আনসার উদ্দিন-দন্ত-মঞ্জন

Spread This

আনসার উদ্দিন

দন্ত-মঞ্জন 

রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে হারার পায়ের তলা থেকে এক ধরনের শব্দ হয়। তারা বুঝতে পারে না কি ধরনের শব্দ হয়, কিন্তু অন্যেরা বোঝে । যেমন কেউ ঘুমের ঘোরে নাক ডাকলে অন্যেরা বুঝে ফেলে তেমনই। হারার নাম অবশ্য হারাধন। কিন্তু গাঁয়ের মানুষ এমনই যে তার পুরো নাম কখনোই উচ্চারণ করে না। তাদের ধারণা, হারা এমন কোনো কেউকেটা নয় যে তার পুরো নাম উচ্চারণ করে অনর্থক সময় নষ্ট করতে হবে। তার বাড়ির লাগোয়া বাড়ি হচ্ছে গোবর্ধনবাবুর। জেলা শহরে ওকালতি করেন। কই, ওঁকে তো কেউ গোবর বলে না? এসব প্রশ্ন মাঝে মাঝে হারার মাথার মধ্যে ঘাই মেরে ওঠে। যখন কেউ সরকারি খাতায়, কিংবা ভোটার লিস্টের পাতায় পুরো নামটা লিখিয়ে দেয় তখন নিজেকে সত্যিকার মানুষ বলে মনে হয়। কিন্তু সেটা খুব সাময়িক ব্যাপার। সে কারণে আধখানা নামেই তার পূর্ণ পরিচয়। হারা বললেই মধ্যবয়সি মাঝারি গড়নের উসকোখুসকো চুলের মানুষের কথা মনে পড়ে। হারা বললেই যে শব্দ কানে ছিটকে আসে তাতে অন্ধকারে অনেকেই সচকিত হয়। কে হারা নাকি? হ্যাঁ খুড়ো। হারা কথা বললেই অন্ধকারে ভেসে থাকা দাঁত কটাকে দেখা যায়। ওইরকম কালো মানুষের অসম্ভব সাদা দাঁতগুলো মাঝে মাঝে যে কাউকে অবাক করে দেয়। তা সত্ত্বেও হারা তার নাম নিয়ে ভীষণ মনোকষ্টে ভোগে। একদিন সে গাঁয়ের শিক্ষক নির্মাল্যবাবুর বাড়িতে উপস্থিত। হারাকে দেখে বললেন, কী খবর হারা? কিছু বলবি? হ্যাঁ, কিছু বলার ছিল মাস্টারমশাই। যদি কিছু মনে না করেন। নির্মাল্যবাবু সাহস দেন, তুই তোর কথা বলবি এতে আমার মনে করার কি আছে হারা? হারা বললে— আমার নাম তো হারাধন। কিন্তু সবাই আমাকে হারা বলে। যেমন আপনিও বললেন। কিন্তু আমাদের পাড়ার গোবর্দ্ধন উকিলকে কেউ গোবর বলে না। এর কী কারণ সেটাই জানতে চাই। হারার কথা শুনে নির্মাল্যবাবু প্রথমে হকচকিয়ে গেলেন। সাতসকালে তার বাড়ি এসে হারা যে এমন আকাট প্রশ্ন করে বসবে তা কে ভাবতে পেরেছিল! অনেক ভেবে নির্মাল্যবাবু বললেন, এটা একটা কথা হল হারা? যে যেমন তার তেমন নাম। তুই তো তেমন লেখাপড়া শিখলি না, বোঝাব কী করে? গোবর্দ্ধন কথার মানে জানিস? হারা মাথা নাড়ে। নির্মাল্যবাবু বললেন, জানলে তোর নাম হারাধনই হত। গোবর্দ্ধন কথার মানে হল শ্রীকৃষ্ণ। গোবর ধন যার। শ্রীকৃষ্ণ হল ভগবান, জানিস তো? হ্যাঁ, জানি। ননী চুরি করে খেত শুনেছি। এজন্য তার আরেক নাম হল ননীগোপাল। আর তোর ভালো নাম হারাধন। হারাধন কথার অর্থ হল- ধন হারিয়েছে যে। ধন মানে সম্পদ হারা সেটা বুঝতে পারেনি। নির্মাল্যবাবুর মুখে এমন ভাষা শুনে সে লজ্জা পায়। এই মাস্টারমশাই নাকি ইস্কুলে ছাত্র পড়ায়! এঁর কাছ থেকে বাচ্চা- কাচ্চারা শিখবে কী? নির্মাল্যবাবু সম্পর্কে হারার ধারণাটাই পালটে গেল। নিজের নাম নিয়ে আর কারো কাছে অনুযোগ জানায়নি। পরে তার মনে হয়েছিল গরিব মানুষের নাম ছোট থাকাই ভালো। স্বামী- স্ত্রী আর বছর দুয়েকের ছোট্ট মেয়ে। তিনজনের ছোড় সংসার। গতবার মা মারা গিয়েছে। মায়ের জন্য তেমন শোক- তাপ নেই। কেবল একটাই আফশোস, আর একটি বছর বেঁচে থাকলে একশো বছর পূর্ণ হত। মরার আগে মাকে অনুনয় করে বলেছিল- আর একটী বছর কষ্ট করে বেঁচে থাকিস। শুনে হারার মা ফোকলা মুখে বলেছিল, হারা ওটা তোর জন্য তোলা থাকল। তুই-ই শতকটা পূর্ণ করিস। হারার মনে হয় মা তাঁকে একটা গুরু দায়িত্ব দিয়ে গেল। কী করে যে অত বছর বাঁচবে হারার ভাবনা হয়। কিন্তু একশো বছর বাঁচব বলে তো তাড়াহুড়ো করলে হয় না। পুরো একশো বছরের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সকাল ছ’টা থেকে হারার দিন শুরু হয়। বিছানা থেকে উঠে প্রথমে বার তিনেক হাই তোলে। হাই তুলতে তুলতে শরীরের আড়মোড়া ভাঙে। প্রাতঃকৃত্য সারতে সে মজুমদারদের পুকুরের ওদিকে যায়। ফেরার পথে আশশ্যাওড়ার ডাল ভেঙে দাঁতন বানায়। তারপর সেই দাঁতনে দাঁত ঘষতে ঘষতে বাড়ি অব্দি পৌঁছে যায়। ততক্ষণে তার বউ কমলি বাসি কাজ অনেকটাই সামলে নেয়। এরপর সে উনুন ধরাবে। উনুনের ধোয়া গল গল করে উপরে উঠতে দেখলে হারার খিদে বাড়তে থাকে। বাড়ন্ত খিদে নিয়ে ছোট মেয়েটাকে আদর করে তার রান্নাঘরের দিকে মাঝে মাঝে উকি মারে। কমলি হারার খিদের ধরনটা বোঝে। বলে আর তুমারে উঁকিঝুকি মারতে হবে না, এবার চান করে নাও। খিদের তাড়সে হারার চানটাও বুঝি ঠিকমতো হয় না। সাততাড়াতাড়ি সে ভাতে বসে যায়। তখনো গরম ভাত থেকে সমানে ভাপ উড়ছে। সামনে বসে কমলি সেই ভাতের উপর হাতপাখা নাড়ে। মেয়েটা পিছন থেকে হারার গলা পেঁচিয়ে ধরে দোল খায়। এভাবে ভাত খেতে তার ভালোই লাগে। তবু কমলি মাঝে মাঝে মেয়েকে মৃদু ধমক দেয় – এই টুসি, গলা ছাড়, গলা ছাড়। নইলে বাবার গলা দিয়ে ভাত নামবে না। কমলি বড় ভালো মেয়ে। নিরীহ, শান্তশিষ্ট। বাবা নেই, মা নেই। ভাই-বোন কেউ নেই। মাসির কাছে মানুষ হচ্ছিল। এক দেখাতে পছন্দ হয়ে যায় হারার মার। বলেছিল, যদি দাও তাহলে মেয়েটাকে ছেলের বউ করি। তবে ছেলে আমার বড় কালো। কালো শুনে বড় কেঁদেছিল কমলি। তার মাসি বলেছিল, কালো জগৎ আলো। হারার মাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল, দিতে থুতে কিছু পারব না দিদি। হারার মা তাতেই রাজি। বিয়ে হয়ে যায় হারার। শ্বশুর-শাশুড়ি শালি-শালা। কেউ নেই। কোথাও যাবার জায়গা নেই তার। বাড়ি থেকে এক কিমি দূরে ধুবধুবির বাজারে তার ছােট্ট চায়ের দোকান। ভেতরে দুটো টানা বেঞ্চি। সামনের ফুটপাত ঘেঁষে একটা। রাত আটটা নাগাদ দোকান বন্ধ করে বাড়ি ফেরে হেঁটে। এইসময় তার পায়ের তলা থেকে যে শব্দটা বেরিয়ে আসে তাতেই যে কেউ আন্দাজ করতে পারে। হারা বাড়ি ফিরছে। অন্ধকারে অবশ্য কুচকুচে কালো রং-এর হারাকে দেখা যায় না। দেখা যায় তার ভাসন্ত দাঁতগুলোকে। মানুষের দাঁত যে এত সাদা আর ঝকঝকে হতে পারে তা বিশ্বাস করা মুশকিল। ধুবধুবির বাজারে চায়ের দোকানে যখন বসে থাকে সে তখন অনেকেই হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। হারা জিজ্ঞাসা করে, কি দাদা, চা খাবেন? তা এক কাপ খেলে হয় বই কি।। হারা চা দেয়। তারা চা খায় আর হারার দিকে তাকিয়ে থাকে। থুড়ি, হারার দিকে নয়, তার দাঁতের দিকে। মাঝে মাঝে কেউ কেউ জিজ্ঞাসা করে বসে, আচ্ছা দাদা, আপনি কী দিয়ে দাঁত মাজেন বলুন দিকি ? কী দিয়ে মানে? কোলগেট, ক্লোজআপ, পেপসোডেন্ট, বাবুল এইসব টুথপেস্টের কথা বলছি। আর কি হারা ওইসব টুথপেস্টের কথা কানে শুনেছে ঠিকই, কিন্তু কখনো উচ্চারণ করেনি। অবশ্য উচ্চারণ করা তার কাছে কঠিনই মনে হয়। মনে রাখা আরো কঠিন। সে বলে, আশশ্যাওড়ার ডাল দিয়ে দাঁত মাজি। কখনো বা ঘুটের ছাই। কিন্তু কেন, বলুন দিকি ? বলছি আপনার দাঁতগুলো খুব সুন্দর কিনা। হারা দেখেছে এইসব মানুষগুলো চায়ের দোকানে বসে দু-এক চুমুক দিয়ে চা খেতে ভুলে যায়। স্থান-কাল, বোধ-বুদ্ধি ভুলে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে। হারাই মনে করিয়ে দেয় দাদা, চা জুড়িয়ে যে জল হয়ে গেল। লোকটা লজ্জা পায়। হারাও। অষ্টক্ষণ মানুষ যদি তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে লজ্জা তো লাগবেই। খরিদ্দারদের অনেকেই চা খেতে খেতে দাঁত সম্পর্কিত নানান সমস্যার গল্প করে। প্রতিদিন এইসব শুনতে ভালো লাগে না তার। কেউ হয়ত বলল, আমার গিন্নি মাড়ির যন্ত্রণায় ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে ক’দিন ধরে। কী করি বলুন তো? কেউ বলল, আমার ছোট ছেলের দাঁতে পোকা লেগেছে, কার কাছে যে যাই! কোন ডেন্টিস্টকে দেখাব বলতে পারেন? ডেন্টিস্ট শব্দ শুনেই হারার দাঁতকপাটি লাগার অবস্থা। এইসব শব্দের সঙ্গে সে সড়গড় নয়। সে সরল সাদা-সাপটা মানুষ। চা, চিনির মতো সহজ শব্দের বাইরে যেতে চায় না। গিন্নি দাঁতের যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছে শুনে পাশের বেঞ্চিতে অন্য একজন চা-পান শেষ করে বলে উঠল, বাঙালি দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। অসহ্য! হারা এঁটো কাপটা ঠক্ করে টেবিলে রাখল। ঘাড় ফিরিয়ে দেখল চা খেয়েও মানুষগুলো বেঞ্চির উপর নির্বিকার বসে আছে। তারা কি এদের উঠে যেতে বলবে? এসব ভেবেও সে নিজেকে সংযত রাখে। ফুটপাত ঘেঁসে যে বেঞ্চি পাতা আছে, সেখানে দু’জন লোক এসে বসল। চায়ের অর্ডার দিয়ে তারা খবরের কাগজ চোখ বোলাচ্ছে। আর কাগজের আড়ালে হারার ঝকঝকে দাঁতগুলো দেখার চেষ্টা করছে। এসব অগ্রাহ্য করে হারা হাতপাখার আড়ালে উনুনের আঁচটাকে উসকে দেয়। গড়গড় করে কেটলির জল ফোটে। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে লোকটা দুধের গামলার দিকে তাকায়। তাকায় আর গরম দুধের সঙ্গে হারার দাঁতের শুভ্রতার তুলনা করে। শুধু চায়ের দোকানের খরিদ্দার কেন, ধুবধুবির বাজারে ঢোকার মুখে অনেকে। তার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখ এমনই এক আজব অঙ্গ যে কোনো কিছু স্পর্শ না করে দূর থেকে তার ইচ্ছে পূরণ করতে পারে। সেবার জষ্টি মাস। অসম্ভব গরম। একটা লোক ডুমুর গাছের ছায়ায় বসে ঘোল বিক্রি করছে। চায়ের দোকানে যেতে হলে ডুমুরগাছের পাশ কাটিয়ে যেতে হয়। হারা যাচ্ছিলও তাই, হঠাৎ করে বিপরীত  দিক থেকে আসতে থাকা একটা লোকের চোখ আটকে গেল হারার দাঁতে। আর যাবি কোথায় ? দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে লোকটা পা ঢুকিয়ে বসল ঘোলের হাঁড়িতে। মাটির হাঁড়িতে কোনো মানুষের পা পড়লে যা হয়, তাই হল। ঘোলওয়ালা হইহই করে উঠতেই লোকটার সম্বিৎ ফিরল। ধুবধুবির বাজারে চায়ের দোকান করে তারা বিভিন্ন চরিত্রের মানুষ চিনেছে। বুঝেছে প্রত্যেক মানুষের আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন তার হাঁটার পর ধরণ অন্যরকম। তেমনই প্রত্যেকটা মানুষের চা-পানের রকমফের আছে। লিকার, দুধ চা, চিনি ছাড়া এ বিভাজন তো আছেই, চায়ের কাপ হাতে ধরা থেকে ঠোট তোলা অব্দি রয়েছে আলাদা কেতা। গরম চায়ের কাপে হাত দিয়ে কেউ গম্ভীরভাবে কিছুক্ষণ বসে থাকে। কেউ প্রতিবার মুখে তোলার পর কাপের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কেউ মুখে সিপ সি্প আওয়াজ করে। কেউ সুড়ুৎ্সুড়ূৎ। কেউ নিঃশব্দে। যাদের কাজের তাড়া তারা খালি কাপটা সশব্দে রেখে চলে যায়। এসব মানুষগুলোর চায়ের দাম মেটাতে খেয়াল থাকে না। একবার এক মাঝবয়সি মহিলা চায়ের দোকানে এসে দাঁড়াল। তখন সদ্য ধূপধুনো দিয়ে উনুনে আঁচ জ্বেলেছে। আঁচ জমকে উঠছে বেশ। হাতপাখার বাতাস বন্ধ করেই হারা মহিলাকে দেখতে পেল। মহিলা একদৃষ্টে তার দিকে চেয়ে রয়েছে। হারা অবাকই হয়। মেয়েমানুষের দুটো কাজে ভীষণ আপত্তি আছে। এক, সতীনের ঘর করা আর দুই, চায়ের দোকানে বসে চা খাওয়া। তারা বলল, কিছু বলবে? মহিলা বললে – কি বলব বাবা, তুমাকে দেখছি। হারা বুঝতে পারে তাকে দেখা মানেই তার দাঁতকে দেখা। কী রকম নির্লজ্জ্ব বেয়াদপ মেয়েছেলে! কোনো পুরুষমানুষের দিকে অচেনা মেয়েমানুষের এরকম তাকিয়ে থাকা দেখে লোকে বলবে কি? আর তাকে যে দেখব বলে এসেছে তার দিক থেকে তো সে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে না। কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে হারা বললে – দেখা হল ? মহিলা বললে – এ দেখার কি শেষ আছে বাবা। বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তখনই হারার পায়ের নীচে মাটি টলে যায়। এ দৃশ্য কারো নজর পড়লে চেঁচিয়ে বাজার মাথায় করবে। লোকজন জড়ো হবে। কেলেঙ্কারির ভাগী হতে হবে। আর বলল, আমি তো তোমাকে কোনো কুবাক্য বলিনি মাসি। কাঁদছ কেন ? মাঝবয়সি মহিলা তেমনই ফোঁপাতে ফোঁপাতে বল, মেয়ে বললে তুমাকে দেখে আসতে। তোমার আবার মেয়ে আছে না কি? কই তাকে তো আমি দেখিনি কোনোদিন। হ্যাঁ বাবা, তুমি দেখনি, কিন্তু সে তুমাকে এই ধুবধুবির বাজারে দেখেছে। মেয়ের এখনো বিয়ে দিতে পারিনি। বলতে বলতে অবরুদ্ধ কান্নাটা ছড়িয়ে পড়ল। আর এতে হারা ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। মহিলার বিবাহযোগ্য মেয়ে তাকে এই বাজারে দেখেছে, দেখে মাকে পাঠিয়েছে। তারপর এই কান্নাকাটি। এসবের মানে কী? মহিলার মেয়ে কি তাঁকে মনে মনে ভালোবেসে ফেলেছে? এই কালো কুৎসিত হারাকে? হা ভগগান। ভগবান বজ্রাঘাত করো, বজ্রাঘাত করে বলে হারা টুলে বসে পড়ল। মহিলা যে এখনো মেয়েকে নিয়ে তার বাড়ি গিয়ে ওঠেনি সেটাই রক্ষে। আর উঠবে না যে সে গ্যারান্টি কোথায় ? বাড়িতে কমলি আছে সেই বা কী ভাববে? এখানে আসার আগে নিশ্চয় ওর আমার ঘরসংসারের খবর নেওয়া উচিত ছিল। সে যে বিবাহিত, দু-বছরের মেয়ে টুসি আছে – এসব ভাবতে ভাবতে মাথা ঘুরে ওঠে হারার। এতক্ষণ ছড়ানো কান্না অনেকটা বাগে আনতে পারে মহিলা। শাড়ির আঁচলে চোখের জল মুছতে মুছতে বলল, তুমার দাঁতগুলো খুব সুন্দর। মেয়ে আমার ঠিকই বলেছে। দেখে আমায় বললে, যা দেখে আয় চায়ের দোকানের মানুষটাকে। ভাল দাঁত কাকে বলে। হারা শুকনো গলায় বলল – তা মাসি আমার কী করার আছে? আমি তো কোনো অপরাধ করিনি। না বাছা, তুমি হলে ভালোমানুষ। অপরাধ করবে কেন? আমার মেয়েরই কপাল মন্দ, দুধে দাঁত ভাঙার পর উলটোপালটা দাঁত গজালো। দু’পাশ দিয়ে গজদন্ত বেরিয়ে এলো। মেয়ে আমার রঙে চঙে, দেখতে শুনতে সব দিকই ভাল, শুধু ওই দাঁতের জন্যি – হ্যাঁ মাসি, দাঁতের জন্য কী হয়েছে? কি আর হবে বাবা, পাত্রপক্ষ আসে আর ফিরে ফিরে যায়। মেয়ে বলে, ওরকম দাঁত যদি আমার থাকত, তাহলে রাজপুত্রের সঙ্গে বিয়ে হত। সব কথা শুনে হারার বুকের থেকে আস্ত পাষাণ নেমে গেল। সে প্রাণভরে নিশ্বাস নিল। বাড়ি গিয়ে কমলিকে এসব কথা বলেনি। শুধু বলেছিল, ভাবছি চায়ের দোকান তুলে দেবো। হঠাৎ একথা বলছ কেন? দোকান তুলে দিয়ে তুমি কী করবে শুনি? কমলি  জিজ্ঞেস করে। অন্য কিছু করব, অন্য ব্যবস্যা ট্যাবসা। ব্যবসা করবে কী করে? তুমি তো লেখাপড়া জান না তেমন। ব্যবসা করতে গেলে অঙ্ক করতে হয়। যোগবিয়োগ করতে হয়। তুমি পারবে কী করে? না, তোমার চায়ের দোকানই ভালো। এতে আমাদের বেশ চলে যাচ্ছে।

উপায়ান্তর না দেখে হারা বলে ফেলল, মানুষ অনর্থক আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হ্যাঁ, সে তোমার ওই সুন্দর দাঁতের জন্য। দাঁতের জন্য প্রতিদিন এতো এতো খরিদ্দার দোকানে উঠছে বসছে। আমার যদি ওরকম দাঁত থাকত! কমলির গলায় আপশোস ঝরে পড়ে। কমলির কথাটা শুনে হারা চমকে ওঠে। মধ্যবয়সি মহিলার সেই মেয়েটি এরপর যোগ করেছিল—তাহলে আমার রাজপুত্রের সঙ্গে বিয়ে হত। যাক এটাই সৌভাগ্য যে, তার সামনে কমলি ওই আপত্তিজনক কথাটি যোগ করেনি। প্রতিদিনের মতো সেদিনও হারা চায়ের দোকানে কাজ করছিল। খবরের কাগজ হাতে কয়েকজন চা-পায়ী মানুষও বসে ছিল। হঠাৎ ধোপদুরস্ত পোশাকে একজন ভদ্রলোকের আর্বিভাব হল। তাঁর গলায় ঝোলানো টাই। হাতে ঝোলানো অ্যাটাচি, পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুল, সুন্দর করে দাড়িগোঁফ কামানো, পরনে প্যান্ট শার্ট, পায়ে ঝকঝকে বুটজুতো। এমন লোককে ধুবধুবির বাজারে কখনো দেখেনি হারা। হারা কেন, হারার চায়ের দোকানে যেসব নিত্য খরিদ্দার বসেছিল তারাও দেখেনি। ভদ্রলোক এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে বেঞ্চিতে বসলেন। কোলের উপর অ্যাটাচি। হারা সযত্নে ভদ্রলোকের হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিতেই তিনি ধাঁ করে উঠে দাঁড়ালেন। একটানা গোল গোল চোখে এমনভাবে তাকিয়ে থাকলেন যেন তার চোখের পাতা উড়ে গেছে। হারা ব্যাপারটা আঁচ করতে পারেনি। জিজ্ঞাসা করল, বাবু চিনি লাগবে চায়ে? ভদ্রলোক সেই একই দৃষ্টিতে নিরুত্তর। হারা আবার বলল, আসলে আমাদের ধুবধুবির বাজারের চা এই রকমের। কিছু মনে করবেন না। কিন্তু তাতেও কোনো বিকার নেই। হল কি লোকটার? পুলিশের লোক, না অন্যকিছু। হারা ভয় পেয়ে যায়। হারা বলল, বাবু, ও বাবু, আপনাকে খেতে হবে না। নতুন পাতি দিয়ে করে দিচ্ছি। ভদ্রলোক এবার বললেন—না, তার আর দরকার নেই। আপনার নাম কী? হারা। মানে হারাধন মণ্ডল। বাড়ি? গাবানিপুর। সে আবার কোথায়? এই তো বাজারের পশ্চিমে। মিনিট কডির হাঁটাপথ। কেন বাবু? কিছু বলবেন। আমি হলাম গে গরিব মানুষ, চা বেচে খাই।। চা বেচছেন বেচুন, কিন্তু আপনাকে দিয়ে আমাদের কোম্পানির একটা বড় কাজ আছে হারাধন বাবু। হারা অবাক হয়। ভদ্রলোকের কথা তার একদম মাথায় ঢোকে না। কী কোম্পানি, কী কাজ এসবের থেকেও বড় কথা ভদ্রলোক তাকে বাবু বলেছেন। উনি আবার বললেন, আমি মোহিনী টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনী এজেন্ট। আপনার এত সুন্দর দাঁত! এত সুন্দর দাঁত নিয়ে, আপনি চা বেচছেন ? আমরা মোহিনী টুথপেস্টের বিজ্ঞাপনের জন্য অনেক মানুষ বাছাই করেছি, কিন্তু আপনার ধারে কাছে কেউ নেই। আপনার মতো মানুষকে আমরা খুঁজছিলাম। আমাদের নতুন কোম্পানি। নতুন প্রোডাক্ট। একটু জানতে ইচ্ছে করছে হারাধনবাবু, আপনি কোন প্রোডাক্ট ব্যবহার করেন? হারা কথাটা ভালোমতো বুঝতে পারে না। সে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে থাকে। ভদ্রলোক এবার খোলসা করে বললেন – আপনি কোন টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মাজেন? আজ্ঞে বাবু আশশ্যাওড়ার ডাল, ঘুঁটে ছাই, পিটুলির ডাল। গাঁয়ের মানুষ আমরা, যখন যা পাই হাতের কাছে। বুঝতে পারছি হারাধনবাবু। ভগবান আপনাকে গায়ের রঙটা দেয়নি ঠিকই কিন্তু ভুবন ভোলানো দাঁত দিয়েছেন। আপনি যদি আমাদের কোম্পানির ছোট্ট একটা বিজ্ঞাপন করে দেন তাহলে আপনাকে যথেষ্ট টাকাপয়সা দেওয়া হবে। তাতে আপনার যেমন আর্থিক সচ্ছলতা আসবে তেমনি আপনি লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে পৌছে যাবেন। হারার বিস্ময়ের সীমা পরিসীমা থাকে না। সে বলল, আমি গরিব মানুষ, চায়ের দোকান ছেড়ে অত লোকের কাছে কি করে পৌঁছাবো বলুন? ভদ্রলোক ছোট্ট করে হেসে বললেন, আপনাকে লোকের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে না। আমরা আপনার ছবি তুলে নেব। আপনি কেবল হাসি হাসি মুখে বলবেন “আমি প্রতিদিন মোহিনী টুথপেস্ট ব্যবহার করি, তাই আমার দাঁত এত সুন্দর আর ঝকঝকে।” আপনার ছবি প্রতিটি খবরের কাগজে আর টিভি চ্যানেলে ছড়িয়ে যাবে। একথা শুনে হারা অনেকক্ষণ ঝিম মেরে বসে থাকল। বসে বসে অনেকক্ষণ ভাবল হারা। তার দাঁতের কত যে মহিমা তা এতদিনে সম্যকভাবে উপলব্ধি করল। তারপর ভাবল, যে দাঁত এত সুন্দর, সুচারু, সেই ভুবনভোলানো দাঁত দিয়ে কোম্পানির শিখিয়ে দেওয়া মিথ্যে কথা সে কিছুতেই উচ্চারণ করতে পারবে না।