
“রেডিওতে বলল?”
” না রে রেডিওতে সব গোপন কথা কয় নাকি?”
“তাহলে কই শুনলে?”
“আমার কথা মিলায় নিও, পূজার আগেই আসে কি না!”

কথাটা খুব ভুল বলেনি চুনী। একমাত্র সে চুনী ফটোককেই বিশ্বাস করে। বাকি গ্রামের সবাই অর্ধেক জেনে কথা বলে। চুনী ফটোক শহরের লোক, শহরে অনেক রকম খবর থাকে। শহরের লোকগুলো কি করে যেন আগে যে কোনো খবর জানতে পারে। আসলে ওখানে কাগজ রেডিও আছে। চুনীও নেতাজি ফিরে আসার খবর জানে বলেই সুজিত মাস্টারের বিশ্বাস। অজিত মাস্টার নেতাজিকে হেমকুমারীতে মাঝেমাঝেই দেখতে পায়। এই তো গতবারই চণ্ডীতলার মাঠে দুর্গা পুজোয় অষ্টমীর দিন অঞ্জলি দিতে গিয়ে অজিত দেখেছিল একটু দূরে সাদা ধুতি পাঞ্জাবি পরে একটু দূরেই তিনি হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে আছেন। কি অপূর্ব তাঁর চেহারা! চোখে চশমা গায়ের রং তো নয় যেন যেন পাকা ধানে সকালের আলো। কিন্তু চোখ বন্ধ করে মায়ের পায়ে ফুল ছুঁড়ে অজিত তাকাতে তাকাতেই উধাও তিন… নেই নেই নেই… প্রতিবার পুজোয় হেমকুমারী আসেন তিনি, সে কথা অজিত জানে। কিন্তু এত ভিড়ের মধ্যে কখনো কথা বলা হয়ে ওঠেনি তার। যদিও তিনি অজিতের গলার মেডেল দেখেই চিনতে পারেন, ওঁর বাবাকেও ভালোভাবেই চিনতেন সুভাষ বোস। তাই তো সারাদিন অজিত মেডেল ঝুলিয়ে রাখে গলায়। পুজোর অনেকদিন আগে থেকেই চুনী ফটোকে আসতে বলেছে সে। এবার যদি নেতাজি আসেন একসঙ্গে যেন একটা ছবি তুলে দেয় যেন। “যত সব পাগল সাগলের কারবার, মাথাটা একদম গেসে।…” মনে মনে বললেও অজিতের সমানে কোনোদিন তাঁর কথা নিয়ে অন্যদের মত ঠাট্টা তামাশা করেনি চুনীলাল।

ছবি গুলো ডেলিভারি দিয়ে কিছুটা কালেকশন হয় চুনীর। হাটবার গুলোতে ভালোই ব্যবসা হয়। বেশির ভাগ ছবিই ধারে তোলে, পরে কিস্তিতে শোধ দেয় খরিদ্দাররা। সব ছবিতেই রেডিওটা মাঝে থাকে। ছবি তোলার সময় রেডিও থেকে চামড়ার কভারটা খুলে রাখা হয়। অজিত হাঁ করে রেডিওটির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। হেমকুমারীতে রেডিওর সিগন্যাল আসার পর খুব ইচ্ছে ছিল রেডিও কেনার, দাম শুনে আর কেনা হয় নাই। চেনা জানার মধ্যে মডার্ন লোক বলতে চুনীলালকেই মনে করে অজিত। চুনীর শহরে বাড়ি, আর শহর মানেই আধুনিক। প্রথম ক্যামেরা দেখে চুনীর কাছেই। সানগ্লাস স্কুটার ঘড়িও আছে তাঁর। অজিত মাস্টারের আকর্ষণ যদিও রেডিওটা। অজিতের বিশ্বাস করে এই রেডিওতেই একদিন না একদিন নিশ্চয়ই খবর আসবে যে নেতাজি ফিরে এসে ভারতের হাল ধরবেন। বছর কয়েক আগে ইন্দিরার মৃত্যুর পর যে পলিটিক্যাল অবস্থা ছিল দেশের তাতে তাঁর স্থির ধারণা ছিল এই পরিস্থিতির কথা সুভাষ বোস নিশ্চয়ই জানেন। তিনি দেশকে ভালোবাসেন তিনি নিশ্চয়ই আর অভিমান করে থাকবেন ন। যদিও প্রতিদিন রেডিওতে খবরের শেষে আবহাওয়ার খবরই বলে, নেতাজি ফেরত আসার খবর আসে না।

“চলো মাস্টার” হাট শেষ করে চুনী বলে। “এক মিনিট” অজিত গম্ভীর হয়ে চুনীকে বলে। অজিত তখন ধীরেনের চায়ের দোকানের ভেতরে চায়ের খালি কাপ গুলো নানা ভাবে জায়গা পাল্টে পাল্টে সবজি বিক্রি করে চা খেতে আসা হাকারুকে বোঝাচ্ছে, “এই তিনি সিয়াম যাওয়ার জন্যে তিনি সিঙ্গাপুর ছাড়লেন। মনে রাখবি চারদিকে শত্রুপক্ষ। এমন একজন বিশ্ব নেতার দিকে সকলের দৃষ্টি… এটা তাঁর প্লেন ব্যাংকক থেকে সায়গন গেল। বিকেলে বেলায় তিনি সায়গন থেকে গেলেন তৌরেন। তৌরেন থেকে তাইহোকু…. তারপর প্লেন ধ্বংস হয়ে যায় বলে তোরা যেটা জানিস সেটা মিথ্যা। আমি আর্মি অফিসারদের থেকে কথা বলে জেনেছি বিমানটা সুভাষ চন্দ্রকে দাইরেনে নামিয়ে দিয়েছিল এবং পরে টোকিও নিয়ে গিয়েছিল। এই বার তোকে এই জায়গাটা পড়ে শোনাই…. “হাকারু মাথা চুলকে অজিতকে বলে আপনাকে চুনী ফোটক ডাকছে।” এই হল সমস্যা! তোরা সত্যি কথা শুনবি না, আর বলবি নেতাজি নাই…! একটা রেডিও কিনলেই আমি প্রমাণ করে দেব যে তিনি আমাদের মধ্যেই আছেন।

নদীর পাড়ে গাছের ছায়ায় ফাঁকা জায়গায় ঘাসের উপর চুনী আর অজিত দুজন এসে বসে। হাটের শেষ হয়ে যাওয়ার পর একটা গন্ধ ভেসে বেড়ায়। নদীর পারে চুনী ওর স্কুটারটিকে দাঁড় করিয়ে রাখে। ওরা দুজন মাটিতে বসে একটি করে হলুদ সুতোর বিড়ি ধরায়। আশ্বিনের শিরশিরে হওয়া গায়ে লাগে। চুনী রেডিওটাকে স্কুটারের পেছন সিটে বসিয়ে স্টেশন ধরার চেষ্টা করে। এখানে সিগন্যাল থাকলেও খুবই দুর্বল। নেপাল না ভুটানের কোন একটা গানের স্টেশন ধরে রেডিওতে। সকালে কাগজে পাহাড় নিয়ে সুভাষ ঘিসিং আর জ্যোতি বসুর খবর পড়ছিল। বিড়ি টানতে টানতে দুজন ওই নেপাল ভুটান না কী যেন পাহাড়ের দেশের ভাষার গান শুনছিল। গানের ভাষা সে বুঝতে পারে না ওরা। সারাদিনে চুনীর এইটুকুই অবসর। এখান থেকে তো সেই স্কুটার চালিয়ে বাড়ি ফেরা, ফিরেই বঙ্কুকে সামলানো। দিনে দিনে বঙ্কুর রাগ বেড়ে যাচ্ছে। একমাত্র ছেলের চিকিৎসার খরচা দিন দিন বাড়ছে। শরীরটাও ক্রমশ বড় হয়ে যাচ্ছে। বয়েস সতেরো হয়ে গেলেও কথা বলতে বুঝতে পারে না, লোকে অ্যাবনারমাল বলে। একবার বাইরে দেখাতে নিয়ে যেতে হবে বঙ্কুকে। গানের প্রতি অজিত মাস্টারের কোনো আকর্ষণ নেই। যতক্ষণ গান হয় সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে বিড়ি হাতে। মাঝেমাঝে বিড়ির ধোঁয়ার রিং ছাড়ে নীল আকাশে গায়ে। নদীর পারে বসে হেমকুমারীর আকাশ দিয়ে উড়ে যাওয়া প্লেনের গতিবিধি মাপতে চায় অজিত। কোথায় যায়, করা যায় অজিত জানে না। সকাল থেকে আজ তিনটে প্লেন গেছে।

“আচ্ছা তুমিই বল নেতাজি কি ফেরত আসবে না?”
“কি করে বলি মাস্টার!”
“নেতাজি কি প্লেন অ্যাক্সিডেন্টে সত্যি মারা গেছে তুমি কি বল, সবাই যা ইচ্ছা বলুক, তোমার কথার আলাদা গুরুত্ব!”
“বিস্বাস করো মাস্টার আমি নেতাজির খবর জানি না! আমি কই পাব খবর!” অজিতের বিশ্বাসে আঘাত করতে চায় না চুনী।
“না তুমি শহরের মানুষ। তোমার ক্যামেরা আছে রেডিও স্কুটার ঘড়ি ক্যামেরা আছে। তুমি খবর না জানলে কে জানবে!”
“আরে এত খবর জানলে আমি কী আর গ্রামে ছবি তুলি!” চুনী মনে মনে ভাবে এত জানলে তো আমি ছেলেটাকে সুস্থ করে তুলতাম। চুনীর নিজেকে ফাঁকা হয়ে যাওয়া হাটের মতই একা লাগে, অসহায় লাগে। অজিতের প্রতি দুর্বলতা আছে চুনীর, কিন্তু ইদানীং কেমন যেন মায়া হয়। “নেতাজি এসে এই দেশের হাল ধরবেই, হেমকুমারীতেও সেইদিন কারেন্ট আসবে। মিলিয়ে নিও বলে দিলাম” অজিত বলে।

অনেকক্ষণ আগে গান শেষ হয়ে গেছে রেডিওতে। অজিত আজও মেডেল গলায় মন দিয়ে খবর শুনেছিল যদি সুভাষ বোস ফিরে আসার খবর পায়। বেলা পরে আসে গদাধর নদীর তীরে নেতাজি ফিরে আসার কোনো খবর বলে কি না রেডিওতে। নাহ, আজও আবহাওয়ার খবর বলেই শেষ হয়ে যায়।

চুনী শেষ বিড়িটা ফেলে রেডিও আর ক্যামেরা গলায় ঝুলায় বলে, “চলো মাস্টার তোমাকে বাড়ি নামায় আমিও বাড়ি ফিরি।”
কয়দিন বাদেই পূজা। চারদিকে সবুজ ধানে ছেয়ে গেছে হেমকুমারীর ক্ষেত। সূর্য হেমকুমারীর আকাশে অনেকটা হেলে গেছে।
চুনী তার টিয়া সবুজ স্কুটার নিয়ে ধানি জমির আলের রাস্তা দিয়ে এক ঘাড়ে ক্যামেরা আরেক ঘাড়ে রেডিও ঝুলিয়ে জলপাইগুড়ি শহরে ফিরছে। স্কুটারে পেছনের সিটে অজিত মলিন পায়জামা পাঞ্জাবি আর গলায় মেডেল পরে বসে আছে। কভার পড়ানো রেডিওটাকে পেছন থেকে ছুঁয়ে ধরে বসে আছে সে। চুনী স্কুটার চালাচ্ছে… নির্বিকার মুখে। চুনীর হাটে ছবি তোলার ব্যাক স্ক্রিনটা যেন হেমকুমারীর আকাশের গায়ে, ধানক্ষেতের পর যেখানে একটা বিরাট শহর দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে অনেক অনেক বাড়ি ঘর রাস্তা, এতবড় শহর দুজনের কেউই কখনো চোখে দেখেনি। সবুজ স্কুটারটি ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছে বিরাট শহরটির দিকে।

সেই শহরের নাম টোকিও সিঙ্গাপুর নাকি জলপাইগুড়ি কেউ জানে না!