শুভংকর গুহ-র গদ্য

Spread This

শুভংকর গুহ

ইঙ্গিত থাকুক অন্তরালে

একটা কোথায় যেন টানা বাঁশির শব্দ গাছ গাছালিতে ফেঁসে গেছে। বহুদূর থেকে… ফুঃ টোকা যেন। সবে চৈত্র, ধু ধু হাঁস, ধুলাখেঁদি ঘুঘুর একটানা ঘু ঘু ঘু…, মানুষের বাস্তু ঘর উপরে চলে এসেছে নির্জনে চড়াই, এই সময়ে পাখ পাখালি ও প্রাণী জগতের আলাদা ব্যস্ততা থাকে। ক্ষেত আনাজের, লতানো কুমড়োর ফণাতে লতিয়ে যাচ্ছে গোখরো। বহুদূরে দূরভাষের বিপ বিপ শব্দের মতো কয়েকটি গ্রামচিহ্ন। ভেসে আসছে ক্ষীণ দারোগা বাবুর জিপের হাওয়া হর্নের শব্দ।
আষাঢ়ে গল্প ফেঁদে বসেছে মাতব্বর – মনে দিয়ে শুনছে বাগান আলি, মইনুল, গণেশ ঘড়াই, চৈতন্য মণ্ডল। প্রথমিক বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক শিবপ্রসাদ রায় কান পেতে শুনে না শোনার ভান করে মাতব্বরের কথগুলিকে অবজ্ঞা করছে। সবাই ভাবছে, এই বুঝি এসে গেল গ্রামে অদৃশ্য দানব। মাঠে মাঠে কাশফুল ফুটে উঠছে। উৎসব আসছে। পাড়ার অলি গলিতে ভোরের শউলির গন্ধ রাতভোরকে মায়াবী করে তুলছে। ফুলের গন্ধ কি আর ভাইরাস মানে? তবুও একঘর ভয়, আতঙ্ক। ছুঁয়ে দিলেই ব্যস, গায়ে জ্বর খুক খুক। কিন্তু আর কতদিন। তারপরে কি যেন বলে, নির্বাসন। ঘরবন্দী থাকুক আক্রান্ত। প্রবল শ্বাসকষ্ট কয়েকদিন চলবে, গড়িয়ে যাবে বুকের ভিতরে শয়তান। খুব বেশি হলে, দিন সাতেক। কপাল খারাপ থাকলে চলো হাসপাতাল। ব্রহ্মানন্দ বৈদ্যর কবিরাজি গুলি কিছুই করতে পারবে না। চৈতন্য মণ্ডল মাতব্বর শশধরের দিকে তাকিয়ে একটা লম্বা হাঁফ ছাড়তে যাবে। অমনি খুক খুক, দলা পাকিয়ে বাতাস মণ্ড হয়ে গেল গলার ভিতরে। শশধর চোখ গোল গোল করে বলল,- এই সরে বস চৈতন, আর আসবিনে, এইখানে।
বাঁশের মাচা থেকে যতদূর দেখা যায়, সবুজ হয়ে আছে, মাঝে ফালি কেটেছে মাটির পথ। আর নরম কাদা। মাঠের মাঝে মাঝে পোড়া পাতিলের ওপরে চুনের টান দিয়ে ভোলা ভোলা চোখ, ফাঁক করে ঠোঁট আর কাঁপা কাঁপা হাতে নিচে নামা দাগ ঠোঁটের ওপরে ব্যস। থ্যাবড়া নাক। বিমর্ষ কাকতারুয়া।
চৈতন্য মণ্ডল ফিরে যেতে যেতে ছিন্ন কুমড়োর ফালির পাশ কাটিয়ে গেল। কিছুটা গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে একবার ভাবল,- কী বলে শশধর মাতব্বর, কিছু স্পর্শ করব না। বলদ ছোঁব না, ঘরের হাঁস মুরগি প্যাকর ছোঁব না। মাঠের ফসল ছোঁব না। সে কী করে হয় ? মাটি ছোঁব না ?
চৈতন্য মণ্ডল আবার ফিরে চলল, শশধর মাতব্বরের কাছে। শশধর মাতব্বর গণেশ ঘড়াইয়ের দোকান থেকে, এক গ্লাস চা নিয়ে পায়ের পাতা হাতিয়ে খোশ মেজাজে চুমুক দিচ্ছে এমন, যেন এই দানবীয় রোগের সময় তারই একমাত্র ছোঁয়ার অধিকার আছে। আর বাকি সব গ্রামের অধিকারি, পঞ্চায়েত প্রধান আর সমিতির মাতব্বর সব ছুঁয়ে ছেনে দেখবে। চৈতন্য মণ্ডল শশধর মাতব্বরের কোণ ঘেঁষে দাঁড়াল। খোশ মিজাজে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিয়ে যাচ্ছে শশধর মাতব্বর।
চৈতন্য সকালে এসে গণেশ ঘড়াইয়ের দুকানে চাইল,- হেঁকে দাও তো ভাই এক গ্লাস চা। কাছে যাব না। সমিতি না করেছে। শশধর সঙ্গে সঙ্গে ফোঁস করে উঠে বলল,- ঠিকই তো বলেছে। মুখে গামছা দিস নাই কেন? সবাইকে বলা হচ্ছে মুখ এবং নাক ঢেকে রাখতে। কথা বললে তোর মুখ থেকে থুতুর ছিটা আসবে।
চৈতন্য মণ্ডল বলল,- এই মাত্তর মাঠ থেকে উঠে এলাম কত্তা। মাটি আর শ্যালো ছাড়া কিছুই তো স্পর্শ করলাম না। শশধর বলল,- কোনো নির্দেশ মানছিস না। শহর বেরাদরে সব কাহিল হয়ে যাচ্ছে। একবার যদি জীবাণু তোর শরীরে প্রবেশ করে, তা হলে আর রক্ষে নাই। এইখান থেকে তোকে কে তখন নিয়ে যাবে, জেলা হাসপাতালে?
চৈতন্য ভাবছিল বলবে কি না, কিন্তু সংকোচ করছিল যদি বলে, তা শশধর কত্তা গালি না দিয়ে দেয়। শশধর বুঝতে পারল, চৈতন কি যেন হ্যাঁ বা না করছে। শশধর বলল,- কী বলতে চাইছিস তুই? আসলে কী বিপদ যে মাথায় এসে ঠেকেছে, বুঝতে পারছিস না তুই। সাবধান না হলে মড়ক লাগবে। এইবার সবাই বলছে দ্বিতীয় দফা। এর ছোবল গোখরোর চাইতেও প্রবল। তখন তুই আর আমি, কাউকেই ছাড়বে না।
চৈতন্য এবার একটা সাহসী কোণ নিল। জানতে চাইল, মলিন প্রশ্নে,- দানবটা কী কত্তা? বন্যায় ভেসে গেলাম, মাঠে চাষ করে ফসলের দাম পেলাম না, তিনবার গোখরো কামড়াল, বৃষ্টি হল না সব ফলন পুড়ে গেল, গাছের ডালে শূন্য উদর ঝুলিয়ে হাট থেকে ফিরে এসে নাকাল। এর থেকে বড় দানব কি আছে কত্তা?
শশধর গম্ভীর হয়ে বলল, করোনা… করোনা ভাইরাস। মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে, ফুসফুসে বাসা বাঁধছে। হৃদযন্ত্রের হাওয়া বাতাস থামিয়ে দিচ্ছে। মানুষ মরে যাচ্ছে। কলেরা শুনেছিস, আন্ত্রিক তো জানিস, ম্যালেরিয়া তাও জানিস। ডেঙ্গুও জানিস। এ বিদেশি আমদানি। দেশি হলে ভয় ছিল না, নকলে নকলও যে মা শীতলার আশীর্বাদে হয় চৈতন্য।
চৈতন্য অবাক হয়ে কত্তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুই সে বুঝতে পারল না। হ্যাঁ, সে বুঝতে পারছে গ্রামবাসীরা নানান কানে কানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। বলছে দ্বিতীয় দফার মার দুনিয়ার বার। যারা বলছে তারা ভীতু। কিন্তু সবাই আর মুখে কাপড় দিচ্ছে না, গামছা দিচ্ছে না। নাক মুখ খুলে রাখছে। বলছে, আসুক এবার, সঙ্গে না কি লেবুজল আছে। চিকিৎসা না কি সব জানা হয়ে গেছে।
টানা তিন বিঘার দক্ষিণ পশ্চিমের এক কোণে বাতাসার টুকরো মতো তার চৈতন্যর কুটির। গণেশ মণ্ডলের চায়ের দোকান থেকে দেখা যায়। শশধর কত্তার চায়ের গ্লাসের দিকে তাকিয়ে তার গলা শুকিয়ে আসছে। কয়েকবার ঢোক গিলে হাঁটা দিল। যাওয়ার পথে একবার পিছন দিকে চাছাইল।
প্রধান শিক্ষক শিবপ্রসাদ রায় শশধরকে বলল, – ওর স্পর্শ থেকে কিছুই হবে না। যা হবে তোমার স্পর্শ থেকে। কারণ তুমি কত্তা, গণেশের চায়ের দোকানে এখন এই বিশ্বব্যাপী ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মহা সংকটে তোমার চা খাওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু চৈতন্যর নাই। আমি ওকে কিছু বলতে চাইছিলাম, কিন্তু বলতে পারলাম না। এই মহামারীর সময়ে বাইরে কারও কিছু স্পর্শ বা বাইরে কিছু খাওয়া নিষেধ আছে। আর তুমি এইখনে বসে যা করছ, বিপদ ডেকে আনছ। বেঞ্চির চারদিকে গুটকা তামাকের থুতু ফেলে রেখেছ। বিপদ আমাদের গ্রামে ছিল না। ভাইরাস বাইরে থেকে এসেছে। মাটি কাদার মানুষ কি আর বহন করবে ? গণেশ চায়ের দোকান খুলতে চায় নি, কিন্তু তুমিই ওকে রাজি করিয়েছ। আমি সব দেখছিলাম। একবার এসে তোমাকে সাবধান না করলেই নয়। তাই বাড়িতে আর বসে থাকতে পারলাম না। এইখানে গুলতানি খাটো করো।

বিবৃত ঘটনাটি কাল্পনিক, মুখরোচক এই সংবাদ প্রতিবেদনের মতো করোনার বাজারে খাস তোল্লাই পেলেও ক্ষমতাবান বা লক্কার দল বা অতিরিক্ত কুছ পরোয়া নেই এমন সব মানুষগুলি শহরে বা গ্রামে ভাইরাসের বারুদ নিয়ে বসে আছে। স্পর্শ এবং সাবধানতার নির্দেশ সরকারি ওপরের স্তর থেকে কোনো বৈষম্য মানছে না। মানেও না। মানবেও না। নির্দেশ সার্বিক স্তরেই। বিপর্যয় যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তখন ভয় বা সাবধানতার নির্দেশ বিশেষ কোনো শ্রেণির জন্য নয়। আপাদমস্তক সব শ্রেণির জন্যই। আমাদের জাতীয় জীবনে ও সামাজিক জীবনে সরকারি নির্দেশের বিভাজন আমরাই করে থাকি। প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করি। আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বারা এমন মত পোষণ করি এবং তা প্রকাশ্যে নিজেরাই অনুমোদন দিই,- এই নির্দেশ আমাদের জন্য নয়, চৈতন্য মণ্ডলদের জন্য।
করোনা ভাইরাসের সতর্কতা, শহর এবং গ্রামীণ স্তরে আনলক লাগু হয়ে যাওয়ার পরে গোটা ভারতবর্ষ এখনও সব স্বাভাবিক নয়। আমরা কেউ একবারও ভেবে দেখছি না, আমাদের জীবনের সাথে কী ভীষণ ভাবে জড়িয়ে গেল, কতকগুলি শব্দ- লকডাউন, পিপলস কারফিউ, আইশোলেশন, কোয়ারেন্টাইন, স্যানিটেশন, মাস্ক এবং বারে বারে হাত ধুয়ে ফেলার উত্তম অভ্যাস…যত দিন যাবে আরও আরও শব্দ ও অভ্যাস জড়িয়ে যাবে। করোনা ভাইরাসের দাপট একদিন না একদিন থেমে যাবেই, জীবন্ত পৃথিবীর ইতিহাস তাই বলে। আগামীদিনের গল্পগাছায় এই সব শব্দগুলি চমৎকার প্রয়োগ হবে। এবারের শারদ সংখ্যায় অবশ্যই আশা করতে পারি সাহিত্যে করোনা ভাইরাসের বিপুল বিপণন ও প্রয়োগ হবে। কিন্তু আলবেয়র কামু–র প্লেগের মতো একটি উপন্যাস সৃষ্টির জন্য বিশ্বকে দীর্ঘ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। পৃথিবীর এই মহা দুর্যোগে একজন সাধারণ পাঠক অপেক্ষা করতেই পারেন মহৎ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য।
তবে সাধারণ মানুষের ভাইরাসটিকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে শ্রেণি বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেইটি ভুল না সঠিক সেই প্রশ্নে যাচ্ছি না। গোটা বিশ্বই আজ করোনা ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। শুধু প্রেক্ষাপটে উঁকি দিয়ে যাচ্ছে কিছু প্রশ্ন। অনুভূতি সম্পন্ন এই কলকাতা শহরে প্রথম কোভিড–১৯ এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় ১৭ মার্চ, মঙ্গলবার। কর্মব্যস্ত শহর। শহরের নিজেদের দৈনিক কাছারির কাজে ব্যস্ত আমরা সবাই। বিলেত ফেরত চকচকে উচ্চবিত্তের এক তরুণ সন্তান ভাইরাসের প্রথম আমদানি কারক। আবার সেই ঔপনিবেশিক চেতনা বিষক্রিয়া করছে। আজ যা সত্য অতীতেও তা সত্য ছিল। সত্যের কোনো মুখোশ নেই। যে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রাষ্ট্রিক ও সামাজিক বিপর্যয় প্রথমে হতভম্ব করে দেয় সমগ্র জাতিকে। তারপরে সর্বনাশ আস্তে আস্তে তার ডানা মেলে দিল– নয়ডা, আনন্দ বিহার, ফরিদাবাদ বাস স্ট্যান্ডের দিকে হেঁটে গেছিল লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক তার পরিবার নিয়ে নিজের গ্রাম ও ঘরের দিকে। কেউ হেঁটে গেছিল তার পরিবার নিয়ে সাতশো পঞ্চাশ কিলোমিটার, কেউ চারশো পঞ্চাশ কিলোমিটার আবার কেউ আটশো কিলোমিটার। সাথে এক বোতল পানীয় জল ও খাদ্যটুকুও নেই। আজ এদের ওপরেই সব চেপে বসল। হায় বিমূর্ত চিন্তার সভ্যতা। আর উন্মাদীয় রাষ্ট্রীয় ঔদ্ধত্য।
আসলে চৈতন্য মণ্ডল এবং শশধর মাতব্বররা যে আজও আমাদের মননে বিভাজন করে দেয়। কিন্তু ভাবনার ক্ষেত্রে এই রকম বৈষম্য কখনই আসা উচিৎ নয়। আজ যে স্বদেশের ও পৃথবীর বড় দুঃসময়।
সব ভাইরাসের বিনাশের সীমা আছে। যতদিন যত বছরই সক্রিয় থাকুক না কেন, কিন্ত পৃথিবীর ইতিহাসে করোনা ভাইরাস আমাদের ভাবনা ও চিন্তনের কাঠামোকে হয় তো বদলে দিল। আমরা আগামী দিনে কি খুব আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ব না উদার, বা সেই চিরায়ত গান মানুষ মানুষের জন্য… সবটুকুই নির্ভর করছে রাষ্ট্র শাসন ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপরে।