অভিষেক ঝা-অমূলদ

Spread This

অভিষেক ঝা

অমূলদ

—– এরপর?
… বাকি সাদা জুড়ে কেবল একটি নিঃশ্বাস…

যখন এইসব ঘটছিল তখনই সে জানত একদিন সে এইসব মনে করবে। না, বরং সে, হয়ত ভেবেছিল এইসবের তাকে মনে পড়বে কোন একদিন। তাই সে অতি সতর্ক ভাবে সবকিছু মনে রেখেছিল। নয়ানজুলি নিয়ে আমার কোনো স্মৃতি নেই। এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি কারণ স্মৃতি হতে গেলে যতখানি দূরত্বের প্রয়োজন নয়ানজুলির সাথে সে দূরত্ব আমার কোনদিন তৈরি হয়নি। নয়ানজুলিকে আমি আধ-ফিসফিসে দূরত্বে গঠন করেছি, সেইসব সময় – যখন বিকেল থেকে পালাতে চেয়ে আমি সন্ধ্যা নামিয়েছি নয়ানজুলির ধারে। খুব ধীর গলায় নয়ানজুলি থেকে অনেক দূরের গলির ধারের জানালা থেকে ভেসে আসে পাকা তালের মৌতাতের স্মৃতির খুচখাচ। গাছটা কি আমার নয়ানজুলির ধারের কোনো গাছ? সে গাছের ছায়ার স্মৃতি কি নয়ানজুলির চোখে লেগে আছে? আচ্ছা, নয়ানজুলির স্মৃতিতে সে ছায়ার গাছ থাকবে কি করে ? নয়ানজুলির গায়ে তো তখন সেইসব জল যারা সেই কবে আকাশ হয়ে গেছে। আমার নয়ানজুলির জলে সেই কবেকার আকাশের জল সব মিলান্তি খেলছে? এইসব বাখোয়াজিতে অবশ্য তালের বড়া খাওয়া লোকটির স্মৃতি নেই। কিন্তু তালের বড়ার ভিতর এখন ঢুকে পড়েছে লোকটির ঠাকুমা। বেশ যত্ন করে পোতাকে তাল-ক্ষীর খাওয়াচ্ছে বুড়ি। মিষ্টির তিতকুটে স্বাদটা জিভময় ঘোরাঘুরি শেষে বাগডুম এক ভাদ্রের বিকেলে হাতিয়া’র বৃষ্টি নামায়। বুড়ি গল্প শুরু করে তার নয়ানজুলিকালের।
বাকিটা এখন সে একটু একটু মেঘের মতো দেখে। এটা একটা ধূ-ধূ সমভূমির দেশ । চোখের জরিপে আকাশ আর মাটির পরকীয়া হাবভাব ছাড়া আর কিছুই নেই যতটা জিরেত করতে পারে চোখ আর চোখের মন। মাটিরেখা এখানে গিরগিটি হয়ে আছে সেই তখন থেকে, যখন লাঙল-হিংস্রতা এখানকার তীর-ধনুকের সহজিয়া হিসাবকে ক্ষেতে ঢুকে পড়া শজারুর মাংসের মতো অতি সাবধানে ছাড়িয়ে, ভোজে মেতেছে গ্রাম কে গ্রাম। ধানী মদের রাত শেষে একটা আধ-ভাঙা মুসুর ডালের মত সূর্য দিয়ে গা ডলতে ডলতে এ নদীর জলে এসে পড়ে তিনদিন আগের বৈকুন্ঠপুর জঙ্গল- হরিণ, খটাশ, বুনো মোষের জিভ জিভ গন্ধ মেখে। জলের স্মৃতিতে থেকে যায় সেই বুনো তেষ্টা মিটাবার জৈবিক প্রেম। এ নদীপালিত মাটি এখানে গিরগিটি হয়ে থাকে বছরভর । গুয়া মেটে – সোঁদা খয়েরী – চিরকি সবুজ- চক্ষু সবুজ- কনে দেখা সোনালী – আগুন- খয়েরী মেটে – সোঁদা গুয়া – সবুজের চিরকি- চক্ষু সবুজ – কনে দেখা সোনালী – আগুন – গুয়া মেটে ………………………। রোদে ছায়া ফেলে যখন পাখি উড়ে যায় এসব কিছুর উপর দিয়ে অনেক অনেক বছর আগের কথা নাভি থেকে বুড়বুড়ি কেটে বুকে এসে থামে তার। চিনচিনায় খানিক। ঘড়ঘড় করে কফে পেন্ডুলাম চলে। দলা দলা কফ জিভে এসে যবের গন্ধে ভরিয়ে তুলে মুখ। ফেলতেও অনীহা বড় এসব আঠাল গন্ধ। ঐ সময় চোখের দিকে তাকালে আকাশ আর মাটি ছাড়াও কিছু দেখতে চাওয়ার ইচ্ছা চোখে পড়ে যাদের চোখে মন থাকে। এ ইচ্ছা নিয়ে এখানে সেই কবে থেকে মরে যাওয়া পোলাপান, গ্যান্ডা, বুড়া-বুড়ি, ডবকা-মদ্দ অঘ্রাণ মাসে পাতা হয়ে আসে হ্যালানো সব অশ্বত্থ গাছে। ঝুরঝুরে হয়ে বাতাস বইলে এখানে ইচ্ছাদের বারবার ফিরে আসা ঝুরে যাওয়াদের ফিসফিস শোনা যায়। ঘুম লেগে থাকা কানে তখন মরে যাওয়া সম্পর্কদের, আনন্দ সময়ের হৈ হৈ ভ্রম। কুউর শব্দ তুলে কান খইল করে বার করে দেয় এইসব বেঁচে ওঠা মরে যাওয়াগুলোকে। কিন্তু এইসবকিছুকে ছাপিয়ে আকাশ আর মাটির বাইরে আর কিছু দেখার ইচ্ছা রয়ে যায় এই সমস্ত ঘুমের প্রবল মাধ্যাকর্ষণে। তাই ঘুম বুকে সেই কবে থেকে পড়েই চলে সেই সমস্ত ঘুম যে ঘুমে মন শুয়ে আছে।
একটা মাটির খ্রিষ্টান কবরখানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে দু-জন। প্রচুর মেঘ ভাসা এক বৃষ্টি হতে পারে হতে পারে হেমন্তের বিকেল। শীতের ভোরে সে অনেকদিন আগে এসেছিল এখানে। চুপটি করে তাকিয়েছিল সদ্য মাটি দেওয়া এক কবরের দিকে। দূরে একটা হ্যালানো পাকুড়। চুপ করে সবকিছু দেখছিল তারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নীলরঙা তার সাইকেল। অনেক বছর আগে, পাশের দোগাছির জঙ্গলে নাকি শজারু দেখা যেত, সে গল্প শুনেছে। কবরে শুয়ে থাকতে থাকতে মানুষের কি কি ইচ্ছা হতে পারে পাশের জনকে সে জিজ্ঞাসা করেছিল। ভরা মেঘের দিকে তাকিয়ে আরেকজন বলেছিল, “আকাশ দেখা” । “ কবরের বাইরে যতদিন ছিল তখনও কি আকাশ দেখে দেখে শখ মেটেনি!! এখানে খালি ধূ- ধূ ক্ষেত আর আকাশ, ব্যাস”। আয়োডিনের মত একটা আলোয় ভরছিল চারপাশ। সে হাঁটছিল একটা জলার পাশ দিয়ে। খানিক পিছিয়ে আরেকজন। “ম্যাজিক করতে পারিস?”, “ কেমন চাস?” , “ জানি না”, “ কি ইচ্ছে করছে বল?”, “ চারপাশটা আমার অসহ্য লাগে” , ‌“ ভ্যানিশ করে দিব”, “ চল ভ্যানিশ হয়ে যাই” , “ এটা আমার ইচ্ছা, তুই কেন নিবি?”………
আমাকে নিয়ে নয়ানজুলির স্মৃতি বোধহয় খুব একটা কম নয় । আত্মবিশ্বাসের সাথে বলা সম্ভব নয় কারণ নয়ানজুলির ক্ষণিক সব জলে ছায়া হয়ে উঁকিঝুঁকি দিতে এসে স্মৃতির জন্য প্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরির সময় আমি চোখ খুলে রাখতে পারতাম না । সেসময় জুড়ে শব্দদের অপার এক জরিপ – যেখানে মাঝরাতে থাকতে চেয়ে সকাল ন’টার সাইরেনে জেগে ওঠা আছে। নৌকার গলুইয়ে বসে জল কেটে যাওয়া পায়ের শব্দে সপাং বেল্টের লাজুলি যন্ত্রণার ওপাশ ফিরে থাকা রয়েছে। একটা থ্যাবড়ানো আলোয় হলদে দেওয়ালের শ্যাওলাটে গা থেকে বিভিন্ন ভাবে ভেসে আসে নাচের শব্দ। ঝুমঝুম করে…বাগান জুড়ে। সেই শব শব্দদের প্রতিধ্বনিতে কি নয়ানজুলি আমাকে শুনতে পেত? আমার স্মৃতিতে কি চিতাপোড়া শব্দরা পিণ্ডের জন্য ফুটতে থাকা কালো নুনিয়ার টগবগ নিয়ে আসত ? সেইসব ফিরে আসা শব্দগুলোতে কি নয়ানজুলির ধারের প্রতিধ্বনিত-আমি ফিরে ফিরে আসতাম ? গলায় তো তখন সেইসব শব্দদের দলা; হালকা সব বেসুর হয়ে টনসিলের ঢোঁক গিলে ফেলছে। এইসব দৃশ্যপটে অবশ্য পায়েস খেতে শুরু করা লোকটির কোন স্মৃতিই নেই। কালো নুনিয়ার গন্ধের ফোঁকল গলে ঢুকে পড়ছে লোকটার ঠাকুরদার ঠাকুরদা। ভূত হয়ে ফি বছর নুনিয়া গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে কোণার দিকের মাটিটা সরিয়ে ক্ষেতের ধারের নয়ানজুলিটার পাশে এসে খানিক বসেন। নয়ানজুলি জুড়ে তখন শুধুই নুনিয়াদের বাতাসে নড়া আর সাঁঝ ( নাকি শুক?) তারার ছায়ার মনকেমন।
দূরের রেখার মেঘগুলোকে তারা এসব সময় পাহাড় বলে ভুল করতে চায়। গুরাসমাখা পাহাড় ফেরত মেঘগুলোরও এসময় ইচ্ছে করে খানিক পাহাড় হয়ে মাটিতে নেমে আসার। আর এইসব সময় হ্যালানো গাছে পাতাদের ফিসফিসানি শুরু হয়। জায়মান এক পাহাড়ের গায়ে বাড়ি বোনা শুরু হয়। খালি হা হা করে পড়ে থাকা সমতলের বিস্তার আর মেঘোয়ালি এক আকাশ এসব সময় সত্যি সত্যি মিশে যায়। আমি ও সে এগোতে থাকে পরস্পরের দিকে।
আর এই সমস্ত নুনচে বিকেলে তুমি বরাবরের মত চলে যাও। বারবার। পড়ে থাকে একটা হা হা করে গিলতে আসা সন্ধ্যার ময়াল হাঁ। ধড়ফড় শ্বাস জলে খাবি খায়। নিঃশ্বাসের শেষটুকু ধরে রাখতে চায় তোমার অবশেষ। যাপনের অন্তঃসলিলা ঝিলগুলো উষ্ণতার মোহে জেগে ওঠে। বাকিদের ডেকে তোলে। এ এক অপূর্ব আয়োজন। চরাচর জুড়ে ঝুলে আছে ভাষাহীন ক্যানভাস। কবে থেকে যে শুরু? কোথায় যে শেষ? ঝিলগুলো আস্তে আস্তে জুড়তে থাকে। জুড়তে জুড়তে নয়ানজুলি কত! কোন সময় যেন নদী বয়ে যায়। যন্ত্রণার এ অবশেষ ধরে রাখতে চেয়ে জীবন ধুকপুক করে ওঠে। জল জুড়ে খলবল করে ওঠে ধুকপুকে শ্বাস। নদী যে কখন নয়ানজুলিরা হয়ে যায়! নয়ানজুলিরা আস্তে আস্তে ঝিলগুলো। উষ্ণতার নির্মোহে ঝিলগুলো ঘুমিয়ে পড়ে। বাকিদের ঘুম পাড়ায়। চরাচর জুড়ে ঝুলে আছে ভাষা পাওয়ার যন্ত্রণা। সে এক অপূর্ব আয়োজন। এখানেই শুরু। এখনই শেষ। ময়াল আলিঙ্গন কখন যে হালকা হয়ে যায়! সেই সমস্ত লবণাক্ত বিকেলে আমি বরাবরের মত চলে আসি। বারবার।

——— এর আগে?
… বাকি সাদা জুড়ে কেবল একটি প্রশ্বাস…
———————————