অদ্বয় চৌধুরী-জীবাণু বাহক

Spread This

অদ্বয় চৌধুরী

জীবাণু বাহক


‘গণেশ মুর্মুর দোকান’। হলুদ টিনের উপরে কাঁচা হাতে লেখা কালো রঙের বাঁকাচোরা অসমান অক্ষরগুলো একটি প্রায় নিভে যাওয়া ক্ষয়াটে হলুদ বাল্বের তলায় চুঁয়ে পড়ছে। রক্ত শুকিয়ে গড়িয়ে পড়লে যেমন হয়। দোকানের সামনে দিয়ে রাস্তাটা সোজা একটুখানি এগিয়েই অন্ধকারে ঝাঁপ দিয়েছে। গোটা এলাকায় এই একটি মাত্র আলো জ্বলছে; আর কোথাও কোনো আলো দেখা যাচ্ছেনা। এই নিভু আলোর উপস্থিতি আশপাশটাকে আরো বেশি অন্ধকার করে তুলেছে। মনে হচ্ছে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলা অন্ধকারের সামনে এই মৃদু আলো নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার আপ্রাণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
বাল্বটার চারদিকে অজস্র কালো পোকা উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, পাক খাচ্ছে। ঘিরে ফেলেছে। বোধহয় এবার নিকেষ করার অপারেশন শুরু হবে। সেই হলুদ আলো ও তার তলায় ‘গণেশ মুর্মুর দোকান’ লেখা টিনের বোর্ডটার নীচে দুটি কালো মাথা এসে দাঁড়ায় নিঃশব্দে। লোকদুটো তাদের গন্তব্যে পৌঁছে গেছে।


রাস্তায় আটকে থাকা অন্ধকারটা দোকান ঘরের ভিতরে ঢুকে আসে। একটা দেশলাই জ্বলে ওঠে। চায়ের দোকান। একপাশে মাটির উনুন। নেভানো। দোকান বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই। এখানে সন্ধের পরেই সব বন্ধ হয়ে যায়। এখন তো প্রায় মাঝরাত! উনুনের উপরে নীচু টালির চালের বাঁশ থেকে কয়েকটা রঙ-বেরঙের প্যাকেট ঝুলছে। বোঁদের লাড্ডু, বাপুজী কেক, বিড়ি, পান-মশলা। দোকানের আর এক পাশে একদিকে একটু কাৎ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটা বেঞ্চ। তার পিছনে একটা ছেঁড়া-খোবলানো, রোঁয়া ওঠা ছোট্ট মাদুর পাতা রয়েছে। দেশলাইটা নিভে যায়। দোকানের পিছন দিকের দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসে একটা আলো। আলোর পিছনে একটা বাচ্চা ছেলে। বছর দশেক বয়স। ছেলেটার নোংরা, বোতাম ছিঁড়ে যাওয়া হাফ-প্যান্টের উপর থেকে কালো তক্তার মতো বুক আর নীচ থেকে সরু গাঁট-ওয়ালা কালো বাঁশের মতো পা বেরিয়ে আছে। দ্বিতীয় লোকটা হঠাৎ কথা বলে ওঠে— “এটাই তো?” প্রথম লোকটা ছেলেটার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থেকে উত্তর দেয়— “সেরকমই তো নির্দেশে বলা আছে। গণেশ মুর্মুর দোকান। একটি বোবা-কালা বাচ্চা ছেলে”।


সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুটো লোকের একজন খুব লম্বা আর রোগা, আর একজন মাঝারি এবং মোটাসোটা। দ্বিতীয় লোকটার হাতে একটা বড় ব্যাগ। লোকদুটোকে দেখে ভালো লাগেনা ছেলেটার। গায়ে ঝাঁঝালো ঘামের গন্ধ। তবে এরকম লোক ছেলেটা এখানে প্রায়ই দেখে। সন্দেহজনক। সজাগ ও সন্ত্রস্ত। ওরা এই দোকানে প্রায়ই আসে। রাত্রিবেলা। দোকান বন্ধ হয়ে যাওয়ার অনেক পরে। মাঝেমাঝে অনেকে একসঙ্গে আসে। অনেক কথা বলে নিজেরা। ছেলেটা জেগে বসে থাকে ছোট্ট মাদুরটার উপরে। কিন্তু শুনতে পায়না ওদের কথা। এখানে রাতের বেলা যারা আসে তারা বেশিরভাগই দোকানের সামনের রাস্তাটা অনেকটা গিয়ে যে ঘন জঙ্গলে ঢুকেছে সেই জঙ্গলের মধ্যে থাকে। মাঝেমাঝে বাইরে থেকে নতুন লোকেরাও আসে। যেমন আজকের লোকদুটো। অচেনা। নতুন।
ছেলেটার হাতের কাচ-ঢাকা ছোটো লম্পটার আলোয় লোকদুটোকে আরও অদ্ভুত লাগে। বাইরের যে অন্ধকারটা তারা মুখে মেখে এসেছে সেটা এই অল্প আলোতে পুরোপুরি মোছে না। উলটে এই আলো-আঁধারের মিশেলে তাদের মুখে জেগে ওঠে আরও রহস্য। লম্পটার আলোয় লোকদুটোর ছায়াগুলো দোকানের দরমার দেওয়াল ছাড়িয়ে টালির ছাত বেয়ে উঠতে শুরু করে। ছেলেটা লম্পটাকে মেঝেতে নামিয়ে রাখে। মাদুরের পাশে। ছায়া দুটো তরতর করে আরো খানিকটা ছাত বেয়ে উঠে লোকদুটোর মাথার প্রায় উপরে উঠে স্থির হয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটা ছায়াদুটোকে দেখে একবার। মনে হয় ছায়ারাই রয়েছে ওখানে, লোকদুটো নেই।
দ্বিতীয় লোকটা হাতের ব্যাগটা বেঞ্চের উপরে রাখে; প্রথম লোকটা পকেট থেকে একটা ছোট্ট চিরকুট বার করে তাতে কিছু লিখে ছেলেটার হাতে দেয়। ছেলেটার কাছে ওই লেখাগুলো শুধুমাত্র কয়েকটা আঁকিবুকি। সে নিরক্ষর। আসলে ছেলেটার কাছে পৃথিবীর বেশিরভাগ জিনিসই অজানা। তবে ছেলেটা জানে এই কাগজটা নিয়ে তাকে কি করতে হবে। সে বেরিয়ে যায় দোকানের পিছনের দরজা দিয়ে।


একই রকম আর একটা চিরকুট হাতে ছেলেটা যখন ফিরে আসে তখন প্রথম লোকটা বেঞ্চের উপরে বসে আছে, আর দ্বিতীয় লোকটা তার সামনে দাঁড়িয়ে একটা লম্বা বিস্কুট খাচ্ছে। হাতে একটা কেক এবং দুটো বিড়ি ধরা। সবকিছু এই দোকানের রঙ-বেরঙের ঝুলন্ত প্যাকেটগুলো থেকেই নেওয়া। এই অল্প আলোতে প্যাকেটগুলোকে বড় অদ্ভুত দেখায়। ওগুলো যে সরু তারে ঝুলছে টালির তলার বাঁশ থেকে সেগুলো দেখাই যায়না প্রায়। মনে হয় লাল, নীল, হলুদ, সবুজ সব খাবারগুলো অন্ধকারে আটকে আছে শুধু।
প্রথম লোকটার হাতে চিরকুটটা দিলে সে সেটা পড়ে— ‘অপেক্ষা করুন’। দ্বিতীয় লোকটা কেকটা খেয়ে ফেলার পরে হাতে ধরা দুটো বিড়ি দুজনে ধরায়। একটাই দেশলাই কাঠি দিয়ে। একটা পোড়া পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে যায় ঘরটাতে। তার সঙ্গে ধোঁয়া। ছেলেটার এই ধোঁয়াওয়ালা গন্ধটা ভালো লাগেনা। যদিও প্রায়ই এই গন্ধটা সে পায় এখানে। কেকের খালি প্যাকেটটা দুমরে দলা পাকিয়ে ফেলে দেয় দ্বিতীয় লোকটা। ছেলেটা দেখে। লম্ফটার পাশের ছোট্ট মাদুরটায় বসে। এই রোঁয়া ওঠা, ছেঁড়া মাদুরটাই ওর জীবন। ছেলেটার মা ওর জন্মের সময়েই মরে গেছে। কয়েক বছর আগে বাবা মারা যায়। বুকে একটা ছেঁদা আর চাপ চাপ রক্ত নিয়ে। ছেলেটা দেখেছে। কিন্তু কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে পারেনি, কেউ ওকে কিছু বলেওনি, বললেও ও জানতে পারেনি। তারপর থেকে ও এই দোকানে কাজ করে। বাহকের কাজ। এই মাদুরেই ও থাকে। দিন-রাত।
মাদুরের পাশে রাখা লম্পটাকে কালো কালো পোকা ঘিরে ধরে। বাইরের আলোটার মতো। পোকাগুলো চারদিকে পাক খায়। মাঝেমাঝে ঝাঁপিয়ে পড়ে আলোটার উপরে। লম্পটার কাঁচের ঢাকনায় ঠোকা খায়। এক অদ্ভুত আওয়াজ হয়। কিন্তু ছেলেটা শুনতে পায় না সেই আওয়াজ। ছেলেটা কিছুই শুনতে পায় না, শুধু দেখতে পায়। আর পায় গন্ধ। পোকাগুলোর কয়েকটা ছেলেটার গায়ে গিয়েও ঠোক্কর মারে। কিন্তু ছেলেটার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। ও বোধহয় প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতেই জানেনা।


দোকানের পিছনের দরজা দিয়ে ছেলেটার চেনা আরো দুজন লোক ঢোকার পর থেকেই ওরা চারজনে শুধু মুখ নেড়ে যায়। কখনো আস্তে আস্তে, কখনো জোরে জোরে। মাঝেমাঝে মাথা আর হাতও নাড়ে। কখনো আস্তে আস্তে, কখনো জোরে জোরে। ছেলেটা একমনে আলোর উপরে পোকাগুলোর আক্রমণ দেখে যায়। পোকাগুলো চারদিকে পাক খাচ্ছে, তারপরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আলোটার উপরে, খানিকক্ষণ বসে থাকছে আলোটার কাচের দেওয়ালে, ভেদ করার চেষ্টা করছে কাচের ঘেরাটোপ, পারছে না, তারপরে সরে এসে আবার নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। বারবার আঘাত করছে।
ঘরের ভিতরের চারজন লোকের নড়াচড়ার গতি বেড়ে যায়। এক সময় ছেলেটা হঠাৎ খেয়াল করে বাইরের অচেনা দুজনের হাতে কালো চকচকে দুটো নলওয়ালা যন্ত্র উঠে এসেছে। মৃদু আলোতে যন্ত্র দুটো অল্প অল্প চকচক করে। এরকম যন্ত্র ছেলেটা এর আগেও এখানে দেখেছে। তবে ওই যন্ত্র দিয়ে একরকম আলোর ঝলকানি বেরোয় তা সে এখন দেখল। আগুনের ঝলকানি। সঙ্গে একটু খানি ধোঁয়া আর একটা পোড়া পোড়া গন্ধ। এই পোড়া গন্ধটা কিন্তু বেশ ভালো লাগে ছেলেটার। দোকানের পিছন দিয়ে ঢোকা দুজন ছেলেটার পাশে পড়ে যায়। মেঝের কোনো এক গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা একটা ইঁদুর তাদের পরে থাকা বডি দুটো দেখে। দেখেই পিছনের দরজা দিয়ে ছুটে পালিয়ে যায়। মেঝের ধার ঘেঁষে একদল কালো পিঁপড়ে মুখে খাবার নিয়ে নতুন আশ্রয়ের খোঁজে এগিয়ে চলে। পড়ে থাকা লোকদুটোর শরীরের তলা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে এসে ফাটা ফাটা মাটিতে বিভিন্ন রকম আঁকিবুকি কাটে। লাল আঁকিবুকি। হলদেটে আলোতে ঈষৎ কালো দেখায়। দ্বিতীয় লোকটা প্রথম লোকটাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “কাজ শেষ, নির্দেশ মতো, চলো এবারে”। প্রথম লোকটা তখন ছেলেটাকে দেখছিল একদৃষ্টিতে। শান্তভাবে সে উত্তর দেয়, “না। এখনো একজন বাকি আছে। জীবাণু বাহক”। দ্বিতীয় লোকটাও ছেলেটার দিকে তাকায় এবারে। ওদের চোখদুটো এই অল্প আলোতে ঈষৎ চকচক করে ওঠে। ওই কালো নলওয়ালা যন্ত্রদুটোর মতো। ছেলেটা তখন ওই ফাট ধরা মাটির মেঝেতে আরও ছড়িয়ে পড়া রক্তের নতুন আঁকিবুকির দিকে তাকায় আবার। সেই সময় মনে মনে খুব করে সে ওই কালো নলওয়ালা যন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসা আলোর ঝলকানি হতে চাইছিল— যে আলোকে চারদিক থেকে কালো পোকারা ঘিরে ধরে না, যে আলোর সঙ্গে মিশে থাকে অদ্ভুত এক ভালোলাগা পোড়া পোড়া গন্ধ।