অংশুমান-এর গদ্য

Spread This
Anshuman dey

অংশুমান

বীজ ও পাথর ২ 

খুব কাছে যাওয়ায়, স্বপ্ন ভেঙ্গেচুরে চোখে গেঁথে গেল। হাত বাড়িয়ে, বাড়িয়ে এখন বাচালের কন্ঠনালী খুঁজি। অন্ধের আঙুলে ভেজা ভেজা দেওয়াল। ভাঙল তো ক্রিস্টালাইন। দু-লাইনের মধ্যে আমাদের সাঁতার। কী বলতে চাইছেন আপনি? আপনার স্তব্ধতার মুহূর্তে আমার কেন এতো উৎকণ্ঠা! প্রতিটা নিরুচ্চার খাঁজে কীসের হাতছানি! অজানার মধ্যে আমার উত্তর আছে জানি, কীসের? নিজেকে ক্ষুধার্ত সিংহ বললে প্রকারান্তরে পেশিপ্রদর্শনও হয়। এমন বন্দির খেলা যে আমি খেলিনি –
বহুবার ক্ষীণ অন্ধকারের মতো নিভে নিভে এসে বুকের কুয়াশা গলার সরোবরে বর্ষাকাল এক আবদ্ধ ধারা কান্নাধারা থেকে কয়েক শতাব্দী শূন্যতা গিলে গিলে ছুটন্ত আলোর শিষ ছুঁয়ে অতীতের দিকে ফিরে দেখেছি যৌনঘোড়া দাঁড়িয়ে আছে – পড়ে আছে ছিনিমিনি মুদ্রা – হাওয়ার অভাবে থমকে আছে বায়ু

যেহেতু আমি স্বপ্নান্ধ, স্বপ্ন স্ফটিক
গেঁথে আছে চোখের লাভা লাল
আমি বাকপ্রবণ
যেসব কথা বলা হয়নি
আপনার বাসনা বুঝিনি বলে
জিভের ডগায় ডিগবাজি খাওয়াচ্ছি
আর আপনি আমার খদ্দের, দর্শক
বেসাতির পার্টনার লোফারের উঠোনে
ধূসর সমুদ্রের পারে আমাদের দেখা হল সেদিন। আপনি আবার ম্যাজিক দেখতে চাইলেন। প্রতিটা ম্যাজিক মুহূর্তেই ঘাই মারে মৃত্যু। প্রতিটা অবাকস্মৃতি উস্কে তোলে আপনাকে।  রাত্রির উৎসুক শেয়ালের চোখ আমি দেখেছি। এই মৃত্যু সে মৃত্যু নয় আপনি জানেন বারবার মরা যায় না। অতএব একবারই মরবো বলে জালিয়াতি করি, বলি, আমার কোনো অভিমান নেই। শুধু অভিমান শব্দটার প্রতি ছেঁড়া ছেঁড়া অনুরাগ থেকে যায়। আজীবন হাত চালাচালি। জানি জীবনের আগে আ বসানোর ধ্বক আমার নেই। এ আমার গা-জোয়ারি। জিহ্বা নড়লে হাওয়ার শব্দও হয়। আমি শুনতে পাই গুনতে পারি বিভিন্ন তাপমাত্রার বিভাগ শরীর এমনকি আত্মার কম্পনে যে ওম বদলে যায়। অথচ আপনি একটা হাত সাফাই দেখবেন বলে এতদূর সমুদ্রের পারে-

আপনার হাত ধরে – আমার হাত প্রকৃতই খালি এবং কারসাজিহীন কি না এমন পরীক্ষা করতে বলব। আপনার চোখে আশ্চর্য হওয়ার হাঙ্গার দেখতে পাই। আপনি বিশ্বাস করে বলবেন আমি সত্যি এতক্ষণ কোনো বুজরুকি করিনি। হাত আসলেই শূন্য। ঐ হাঙ্গার কি আমি দেখতে চাই নি?  এই যে আদানপ্রদান – প্রাচীন আর নতুনের পার্থক্য ধ্বংস করে দাঁড়িয়ে আছে, এই অমোঘ ভরমে এই ফাঁকা কাগজ বাড়িয়ে, “ওস্তাদ, একখান নতুন খেলা দেখাও দেখি!” কোনো খেলা না দেখানো কি কোনও প্রকার খেলা কি না – সেই বৃত্তাকার প্রশ্নে ফিরে আমি শূন্যতাকে বারবার খণ্ডন ও গ্রহণ করে চলেছি। আমি হাসব এবং এই মুহূর্তে আপনি জানেন আপনার দিকে তাকিয়ে আমি কোর্টশিপের মহিমায় দৃষ্টিভ্রম তৈরি করতে থাকব আর আপনি অপেক্ষায় অন্ধ হয়ে খুঁজবেন সেই ছোট বলের মত এক পৃথিবী বেরিয়ে আসবে শূন্য হাতের তালু থেকে। ফেনোমেনাল!
হে মেহেরবান, আপনাকে বাজি রেখে আমি জিতে চলেছি একেকটা দিন। কেউ প্রসন্ন নয় তবু। আমি জানি শূন্য হাতের তালু থেকে বেরিয়ে আসা পৃথিবী আপনি দু-একবার ঘুরিয়ে কিছুটা হাওয়া সামলে অমোঘের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। অতঃপর আমি নতজানু, নতুন এক দৃশ্যপটের জন্য। কয়েকটা ফিরে পাওয়া হাসি আর অসহায় হাওয়ার আমার চুলের উদ্ভব – আমাদের অস্তিত্বের পক্ষে ক্ষতিকর জেনে আমি কথা দেবো। আমি কথা দেবো কোন সাঁকোর কম্পনে আপনার তাল মেলাতে। আমি মেলাতে পারি,  মেশাতে পারি – আবার যেকোনো পরিকৃতি আবার জন্মমুহূর্তে এনে ফেলতে পারি। আর আপনি বিচক্ষণ, ধরে ফেলতে পারেন। ধরে ফেলতে পারেন, দীর্ঘকাল ধরে আমরা একি সীমারেখার ভিতরে বন্দি। অথচ চোখেই রেখা – রেখায় ভর্তি। সময়ের দুই প্রান্ত আমি বিচার করতে পারিনি, তাই, দুটো মুহূর্তের মাঝে কি ধরতে পারিনা। হয় এখন, নাহয় অন্যক্ষণ। প্রতিশ্রুতি তাই বাচালের গুণ মনে হয়। তাকে আমি জীবনের ভোর থেকে খুঁজছি নিজের মধ্যে। ঘাসগুল্মকে চিরদিন মাটির প্রতিভা ভেবে এসেছি। গাছকে জানতে পারিনি…
কাঁপা কাঁপা সাঁকোয় আমি চোখের সামনে মিলিয়ে যেতে দেখাবো আপনাকে। মিলিয়ে যাওয়ার দুই রূপ – অন্তর্লীন আর গায়েব।  আমি গায়েব হবো। যদিও  স্বপ্ন ছিল অন্য। স্বপ্ন ছিল, যেকোনো ভবিষ্যতবাণী ভেঙে দেওয়ার। খুব নিকটে যাওয়ায় সে অনভ্যস্ত আগ্নেয়গিরি। কেউ ঠিক নয়, এবং আমি যে ভুল। এই প্যারাডক্সিক্যাল  আরামের ভিতর লুকিয়ে বসে থাকি। কখনো কুয়াশা বীথিকায় হেঁটে ঘোর হেঁটে পৌঁছই সুইসাইড পয়েন্ট –  টিম্পানি বেজে ওঠে। হাজার দর্শকের ঝলসানো  মুখ, হাততালির স্রোতে আমি ভুলে যাই আজকের প্রথম ম্যাজিক…