রাজর্ষি পি. দাস-আরোয়ানা

Spread This
Rajarshi das

রাজর্ষি পি দাস

আরোয়ানা

ওর থেকে দূরে থাকাকালীন অসুখটা তৈরি হয়েছিল।

পরোয়া না করে, একা একা থাকতে থাকতে একা থাকাটাই বাঁচার সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থা বিশ্বাস করা শুরু করে দিয়েছিল শিশির। স্মৃতি বিযুক্ত একটা মানুষ যে শেয়ার করতে জানে না! মশাকে ভীষণ ঘেন্না করে। দুম করে সশব্দে এতো ব্যক্তিগত স্পেসে ঢুকে পড়ে যে মনে হয় না জন্মালে বেটার হতো। এতো একটা আস্ত বড়ো মাছ।
নির্মল একটা ফেংসুই মাছ কিনে দিয়ে গেছে। নাম আরোয়ানা। বাঁশপাতার মত দেখতে অথচ বাঁশপাতা নয় চকচকে রাংতার পাতের মতো রং, এঁকেবেঁকে সারাদিন ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ দুটো কপাল থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসছে, পলকহীন, দুচারটে গোঁফ নিয়ে সারাদিন শিশিরকে দেখতে থাকে। শিশিরের গা শিরশির করে, মাছটা যেন ওর মাথার ভিতর স্মৃতি প্রতিদিন খুবলে খুবলে খেয়ে নিচ্ছে।
মাছটা আবার ক্যানিবাল, জ্যান্ত মাছ ছাড়া খায় না। প্রায়দিন মুখের দুপাশে বেরিয়ে থাকে ছটফটে গাপ্পি মাছের লেজ ও মাথা! ঠিক ওই ভাবে মাছটি, মনে হয়, প্রথমে এক কামড়, তারপর মুখে করে শিশিরের স্মৃতি কষের দুপাশে ঝুলিয়ে শিশিরের দিকে তাকিয়ে থাকে তারপর হঠাৎ মুখটা একটু হাঁ করে পুরোটা কপাত।
এইভাবে শিশির সেদিন নাম না জানা একটি মেয়ের মৃত্যু দেখেছে।
মেয়েটিকে সে দেখেছিল এবং পাশে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ব্যাঙ্কে টাকা জমা দিতে গিয়ে।
#
একটি ক্ষুদে মেয়ে যাকে কোলে করে নিয়ে ঘোরা যায় বা পাখির মতো হাতের তালুতে নিয়ে চুমু খাওয়া যায়। না সে আন্ডারেজ নয়, সে পরিপূর্ণ যুবতি, বুকে লেখা বয়স নিয়ে একটা দোয়েল অথবা পেঙ্গুইন পাখির মত কৌতুহলী। মেয়েটির ব্যাংকের পাশবুকে একবার উঁকি মেরে নামটি দেখতে চাইলো শিশির কিন্তু হ্যাশের চশমা। সাইড ভিউ-তে জিরো। অনেকদিন পর কলেজ জীবন প্রার্থনা করল শিশির রাস্তার উল্টোদিকের চার্চের দেওয়ালে আঁকা যিশুর দিকে তাকিয়ে। ভিতরে ভিতরে ক্যামন একটা চেনা হৃদপিণ্ড জেগে উঠল যে অনেকক্ষণ দৌড়তে পারে।
দুজনে প্রায় একঘন্টা লাইন অমান্য করে পাশাপাশি দাঁড়িয়েছিল। এই কথা বলে ফেলে আর কি! নাম জিজ্ঞেস করে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার চাইলে বা যেন বললেই দিয়ে দিত সবকিছু এতটাই আস্থা ওর দুচোখে ছিল। হায়, কেন যে ওর ব্যাগ ভর্তি পুরোনো ৫০০ টাকার নোট দেখে ফেলল শিশির! প্রায়, প্রায়… দশটা বান্ডিল। মেয়েটিও অমনি দুম করে শিশিরের দিকে ওর ব্যাগ এগিয়ে দিয়ে বলল, একটু ধরবেন আমি একটু আসছি। শিশিরের শরীরে কাঁপুনি, মনে আনন্দ।
বা! এর মধ্যেই এতোটা বিশ্বাস করে ফেলল।
তবে শিশির বলল না, আর মেয়েটি শুনল হ্যাঁ।
আরো দুঘন্টা পর ব্যাংকের কাউন্টার যখন দেখা যাচ্ছে আর মেয়েটি আসছে না দেখে শিশির আধঘন্টা পর আর অপেক্ষা না করে খালপাড়ে একটি নোংরা শীতলা মূর্তির পায়ের কাছে ব্যাগটি রেখে আবার লাইনে এসে দাঁড়াতে গিয়ে মনে পড়ল শিশিরের পকেটে মাত্র ৭০০০ টাকা। জমা না দিলেও চলে।
বেরিয়ে এল ব্যাঙ্ক থেকে। অটো না ধরে হেঁটে আসতে আসতে আসতে কিছুক্ষণ পর দেখলো মেয়েটি আরেকটি ব্যাংকের লাইনে। সেই চঞ্চল ঘাড় আর ঝলমলে চোখ। প্রতিমুহূর্তে ব্যস্ত চারপাশ চেখে নেওয়ার জন্য!
সরাসরি স্মৃতি বলতে এতটুকু।

মাছটা ক্যামন কুল কিলারের মত তাকে হত্যা করল!
এরপর কার পালা!

ও কে ছিল ?

যে আলাদা হয়ে যাবার পর শিশিরের একটি মজার রোগ হয়েছে। ঘুম আসে না। হ্যাশ ড্যাস হ্যাশ হ্যাশ রোগ। ক্যান্সার হতে পারত, হার্ট অ্যাটাক হতে পারত, সেরিব্রেল তা না, ঘুম আসে না! নিজেকে খুব চিপ মনে হয় শিশিরের।
ভাগ্যিস নামটা এখনও মনে আছে।
ও ছিল এবং আছে, একজন ৩৫ বছরের মহিলা , নাম সংযুক্তা, ডাকনাম সা। না না এর সাথে গানের কোনও সম্পর্ক নেই। ও নাচে। বেশ ছিল ওরা।
শিশির সা-এর বিশাল চওড়া ও ভরপুর বুকে মাথা রেখে ঘুমোতে এত ভালবাসত যে সংযুক্তা নিজে চলে যাওয়ার সাথে বুকে করে শিশিরের ঘুম নিয়ে চলে গেলে শিশিরের ঘুমের ওষুধ একটা এত্তটুকু তিলের মতো ঘুমের ওষুধ অতবড়ো বুককে কীভাবে রিপ্লেস করতে পারে ? শিশির এই প্রশ্নেই কাত হয়ে প্রতিরাত হালকা ঘুমের চাদর মুড়ি দিয়ে পড়ে থাকে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে ও আর সংযুক্তা হানিমুনে গিয়ে এক বিদেশি সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে ওয়াইন খাচ্ছে।
একদিন শিশির স্বপ্ন দেখল সংযুক্তা ওর লিঙ্গ টকটক শব্দ করে লম্বা জাপানি ছুরি দিয়ে কিমা করে চাট বানিয়ে তারপর তারিয়ে তারিয়ে আবার ওর সাথে বসেই হোয়াইট ওয়াইন খাচ্ছে। ও নিজেও ওর লিঙ্গের কিমা খাচ্ছে। আর আস্তে আস্তে ছোট হয়ে সংযুক্তার সিলভার ফর্কে একটা মটরশুঁটির দানা হয়ে ঢুকে গেল! কানে বিদেশি সমুদ্রের শব্দের সাউন্ড নিয়ে শিশির সংযুক্তার মুখে হারিয়ে গেল।
আরেকদিন দেখল শিশির একটি কালো পিস্তলের নল সা-এর মুখে ঢোকাচ্ছে আর বের করছে, সা কামনায় তাড়নায় মুখ হাঁ করে কাৎরাচ্ছে আর ওর চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে তবুও বলে যাচ্ছে চালিয়ে যেতে। শিশির একসময় ট্রিগার টিপে দেয়। শব্দ হয়েছিল কি ? তারপরেই দেখেছিল শিশির একা একা সংযুক্তার ঠোঁট প্রবল তৃপ্তিতে তারিয়ে তারিয়ে চিবোচ্ছে, আর ঝুলে আছে শিশিরের ঠোঁটের বাইরে সংযুক্তার ঠোঁটের কিছুটা।
ডাক্তার এসব শুনে বলেছিল, যাক কে ভুলে যান। আলাদা হয়ে মঙ্গল হয়েছে।
আর মঙ্গলের চিহ্ন ঘুমের ওষুধ আর মাসে একটা করে ইন্টার ভেনাস ইনজেকশন।

স্মৃতি মানে কি শুধু স্বপ্ন!

ওরা খুব খুশ ছিল!

ওদের ড্রয়িংশালে …সোফা …টি ভি…স্টোন পিরামিড, বার কর্নারে বেলজিয়াম…ফরাসি কাট গ্লাস…ভোদকা…… বেডশালে এসি, মেহগিনি ৮ /১০ বক্স খাট, ওয়ারড্রোব, বাথরুমশালে গীজার আর জাগুয়ার, …। শিশিরের উপার্জন মাসে ১০০০ থেকে ৫০০০, সম্ভাবনা অনন্ত আর সংযুক্তার মাসে ১ লাখ সম্ভাবনা ৩ লাখ, ওরা প্রায়ই বেড়াতে যেত। বাই কার। সংযুক্তা সারথি।
দুষ্টু লোকের মুখে ঝামা ঘষে সংযুক্তা গ্যারাজ থেকে গাড়ি বের করত ক্লাচে পা চেপে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করতে করতে…
সংযুক্তা আমাকে পাশে বসায়– থাকতে দেয় খেতে দেয়। এতোকিছু কি শুধুমাত্র ভালবাসা। হ্যাশস্টার স্টারহ্যাশ !
স্বার্থ!
সেটা কী ?
সা বলেছিল, আমি আসলে নিজেকে জানতে চাই! যেদিন জানতে পারব মনে হয় না আর তোমার সাথে থাকব!
উত্তরে শিশির, যদি আমি আগে জেনে যাই!
কার ? প্রত্যুত্তরে সা এমন ভাবে হেসেছিল যে ওর না বলা হাজার হাজার অক্ষর শিশিরকে উড়িয়ে একটা একটা অনন্ত সরু রাস্তায় দড়াম! অনেক দূরে কেউ একজন হেঁটে চলে যাচ্ছে– না, ডিফাইন করবেন না, প্লীজ!

মাছটি সন্ধ্যে থেকে কাচের গায়ে মুখ ঠেকিয়ে শিশিরের দিকে অদ্ভুতভাবে দুচোখ একজায়গায় করে দেখছে। এক শান্ত শীতল হিংস্রতম চাউনি নিয়ে ও মরিয়া যেন শিশিরের ব্রেন স্ক্যানিং করে চলছে, ও খুঁজে বেড়াচ্ছে শিশিরের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিকে, যাকে খেয়ে ও আজ রাতে আর লেজ নাড়াবে না।
নির্মল ওকে পুরোনো টাকায় কিনেছে! তাই ডাবল দাম দিয়েছে। কারণ মাছটির ওরিয়েন্টেশন…এমাছ ঘরে থাকলে নাকি বৈভবের অভাব হয় না, অভাব অনেক দূরের কথা কতটা ঐশ্বর্য দরকার আপনার আগে ঠিক করে নিন নাহলে আরোয়ানা আসার পর টাকা কোথায় রাখবেন ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে যাবেন!

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে গেল, যা সচরাচর ঘটে না! মোবাইল টিপে দেখলাম সকাল ৫ টা ১২। মোবাইলটা অ্যাকোরিয়ামের দিকে ঘোরাতেই দেখলাম মালটা এখনও সেভাবেই স্থির, আমার দিকে, দুচোখ। সাথে সাথে মোবাইল বন্ধ করে দিলাম। ও! মোবাইলের আলো যেন লক্ষাধিক বেশি ওয়াট নিয়ে ফিরে আসছিল আমার চোখের দিকে। যেন স্ক্যানিং বাকি ছিল!

একটা কুকুরের অবিশ্রান্ত ডাকে আস্তে আস্তে চোখ আর মস্তিষ্ক জুড়িয়ে এল। স্বপ্ন দেখলাম। শাওয়ারের নিচে মাছটি লেজের উপর দাঁড়িয়ে একা একা স্নান করছে আর কিলবিল করে করে উঠছে, থেকে থেকে। আর নির্মল শাওয়ারের বাইরে দাঁড়িয়ে একটা বই পড়তে পড়তে কথা বলছে আরোয়ানার সাথে ভীষণ নিবিড়ভাবে। কিছু শোনা যাচ্ছে না! কান পেতে শোনার চেষ্টা করতেই আরও ঘুম জড়িয়ে ধরল শিশিরকে আর ঘুমের মধ্যে যেন প্রতিটা বই ছুঁতে পারছে এরকম কিছু লাইব্রেরি ঘেঁটে চলেছে শিশির, প্রাণপণে। একটা বইয়েরও লেখক বা বইয়ের নাম নেই, প্রচ্ছদ নেই। সারা লাইব্রেরি ঠাসা ন্যাড়া বই! শিশির একটার পর একটা বই উলটে পালটে দেখছে আর চিৎকার করে জানতে চাইছে লেখকের নাম… শিশির কেঁদে ফেলছে, হাঁটু ভেঙে বসে পড়ছে, কেঁদে ফেলছে আর চিৎকার করে বলছে …কেউ তো বলুন লেখকদের নাম…নাহলে আমি আবার ঈশ্বরকে বিশ্বাস করে ফেলব…আমি হেরে যাব…কেউ বলুক লেখকদের নাম!

ভোরের স্বপ্নটা ফেরত এসেছিল গরম ইডলিকে রিপ্লেস করে দুপুরবেলায়। শিশির আজ প্রতিজ্ঞা করেছে, লাঞ্চ করবে না। শুধু ইডলির স্বপ্ন দেখবে। তাই হয়তো স্বপ্ন স্বপ্নকে রিপ্লেস করল। সিনিয়রিটি স্বপ্নেও থাকে! তাই বলে, মানে স্বপ্ন বলে একটা বইতেও লেখকের নাম থাকবে না, প্রেস ডিটেইলস থাকবে না, প্রচ্ছদ থাকবে না! একটা আস্ত লাইব্রেরি টইটুম্বুর ন্যাড়া বইয়ে!
মানা যায় না!
মাথা নেড়ে নেড়ে একটা সিগারেট ধরালো শিশির।
সিগারেটের ধোঁয়া লক্ষ্য করলে একজন লেখক বুঝতে পারে অক্ষরের বিমূর্ততা! কেরকম আরোয়ানা মাছের মত এঁকেবেঁকে…

শিশির এই শীত আসবে আসবে আবহাওয়ার মধ্যে ঠিক করল ও লেখক হবে। তাহলেই জব্দ করতে পারবে ঐ বালের মাছকে। ও শিশিরের স্মৃতি খুবলে খুবলে খাওয়ার আগেই ও লিখে ফেলবে ওর স্মৃতিকে।
যা ভাবা তাই কাজ। একটা ন্যাপকিনে ঝটপট শিশির লিখে ফেলল ওর অন্যতম প্রিয় স্মৃতি –ডিগবয় বেড়াতে যাচ্ছি, মা বাবার সাথে, জেঠুর বাড়িতে! একটা চওড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বানানো লম্বা রাস্তা, শেষ হলেই চারদিকে সবুজ টিলা আর টিলার মাথায় সাদা ঝকঝকে বাংলো, সরু পায়ে হাঁটা পথ উঠে গেছে গেট অব্দি। জেঠুর বাড়ি অবশ্য সমতলে। ওগুলো সাহেবদের বাড়ি। যতবার গিয়েছি মনে হয়েছে ঐসব বাড়িতে একটি করে রাজকন্যা থাকে আমাকে দেখার জন্য। কারণ আমি ওদেরকে দেখতে পেতাম না! কোনোদিন দেখেনি কেউ উঠছে বা নামছে। গা শিরিশির করত। তবে ৫ বছর আগে ডিগবয় গিয়ে অনুভব করলাম আর কোনো বাংলোতে রাজকন্যা থাকে না। বাংলোর রং চটে গেছে, টিলাময় জঙ্গল। পায়ে হাঁটা রাস্তা ঢাকা পড়ে গেছে। আমার আবার রাজকন্যাদের ভূত ভাবতে ভালো লাগে না!
না ভুল লিখল শিশির, আসলে ব্যাপারটা রাজকন্যা নয়, শিশিরের সবচেয়ে ভালো লাগত ঐ উচ্চতা। আর অত উঁচুতে মাত্র একটা বাড়ি। ওর মনে হত ঐসব প্রতিটা বাড়িতেই ও থাকে। ওগুলো ওর বাড়ি। কেউ জানে না! ও আসলে জেঠুর বাড়িতে আসে নি এসেছে নিজের টিলা- বাংলোতে বেড়াতে।
এই মুহূর্তে একটা লোক একটি মেয়ের হাত ধরে রাস্তা পার হল। এতটুকুও মানাচ্ছে না মেয়েটিকে লোকটির সাথে। লোকটি মেয়েটির বাবা কাকা স্বামী প্রতিবেশী বন্ধু হতেই পারে না, জাস্ট যাচ্ছে না! অথচ লোকটি মেয়েটিকে ডানদিকের একটি উঁচু দশ-পনেরোতলার দিকে আঙুল তুলে ইশারায় কিছু বলতেই মেয়েটি লজ্জায় চোখ নামিয়ে লোকটির শরীরে নিজের শরীর কিছুটা ঘষে দিল। তারপর লোকটি আবার আঙুল নেড়ে নেড়ে কীসব বলতেই মেয়েটিও আঙুল নেড়ে প্রত্যুত্তর দিল। আবার লোকটি আবার মেয়েটি… হঠাৎ লোকটি মোবাইল বের করে কথা বলা শুরু করলে আর মেয়েটি হাঁ করে অদ্ভুত সমর্পিত মুখে লোকটির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে কেন যেন মনে হলো শিশিরের মেয়েটি বোবাকালা আর লোকটি শিক্ষক।
হঠাৎ শিশিরের বাস এসে পড়লে শিশির একদৌড়ে বাসে উঠে দশমিনিট পর মুদিয়ালি পার হবার পর আবিষ্কার করল ও টিস্যু পেপারটি ফেলে এসেছে।

একটা লেখা, লেখকের কোনো নাম না থাকলে যে হাতে পাবেন সে কতটা লেখাকে বিশ্বাস করতে পারবে। সে নিশ্চয় লেখককে খুঁজবে দুতিন মুহূর্তের জন্য হলেও। কারণ সে নিজের অজান্তে পাঠক হয়ে গেছে। লেখকের নাম না থাকলে সেটা একটা ডাস্টবিনের কাগজের মতো বর্জিত। আর যদি লেখাটা এই পাঠকের ভালো লেগে যায় তাহলে? সে মনে মনে তাঁকে প্রশংসা করে কাগজটি রেখে দেবেন, বা আবার যদি ভালোলাগা দীর্ঘস্থায়ী হয় তাহলে নামহীন লেখককে কেউকেটা ভাবা শুরু করবেন। তারপরেও যদি লেখককে খুঁজে না পান তাহলে লেখাটি বন্ধু বান্ধবদের পড়িয়ে প্রথমে প্রতিক্রিয়া দেখবেন তারপর রহস্য করে লেখকের নাম না বলে একদিন নিজের নামে চালানো শুরু করবেন। আর যদি লেখাটি এই নতুন পাঠকের মধ্যে সুপ্ত লেখক সত্তাকে জাগিয়ে দেয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই কারণ প্রতিটা পাঠকের মধ্যে একজন লেখক লুকিয়ে থাকেন নাহলে লেখা পড়বেন ক্যানো। কিন্তু যদি তিনি নিজে লিখে বলেন তিনি স্বপনে লেখা পান, ওনার লেখা আকাশ থেকে নেমে আসা বাণীস্বরূপ। ঈশ্বরের বাণী! এই লেখা আসলে লিখিয়ে নেওয়া হয়! তাহলে!
একটা সিগারেটের ধোঁয়া সরাসরি শব্দ থেকে তৈরি হয় না কিন্তু শব্দের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আদর্শ সিগারেটের ধোঁয়া আজ অব্দি যাঁদের আঙুলের ফাঁক থেকে তৈরি হয় তাঁদের কলমের কালির রং কী ছিল জানতে ইচ্ছে করে! অনেকটা।

সেই ব্যাংকে দেখা হওয়া মেয়েটি কিন্তু শিশিরকে বলেছিল, ও জানে না টাকাগুলো কার? ও প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দেখে ও একটা পুরোনো ৫০০ টাকা ভর্তি বালিশে শুয়ে আছে। পাশে একটি চিরকুটে লেখা থাকত একটা পরমাণুগল্প। লেখকের নাম থাকতো না!
যেমন প্রথমদিন টাকা ভর্তি বালিশের পাশে লেখা ছিল-
একটি শহরে একজন মানুষ থাকে। যে তোমার বাবা। বা মামা বা কাকা বা দাদা বা প্রেমিক! একদিন সেই মানুষটি শুনতে পেল ওর নিজের টাকাগুলো ওঁর নয়। সরকারের। সরকার কে? খোঁজ খোঁজ খোঁজ। জানা গেল সরকার একটা ব্যাংক একাউন্টের নাম্বার সেটা তোমার ওদের তাহাদের যে কারোর হতে পারে। নাহলে যে তোমার বাবা বা মামা বা কাকা বা প্রেমিকা – যে কোনো একজন মাইনাস হতে পারে। শোনা যায় তোমার ওদের তাহাদের মধ্যে একটা ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ আছ। যদি না থাকে সে তৈরি করে। নাহলে টুক করে ওই বাবা মামা ইত্যাদির মধ্যে কেউ একজন আকাশে বেড়াতে যায়।

বাসে পুরোনোদিনের হিন্দি গান বাজছে, বিস্মৃতির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে দৃশ্যত খণ্ড খণ্ড মুমতাজ , শব্দে গোটা লতা –দ্যাখো দ্যাখো দ্যাখো/ দিল্লী কা কুতুবমিনার দেখো… মনে পড়ল সিনেমাটা দেখেছিল আসামে রংঘরে তাম্বুল পান আর ব্ল্যাক রিজেন্ট খেতে খেতে… টিকিটের দাম ছিল ৭৫ পয়সা… বাইরে তুমুল বৃষ্টি… বাড়িতে ভিজে গেলে বাড়িতে মা-এর হাতে প্রচুর মার অপেক্ষা করছে —পয়সা ফ্যাকো তামাশা দ্যাখো … দিল্লী কা কুতুবমিনার দেখো / বোম্বে শহর কি বাহার দেখো… মমতাজ শিশিরকে কৈশোর থেকে হাত ধরে যৌবনের শয্যায় এনে ফেলছিল। ডিগবয় টিলাবাংলোয় একজন রাজকুমারীর মুখ এখনও পরিষ্কার, মুমতাজ। প্রায় প্রতিটা টিলায় ও থাকত…… না থাকতেন ?

হঠাৎ ঝিমুনি ভাঙলে শিশির দেখল বাস একটা শার্প বাঁক নিচ্ছে, রাসবিহারী মোড়। হঠাৎ শিশির দেখে প্রচন্ড হিংসা ভর্তি চোখ নিয়ে একটি বিশাল আরোয়ানা মাছ সশব্দে বাসের জানলায় আছড়ে পড়ছে।