অর্ক চট্টোপাধ্যায়-এর গদ্য

Spread This

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

বুলন্দ দরোয়াজাঃ হঠাৎ ডায়োজিনিস

দরজা খুললে বৃষ্টি। দরজা খুললে বাইরে বেরনো যাবে। দরজা খুললে বৃষ্টি বাইরে বেরোবে। চৌকো থেকে গোলক। চৌকো চৌকো গোলক। পিঠ টান করে মেঘ। আর ঐ আড়বুঝো দরজা। আধ-ভেজা। ভেজানো। আলগা হাঁ মুখ। খুলে দিলে বৃষ্টি। কত বৃষ্টি হলে বাইরে বেরোবে বৃষ্টি? আর কত বৃষ্টি হলে বুজে যাবে দরজা? শত্রুদের জব্দ করার জন্য অনেকানেক ভুয়ো দরজা বানানো! হাজারেরও বেশি। দরজা খুললে শত্রু। দরজা খুললে শত্রু বাইরে বেরোবে।
আজ এক-বোশেখ ঝড়ের ভেতর দরজা। এমন ঝড়ে চোখের জল খটখটে হয়ে যায় নিমেষে। কান্না শেষের আগেই কান্না উড়িয়ে নিয়ে যায়। “আমাকে সঙ্গে নাও ফেরারি বাতাস।” চোখের জলে লেজ গজায়। আলোর লেজ। চিকচিক বাড়ে, কিন্তু আলো বাড়ে কি? গোলক থেকে চৌকো। গোলক গোলক চৌকো। আলোগুলো নিঃশব্দে ফাটে। ফাট আর ছোঁয়াচ মিলিয়ে দেয় কান্না। চোখ খুললেই বৃষ্টি। চোখ খুললে বৃষ্টি বাইরে বেরবে। অস্পষ্ট সব ফাটল। জলে ফাট ধরছে।
চাঁদ দেখবার দরজা। সদাগরবিহীন। পিঠের ওপর চাপ চাপ মেঘ। সময়ের ভিত বরাবর সদাগরহীন চাঁদ দেখবার দরজা। দুই পাল্লার ফাঁকে ফ্যাটফ্যাটে চাঁদ। দরজা খুললেই চাঁদ। দরজা খুললেই চাঁদ বাইরে বেরোবে। মেয়েটার আঁকায় হিসির কাটাকুটি চাঁদে গিয়ে মিশতো। এভাবেই সে বাবার ছবি আঁকতো অনেক বছর আগে। ঘুমোতে হলে কারুর না কারুর শব্দ শুনতে হয়। ঘুমের ভেতর তখন রক্তপাতের ভয় ছিল। রক্ত বইছে শরীর জুড়ে। চোখ বন্ধ করলেই শব্দ শোনা যায়। চোখ খুললে মিলিয়ে যায়, ফুরিয়ে যায়।
দরজার ঠিক সামনে আকন্দ ফুলের গাছ। সেখানে কে বা কারা কাটাকুটি খেলে গেছে। দরজায় দাগ। শ্মশানের দেওয়ালে হলকার দাগের মত। ইটগুলো দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করছে। কাকিমা তখন চুল্লিতে। তারপর শেষ ট্রেন ধরে বাড়ি। বেনারসের রেস্তরাঁয় শরীরের তেল-কালি লেগে দেওয়ালে চাপচাপ দাগ হয়ে গেছে। মাঝরাতের ক্যাফেতে কেউ না কেউ থেকেই যায়। দরজা খুললেও বেরোয় না। বেরবে না। দরজা খুললে ভেতর বাইরে চলে যাবে!
দরজা খুললে মর্গ। কুমারী সুন্দরীর সেরিবেলাম। মোবাইল ক্যামেরার ছবি। কাজ শেষে দরজা খুলে বাহির। দরজা খুললেও শার্ট খোলে না। ঐ শার্ট পড়েই গোলাপ ফুল কিনতে বেরিয়ে পড়ে। দরজা খুললে গোলাপ। চাঁদ চড়চড় করে বাড়ছে।

চাঁদের টোকায় মগজের মতো গলে যায় দরজা। চাঁদ তখন ভেসে বেড়াচ্ছে তার ওপর। এবার মাটির ভেতর খুলবে দরজা, আনুভূমিক অক্ষে। পাহারায় চাঁদ। দরজা খুললে বৃষ্টি। বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকবে। মাটি ভিজে গেছে। দরজা খুলে দিলে মাটি বাইরে বেরবে। পিঠের শরীরে মেঘ ছয়লাপ। গোলক গোলক শরীর। চৌকো চৌকো শরীর।
ঐ দরজা দিয়ে নববর্ষের রাতে ছটা ছায়া পাতাল প্রবেশ করল পরপর। ওদের এক বন্ধু ফেসবুক থেকে বলে উঠল : “সবাই একদিন ছায়া হয়ে যাবে।” সে তো আমিও বলতে পারতুম, “সবাই একদিন দরজা হয়ে যাবে” কিম্বা “সবাই একদিন পাতাল হয়ে যাবে” কিন্তু না, এসব আমি বলব না। যা বলছিলাম, ঐ দরজা দিয়ে নববর্ষের রাতে ছটা ছায়া পাতাল প্রবেশ করল। ডায়োজিনিস তখন সবে তাঁর লন্ঠন হাতে বেরিয়েছেন, কোনও এক সৎ লোকের খোঁজে। একটিমাত্র সৎ লোক পেয়ে গেলেই কেল্লা ফতে। সৎ লোক পাওয়া দুস্কর। সচরাচর মেলে না, তাই লন্ঠনের আলো জ্বালিয়ে খুঁজতে হয়। আগে দুপুর রোদে মাঠেঘাটে বাজারে ঘুরতেন লন্ঠন হাতে। এখন সে দিন আর নেই! আজকাল রাতেই বেরোন। লন্ঠনের আলোয় দেখা যায় ছটা ছায়া ঢুকে গেল মাটিতে শোয়ানো ঐ দরজা দিয়ে। আলো একটু কেঁপে উঠল, যেন ইউএফওর সিগন্যাল ক্যাচ করছে। লন্ঠনখান দরজা বরাবর তাক করতেই আবার সুড়সুড় করে বেরিয়ে এল ছ’জন।
ছ’টা ছায়া গোল হয়ে ঘিরে ধরল ডায়োজিনিসকে। এক এক করে বলতে লাগলো :

কী ফারাক?
জীবন আর মৃত্যুর?
কী ফারাক?

ডায়োজিনিস তার লন্ঠন নিভিয়ে মাটিতে রাখলেন। তারপর পিঠ টান করে দাঁড়ালেন। বললেনঃ “কোনো ফারাক নেই তো!” ছায়ারা বললো :

কোনো ফারাক না থাকলে
না থাকলে
আছেন কেন তবে?
নেই হলেই তো হয়?

ডায়োজিনিস অন্ধকারে দাড়িতে হাত বুলিয়ে নিতে নিতে বললেন :

তাই জন্যেই তো আছি,
ফারাক নেই বলেই তো
রয়ে গেছি এখনো…

উত্তর শুনে ছায়ারা চুপ। একে একে দরজা বেয়ে চাঁদের দিকে উঠে গেল। একটা জল-মই নেমে এসেছে আকাশ থেকে। চাঁদ টু দরজা। দরজা টু চাঁদ। হিসির সিঁড়ি। সাপলুডোয় সততার শর্টকাট! ডায়োজিনিস দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। লন্ঠনটা জ্বাললেন আলতো করে। বেশ খানিক ঠাহর করার চেষ্টা করে ভুরু কুঁচকে উটকো গজিয়ে ওঠা দরজাটাকে মাপতে লাগলেন। তারপর আলখাল্লা নিচের দিক থেকে ফাঁক করে হিসি করে দিলেন আকন্দ গাছটার ওপর। হিসির জল কাটাকুটি খেলতে খেলতে দরজার ভেতর সেঁধিয়ে গেল। ডায়োজিনিসের মনে পড়ল সিবেলির মন্দিরের বাইরে তার সাধের স্নান করার টাবখানার কথা। কী সব দিন ছিল! পেঁয়াজে ভর্তি থাকতো সে টাব। ধরা ধরা চোখে ডায়োজিনিস আকাশের দিকে তাকালেন। চাঁদটা চড়চড় করে বেড়েই চলেছে। হিসির মই বাতাসে মিলিয়ে গেছে। ছায়ারা চন্দ্রাহত। সততাপ্রাপ্ত! এক নয়, ছয়-ছয়টা ছায়া সততায় অন্তর্হিত হয়েছে। বাড়তে বাড়তে একলা একটা আলো কখন তাঁর আলখাল্লার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে এসেছে! সেদিকটা একবার নজর করে নিয়ে ডায়োজিনিস তাঁর লন্ঠনটা ফেলে দিলেন দরজার ভেতর। কয়েক মুহূর্ত। আলো মিইয়ে এল। অন্ধকার খোপ কেটে কেটে বড়ো হল। চৌকো থেকে গোলক। চৌকো চৌকো গোলক।
ডায়োজিনিস দরজার দিকে ঠায় তাকিয়ে। আকন্দ গাছটা চড়চড় করে বাড়ছে। এবার নেই হবার পালা। অবশেষে। অবশেষ কেবল দরজা। চন্দ্রালোকে বুলন্দ শুয়ে রয়েছে মাটির কবরখানায়।