রবিন জামান খান-ত্রাণকর্তা

Spread This

রবিন জামান খান

ত্রাণ-কর্তা

আলহাজ¦ মোহাম্মদ মফিউজ্জামান তরফদার, এমপি’র বয়স যখন দশ-বারো বছর তখন বঙ্গদেশে একটা গান খুব জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। তখন তো আর এখনকার মতো ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইন্টাগ্রাম, টিক-টিক এসব ছিলো না। তাই এখনকার দিনে যেটাকে বলা হয় ভাইরাল হওয়া তখনকার দিনে সেটাকে বলা হলো লোকমুখে ছড়িয়ে পড়া। তখনকার সময়ে লোকজনের বিনোদনের মাধ্যম ছিলো এক বিটিভি, আর স্বল্প পরিসরের ভেতরে এন্টেনা ঘুরিয়ে ধরা ডিডি ওয়ান। অন্যদিকে টিভি আসার পরেও বেশ দাপটের সাথেই রাজত্ব করছিলো রেডিও, সেটার সাথে ক্যাসেট প্লেয়ার যোগ করে আবার বাজারে এসেছিলো ট্রানজিস্টার, টু ইন ওয়ান ইত্যাদি। তবে তখনো রেডিও-টিভি-পত্রিকা এসব ছিলো ¯্রফে উৎস মাত্র যেকোন ঘটনা ছড়ানোর সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ছিলো মানুষের মুখ- সেই যুগে ভাইরালের একমাত্র পদ্ধতি। তো বিটিভির প্রচারিত একটা নাটকের গান ঠিক সেভাবেই লোকের মুখে-মুখে দারণ জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছিলো। নিজের বিরাট বেলজিয়ান কাঁচ লাগানা ড্রেসিং টেবিলের বিরাট আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবির ওপরে বø্যাক অবিলিস্ক পারফিউম মাখতে-মাখতে গানটা আজো পরিষ্কার মনে পড়ে মফিউজ্জামান তরফদারের;
‘আটার রুটি কলের পানি, রাইত পোয়াইতে টানাটানি, দেড় মোইন্না বস্তা চেয়ারমেইন্না নাস্তা…’
আয়নার দিকে তাকিয়ে এমপি তরফদারের পরিষ্কার মনে পড়আে কিভাবে একদল ছেলেপেলে গোল হয়ে নেচে-নেচে গানটা গাইছিলো বিটিভিতে দেখানো নাটকের এক দৃশ্যে। গানের কথাগুলো আর দৃশ্যটা মফিউজ্জামান তরফদারের একেবারে মাথায় গেঁথে গেছিলো। এর পেছনে কারণও ছিলো। সে নিজেও তখন নাটকে দেখানো ভুখা-নাঙ্গা সুবিধাবঞ্চিত ছেলেদেরই একজন ছিলো। বলতে গেলে তার অবস্থা ছিলো নাটকে দেখানো ওই ছেলেগুলোর থেকেও খারাপ।
“বড় ভাইজান, সব রেডি,” পেছন থেকে একটা গলা শুনে ফিরে তাকালো মফিউজ্জামান। তার কাছের ছোট ভাই একরকম বলতে গেলে তার ডান হাত জগলুল মোস্তফা ওরফে জগলু দাঁড়িয়ে আছে। মফিউজ্জামান জগলুর দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে জানতে চাইলো, “সব ঠিক ঠাক করা আছে তো?”
জগলু মাথা নিচু করে জবাব দিলো। “জি ভাইজান, সব রেডি। ক্যামেরা আসছে, জিনিসপত্র প্যাকট করা অইছে। লোকজনরেও ঢুকাইছি ভিতরে। সাংবাদিকরাও আসছে।”
“শোন তুই এক কাম কর,” বলে মফিউজ্জামান এক মুহূর্ত ভাবলো। “তুই সাংবাদিক যারা আসছে সবাইরে ভিতরে নিয়ে ভালো কইরা আপয়্যনের ব্যবস্থা কর। দূরে দূরে বসাইস। আর আপ্যায়নের পরে একটা কইরা খাম ধরায়া দেইস। আমি আসতাছি।” নির্দেশনা শুনে জগলু মাথা নেড়ে চলে গেল। মফিউজ্জামানের কাজের প্রক্রিয়া সে খুব ভালোকরেই জানে।
জগুলুকে বিদেয় দিয়ে হাসি মুখে এসে বিছানার পাশে রাখা ইজি চেয়ারটাতে আরাম করে বসলো সে। কেন জানি এরকম আনন্দময় সকালে তার হঠাৎ খনিকটা পান করতে ইচ্ছে করছে। বিছানার পাশেই কার্বডে রাখা জেডি’র বোতল বের করে ইজি চেয়ারে বসে সে কয়েক ঢোক পান করে নিলো। মনে মনে ভাবলো, যা সময় এসেছে এসব ভাইরাস টাইরাসের থেকে বাঁচতে এলকোহল বরং উপকারই করবে।
বোতলে টান দিতে দিতে মফিউজ্জামান সেই গানটা আর ছেলেগুলোর কথা মনে পড়লো। সে মনে করলো সেই সময়টার কথা। তখন তার নাম মফিউজ্জামান ছিলো না। ছিলো মইজ্জা। যে ব্যাটারির ফ্যাক্টিরিটাতে সে শিশু শ্রমিক হিসেবে কাজ করতো। সেখানেই সন্ধ্যের পর ঝির-ঝিরে একটা টিভির সামনে পাটি পেতে বসে টিভি দেখতো ওরা একদল ছেলে। ওখানেই ঘুমাতো ওরা। সেই সময়েই টিভিতে দেখা গানটার কথাগুলো মইজ্জা ওরফে মফিউজ্জামানের মনের গভীরে দাগ কেটেছিলো। ধীরে-ধীরে পৃথিবীর কষাঘাতে একটা ব্যাপার বুঝতে শুরু করেছিলো, এই দুনিয়াতে কোন সঠিক বিচার নাই। এইখানে যে আদায় করতে পারে সে রাজা, আর তার নাস্তার জন্যে থাকে দেড় মনের বস্তা, আর যে আদায় করতে জানে না তার জন্যে আটার রুটি আর কলের পানিই বরাদ্দ।
আর সে-বয়েস থেকে যখন বড় হতে শুরু করে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে আটার রুটি কলের পানিতে তার চলবে না। তা চাই দেড় মনের বস্তা। সেখান থেকে এক নেতার চামচার ফুটফরমাইশ খাটার মাধ্যমে রাজনৈতিক জীবনের হাতে খড়ি তার। সেই বয়স থেকেই খাটার পরিবর্তে চাটার যে অভ্যাস সে গড়ে তুলেছিলো সেই অভ্যেস তার ভেতরে জন্ম দিয়েছিলো এক মহাবিশ^ পরিমাণ ক্ষুধার। সেখান থেকে পাতি নেতা, পাতি নেতা থেকে স্থানীয় নেতা তারপর ধীরে-ধীরে অত্র এলাকার এমপি হয়েছে সে। শহরের সবচেয়ে ভালো জায়গায় বাড়ি বানিয়েছে, এলাকার সেরা সুন্দরিকে উঠিয়ে এনে বিয়ে করেছে, সরকারি ভাঙাচোরা ব্যাঙ্ক থেকে শুরু করে সুইজারল্যান্ডের রিশল্যু ব্যাঙ্কে টাকার পহাড় জমিয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষুধার এক কণাও মেটেনি তার ভেতরে।
কথাটা ভাবতেই সামান্য মাতাল মফিউজ্জামানের মুখে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুঠে উঠলো। পৃথিবীর সামনে সে নিজেকে খুব ধার্মিক দাবি করে, কিন্তু মনে মনে সে নিজেই নিজেকে মনে করে খোদার সমতুল্য। নিজের হিং¯্র দীর্ঘ জীবনে একের পর এক সাফল্যের ধাপ পেরিয়ে এসে পরাজয় কাকে বলে ভুলে গেছে সে। নিজেকে সে অপরাজেয় মনে করে। আর সে এটাও জানে এই দেশের মানুষকে যতো চাপ দেয়া যাবে এরা ততোই তাকে মান্য করবে। একদিন যে রিলিফের মাল চুরি দিয়ে শুরু হয়েছিলো তার চুরির যাত্রা আজ সেটা বহু বছর পর আবারো তাকে এনে দিয়েছে নতুন এক অসীম সম্ভবনা।
করোনার যন্ত্রণায় সারা বিশ^ যখন উতলা তখন মফিউজ্জামানের মুখে ফুঁটে উঠেছে আনন্দের হাসি। সে নিজেকে খোদা মনে করে। আার তাই জানে এসব করোনা ফরোনায় তার কিছু হবে না। বরং যেটা হবে সেটা হলো; এই সুযোগে সরকারি প্রণোদনা থেকে ইচ্ছেমতো চুরি করা যাবে। গরীবকে বড়লোক বানানো সম্ভব নয়, তাই বড়লোকের আরো বড়লোক হওয়াতেই মজা, এই নীতিতে বিশ^াসী সে। সেই বিশ^াসের প্রতিফলনেই সে জানে এই করোনা কার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। আর এই দেশে গরীবকে যতো মারা যাবে ততোই বেশি টাকা কামানো যাবে। তবে এই লাভের পূর্ণ ফায়দা নিতে হলে নাটক করতে হবে তাকে, অনেক অনেক নাটক।
কথাটা মনে হতেই সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সকালবেলা বলতে গেলে প্রায় খালি পেটে মাল টানাতে জিনিসটা ধরে গেছে খুব সহজেই। তবে এরকম আনন্দের দিনে একটু উৎসব করা যেতেই পারে। সারা বিশে^ গোলযোগ লেগে যেতেই সে জানতো এর ফায়দা সে তুলবেই তুলবে। আর আজকেই সেই দিন এসেছে। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে টেবিলের ওপর থেকে নিজের মোবাইলটা নিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে ভরে টুপিটা তুলে মাখায় পরে নিলো সে। তারপর নিজে নিজেই মুখটাকে হাসি হাসি করে বেরিয়ে এলো কামরার বাইরে। ডায়নিং রুমে তার বউ আর দুই ছেলেমেয়ে নাস্তা করছে। সে টেবিলের পাশ দিয়ে এগিয়ে গেল কিন্তু না বউ না ছেলেমেয়ে কেউই তাকে খেতেও ডাকলো না। একজন চাকর ছুটে এসে জানতে চাইলো মালিক নাস্তা করবে কিনা। হাত নেড়ে মানা করে সে বাইরের দিকে রওনা দিলো। খাওয়া দাওয়া পরে হবে আগে সব মাল জমানো হয়েছে কিনা সেটা জানতে হবে।
সোজা হেঁটে সে চলে এলো নিচের তলায়। তাকে দেখে সবাই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে গেল। সবাই মাস্ক পরে আছে মুখে। সে নিজেও পরবে কিনা ভাবলো। তারপর মনে মনে উড়িয়ে দিলো ব্যাপারটা। জগুলকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে সে জানতে চাইলো। “কি রে কী অবস্থা?”
জগুল খুব ভারোাবেই জানে বড় ভাই কিসের অবস্থা জানতে চাইছে। সাথে সাথে সে বলতে শুরু করলো, “জি ভাইজান। প্রায় বিশ মন চাউল বাড়ির পিছে গুদামে নিয়া রাখছি। লগে ডাইল, আর অন্যান্য জিনিওস আছে। তবে সব এখনো নেয়া অয়নাই। সারাদিন লাইগা যাবো সব নিতে নিতে।”
মফিউজ্জামান মনে-মনে হিসেব করে ফেললো এই পরিমাণ ত্রাণ হজম করে কী পরিমাণ টাকা সে কামাতে পারবে। এই জিনিসগুলো গোপন জায়গাতে মজুদ রাখবে সে। দেশের পরিস্থিতি আরো খাপার হলে তখন এলাকাতে কৃত্রিম একটা ক্রাইসিস তৈরী করবে তার লোকেরা। তখন গিয়ে ডাবল দামে বিক্রি করবে সে এই ত্রাণের জিনিস। মনে-মনে খুশি হয়ে উঠলো সে। সত্যিকার অর্থেই সে ত্রাণ চুরির কর্তা।
“আর সাংবাদিক? ক্যামেরা?” ওটাই মেইন। ত্রাণ দিবে সে, সেটার নিউজ না হলে লাভ কি।
“জি সবাইরে খাম দেওয়া অইছে। হেরা বাইরেই আছে,” জগলু মাথা নেড়ে বলে উঠলো। “আর বিশ জনরে ভিতরে ঢুকাইছি জিনিস দেওনের লাইগা।”
বিশজনকে গেটের ভেতরে ঢোকানো হয়েছে শুনে মনে-মনে অত্যন্ত বিরক্ত হলো মফিউজ্জামান। ক্যামেরায় ছবি ভালো আসার জন্যে দশজনই যথেষ্ঠ ছিলো। অকারণে আরো দশটা প্যাকেট হাতছাড়া। “ঠিক আছে, এখন নিচে চল।”
বিশজনের কথ শুনে যে রাগটা উঠেছিলো নিচের আয়োজন দেখে মনট আবারো ভালো হয়ে গেল মফিউজ্জামানের। টেবিলে অনেকগুলো প্যাকেট সাজানো আছে। এক সারি দরিদ্র মনুষ দাঁড়িয়ে আছে গেটের ভেতরের লাইনে। অন্যদিকে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সাংবাদিকেরা। সাংবাদিকদের সংখ্যাটা ত্রাণ নিতে আসা লোকেদের চেয়ে বেশি। তবুও এতোগুলো প্যাকেট দিয়ে দিতে হবে দেখে মফিউজ্জামানর মনটা আবার খারাপ হয়ে গেল। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো ছবি তোলা হয়ে গেলে দশটা প্যাকেটই সে দিবে। বাকি দেরকে ভাগিয়ে দিতে হবে। লোকগুলোর কথা চিন্তা করে মনে মনে রেগে গেল সে, সারা দুনিয়া আছে বিপদে আর এই ফকিন্নিগুলা খাবার নেয়ার জন্যে অস্থির হয়ে আছে। এদের কোন শরমও নাই। জগলুকে ডেকে সে বলে দিলো ছবি ওঠা হতেই, দশ জনের বেশি ত্রাণ দেয়ার দরকার নেই। বাকিদের ভাগিয়ে দিতে বললো সে।
সাংবাদিকদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে এগিয়ে গেল সে সামনে। এলাকার নেতারা এগিয়ে এসে সম্ভাষণ জানালো তাকে। যদিও করোনার সময় তবু রাজনীতি তো রাজহনীতিই। সবার সাথে হেসে কথা বলো সে। তারপর ক্যামেরার সামনে পোজ দিয়ে সে আর তার চ্যালারা ত্রাণ দেয়ার ছবি তুললো। সব কাজ সেরে তৃপ্তির একটা অনুভূতি নিয়ে সে বাড়ির ভেতরের দিকে যাবে হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ফিরে তাকালো। দেখলো এক জায়গাতে জটলা করছে দুই তিনজন।
“কি ব্যাপার সেদিকে এগিয়ে জানতে চাইলে সে?”
“ভাইজান দেহেন তো, কইছি আজকের মতোন দেয়া অয়া গেছে এই দুই বুড়া-বুড়ি শোনেই না। হেগোর নাকি প্যাকেট লাগবোই,” বলে জগলু দুজনার দিকে নির্দেশ করলো। মফিউজ্জামানের শরীরে রাগের হল্কা বয়ে গেল। রাগের সাথে সে ফিরে তাকিয়ে দেখলো, দুই বুড়ো-বুড়ি দাঁড়িয়ে আছে নাছোড় ভঙ্গিতে। দেখলেই বোঝায় যায় কয়দিন না খেয়ে আছে। দুটোকেই দেখে অসুস্থ মনে হলো তার কাছে। বুড়াটারে এক হাতেধরে সে ঠেলে ফেলে দিলো গেটের বাইরে। বড়িটার গায়ে হাত দিতে গিয়েও থেমে গেল সে। জগুলুকে ইশরা করলো এটাকে সরানোর জন্যে।
বুড়ির দিকে রাগের সাথে তাকিয়ে আছে সে, হঠাৎ বুড়িটা থুতু ছুঁড়ে মারলো তার দিকে। রাগের চোটে মনে হলো বুড়িকে খুন করে ফেলবে মফিউজ্জামান কিন্তু অসংখ্য মানুষ তাকিয়ে আছে দেখে সে হাসি মুখে রুমাল বের করে মুখ মুছলো তারপর জগলুকে আবারো নির্দেশ দিলো এদেরকে বের করে দিতে। হাসিমুখে সে রওনা দিলো বাড়ির ভেতরের দিকে। বুড়োবুড়ির ব্যাপারটা তাকে মৃদু কষ্ট দেয়ার কথা ছিলো কিন্তু যে পরিমাণ ত্রাণ সরানো গেছে আজ তাতে খুশি আর বাঁধ মানছে না তার মনে। করোনা তার জন্যে এতোবড় আশীর্বাদ হয়ে আসবে কে জানতো।
সারাদিনের মালামাল আনা-নেয়ার তদারকি করে মাল টেনে মফিউজ্জামান ঘুমাতে গেল অনেক রাতে। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মনে হলো তীব্র গলা ব্যাথা আর জ¦রের চোটে গা পুড়ে যাচ্ছে তার।