স্নিগ্ধা বাউল-এর গদ্য

Spread This
Snigdha Baul

স্নিগ্ধা বাউল

আরিচা ঘাট

সেবার পদ্মা নদীর একটা গল্প লিখার মতো যে সময়টা গড়ে উঠলো তখন আমার বয়স সম্ভবত সাত কিংবা আট, আরও অনেক দিন পরে আমরা জানতে পারি সেটি ছিলো একবারেই দর্শনহীন আমার বাবার এক অচরিতার্থ দিনযাপনের পরিহাস। যে দাম্পত্যে মা কিংবা আমাদের কেবল কাঠামোর বাইরে যাওয়ার জন্য রচিত হতো আঁচলের গল্প। মা কাঁদতে জানতো, তবে সেগুলো বহুদিনের বেদনার মতো গুমরে বেরিয়ে আসতো আমাদের তেঁতুলতলার গল্পে, এতো গোপনে কাঁদে কেবল নারীর অভিযাত্রা। আমাদের সেবারের যাত্রায় জড়িয়ে যায় রাজনৈতিক কাঠামোরও জাল। বাবা সম্ভবত দেশ ছাড়তে চাইলেন, মা হয়তো চাইলেন না।
আমার মায়ের সম্পদ বলতে তখন কাঁসার কয়েকটা ঘটি, সিরামিকের থালা, স্টিলের গেলাস, চারপায়া দুইটা খাট, একটা ফিলিপস সাদা কালো টিভি আর তার লকলকে এন্টেনা, কয়েকটা পাট না-ভাঙ্গা শাড়ি, এক জোড়া ঝুমকা, নকল দানার মতো একটা মুক্তার নাকফুল আর আমাদের হাসি। সব মিলিয়ে দে ছোট –প্রথম বড় বাসে করে আমরা ঢাকা আসি সেবার।

রাতে বাবার কোলে ঘুমিয়ে পড়লে বুঝিনি সকালের আলো, তবে শুনছিলাম সেটি বর্ডার; একপাশে দর্শনা অন্যপাশে গেদে। তখন জানতাম না, নো ম্যান্স ল্যান্ড কাকে বলে! কেবল দেখেছি একটি বটের একরাশ ঝুড়ি নিচে নেমে এসেছে মাটির কোলে, একই মাটির মতো দেশ কেবল ভিন্ন হয়ে যাচ্ছিল আমাদের চোখের সামনে। ত্রিশ দিন পরে আমরা আবার ফিরে আসি একই পথ ধরে নিজস্ব লোকালয়ে, এবারও আমার মা জড়িয়ে রাখে তার তুলার তোষক ট্রাঙ্কের তালা আর আমাদের ছোট ছোট হাত।

ঠিক সন্ধ্যা পেরিয়ে যখন রাতের শুরু, আমরা তখন সীমান্তে দাঁড়িয়ে, বাবা জানছেন না কি করবেন, শেষ গাড়িটি চলে গেছে তখন ঘণ্টা দুই। দিদির হাত ধরে আমি দাঁড়িয়ে আছি, ভাই ধরে আছে মায়ের হাত- বাবা হাসছেন এমন করে যেন আরও একটা গাড়ি এখনই এসে আমাদের নিয়ে যাবে আমাদের সেই ঘরটায় যার টিনের চালায় বৈশাখের আমের ডাল ঝুলে আছে শুকনা পাতা লয়ে, যেখানে দূর্বা তলায় চালতার ফুলগুলো ফটফট করছে সাদা পাঁপড়ি হয়ে। আরও থই থই করছে পুকুরের জল মেঘনার জলে। আমাদের ফিরে আসার গল্প তখন যখন রচিত হচ্ছিল, ঘুটঘুটে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি আমরা তখন নো ম্যান্স ল্যান্ড বরাবর…

রাত আটটায় কেউ একজন এগিয়ে আসে, বাবা স্বস্তি পায় নিজের ভিতরে অন্তত সন্তানের সামনে যেন আগত ব্যক্তিটি আমাদের পরিত্রাণ, সে জানে আমাদের পরবর্তী করনীয় কিংবা সেই যেন তখন বাবার ছায়া! জানাচ্ছে এই রাতে কেবল একটি দোকান খোলা- গণেশ পালের হোটেল। আমরা তখন যাচ্ছি গণেশ পালের হোটেলে। ব্যাগের সাথে মা টানছেন আমাদের হাত সহ পায়ের তলার মাটি, ঘন লম্বা গাছের ছায়া সেই সন্ধ্যায় আরও ঘনীভূত হয়ে নেমে আসে আমাদের অবলম্বন করে, ছায়ার সাথে অন্ধকারের তফাৎ নির্ধারণের যে খেলা আমরা অনবরত হাতের পৃষ্ঠা উল্টিয়ে খেলতাম তার সাথে এখানে জমছে এক প্রলম্ব ব্যাঘাত। তবুও আমরা হাঁটছি কেননা মা হাঁটছে আর বর্ডারে যে নারী আমার পরনের ছোট প্যান্টও হাতড়ে দেখেছিল কেবল তার কথা আমার মনে ভাসে, তার হাতের খসখসে আঙুল আমার শরীরে তখনও বইছে নলখাগড়ার মতো।

গণেশ পালের হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমরা! লম্বা টানা বারান্দার একটা দোতলা মেসবাড়ি। শেষ কবে কেউ এখানে থেকেছে ঠাওর করা যাচ্ছে না। লাল আলোটি তখন অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিমটিমে সলতের মতো জিইয়ে রাখছে নিজেকে যেন আমার বাবার মতো তার অস্তিত্ব। দোতলার কোণার ঘরটায় একটা চারপেয়ে চৌকির সঙ্গে ঝোলানো মশারি আর চিটচিটে তোষকে আমরা যখন বসলাম, টের পাই ইতিহাসের তীব্র ক্ষুধার তাগাদা। মা জেনে যায় আমাদের তখন, তাড়াতাড়ি সেরে নেন হাতের ব্যাগের কাজ, মুখে জল দিয়ে জানায়- একটু জল খা তোরা।

গণেশ পাল বসে আছেন কাঠের চৌকির উপর, গণেশের মতোই গণেশ পাল। ঢাউস সাইজের পেট উঁচিয়ে দাঁত খিলান করতে করতে তিনি হেসে বাবাকে জিজ্ঞেস করলেন- বাড়ি কই! বাবার সঙ্গে জমে উঠতে বেশি সময় লাগেনি গণেশ পালের। আমি তখন তাকিয়ে আছি গনেশের সামনে রাখা সাদাভাত আর ডালের কড়াইয়ের দিকে, সেখানে গন্ধ বলতে কিছু নেই, আছে কেবল দৃশ্য। তাকিয়ে থাকা চোখের ভাষা লয়ে আমরা বসে যাই কাঠের লম্বা বেঞ্চিতে। একটু পরে আসে ইলিশ মাছের পাতলা ঝোল – যেন অমৃত। ইলিশের ঝোলের সাথে সাদা ভাতের সেই তৃপ্তি আমি আজও ভুলিনি। জীবনের সেই অমৃত স্বাদের পরিক্রমায় যতদিন কেটেছে তার সাথে আমার অন্তরের ভাবনারাও একীভূত।

ঠিক চার বা পাঁচটায় ভোরে আমরা আবার বেরিয়ে পড়ি, দর্শনা থেকে গোয়ালন্দ, রেলপথের সেই যাত্রায় আমরা মাকেই জড়িয়ে আছি। রেলের ঘরগুলো এগিয়ে চলছে সীমানার সঙ্গে সঙ্গে। আমার চোখে তখন ঘুম, মা-ও ঘুমিয়ে পড়লেন হয়ত। হঠাৎ শরীরে টের পাই গড়িয়ে পড়ছে আনেকগুলো শাড়ি, আর এই শাড়ির অধিকাংশ বিক্রেতা নারী, কী শ্রমের বিনিময়ে তারা গড়ছে এমন জীবন, লাফিয়ে উঠছে ট্রেনের কামরায় আবার নামছে পুলিশের তাড়া খেয়ে। তখন আমাদের পাড়ার দুই বোন হেলু আর তারানার কথা মনে আসে। শুনেছি তারাও শাড়ি ব্ল্যাক করতো! আহ জীবনের কতো রকমফের। এগিয়ে যায় ট্রেন, প্রথমে গোয়ালন্দ বাজার, তারপর ঘাট, কী ভেবে বাবা নেমে পড়লেন বাজার স্টেশনে, আমি বাবার হাত ধরে দিলাম লাফ- ওদিকে মা দিদি আর ভাই চলে যাচ্ছে ট্রেনে করে আরও সামনে, আমি কাঁদছি আর বাবা দাঁড়িয়ে আছেন কী করবেন বুঝতে পারছেন না-

বাবা আর আমি তখন দৌড়াচ্ছি, কেউ একজন বললেন একটা রিকশা নিয়ে চলে যান ঘাটে, আমরা খুঁজে পেলাম একটা রিকশা- রিকশার সঙ্গে ট্রেনের একবার কোথাও দেখা হয়ে গেলো, ঘাটের ভিড়ে মাকে পেলাম আবার।
এক টাকা করে দিয়ে পার হলাম যে ঘাটের সীমানা, এরপর সামনে আমাদের পদ্মা। লঞ্চের ডেকে ব্যাগ বিছায়ে আমরা বসে পড়লাম। বিস্তীর্ণ পদ্মার সঙ্গে সেই আমার প্রথম দেখা। লঞ্চ দুলছিল পায়রার মতো, এমন সময় কোত্থেকে এক বুট আর গগজওয়ালা এসে পড়ে গেলো মায়ের কোমর বরাবর। সেই থেকে আজ হয়তো বছর ত্রিশ হবে, কোমরের ব্যথাটায় মা এখনো তারেই শাপান্ত করে।

আরিচা হয়ে ঢাকা হয়ে আমরা ফিরে আসি আবার আমাদের কালো টিনের ঘরটায়, শুকনো পাতাগুলো তখন যেন মচমচিয়ে উঠলো, তালা খুলতেই একটা ইঁদুর লাফিয়ে চলে গেলো নতুন গর্তে, আর পরদিন মা যখন রান্নাঘরে যায় কদম গাছটা যেন আবার হেসে উঠে, সকালের দূর্বা ঘাসের ডগায় চিকচিক করে তখন নতুন রোদ। এমন করেই জেনেছি জীবনের বাঁক পরিহাসের কলতান আর গল্পের পটভূমি।