সমীরণ দাস-ফুলকুমারী

Spread This
Samiran Das

সমীরণ দাস

ফুলকুমারী

টেমির আলো ফুলকুমারীর মুখ থেকে অন্ধকার সরিয়ে দেয়। তার ঈষৎ উন্নত নাক , যেদিকে নোলক , সেইদিকেই আলো এসে পড়ায় মুখের অন্যপাশ কালো ছায়ায় ঢাকা পড়েছে। ওর ঠোঁট , নাক, চিবুক তেমন চোখা নয় , কিন্তু ত্বক মসৃণ । সেই মসৃণ ত্বকের ওপর আলো পিছলে যায় , চক চক করে ওঠে কালো পাথরের মতো । ফুলির ছিপছিপে শরীর দীর্ঘ ও সুগঠিত , এই ত্রিশের মধ্য যৌবনেও প্রথম যৌবনের চটক ও তেজ দৃশ্যমান। ছোট্ট একটা ডিম্বাকৃতি আয়না বাঁ হাতের চেটোয় ধরে নিজের মুখায়বের দিকে তাকিয়ে থাকে সে । খোপায় জড়ানো ফুলের মালা , দুই কানে দুলের সঙ্গে ঝোলানো দুটো লম্বা ফুল। পরনে ডুরে শাড়ি ও ব্লাউস ; ব্লাউসের নিচে একটা কাটা দাগ। মাঝে মধ্যেই হাত চলে যায় সেই কাটা দাগে। শাড়িটা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত টেনে তোলা হয়েছে , বাহুর চারদিকে জড়ানো কঙ্কনের মতো ফুলের মালা। ব্লাউজের নিচে ছোট জামা নেই , যেজন্য শরীরের গতির সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলিত হয় উন্নত স্তন ও খোপার ফুল। দূরে খাদের ওপর স্টিম এঞ্জিনের ভস ভস শব্দ শোনা যায় ক্রমাগত। রেল লাইন বরাবর ট্রেন পেরিয়ে যাচ্ছে । খাদ চব্বিশ ঘণ্টাই জীবন্ত থাকে , কয়লা তোলা হয়। সকালের শিফট শেষ হয় বিকেল চারটেয়। ফুলকুমারী কাজ শেষ করে ঘরে ফিরেছে বহুক্ষণ। এখন তার সাজ প্রায় শেষ , সন্ধ্যা গভীরতর হয়ে উঠেছে । উঠোনে যারা বসে বা দাঁড়িয়ে , তারা প্রত্যেকেই নেশাগ্রস্ত — যা সুস্পষ্ট তাদের লাল চোখ ও মাথার রুক্ষ চুলে। এলোমেলো কাপড় কোমরে জড়ানো , ভাঙ্গাচোরা মুখ , ওরা ডিয়াং খায়। ডান হাতে ধরা পাত্রটা মুখে ওঠে। বাহুতে তাগা বাঁধা , পাত্রটা মুখে তোলার সময় হাতের পেশি ফুলে উঠলে তাগায় চাপ পড়ে , ফেটে বেরিয়ে আসতে চায়। কয়েকজন নারী নৃত্যরতা ,গলায় গান। পাশে বসে থাকা মরদদের মুখ থেকে বিভিন্ন শব্দ উচ্চকিত হয় , কেননা নাচ তাদের নেশা তীব্রতর করেছে। কম বয়সি যুবকেরা উচ্ছসিত বেশি , তারা কেউ কেউ ভাঁজ করে বসে থাকা হাঁটু সোজা করে নৃত্যরতাদের হাত ধরে। ডিম ডিম ঢোল বাজে , সঙ্গে তাল মেলায় ওদের পা। সময় কাটে , পরিবেশ জমাট , তবুও কিসের যেন অভাব মালুম হয় সবার কাছে। বসে থাকা মানুষদের একজনের নাম শিবেন , যে ফুলির বর্তমান পুরুষ , ঘরের দিকে দৃষ্টি প্রসারিত করে। ফুলকুমারীর ছায়া-ছায়া শরীর তার চোখে আটকে যায়। ডাকে সে , ফুলি ? এই ফুলি ? ফুলি নীরব থেকে ভ্রূ বাঁকায় ও মাথাটা ঈষৎ ঘুরিয়ে ঋজু ভাবে তাকায়। তখন উঠোন থেকে জড়ানো স্বর আবার হাওয়া কাঁপিয়ে দেয় , আসিস না ক্যান , এই ?

ফুলি বাইরে আসে ,তখন তার কপালে কোনো ভাঁজ বা বিরক্তি নেই , চারপাশের নৃত্যরত পা গুলো থামে ,থামে ঢোলের কাঠিও। সকলে উল্লসিত হয়ে হাত ধরে ফুলিকে মধ্যখানে টেনে আনলে তার মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে । ফুলি গ্লাসে মদ ঢালে , তার কাজ ও আচরণ জড়তাহীন। গ্লাসে পরপর চুমুক দেয় , তখন আবার ঢোলে কাঠি পড়ে। সুর পাক খায় , যা জড়িয়ে যায় ফুলির মস্তিষ্কের কোষে । অন্যান্যরাও হাত ধরে দাঁড়ায় , মাঝখানে ফুলি। তার পায়ের চেটো মাটিতে আঘাত করে বার বার , একই সঙ্গে গলা থেকে সুর বেরিয়ে আসে —- “ এক পয়সার পুঁটি মাছ , কী দিয়া রান্ধিব। বুড়া ভাসুর গালে খুদায় , কী বলে কাঁদিব ওগো মাই। স্বশুর ঘরে দমেই মারে , আর যাবো নাই।“ গান এবং নাচ চলতে থাকে ক্রমাগত , যেখানে ফুলকুমারীই প্রাণ। ঢোলের শব্দ নেশাকে তীব্র করে তোলে। পায়ের ছন্দ দ্রুততর হয় , শরীরগুলোও পাক খায়। মুঠো করে ধরা হাত মাথার ওপর ওঠে , নামে। শরীরও ঝুঁকে পড়ে এবং ওঠে । দীর্ঘ সময় এই রকম নাচ-গান চলে , চলতে থাকে। চৈত্র মাসের শেষ দিন “ ছাতু” পরব এই সবের উপলক্ষ। ক্রমে শরীরগুলো ক্লান্ত হয় , ঘাম জমে যায় শরীরে। গড়ায়। রাত ঘন হয়ে এলে নাচ-গান শেষ করে ফুলি ঘরে ঢোকে , মেঝের ওপর ভেঙ্গে পড়ে তার ক্লান্ত শরীর। টেমির সাদা আলোয় স্তনের একাংশ দৃশ্যমানহয়। একটা চেরা দাগ ঝক ঝক করে , যা এক সময় গভীর ক্ষত ছিল। বাচ্চা তিনটে খাটের ওপর বহুক্ষণ জেগে থেকে এখন ঘুমচ্ছে। অনেক রাত হল , শিবেন পাশের খাটিয়ায় চিত। পাঁজরার হাড় ভাসছে। ক মুহূর্ত সেদিকে তাকায় ফুলি , পায়ের কাছে চোখ যায়। সেখানে দাদার মেয়েটাও ঘুমচ্ছে। দাদা মরেছে প্রায় দশ বছর আগে ট্রেন অ্যাকসিডেন্টে। বউটা পালিয়েছে পরপরই। মেয়েটা পড়ে আছে ওর কাছে। টেমির ফ্যাকাসে আলোয় মৃত দাদার মেয়েকে নিরীক্ষণ করে উঠে বসে ফুলি। ডান পায়ের হাঁটু ত্রিভুজের মতো বাঁকানো , যার ওপর ওর কনুই ও মুখ। বাইরের ঘন অন্ধকারে চৌদিক বুড়ে আছে। কখনো নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে ট্রেনের চাকার শব্দ দ্রুতগামী। খাদের ওপর স্টিম এঞ্জিন বার বার শব্দ তোলে , অভ্যন্তরে বুক চাপা মানুষেরা নিজেদের সক্রিয় রাখে বাঁচার চেষ্টায়। কয়লা ওঠে , লম্বা টাওয়ারে সংবদ্ধ পুলি দ্রুত ঘোরে , ডুলি নামে এবং ওঠে। এঞ্জিন খালাসির চোখে ঘুম ঘন হয়ে জড়ায়। সেই ঘুমন্ত চোখ নিয়েই সে কাজ করতে থাকে যান্ত্রিক ভাবে। ব্লাউজের নিচের কাটা দাগটা চুলকে ওঠে , ফুলি আঙ্গুল রাখে দাগের ওপর। ঘসে। সেই ঘসতে থাকা আঙ্গুল গতিশীল হয় দাগ থেকে স্তনের মধ্যভাগ পর্যন্ত। শরীর শির শির করে মুহূর্তের জন্য , কিন্তু পরমুহুরতেই চোয়াল দৃঢ় হয় , নাক দিয়ে উষ্ণ নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসে। অন্ধকারে মশার উপদ্রব , বারবার ফুলির হাতের বস্ত্রখণ্ড ওপরে ওঠে এবং গরুর লেজের মতো আছড়ে পড়তে থাকে শরীরের উপর। ফুলি তার সন্তানদের মশা তাড়াতে তাড়াতে মরদটার দিকে দৃষ্টি ফেরায়। শরীর ভেঙ্গেচুরে শুয়ে শুয়ে আছে লোকটা। বছর দুয়েক আছে ফুলির সঙ্গে , ছোট বাচ্চাটার বাপ ও। খাদে কাজ করতে এসেই ফুলির নজরে পড়ে। ফুলি ওকে রেখে দেয় , কেননা আগের লোকটাকে ও তাড়িয়েছিল আরও কিছুকাল আগে। ফুলির প্রথম সন্তানের বাপ ছিল ওর জীবনের প্রথম পুরুষ , ওর স্বামী , যার কথা মনে হলেই ফুলির কপালে রেখা আঁকা হয় , চোয়াল শক্ত হয় এখনও , এত বছর পরেও। ঘুম আসেনা দুচোখে। বাইরে বাড়ির কুত্তাটা ভোস ভোস শব্দ করছে , কিছু সন্দেহজনক হয়ত নজরে পড়েছে। দূর থেকে রেল এঞ্জিনের শব্দ এগিয়ে আসে , ফুলি জল গড়িয়ে গলায় ঢালে। আবার বুকের ওপরের কাটা দাগটায় হাত বোলাতে বোলাতে খাটিয়ায় এসে বসে। নারকেলের দড়ি ছাওয়া খাটিয়া শরীরের নড়াচড়ায় শব্দ তৈরি করে। তখন চোখের সামনে কপালে তিলককাটা গুদামবাবুর লোভী চোখ ভেসে ওঠে। লোকটা বিয়ে করেনি । ওর দিকে তাকায় , কী যেন বলতে চায়।

ভাঙ্গাচোরা কয়লায় টব বোঝাই , মালগাড়ির মতো পর পর সংযুক্ত টব পাশের ঘুলঘুলির ওপর দিয়ে টানা রশার আকর্ষণে চলা-ফেরা করে। এগিয়ে ডুলির কাছে আসে। একের পর এক টব ডুলিতে উঠে বাইরে আসে , যেখানে হাওয়া। আজ নতুন সেকশান খোলা হয়েছে , ব্লাস্টিং-এর শব্দ শোনা যাচ্ছে বার বার। কয়লা ঝরে পড়ে , ছিটকে যায় , কখনো কখনো অসতর্ক কুলির মৃত্যুর কারণও ঘটে। কিছুটা দূরে ওপরের স্টেশানে ফুলি দাঁড়িয়ে আছে। তার কপালের ঘামে মাথার চুল ল্যাপটানো। চারদিকে বেশ গরম , খনি সংলগ্ন বৃহদাকার বৈদ্যুতিক পাখা সর্বক্ষণ সক্রিয় , যা টেনে বের করে দেয় ভেতরের গরম হাওয়া। খাদের মধ্যের ক্লান্ত শ্রমিকদের শরীরে আয়েশ , তারা এখন বিশ্রামরত । পাছা পেতে বসা শরীরগুলোর পাশে একের পর এক উলটে রাখা ঝুড়ি পাহাড়-চূড়ার মতো জমা হতে থাকে। জমা হতে থাকে বেলচাও। হেলমেটের আলোয় পরস্পরের মুখ দেখে ওরা। কথা বলে। তখন ওপরে ফুলিও তার কপালের শ্রমজনিত ঘাম এবং ল্যাপটানো চুল নিয়ে বসে পড়েছে । ঠাণ্ডা হাওয়া তার মুখমণ্ডল স্পর্শ করে শরীরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় , স্বচ্ছন্দে শ্বাস নেয় সে এবং ছাড়ে। চারিদিকে অন্যান্য কামিনদের গলার স্বর , হাসি উচ্চকিত। তারা ফুলিকে ঘিরে বসে আছে। লাল শাড়ি ফুলির কোমরে পেচানো। বাহুতে উল্কির দাগ , কপালে ঘাম। ব্লাউজের প্রথম বোতামটা অসতর্কতায় খুলে ঝুলে আছে , বুকের উপরে কাটা দাগের যায়গাটা শুকিয়ে কালো ও উঁচু হয়ে আছে। গুদামবাবুর লোভী চোখ ফের মনে পড়ে । দূরে একটা আলোর বিন্দু দৃশ্যমান হচ্ছে। এগিয়ে আসছে। তার এগিয়ে আসার গতির মধ্যে ব্যস্ততা। লোকটা মাইনিং সরদার লালুবাবু। লালুবাবু কাছে এলে ওরা তাকায় । সর্দার বলে , কী হইল ? তুরা সব ইখানে কেনে ? সর্দারের কথার মধ্যে ধমকের সুর , যেজন্য সকলেই নীরব থাকে। পরস্পরের মুখের দিকে তাকায়। ফুলি ? সর্দারের কণ্ঠস্বর আবার উচ্চকিত। কী হইছে ? কাজ শেষ হয়িছে তুদের ? ইখানে সব বইসে আছিস ক্যান ? দুপুরের জোরালো আলো ফুলির বেতের মতো শরীরে চক চক করে। সোজা হয়ে বসে বলে , বেশি কাজ দিখাবি না। দুই টব বুঝাই করার কথা , তিন টব কইরছি। এখন ইটটু আরাম কইরব। আমাদিগের শরীর কি শরীর লয় ? তু যা , সময় হলিই আমরা সেকশানে যাবো। ফুলির মুখায়ব , ভঙ্গি ও কথার যুক্তি মাইনিং সর্দারকে নত করে। সে ফুলিকে চেনে যথার্থ ভাবে। বলে , জলদি আয় সব। তার শরীর ধীরে ধীরে অপসৃত হয়ে থাকে। ফুলি বিড় বিড় করে , মাইনসের শরীল এট্টু আরাম-বিরাম কইরবেক নাই ? খালি বেলচা চালাও ? ফুলির শরীরের ভঙ্গি ও মুখাবয়বের দৃঢ়তা। পাশের অন্যান্য রমণীদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ কথা ছোঁড়ে। তারা ফুলির নজর কাড়তে চায় , তাদের ধারনা , একমাত্র ফুলিই সর্দারের সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারে। তখনো চারটে বাজেনি। ওপেন কাস্টের নতুন সেকশানে ক্রমাগত শব্দ ও আলোকরশ্মি ঝলসাচ্ছে। বেলচার শব্দ , সঙ্গে নিঃশ্বাস- প্রশ্বাসের আওয়াজ হাওয়ার ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। খাদের মধ্যে ব্লাস্টিং হচ্ছে , পূর্ব মুহূর্তে সতর্কবাণী উচ্চারিত হয়েছে , হুঁশিয়ার। তারপরই আলোর ঝলক , কয়লা ঝরে পড়ে। ফুলির হাতের চেটোয় শক্ত কড়া , যা শ্রমের চিহ্ন। সে খালি ঝুড়িটা হাতে নিয়ে এগোয়। আঁচলটা কোমরে জড়িয়ে লাইনে এসে দাঁড়ালে ওর মতই একজন ঝুড়ি ভর্তি কয়লা এনে মাথায় তুলে দিয়ে ওর খালি ঝুড়িটা হাতে নিয়ে পেছন ফেরে। একটু এগিয়ে ফুলি ওর কয়লা ভর্তি ঝুড়ি তুলে দেবে অন্য একজনের মাথায়। এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে , ব্লাস্টিং-এ ঝরে পড়া চাঙ্গড়ের মধ্যে কাটানি চলে। কয়লা টুকরো হয় , ঝুড়িতে ওঠে। ঝুড়ি এগোয়। বুক চাপা গরমে শরীর ভিজে যায় , জামা লেপটে থাকে। আঁচল ঘষে ঘাম মোছে ফুলি , শিফট শেষ হওয়ার প্রতীক্ষায় থাকে।

পাঁচটায় শিফট শেষ। খাদের মধ্যে শিবেনের হাতের কর্মরত পেশির ক্লান্তি অবশেষে মুক্তি পায়। শিফট শেষের ঘণ্টায় সে ঝুড়ি তুলে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায় ও বেরিয়ে আসার জন্য ডুলির দিকে এগোয়। ইঞ্জিন খালাসির হাতের দণ্ডের আঘাত লোহার পাইপ বেয়ে ওপরে উঠলে ওপরের দিক থেকেও অনুরূপ শব্দ নীচে নামে , যা ডুলির উঠে আসার অনুমতি-সংকেত। ডুলি গতি পায় এবং ওপরে ওঠে। বেরিয়ে আসে সে। উপরে ফুলির চারপাশ ঘিরে তখন ওর বন্ধুরা একই সঙ্গে এগোয়। তার মুখাবয়বে সর্বক্ষণ দৃঢ়তা , কিন্তু অন্যের বিপদে নির্দ্বিধায় ঝাঁপায়। দলটি এগোতে থাকে শরীরে কালি ও মুখমন্ডলে ক্লান্তি মেখে। তখন দূরে গুদামবাবুর দীর্ঘ শরীর চঞ্চল হয়ে ওঠে। এতক্ষণ যেন প্রতীক্ষায় ছিল সে। পরিস্কার জামাকাপড়ে আতরের গন্ধ। পেটটা স্ফীত , সেই চর্বির থাক গলায়ও জমানো থাকে। লোকটা নিকটবর্তী হলে ফুলিও নিরীক্ষণ করে তাকে। ফের মনে হল , গুদামবাবু কী যেন বলতে চায় ওকে। সামনে ধু ধু মাঠ , আগে খাদ ছিল , এখন মরে পড়ে আছে। সাদা বালি দিয়ে বোজানো। মাঝে মধ্যে দু একটা ছোট গাছ সেই প্রান্তরের শূন্যতা বাড়িয়ে দিয়েছে। লোকটা দ্রুত ফুলির সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলে , তোর সাথে কথা আছে ফুলি। কী কথা ? আছে , এখন বলা যাবেক নাই। বলনা কেনে , ক্ষতি কী ? না , ইখন না , তু আজ সাঁঝের বেলায় আমার সাথে দিখা করবি ডিপোর পিছে। ফুলির চোখ উজ্জ্বল হয় , হাসির রেখা দেখা যায় মুখাবয়বে। ভাবে , কী আর কথা থাকবে , কথা তো একটাই। গুদামবাবুর চলমান শরীর অপসৃত হলে ফুলির বন্ধুদের উচ্ছল হাসি চারপাশের মাঠ ভাঙ্গে। বলে , মতলব কী লুকটার ? কী কইবে তুরে ? ওরা কথা বলতে বলতে , হাসতে হাসতে সামনে এগোয়। দূর থেকে গন্ধ উড়ে আসে , কয়েকজন কুলি-কামিন পাছা পেতে বসে আছে। চার পাশে ভাঙ্গা খোয়া ও কয়লা এলোমেলো। কয়কজন দাঁড়িয়েও আছে , তাদের পা এলোমেলো , অস্থির। ফুলি বন্ধুদের সঙ্গে পাশে গিয়ে দাঁড়ায় ও পর পর দু গ্লাস ডিয়াং টানে। মাথার মধ্যে ঝাঁকুনি অনুভব করে , শরীরটা কেঁপে ওঠে। বাইরে পা বাড়ায় সে , গতির আন্দোলনে বুকের আঁচল সরে যায়। তখন আবার কাটা দাগটা পড়ন্ত সূর্যের লাল আলোয় ঝলসে ওঠে । ফুলি বন্ধুদের সঙ্গে ধাওড়ার দিকে এগোতে থাকে।

পেছনে গাছ-পালার লম্বা ছায়া খড়ের চালের ওপর ভেঙ্গে পড়েছে। শুওর চরছে , দূরে একপাল মুরগি। শিবেন মাটির ওপর বসে আছে। তার চোখ লাল , ফাটা ধুতিটা কোমরে জড়ানো। মাথার চুল এলোমেলো , শুকনো। ফুলি ফিরে এলে দাদার মেয়েটা ছুটে এসে কোমরে জড়ায়। ওর চোখ দুটোও লাল , সারা মুখে অভিমান। ফুলি জিজ্ঞেস করে , কী হয়িছে বটে ? তার গলার স্বরে ঘটনার বিবরণ জানতে চাওয়া ও সহানুভুতি—দুই-ই থাকে , যার স্পর্শে মেয়েটা ফুঁপিয়ে ওঠে। আঁচলে মুখ ঘসতে ঘসতে বলে , মেইরেচে। শিবেনের দিকে আঙ্গুল নির্দেশ করে। ফুলির শরীরের মধ্যে অস্থিরতা জেগে ওঠে , সে শিবেনের দিকে তাকিয়ে বলে , তু আবার ওকে মেরিচিস ? বেশ কইরচি , ফের মারব। শিবেনের গলার স্বর মদের প্রভাবে জড়ানো। তুর ইতো সাহস ? ফুলির চোখের তারা কাঁপে , কোমরে আঁচল জড়িয়ে নেয় সে। শিবেন ওর কথার উত্তর না দিয়ে আরও জোরে চিৎকার করে , গুদামবাবুর সাথে তুর কী পিরিত ? এতক্ষণে কিছু যেন আবিস্কার করে ফুলি। লোকটা তাকে সমীহ করত , কথাবার্তাও শুনত , সেজন্য ফুলি ওর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেনি কখনো । কিন্তু সেটাকে কি আজকাল ও দুর্বলতা বলে ভাবছে ? মাথা তুলতে চাইছে ? ফুলির স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতে চায় ? ফুলি স্থির ভাবে বলে , বেশি বাড়িস না। গুদাম বাবুর সাথে আমার কী পিরিত , তার জবাবদিহি তুকে কইরতে হবে ? হবে ,তুর কী কাম উর সাথে ? ফুলি ক মুহূর্ত বিস্মিত ভাবে তাকায়। কাঁধের ঘাম মোছে আঁচল দিয়ে। তারপর কঠিন স্বরে বলে , আমার কুনো কাজে মাথা ঘামাতি এলি পথ দেখতি পারিস। তুর মতো মরদে আমার কাম নাই। মেয়েটিকে কোল থেকে নামায় ফুলি , শরীরের ঘাম বেয়ে কয়লার গুঁড়ো নেমে কাপড়ে জড়ায়। আঁচলটা খোলে , তখন ঘরের মধ্যে দমকা হাওয়ায় গুঁড়ো কয়লা উড়তে থাকে চারদিকে। ফুলি শাড়ি পালটে গামছা জড়িয়ে নেয় কোমরে। কুয়োয় এসে মুখে জলের ঝাঁপটা দেয়। হাত ঘষে। ডাবরে জল ভরে সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয় ঝর্নার মতো। উত্তপ্ত শরীরে শীতল আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যাবেলা গুদাম বাবুর সঙ্গে দেখা হবে।

ডিপোর পিছনে বলিষ্ঠ শরীরটা ঘষা অন্ধকারের মধ্যে অস্থির। সে রাস্তার পাশে গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকে। চকিত শব্দে ফিরে তাকায় চোখে তীব্র আগ্রহ নিয়ে। দুটো বুড়ো মানুষ কথা ছড়াতে ছড়াতে রাস্তা পেরোচ্ছে । ফুলি দূর থেকে গুদামবাবুর শরীরটা দেখতে পায়। গুদাম বাবু এগিয়ে এসে বলে , ইদিকে আয়। ল্যাম্পপোস্টের বাল্ব আলো ছড়াচ্ছিল , সেই আলোর আয়ত্ত থেকে ওরা একটু দূরে একটা গাছের নিচে এসে দাঁড়ায়। এদিকটা নির্জন , ফুলি বলে , কী কথা কইয়ে ফ্যালাও। ক মুহূর্ত তাকায় গুদামবাবু । ইতস্তত করে বলে , তু আমার কাছে থাকবি ফুলি ? তুর কুনো অভাব রাইখব না। যা চাস , তাই দিবো। হাওয়ায় ঝরে পড়া পাতার শব্দ হয়। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে ফুল্কুমারীর , চকিতে বুকের আঁচল সরালে দুরের ল্যাম্প পোস্ট থেকে ছিটকে আসা আলোয় কাটা দাগটা ঝলসে ওঠে। সেটার ওপর আঙ্গুল রেখে সাপের মতো হিস হিস করে ওঠে , ইটা দ্যাখ , আমার বিয়ে করা মরদের চেন্ন। আমাকে সন্দেহ করত , মারত , তারপর তারপর একদিন ছুরি মেইরে পলায় গেল অন্য মেইয়ের হাত ধরে। ক মুহূর্ত নীরব থাকে ফুলি , যেন দম নেয় , তারপর ফের দৃঢ় স্বরে বলে , তুর কাছে থাকলি তুইও ওই রকম করবি। আমাকে আমার মতো থাইকতে দিবি নাই। —- আমি কুনো মরদের কাছে থাকি না বাবু , মরদকেই আমার কাছে রাখি। তুই থাকবি ? নিস্তব্ধতার মধ্যে ফুলির কথা পাক খায়। গুদামবাবুর পুরু ঠোঁট ঝুলে পড়ে , চোখ বিস্ফারিত হয়। কোনো কথা বলতে পারে না সে। তখন খাদের মধ্যে রাতের শিফটের কাজ শুরু হয়েছে।

Samiran das Vivekanandapally , Sonarpur , kol-700150 M no 9903828683