নীলাব্জ চক্রবর্তী-র গদ্য

Spread This
Nilabja Chakrabarty

নীলাব্জ চক্রবর্তী

শো ইওর ট্রু কালার অথবা আমি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক

এক তীব্রতার ভেতর দিয়ে হসন্ত শুরু হয়। এরপর ওয়াগন টিপলার কমপ্লেক্সে কয়লাভর্তি ওয়াগনগুলো একটা একটা করে এসে দাঁড়াবে। রেলটেবিল। ভারী বিমের ভেতর লোহাদের পারস্পরিক অবস্থান আর নিউট্রাল অ্যাক্সিসের ওঠানামা। নতুন চশমায় সমস্ত বর্ষাকাল জুড়ে লেখা রুবি কখন আসবে। ইনহল হুইল চোক। ওয়ে ব্রিজ থেকে আস্তে আস্তে লোড ট্রান্সফার হবে পিভটে। মোমেন্ট আসবে। পিভটে ভর রেখে ক্রমে উল্টে যাবে কয়লাভর্তি পুরো ওয়াগন আর হপারসভ্যতার ভেতর হুড়হুড় করে চলে যাবে কালচে জীবাশ্ম, ভাঙাচোরা ভাষার টুকরো, দুর্গোৎসবের বাল্যস্মৃতি, প্রিয় অভ্যাসগুলোর ডাকনাম…

# – * – #

প্যারাসিটামল শব্দে
দূরে কবুতর কবুতর ধ্বনি
মদ খেও না
সাদা মাঠ
মাপজোখের সবটা আমি ফেলে
ইসিজি টেবিলের ওপর শুয়ে
তোমাদের গ্রামার একটা বই
লোহার সিঁড়ির মতো স্মৃতিহীন
মেয়েদের কথা
সাবানফ্যানার কাছে কাছে…

# – * – #

একটু একটু করছে। বড়ো হচ্ছে ঘটিবাড়ির পিছল রোদ। সুনি সুনি হচ্ছে। রক্তমাংস নিয়ে ছায়ারা কুশলী হয়ে আছে। সংখ্যায় হাত রাখতে কাঁচের গায়ে ফুলে উঠলো আর্কিওলজিকাল বক্স। অর্থাৎ ভাষা এক ওয়ান-ওয়ে সাম্যাবস্থা। এখানে একটা দরজার অনুষঙ্গ। ফ্রেমের বাইরেও ফ্রেম। আবার অ্যাতোদিন বাদে ফ্যানার অনুবাদের কথা। পাথরের কথা। যা আর লিখবো না তার কথা। অথচ মিডশটের সবটার গায়ে সেই রূপোলী গুঁড়ো। পালকের একেকটা ভঙ্গি কোথাও ধ্বনি হয়ে। ওখানে তোমাদের ছবিতে তোমরা ছিলে না…

# – * – #

এই তো চামড়া পরে আছি
আর ভাবছি পাহাড়ি রাগে হিন্দি গানগুলোর কথা

কাঠামোয় কাঠ নেই তো
শুধু
চাঁদমারি শব্দটার লোভ
কয়েকটা অক্ষর ঘুরে বেড়াচ্ছে
আয়না বদলে বদলে
ভালোবেসে ফেলছি ফটোজেনিক শব্দটার লঘুতা…

# – * – #

অনুগ্রহ করে সবাই শুনুন। একটি বিশেষ ঘোষণা। আমাদের শপিং মলের তরফ থেকে আপনাদের জন্য একটি দারুণ আকর্ষণীয় সুযোগ। আজ বুধবার। আর তাই কর্তৃপক্ষ নিয়ে এসেছেন ধামাকাদার এই বিশেষ মিড উইক বো-না-ন্-জা-আ-আ। আপনাদের প্রত্যেকের সামনে সমান সুযোগ নিজের নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করার আর কিছু জিতে নেওয়ার। আপনাদের টিফিনবাক্সের রঙ আর অন্তর্বাসের রঙ পরীক্ষা করে দেখা হবে। যদি মিলে যায়, তাহলে আপনারা আজ সারাদিনের কেনাকাটার ওপর পাবেন… দশ নয় বিশ নয়… একেবারে সাতচল্লিশ শতাংশের অভাবনীয় ছাড়। হ্যাঁ, সাতচল্লিশ শতাংশ ছাড়। আসন্ন স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তির বছরটিকে স্মরণীয় করে রাখতে আমাদের এই অভিনব উদ্যোগ… তাই আসুন আসুন আসুন… সেকেন্ড ফ্লোরে লিফটের বাঁদিকের কাউন্টারে মহিলাদের আর ডানদিকের কাউন্টারে পুরুষদের রঙ কম্বিনেশন পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে… একে একে লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ুন আর আমাদের পরীক্ষা করে দেখতে দিন আপনার টিফিনবাক্স আর অন্তর্বাসের রঙ… যাঁদের রঙ মিলবে না, তাঁদের জন্য রয়েছে লাকি কুপনের ব্যবস্থা আর বিশেষ সান্ত্বনা পুরস্কার… সবার জন্য কিছু না কিছু… চলে আসুন আর অংশ নিন এই মিড উইক ধামাকায়… আমরা আমাদের এই বিশেষ অনুষ্ঠানের নাম দিয়েছি রঙবাজি… তাই চলে আসুন রঙবাজি করতে আর দেখান আপনার নিজের রঙ… বলুন, ভারতমাতা কি জয়… বলুন, জয় স্বাধীনতা… জয় সাতচল্লিশ…

# – * – #

বাক্সের পর বাক্স
ছায়া ভাঙতে ভাঙতে তোমাকেই
জুড়ে নিচ্ছি
শীতকাল নামের এক গভীর পলিলাইন
শুটিং রেঞ্জের বাইরে
চাবি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফ্ল্যাটবাড়িতে
বড়ো হচ্ছে সকাল…

# – * – #

• আপনার নাম ?
• অভ্র। অভ্র মুখোপাধ্যায়।
• আপনি অনেকক্ষণ ধরে এখানে এই মাঠের মধ্যে একা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে… এখানে কি করছেন আপনি?

কালো ডাঁটির রিমলেস চশমা পরা কালো জামা পরা একটা লম্বা ফর্সা লোক পেয়ারাগাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছে। ক্যামেরা লো অ্যাঙ্গেল থেকে লোকটাকে ধরে। মিড শট। দেখা যায় মাঝে মাঝে গাছ থেকে কয়েকটা পাতা ছিঁড়ে দু’হাতে ঘষছে আর গন্ধ নিচ্ছে। স্ক্রিনের ডান দিকের নীচের দিক থেকে তার গন্ধ শুরু হয়। গোটা স্ক্রিন জুড়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ঘষে ফ্যালা কাঁচা পেয়ারাপাতার গন্ধ…

• আমার দু’হাতে অনেক পুরস্কার লেগে আছে… ওহ… জানেন, প্রায় বইপিছু একটা করে ছোট বা বড়ো পুরস্কার… পেয়ারাপাতা ঘষে ঘষে দেখছি সব পুরস্কারের দাগ সব পুরস্কারের গন্ধ তুলে ফেলতে পারি কিনা… এটা ওটা দিয়ে অনেক চেষ্টা করে দেখেছি… কিছুতেই যাচ্ছে না এগুলো…
• বই? মানে? আপনি বই লেখেন? কিসের বই?
• কবিতা…
• আপনি কবি?

উত্তরে ম্লান হাসে লোকটা। যার নাম, আমরা জেনেছি, অভ্র মুখোপাধ্যায়।

• অনেক বছর আগে আমাদের বাড়িতে একটা লিকুইড হ্যান্ডওয়াশ ছিল জানেন… পুরো পেয়ারাপাতার মতো গন্ধ… তাই ভাবলাম কিছুতেই কিছু যখন হচ্ছে না… একবার সত্যিকারের কাঁচা পেয়ারাপাতা ঘষে ঘষে যদি কিছু হয়…

ক্যামেরা শুধু পেয়ারাগাছটাকে দেখায়…

কাট

লং শট। কলেজ চত্বর। জটলা। স্লোগান শোনা যায় আবছা। মিড শট। সিমেন্টেড ফ্লোরে পায়রার ঝাঁক। হঠাৎ উড়তে শুরু করল…

কাট

… নীরব মিছিল। হাতে হাতে প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। শহর লম্বা হচ্ছে। স্মিতটি ক্রমে বর্ণমালা হবে। তারপর হরফযাপন…

# – * – #

একটা বাড়ির নাম জলবায়ু হয়। তাহলে শীত এক পুরুষপ্রধান অক্ষরেখা। রিয়েলিটি শো। তারপর আপেলক্ষেতের ধারে ফিরে যায় দু’মিনিটের নীরবতা পালন। এভাবেই বিকেল একটি পতনশীল অভিজ্ঞতা। সেই পাঠ। অথচ শনি-রবি এই দুই মাস শরৎকাল। পার্চমেন্ট ছিঁড়ে ফ্যালার গন্ধ। ভারী বুটের শব্দ খুঁজে বেড়াচ্ছে একটা একটা গোপন ধাতুরূপ আর তাদের হাফহাতা রঙ। ফার্স্ট প্রিন্সিপাল থেকে শুরু হওয়া একটা প্রিয় বাক্যের গায়ে আলো পড়লেই যেভাবে ঘুরে যায় ন্যারেটিভের আয়না। বৃষ্টির ভেতর কাঁচের ভেতর গুঁড়ো গুঁড়ো আমি এই প্যাসিভ সমকাল। সেই আয়না পর্যন্ত রাস্তা খেয়ে ফেলছি। দেখছি সে আর তার অনুভূতি বানানো হচ্ছে। জানলায় নাভির ছাপ। বোতামের পর বোতাম পেরিয়ে যাচ্ছে আর ভুলে যাচ্ছে কালার কোড। একটু একটু করে ধারালো হচ্ছে আমি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক…