ধারাবাহিক উপন্যাস:সৌপ্তিক চক্রবর্তী-রামমোহন(শেষ পর্ব)

Spread This
Souptik Chakraborty

সৌপ্তিক চক্রবর্তী

রামমোহন

সাত

রামমোহনের সাথে গগাই-বুল্টাই-সব্যদার দেখা-আড্ডা বলতে শুধু রবিবারই। সপ্তাহের অন্যান্য দিন তারা নিজের নিজের মত ব্যস্ত থাকে।
বুল্টাইয়ের মর্নিং স্কুল। পাশেই যতীন কলোনিতে। রোজ সকাল সাড়ে ছটা নাগাদ বুল্টাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে যায়। সাড়ে এগারোটা নাগাদ ফিরে আসে। তারপর স্নান-খাওয়া সেরে একচোট ভাতঘুম দিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ যায় পাড়ার ক্লাবে। সেখানে কিছুক্ষণ ক্যরম-টিটি পিটিয়ে বাজার​-হাট সেরে সন্ধে সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরে আসে। তারপর বৌ-ছেলের সাথে কোয়ালিটি টাইম কাটায়। বুল্টাইদের পৈতৃক দোতলা বাড়ি। ওর ঠাকুরদার তৈরি। বাবা-মা-বৌ-ছেলে-জ্যাঠা-জেঠিমা-অবিবাহিত কাকা নিয়ে একান্নবর্তী পরিবার। জ্যাঠতুতো দুই দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। পাড়ার অনেকে বলে বুল্টাইয়ের চাকরি নাকি তার বাবার সুপারিশে পাওয়া। বুল্টাইয়ের বাবা অগেকার লালপার্টির জামানায় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। এখন একদমই গুটিয়ে নিয়েছেন। তবে এটাও ঠিক যে বুল্টাইও রামমোহনের মতই গ্র্যাজুয়েট। ভূগোল অনার্স​। প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে আর কী বা লাগে!
গগাই আছে ইউবিআই ব্যাংকে। শ্যামবাজার ব্রাঞ্চে। রোজ সকাল সাড়ে নটা নাগাদ বেরিয়ে যায় আর সাড়ে পাঁচটা-ছটায় পাড়ায় ফেরে। মোড়ের মাথায় বিজ​য়ের পান​-বিড়ির দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ গুলতানি করে বাজার​-হাট সেরে সে-ও ফিরে যায় বাড়ি। তারপর বৌ-মেয়ে আর কোয়ালিটি টাইম​। গগাইদের বাড়িটা অনেকটা ফ্ল্যাটবাড়ির মতো​। সিঁড়িটা বাইরে কমন প্যাসেজে। একতলায় ওর বাবা-মা-ভাই থাকে আর দোতলাটা গগাই নিজের মতো করে নিয়েছে। গগাই বরাবরই বুদ্ধিমান ও বৈষ​য়িক। কমার্স গ্র্যাজুয়েট​।
সব্যদা খুবই ব্যস্ত​। পার্ট ওয়ান ড্রপ দিয়ে লেখাপড়া ছেড়েই নেমে পড়েছিল ব্যবসায়​। প্রথমে ফাস্টফুড তারপর ক্যাটারিং। টবিন রোডে অফিস। রুচি ক্যাটারার। স্কুটারে যাতায়াত করে। সকাল দশটা-সাড়ে দশটা থেকে রাত সাড়ে আটটা-নটা পর্যন্ত রোজ অফিসেই থাকে। আর কোথাও ক্যাটারিং থাকলে তো কথাই নেই! রাতদুপুরে বাড়ি ফেরে। একতলায় দুটো ঘর নিয়ে থাকে সব্যদা​। দোতলায় থাকে তার বাবা-মা আর রাতদিনের কাজের লোক অনিমাদি। রান্নাবান্না ও খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা একতলাতেই।
সুতরাং রামমোহনের রোজ সন্ধের ঠেক বলতে লেবুদার চায়ের দোকান। সোম থেকে শনি তো বটেই আবার কোনো রবিবার সব্যদার বাড়ি তাসের আসর না বসলে রামমোহন আড্ডা দিতে চলে যায় ওই লেবুদার দোকানেই।
যাইহোক, আজ দুপুর থেকেই মেঘলা। রামমোহনের শরীরটাও বেশ ম্যাজম্যাজ রছে। সন্ধে নাগাদ দোকান বন্ধ করে ভাবল আজ আর লেবুদার দোকানে যাবে না। বাড়িতে মদ নেই তাই শুধু মদটা তুলে নিয়েই বাড়ি ফিরে আসবে। আলু-বেগুন দিয়ে তেলাপিয়ার ঝোলটা কাল করে রেখেছিল ভাগ্যিস!
ছোট থলিটা নিয়ে রামমোহন বেরিয়ে পড়ল। মোড়ের দিকে যেতে যেতে দেখল রুনুদের বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই শুনছিল বাড়িটা প্রোমোটিং হবে। রুনুই ছিল এ পাড়ায় তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। দুজনে একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়েছে। রুনু-সোনু পিঠোপিঠি দুই ভাই। জ্যাঠতুতো-খুড়তুতো। রুনুর বাবা-কাকা মিলে মস্ত বিজনেস করতেন​। রামমোহনের মনে আছে প্রত্যেক বিশ্বকর্মা পুজোয় পাড়ার সব বন্ধুরা মিলে রুনুদের মস্ত ছাদে ঘুড়ি ওড়ানোর ধুম পড়ে যেত। রামমোহন ঘুড়ি ওড়াতে পারে না। সে শুধু লাটাই ধরে থাকত। বন্ধুরা কেউ অন্য কারো ঘুড়ি কেটে দিলে সবার সাথে গলা মিলিয়ে সে-ও বলে উঠত ‘ভোওও কাট্টাআআ।’ রুনুদের বাড়িতে ঘটা করে কালীপুজো হত। পরদিন বন্ধুদের সবার নেমন্তন্ন থাকত। সেই খিচুরি আর নিরামিষ পাঁঠার ঝোল, আঃ! রুনুর বাবা মারা গেলেও সোনুর বাবা বেঁচে আছেন। তবে ব্যবসা লাটে উঠে গেছে। রুনু-সোনু কেউই ব্যবসায় যায়নি। তারা বড় চাকরি করে। রুনু থাকে কানাডায় আর সোনু পুনেতে। পুজো বন্ধ বহু বছর। এবার বাড়িটাও গেল।
পার্টি অফিস ক্রশ করে মোড়ের দিকে এগোনোর সময় রামমোহন দেখল পার্টি অফিসের সামনে চেয়ার পেতে গুড্ডু বসে বসে সিগারেট টানছে। গুড্ডু ষণ্ডামার্কা জোয়ান। বয়সে তার থেকে কিছুটা ছোট। প্রোমোটিং করে। একটা লাল রঙের এনফিল্ড বুলেটে চড়ে কেত মেরে ঘুরে বেড়ায়। সোনার চেন পরে। শুনেছে রুনুদের বাড়ির প্রোমোটিং নাকি সেই করছে।
মোড়ের মাথায় রিক্সাস্ট্যান্ডের পাশে হনুমান মন্দিরের সামনে দেখল ঘটা করে হনুমান জয়ন্তী পালন করা হচ্ছে। লাইট-ফাইট দিয়ে সাজিয়ে ছোট প্যান্ডেল করে কতগুলো ফেটি বাঁধা ছেলে বসে গুলতানি করছে। কয়েকটা এপাড়ারই। বাকিগুলো বেপাড়ার। তারস্বরে মাইক বাজছে যার আওয়াজ সেই রুনুদের বাড়ির সামনে থেকে সে পাচ্ছিল।ছেলেগুলোকে দেখে মনে হল হাল্কা চড়িয়ে আছে সবকটা। পাড়ায় বরাবর দুর্গাপুজো-কালীপুজো আর জগদ্ধাত্রী পুজো হয়। হনুমান জয়ন্তীটা এবারেই প্রায় পুজোর চেহারা নিয়েছে।
মন্দির ক্রশ করে রাস্তা টপকে রামমোহন ওপারে চলে গেল।
মদ কিনে ফেরার সময় দেখল হনুমান মন্দিরের সামনে পার্টি অফিসের ছেলেদের সাথে ওই ফেট্টিবাঁধা ছেলেদের প্রবল বচসা চলছে। মাইক ফাইক সব বন্ধ। শুনতে পেল​ গুড্ডু একটা ছেলের কলার চেপে ধরে শাসাচ্ছে, ‘গাঁড় মেরে দেব বোকাচোদা। এটা গুজরাট পাসনি।’
রামমোহন আর দাঁড়াল না। যুযুধান দুপক্ষকে অল্প তফাতে রেখে পাশ কাটিয়ে সে পাড়ায় ঢুকে পড়ল। পাড়ায় ঢুকে একটা বিড়ি ধরিয়ে সোজা হাঁটা দিল বাড়িমুখো।

আট

বাপের দিকের প্রায় সব আত্মীয়দের সাথে একযোগে রামমোহনের শেষ দেখা তার নীলু জেঠুর মেয়ের বিয়েতে। নীলু জেঠু তার বাবার জ্যাঠতুতো দাদা। প্রতিষ্ঠিত উকিল। পৈতৃক বাড়ি বেলেঘাটায়। তাঁর ছেলে মানে রামমোহনের জ্যাঠতুতো দাদা তদ্দিনে স্পোর্টস কোটায় রেলের পাকা চাকরিতে। নীলু জেঠুর বাবা মানে রামমোহনের বড়্দাদু মারা গেলেও ব​ড়্ঠাম্মি তখনও বেঁচে। নীলু জেঠুর বোন বুলু পিসির শ্বশুরবাড়ি মোতিঝিলে। পিসেমশাই লেক থানার এস. আই আর পিসতুতো দাদা তখন পার্ট টু দেবে। তার ছোট্দাদু-ছোট্ঠাম্মিও এসেছিলেন। তাঁরা থাকেন বেলুড়ে​। দুই ছেলে নবকাকু-দিপুকাকু দুজনেই গেছেন বাপের ট্রান্সপোর্টের ব্যবসায়​। নবকাকুর মেয়ে সেবার এইটে উঠেছে আর ছেলে ক্লাশ টুয়ে। দিপুকাকু বিয়ে করেননি। সন্তোষপুর থেকে পিসিঠাম্মা-পিসেদাদু এসেছিলেন বটে তবে তাঁদের মেয়ে মালা পিসি আসেননি। ইঞ্জিনিয়ার পিসেমশাই এর সাথে তিনি বহুদিন সেট্ল সুদূর জার্মানিতে। তাঁদের যমজ দুই মেয়ে সেদেশেই জন্মেছে। পিসতুতো দাদাটা সেবার ইচ্ছে করে তার জামায় আইসক্রিম ফেলে দিয়েছিল​। সেই কবেকার কথা! রামমোহনের তখন ক্লাশ টুয়েল্ভ। যাইহোক​,গরমটা অনেকটাই কেটে গেছে। অসহ্য গরম প​ড়েছিল এবার​। বর্ষা আসবে আসবে করছে। রোজকার মতো দোকান বন্ধ করে রামমোহন চলল তার সান্ধ্য ঠেকের দিকে। লেবুদার চায়ের দোকানে। লেবুদার দোকানে শঙ্খ-বিতানরা প্রবল আলোচনায় মেতেছে। বিষয়টা হল ওরা সব দল বেঁধে বেড়াতে যাবে। তা মন্দারমনি না তাজপুর কোথায় যাওয়া হবে সেই নিয়েই চলছে আলোচনা। ক্রমে আলোচনা ঘুরল। আরো নানান বিষয় গল্প-আড্ডা হল। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রামমোহন ভাবল যে সে অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যায়নি। ছোটবেলায় বাবা-মার সাথে সে দীঘা-পুরী-দার্জিলিং আর সিমলা গেছে। কলেজে পড়ার সময় পাড়ার বন্ধুদের সাথে গেছে ঘাটশিলা আর কলেজের বন্ধুদের সাথে সুন্দরবন। তারপর সেই মা মারা যাওয়ার আগের বছর মাকে নিয়ে গিয়েছিল বেনারস। ওই শেষ। বুল্টাইয়ের​ বিয়েতে বরযাত্রী গিয়েছিল মালদা। তবে সে তো আর ঠিক বেড়াতে যাওয়া নয়। টুক করে কোথাও ঘুরে এলে কেমন হয়! ওরা চায়ের দোকানে তাজপুর-মন্দারমনি নিয়ে আলোচনা করছিল বলেই বোধহয় রামমোহনের মাথায় এল শঙ্করপুর। জোরে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে। হোটেল বুকিংটাই আসল। এসপ্ল্যানেড থেকে বাস তো আছেই পরপর।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। বাড়ি ফিরে রামমোহন নেট ঘেঁটে একটা মোটামুটি সস্তা হোটেল খুঁজে বের করল। হোটেল আশোকা। রিসেপশনের নাম্বারটা ডায়াল করল। পেয়েও গেল। তার মন বলছিল রুম অ্যাভেলেবেল হবেই। উইকডেজ। হলও ঠিক তাই। একটা সিঙ্গল রুম সে দুদিনের জন্য বুক করে নিল। শিস দিতে দিতে রামমোহন আলমারী খুলে একটা বহু পুরনো খয়েরী রঙের কিট ব্যাগ বার করল। তারপর তাতে পরপর দুটো বারমুডা দুটো টি-শার্ট, দুটো জাঙ্গিয়া আর একটা কাচা গামছা ভরে নিল। একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট আর সুপার মার্কেটের ফুট থেকে কেনা লাল-কালো ক্যাপটাও ভরল। ব্যাস গোছগাছ শেষ। ফ্রিজে একটু ডাল ছিল। রামমোহন আলু-পটলের তরকারিটা না করে শুধু আলু ভেজে নিল আর রাতের মতো ভাত করে নিল। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে মহানন্দে সোফায় বসে চুকচুক রাম খেতে থাকল। ভাতটা করতে করতেই দুটো মশলা পাঁপড় সেঁকে নিয়েছিল। আহ্! কদ্দিন বাদে সে বেড়াতে যাবে। পরদিন সকালে ফুল্লরাদি কাজ করতে করতেই রামমোহন চা-ডিম সেদ্ধ​ খেয়ে তৈরী হয়ে নিল। ফুল্লরাদিকে বলে দিল যে আগামী দুদিন আসার দরকার নেই। তারপর ফুল্লরাদি চলে গেলে একটা ফাঁকা বিসলারির বোতলে জল ভরে কিটব্যাগে নিয়ে সে-ও বেরিয়ে পড়ল। এসপ্ল্যানেডে নেমে রামমোহন একটা রামের পাঁইট, দু প্যাকেট উইলস ফ্লেক আর এক বান্ডিল বড় বিড়ি কিনল। তারপর গেল বাস ডিপোয়। খানিক খোঁজাখুঁজি করে একটা নন এসি বাসের জানলার ধারের একটা সিটে চড়ে বসল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস ছেড়ে দিল। চোদ্দমাইলে বাস যখন রামমোহনকে নামিয়ে দিল তখন বিকেল প্রায় পাঁচটা। মাঝখানে হল্টে নেমে মাছভাত খেয়ে সে বেশ একচোট ঘুম দিয়ে নিয়েছে। চোদ্দমাইলের চায়ের দোকান থেকে এক গ্লাস কড়া লিকার চা খেয়ে একটা ফ্লেক ধরাল। তারপর উল্টোফুট থেকে একটা ভ্যানরিকশা ধরল। শঙ্করপুরের কাছাকাছি এসে পড়তেই সমুদ্রের লোনা ভারী হাওয়ায় রামমোহনের শরীরটা যেন তরতাজা হয়ে উঠল। হোটেলে ঢুকে চেক ইন করে প্রথমেই ভালো করে স্নান করল। রুম চলনসই। পরিষ্কারও মোটামুটি। স্নান সেরে রামমোহন বিসলারির বোতলটায় হাফ পাঁইট রাম পাইল করে প্লাস্টিকের প্যাকেটটায় ভরে নিল। তারপর চলল সমুদ্রের ধারে। সি বীচ হোটেল থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা পথ। তখন সন্ধে নেমে গেছে। সমুদ্রের ধারে পৌঁছে সে একটা ছোট্ট ভাতের হোটেল দেখতে পেল। বাহ্! ভালোই হল। সে মনে মনে ভাবল। হোটেলে খাওয়ার বন্দোবস্ত থাকলেও সমুদ্রের ধারে বসে ঝুপড়ি হোটেলে খাওয়ার আনন্দই আলাদা। দোকানে একটা বুড়ো লোক রান্না চড়িয়েছে আর একটা এই সতেরো-আঠারো বছরের ছেলে সব্জি কাটছে। হোটেলের কাছাকাছি থেকেই বুড়োটা রামমোহনকে দেখে হেসে জিজ্ঞেস করল ‘বাবু পমফ্রেট ফ্রাই খাবেন নাকি?’ রামমোহনের চোখমুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। বেঞ্চে বসতে বসতেই বলে দিল ‘ হ্যাঁ, দাও একটা।’ এখান থেকে সমুদ্রটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সামনে। পূর্নিমার চাঁদ যেন গলে ছড়িয়ে আছে জলে আর চারিদিকে। রামমোহন বোতলটা তুলে হাত আর চোখের ইশারায় বুড়োকে জিজ্ঞেস করল মাল খাওয়া যাবে কিনা। ‘খান না, একটু ঢেকেঢুকে খান।’ বুড়ো হেসে জবাব দিল। পমফ্রেট ফ্রাই শেষ হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। রামও শেষ। সিগারেট ঠোঁটে রামমোহন তন্ময় হয়ে সমুদ্র দেখছিল। কতক্ষণ কেটে গেছে তার খেয়াল ছিল না। ‘বাবু, এইবার খাওয়া দাওয়া সেরে নিন। দোকান বন্ধ করে দেব।’ বুড়োর কথায় তার চটকা ভাঙল। সাড়ে আটটা বাজে। মোবাইলে রামমোহন দেখল। এখানে এমনিতেই দোকানপাট জলদি বন্ধ হয়ে যায়। তাও আবার উইকডেজ। টুরিস্ট থাকলেও না হয় কথা ছিল। সিগারেট শেষ করে রুটি- তড়কা খেয়ে রাত সয়া নটা নাগাদ রামমোহন হোটেলে ফিরে গেল।

পরদিন সকালে উঠে রামমোহন হোটেলেই লুচি-আলুর তরকারি দিয়ে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়ল। মাথায় ক্যাপটা পরে নিয়েছে আর বিসলারির বোতলে জল ভরে নিয়েছে হোটেল থেকেই। বীচ ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে প্রায় মন্দারমনি অব্দি চলে গেল। একদম ফাঁকা। লোকজন নেই বললেই চলে। রামমোহন দারুণ খুশি আর শরীরটাও যেন চাঙ্গা লাগছিল একদম। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে একটা ডাব খেল। মিষ্টি জল আর তুলতুলে শাঁস। তারপর ফেরার পথ ধরল। রোদ উঠতে শুরু করেছে। অনেক লাল কাঁকড়া দেখল সে। পায়ের শব্দে দুড়দাড় করে গর্তে ঢুকে যাচ্ছে। একটা মরা স্টার ফিশ দেখল আর দেখল গাছের বড় বড় মরা ডাল এদিক সেদিকে বালির মধ্যে আটকে আছে। শঙ্করপুর ফিরে ওই বুড়োর হোটেলে মুরগির ঝোল-ভাত খেয়ে হোটেলে ফিরে স্নান করে একটা দারুণ ঘুম দিল সে। সন্ধে নাগাদ যথারীতি আগের দিনের মতোই বুড়োর হোটেলে বেঞ্চে বসে কাটাল। আবারও রাম-সমুদ্র আর চাঁদের আলো। তবে আজ আর পমফ্রেট ফ্রাই ন​য়​ ডিমভুজিয়া দিয়ে মালটা শেষ করে রুটি-তড়কা খেয়ে হোটেলে ফিরল। পরদিন সকালে রামমোহনের ফেরার পালা। কিছুক্ষণ সমুদ্রের ধারে ঘোরাঘুরি করে এগারোটা নাগাদ হোটেলে ফিরে স্নান করে ব্যাগ গুছিয়ে চেক আউট করে দিল। বুড়োর হোটেল থেকে পমফ্রেট কারি আর ভাত খেয়ে একটা শেয়ারড ট্রেকারে চলে এল চোদ্দমাইল। মোড়ের চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করতে বলল একটু পরেই কলকাতার বাস আসবে। অল্প কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই বাস এসে পড়ল। টিকিট কেটে প্রায় ফাঁকা বাসের পেছনের একটা সিটে বসে জানলা দিয়ে আশপাশ দেখতে দেখতে রামমোহন ঘুমিয়ে পড়ল।

নয়

আজ রামমোহনের জন্মদিন। না, কোনো স্পেশাল প্ল্যান নেই। যথারীতি সকালবেলা দোকান খুলেছে। তার​ মা বেঁচে থাকতে এই দিন তাঁকে দিয়ে একটু খাসির মাংস আনাতেন​। রাতের বেলা গোবিন্দভোগ চালের পোলাও, মাখামাখা তুলতুলে কষা মাংস আর দু-চামচ পায়েস দিয়ে সে ভোজ সারত। এখন আর সেসব পাট নেই। আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতই সে জন্মদিন কাটায়। দোকানে বসে বসে রামমোহন সাপ্তাহিক বর্তমান পড়ছিল। হঠাৎ ‘কী রে পাগলা, আছিস কেমন?’ শুনে চমকে মুখ তুলে তাকাল। দরাজ হাসি নিয়ে রুনু দাঁড়িয়ে আছে দোকানের বাইরে। – আরে রুনু, কী আশ্চর্য! আয় আয়, ভেতরে আয়। বলে রামমোহন দোকানের সামনে কাঠের পাল্লাটা তুলে ধরল। – তারপর? বলে রুণু তার কাঁধে একটা আন্তরিক চাপড় মেরে দোকানে ঢুকে পড়ল। – ওহ্! কদ্দিন পর দেখা! বলে রামমোহন চেয়ারে এসে বসল। – হ্যাঁ, তা চার বছর তো বটেই। রুনু বলল। ততক্ষণে সে গুছিয়ে বসেছে। – চা খাবি? রামমোহন জিজ্ঞেস করে। – না থাক। এই নে, এটা তোর জন্য। বলে রুনু একটা বিদেশি সিগারেটের প্যাকেট বার করে রামমোহনের দিকে এগিয়ে ধরল। – থ্যাঙ্ক ইউ ভাই। বলে রামমোহন প্যাকেটটা নিয়ে ডেস্কটপের পাশে টেবলের ওপর রাখল। – আবার ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ কিসের? মারব শালা। বলে রুনু হেসে উঠল​। – হ্যাঁ রে তোদের বাড়ি তো দেখলাম প্রোমোটিং হচ্ছে। তা তুই উঠেছিস কোথায়? রামমোহন জিজ্ঞেস করল​। – আরে, ওই ব্যাপারেই তো এসেছি। গত মাসে সোনুও এসেছিল। ও এসে রথতলায় একটা বড় ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে মা আর কাকু-কাকিমাকে শিফট করাল। আমি ওখানেই উঠেছি। আর এবারে তো একলাই এসেছি। বউ- মেয়ে কানাডাতেই। রুনু থামল​​। – ও, তা থাকবি তো কদিন, নাকি? রামমোহন আবার জিজ্ঞেস করল​। – না রে ভাই। ছুটিছাটা পাইনি তেমন। হপ্তাখানেকের জন্য এসেছি জাস্ট। সামনের শুক্রবারই বেরিয়ে যাচ্ছি। রুনু বলল। রামমোহনের মনে পড়ে গেল​ ইলেভেন টুয়েলভে পড়ার সময় দু-তিনবার তারা দুজন স্কুল কেটে সিনেমায় গেছে। রুনু ছিল যাকে বলে তার পার্টনার ইন ক্রাইম। প্রথম সিগারেটও তারা দুজন একসাথেই টেনেছে। রুনু ওর কাকার প্যাকেট থেকে ঝেড়ে এনেছিল। ঘ্যাষের​ মাঠে গিয়ে দুজনে কাউন্টারে ফুঁকেছিল সেটা। উচ্চমাধ্যমিকের পর রুনু ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল জলপাইগুড়ি। তারপর চাকরি নিয়ে ব্যাঙ্গালোর আর আজ প্রায় দশ বছর সে তো বিদেশেই আছে। এই ছুটিছাটায় এলে তবেই তাদের দেখা হয়। যতবারই রুনু আসে পাড়ায় ততবারই সে দেখা করে রামমোহনের সাথে। যোগাযোগ কমে গেলেও রুনু তার ছেলেবেলার বন্ধুকে ভোলেনি। অবস্থার ফারাক বিস্তর হলেও তাদের বন্ধুত্ব অটুট। রামমোহন একটু আনমনা হয়ে পড়ল। – যাক গে বল কী খবর তোর? রুনুর প্রশ্নে রামমোহনের চটকা ভেঙ্গে বলে উঠল- হ্যাঁ ওই একইরকম, তোর? -চলছে, আর কি! রুনু হালকা হেসে জবাব দিল।

আস্তে আস্তে দুই বন্ধু ডুবে গেল আড্ডায়। ছেলেবেলার টুকরো টুকরো গল্প আর মজার মজার স্মৃতি…
রুনু হাসতে হাসতে বলে- তোর মনে আছে সেই সব্যদা একবার পাড়ার মাঠে খেলতে খেলতে তোর প্যান্ট খুলে দিল। তুই টুক করে প্যান্টটা তুলে পরে নিয়ে রেগে মেগে ছুটলি সব্যদাকে ক্যালেতে। তা ছুটে ধরতে তো পারলি না। তখন কাঁদতে কাঁদতে খেলা ছেড়ে বাড়ি চলে এলি?
রামমোহন মৃদু হেসে মাথা নাড়ে তারপর বলে- আর সেই একবার গুটখা খেয়ে সোনুর নতুন সাদা টি-শার্টে পিক ফেলে দিল, বল?
রুনু (হো হো করে হেসে উঠে)- ওফ! সে এক কান্ড! সোনু তো প্রথমে কিছু বোঝেনি। বাড়ি ফিরে টি শার্ট খুলে তারপর দেখতে পেয়েছে। ও তো বুঝেইছে কার কাজ হতে পারে। তারপর ব্যাট নিয়ে বেরচ্ছে অতনুকে ক্যালাবে বলে। বাবা অনেক কষ্টে সেদিন শান্ত করে ওকে। আর একটা টি শার্ট কিনে দেবে বলে টলে। কিনেও দিয়েছিল পরদিনই। তবে ও ওটা পরে আর কখনো খেলতে আসে নি।
– আর আসে? বলে রামমোহনও হেসে উঠল জোরে।
ঘন্টাখানেক আড্ডা দিয়ে রুনু উঠে পড়ল। রুনু চলে গেলে রামমোহন হাত বাড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা নিল। মনে মনে সে বেশ খুশী হয়ে উঠল। অভাবনীয় ভাবে জন্মদিনে কেমন একটা উপহার পেয়ে গেল! প্যাকেটটা খুলতে খুলতে তার মনে প​ড়ল​ যে তার বাবা বেঁচে থাকতে প্রতিবার এইদিনে তাকে বই উপহার দিতেন। তারপর থেকে আর কেউ কোনোদিন তাকে কোনো উপহার দেয়নি।
রামমোহন দোকানের বাইরে এসে একটা কিং সাইজ সিগারেট ধরাল।

দশ

দুদিন আগে মহালয়া চলে গেল। রামমোহনের মনটা বেশ খুশী খুশী। পুজো আসছে। সপ্তমী-অষ্টমী-নবমী-দশমী রামমোহন বিকেলে দোকান খোলে না আর প্রতিদিন এক প্যাকেট করে সিগারেট কেনে। উইলস ফ্লেক। পাড়ার প্যান্ডেলে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয় আর আশেপাশের ঠাকুর দেখে। কলকাতার দিকে এখন আর ঠাকুর দেখতে যায় না। ছোটবেলায় বাবা মার সাথে গেছে। কলেজের বন্ধুদের সাথে দুবার হোল নাইটও বেরিয়েছে। আগে বিজয়ার পর পাড়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। পাড়ার ছেলেমেয়েরা নাচ-গান-আবৃত্তি-নাটক-নৃত্যনাট্য করত। সঞ্জয়কাকু নাটকের রিহার্সাল করাত। ছোটবেলায় রামমোহন বেশ কয়েকবার পার্ট করেছে নাটকে। এখন আর ওসব হয় না। পুজোর চারদিনই যা আনন্দ।
দুপুরে খাওয়া দাওয়া সেরে রামমোহন ভাবল আজ আর ঘুমোবে না বরং এইবেলা পুজোর শপিংটা সেরে নেবে। একটা বিড়ি ধরিয়ে গুনগুন করতে করতে চলল সুপার মার্কেট।
সুপার মার্কেটে গিয়ে প্রথমেই সে এস. এন. ফুটওয়্যার থেকে একটা কিটো কিনল। সাড়ে তিনশো পড়ল। লাস্ট তিন বছর সে জুতো কেনেনি। তারপর নোভেল্টি গারমেন্টস্ থেকে কিনল বাই ওয়ান গেট ওয়ান অফারে দুটো দুটো চারটে টিশার্ট, সেলের একটা রেগুলার জিন্স আর লোকাল ব্র্যান্ডের টু ইন ওয়ান দু বক্স জাঙ্গিয়া। ফেরার পথে ফুটের একটা দোকান থেকে কিনে নিল লাল​-কালো আর নীল​-সবুজ প্রিন্টের দুটো বারমুডা। ব্যাস হয়ে গেল তার পুজোর শপিং। আসলে আগামী এক বছরের শপিং হয়ে গেল। বছরে এই একবারই জামাকাপড় কেনে সে।
বাড়ি ফিরে প্রথমেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টি-শার্ট জিন্স সব পরে ট্রায়াল দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিল নিজেকে। দিব্যি লাগছে। ফিটও করেছে দারুণ। তারপর চা খেয়ে দোকান খুলল।
ষষ্ঠীর দিন লেবুদার দোকানে যাওয়ার আগে রামমোহন পাড়ার ঠাকুরটা দেখতে গেল। প্যান্ডেলে গিয়ে দেখল সব্যদা আর গগাই বসে আড্ডা মারছে। রামমোহনকে দেখেই সব্যদা বলল, শোন অষ্টমীতে কোনো প্ল্যান রাখিস না। আমরা চারজন শেরাটনে বসব। বুল্টাইকেও বলে দিয়েছি। ঠাকুর দেখে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে রামমোহন লেবুদার দোকানে চলে গেল।
সপ্তমীর দিন সন্ধেবেলা নতুন টিশার্ট-জিন্স আর কিটো পরে রামমোহন আশেপাশের ঠাকুর দেখতে বেরল। প্রথমে গেল পেয়ারাবাগান। সেখানে ঠাকুর দেখে পাপড়ি চাট খেল। এরপর গেল দেবগড়। দেবগড়ে প্যাণ্ডেলে ঢোকার মুখে বুল্টাইয়ের সাথে দেখা হল। সাথে ওর বৌ-ছেলেও ছিল। সব শেষে গেল যতীনকলোনি। ওখানে লোকগানের ব্যান্ড এসেছিল। রামমোহন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পুরো প্রোগ্রামটা শুনল। ব্যান্ডের লিড সিঙ্গার মেয়েটির গলা খাসা লাগল তার। তারপর এক প্লেট চিকেন চাউমিন খেয়ে রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ বাড়ি ফিরে এল।
অষ্টমীর দিন সব্যদার প্ল্যান মতো তারা সব প্যান্ডেলে মিট করল। কিছুক্ষণ বসে আড্ডা-টাড্ডা দিয়ে রাত আটটা নাগাদ উঠে পড়ল। দুটো অটোয় ভাগাভাগি করে চলে এল শেরাটন বার কাম রেস্তোরাঁয়। একটু অপেক্ষা করেই টেবল পেয়ে গেল। জমিয়ে বসল চার বন্ধুতে। ফিশ ফিঙ্গার আর বাদাম চাট দিয়ে মদ খেয়ে তন্দুরি রুটি-কিমা মটর-মাটন ভুনা আর গ্রিন স্যালাড দিয়ে ডিনার সেরে রাত প্রায় বারোটা নাগাদ তারা পাড়ায় ফিরল। সব্যদা-গগাই-বুল্টাই প্যান্ডেলে বসল গুলতানি করতে। রামমোহনের ঘুম পাচ্ছিল বলে সে বাড়ি ফিরে গেল।
নবমীর দিন সন্ধেবেলা রামমোহন প্যান্ডেলে গিয়ে দেখল সব্যদা বসে হিটু-বুড়ো-সুধীরের সাথে আড্ডা দিচ্ছে। সব্যদা বলল যে গগাই-বুল্টাই নাকি বৌ-বাচ্চা নিয়ে ঠাকুর দেখতে গেছে। রামমোহন ওদের সাথে বসে আড্ডা মারতে থাকল। কিছুক্ষন আড্ডা মেরে হিটু-বুড়ো-সুবীর উঠে পড়ল। ওদের মালের প্রোগ্রাম আছে।
রামমোহন সব্যদাকে নিয়ে গেল সুপার মার্কেটের ঠাকুরটা দেখতে। ঠাকুর দেখে পাড়ায় ফিরে মোড়ের মাথায় ভুজিয়াওয়ালার থেকে ছোলা-বাদাম মাখা আর রাজার হোটেল থেকে রুমালি রুটি চিলি চিকেন তুলে রামমোহন সব্যদাকে নিয়ে বাড়ি এল। কিছুটা রাম আছে। হয়ে যাবে দুজনের। দুজন বসে জমাটি খানাপিনা করতে করতে মেতে উঠল ছেলেবেলার পুজোর সব মজার মজার গল্পে। অনেক রাতে সব্যদা বাড়ি ফিরে গেল। রামমোহন গিয়ে সটান বিছানায় শুয়ে পড়ল। বেশ নেশা হয়েছিল তার।
দশমীর দিন সন্ধেবেলা প্যান্ডেলের দিকে যেতে যেতে রামমোহন শুনতে পেল ঢাক-কাঁসর-চটপটির সাথে ব্যান্ডের বাজনা। মনটা তার খুশীতে চনমন করে উঠল। একটা সিগারেট ধরিয়ে জোরে হাঁটা দিল। অদ্যই শেষ রজনী। বাড়ি থেকে সে দুপেগ চড়িয়েই বেড়িয়েছে।
প্যান্ডেলে পৌঁছে দেখল পাড়ার ছেলে- বুড়ো সব জড়ো হয়ে গেছে। লরিতে ঠাকুরও উঠে গেছে। দেবীবরণ-সিঁদুরখেলা সব শেষ। সব্যদাকে দেখতে পেল। ঢাকি আর ব্যান্ডের বাজনাদারদের সামনে দাঁড়িয়ে হাত-পা নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করে তাদের উৎসাহ দিচ্ছে। মাঝে মাঝে কোমরে হাত দিয়ে নেচে নেচে উঠছে। ভিড়ের মধ্যে চোখে পড়ল পারুলকে। পাড়ার অন্য​ মহিলাদের সাথে হাসি-ঠাট্টা করছে। কপালে-গালে-গলায় লেপা সিঁদুর।
হঠাৎ ‘এই রাম্মোন, এদিকে আয়’ ডাক শুনে ঘুরে তাকিয়ে দেখল প্যান্ডেলের পেছন থেকে বুল্টাই ডাকছে। গগাইটাও অছে সাথে। রামমোহন চট করে চলে গেল প্যান্ডেলের পেছনে।​ ‘এই নে, মেরে দে’ বলে প্লাস্টিকের প্যাকেটে মোড়া একটা জলের বোতল তার দিকে এগিয়ে দিল। বোতলটা হাতে নিতে নিতে রামমোহন জিজ্ঞেস করল ‘রাম তো?’ হ্যাঁ রে বাবা, খা।‘ গগাই খেঁকিয়ে উঠল। দু’ঢোক মেরে বোতলটা গগাইয়ের হাতে চালান দিয়ে রামমোহন জিজ্ঞেস করল ‘সব্যদাকে ডাকলি না?’ বুল্টাই চোখ টিপে হেসে বলল ‘সব্যদা অলরেডি চড়িয়ে আছে।’ তিন বন্ধুতে বোতল থেকে পাইল করা রাম মারতে থাকল।
লরি স্টার্ট দিল। ঢাক কাঁসরের বাজনা দ্বিগুন হয়ে উঠল। পুজোর সেক্রেটারি পরিমলদা চিৎকার করে উঠল ‘বলো দুগগা মাই কি’। সমস্বরে সমবেত জনতা বলে উঠল ‘জয়’ পরিমলদা আবার চিৎকার করে উঠল ‘আসছে বছর’, আবারও সমস্বর উঠল ‘আবার হবে’ ওরা তিনজন ঝটপট বোতল শেষ করে প্যান্ডেলের সামনে চলে এল।
বোম পটকা ফাটিয়ে শুরু হল ভাসান যাত্রা। ব্যান্ড পার্টি ট্র্যাক ধরল ‘মুন্নি বদনাম হুয়ি ডার্লিং তেরে লিয়ে’। ওহ্! রামমোহনের শরীরটা যেন আপনা থেকেই দুলে উঠল। পাশ থেকে গগাই-বুল্টাই নাচতে শুরু করে দিয়েছে। তাকেও মারছে কনুইয়ের ঠেলা। হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে সব্যদা নাচতে নাচতে তাদের দিকে এগিয়ে এল। আশপাশে হিটু-বুড়ো-সুবীর-পরিমলদা-সনাতনদা-ভোলা-কার্তিক-শুভ্র-প্রদীপ-গুরমীত-বিতান পাড়ার ছোট বড় সবাই নাচছে। রামমোহন আর স্থির থাকতে পারল না। ঠোঁটে জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে দু হাত মাথার ওপরে তুলে সে নাচতে শুরু করল। ভিড়ের মধ্যে আবার দেখতে পেল পারুলকে। চোখাচুখি হতে পারুল মিষ্টি করে হাসল। রামমোহনও ছুঁড়ে দিল আলগা হাসি। তার সব দুঃখ-রাগ-একাকিত্ব-না পাওয়া ভুলে রামমোহন নাচতে থাকল।
নাচতে নাচতে সে বুঝতে পারল যে পাশ থেকে ধুর্জটি জেঠু-নগেন কাকা এরা সব আড়চোখে তাকে দেখছে। দেখুক, কুছ পরোয়া নেহি। বছরে এই কটা দিনই সে দিল খুলে বাঁচে। আশপাশ থেকে ‘জিও রাম্মোন, জিও’, ‘পাগলা, পাগলা’ এইসব উৎসাহ ধ্বনি ভেসে আসতে থাকল আর মুঙ্গরা, দো ঘুট মুঝে ভি পিলা দে, বিড়ি জ্বালাইলে এইসব চটুল গানের ট্র্যাকের তালে তালে রামমোহন নাচতে নাচতে চলল।
মাঝে মাঝে নাচ থামায়। দম নেয়। সব্যদা কি গগাই-বুল্টাইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে চলে। সিগারেট ধরায়। আবার নাচতে শুরু করে।
বেশ অনেকক্ষণ পর রামমোহন সম্বিত ফিরে পেল। অনেকটা দূর চলে এসেছে সে। নেচে-হেঁটে বেদম ক্লান্ত। নেশাও জমেছে ভালোই। সে ঘাট অব্দি যাবে না। এবার ফিরে যাওয়াই ভালো। এদিক ওদিক তাকিয়ে গগাইকে দেখতে পেল। সব্যদা আর বুল্টাইকে দেখতে পেল না। হয় এগিয়ে গেছে নয় পিছিয়ে পড়েছে। সে গগাইকে বলল ‘আমি বাড়ি চললাম, সব্যদাদের বলে দিস।’ বলেই সে রাস্তা ক্রশ করে উলটো ফুটে চলে এল। গলাটা শুকিয়ে কাঠ। একটা পান-বিড়ির দোকান থেকে ছোট একটা মিনারেল ওয়াটারের বোতল কিনে ঢকঢক করে পুরোটা শেষ করে দিল। তারপর একটা অটো থামিয়ে উঠে পড়ল সামনের সিটে।
মোড়ের মাথায় নেমে সোজা ঢুকে গেল রাজার হোটেলে। খিদে পেয়েছিল বেশ​। এক প্লেট মাটন বিরিয়ানি অর্ডার করল। চেটেপুটে খেয়ে পনেরো টাকা টিপস দিয়ে মৌরি চিবোতে চিবোতে রামমোহন রেলাসে বেরিয়ে এল হোটেল থেকে।
পাড়ায় ঢুকে প্যাকেটের লাস্ট সিগারেটটা ধরিয়ে হাঁটতে থাকল বাড়ির দিকে।

এগারো

পুজোর পর থেকে বৃষ্টি-বাদলা লেগেই আছে। দোকান বন্ধ করতে করতেই রামমোহন বুঝল ঝেঁপে বৃষ্টি আসছে। মেঘ গুড়গুড় করছে। জলদি জলদি বেরিয়ে কাউন্টার আর ভোলার দোকান ঘুরে যখন বাড়ি ফিরছে টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আজ আর লেবুদার দোকানে যায়নি। চারাপোনার ঝোলটা নামাতে নামাতেই ঝমঝম করে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টি রামমোহনের খুব ভালো লাগে। বাইরে প্রবল বৃষ্টিতে ঘরে বসে গান শুনতে শুনতে রাম খাওয়ার আনন্দই আলাদা। রামমোহন যথেষ্ট আনন্দিত চিত্তেই রাম খাচ্ছিল। এমন সময় দরজার কাছ থেকে শুনতে পেল কুকুরছানার কুঁইকুঁই। রামমোহন উঠে দরজার বাইরের আলোটা জ্বেলে দরজা খুলে দেখে একটা কুকুরছানা। একদম ভিজে গেছে। কুঁইকুঁই করতে করতে সে ঘরের ভেতর ঢুকে গেল। সিঁড়ির পাশে ছানাটা গুটিসুটি মেরে বসে গেল। কোথা থেকে এল কে জানে। হয়ত পথ হারিয়ে ফেলেছে। মাকে খুঁজে পাচ্ছে না। রামমোহনের খুব মায়া হল। সে ঝুঁকে পড়ে বাচ্চাটার কপালে গলায় একটু হাত বুলিয়ে দিল। বাচ্চাটাও লেজ নেড়ে, জিভ দিয়ে তার হাত চেটে কৃতজ্ঞতা জানাল। হাত দিয়ে রামমোহন বুঝল ভিজে গিয়ে কাঁপছে ছানাটা। সে ঘরে ঢুকে একটা পুরনো গামছা নিয়ে এসে ভালো করে ছানাটার গা মুছিয়ে দিল। ছানাটা যে বেশ আরাম পেল সেটা তার মুখ দেখে রামমোহন বুঝতে পারল। ওকে কোলে তুলে নিয়ে হলে চলে এল। সোফার পাশটায় বসিয়ে দিল। তার পর বেডরুমে গিয়ে আলমারী খুলে তার পুরনো ছেলেবেলার কাঁথাটা বার করে আনল। একে ভিজে গেছে তায় বাচ্চা যদি ঠান্ডা লেগে যায় এই ভেবে সে কাঁথাটাকে ফোল্ড করে সোফার পাশে মেঝেতে পেতে দিল। ছানাটা গুটিগুটি পায়ে সেখানে গিয়ে কুন্ডলী পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। আরামে চোখ বুজে ফেলল। রামমোহন শিস দিতেই পিটপিট করে তাকিয়ে লেজ নাড়তে থাকল। রামমোহন আবার রামে চুমুক দিল। রাম খেতে খেতে হঠাৎ রামমোহনের খেয়াল হল ছানাটার নিশ্চয়ই খিদে পাচ্ছে। তার নিজের জন্য মাছের ঝোল-ভাত​ আছে কিন্তু তা তো একে ঠিক দেওয়া যাবে না।। বিস্কুট সে খায় না। তবে? সে বসে বসে একটু ভাবল। মনে পড়ল অনেকদিন আগে একবার গগাই বলেছিল কুকুর নুন খায় না। গগাইদের একটা অ্যালসেশিয়ান আছে। রামমোহন উঠে রান্না ঘরে গেল। ছানাটা শুয়ে শুয়ে জুলজুল চোখে তাকে দেখতে লাগল​। রামমোহন গ্যাস জ্বেলে কুকারে একটু চাল-ডাল-আলু সামান্য হলুদ দিয়ে বসিয়ে দিল। তারপর আবার এসে সোফায় বসে ছানাটাকে কোলে নিয়ে আদর করতে থাকল। গোটা চারেক সিটি পড়ার পর রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাস বন্ধ করে দিল। নিজে খাওয়ার আগেই রামমোহন ওই চালে-ডালে বানানো খাবার একটু চটকে মেখে একটা মাঝারি বাটিতে করে ছানাটার সামনে এনে রাখল। গপগপ করে সবটা খেয়ে নিল। আহা রে! খুব খিদে পেয়েছিল। রামমোহনের মায়া বেড়ে গেল।​ খাওয়া দাওয়া সেরে রামমোহন শুয়ে পড়ল। ঘুম থেকে উঠে দেখল​ ছানাটা আগেই উঠে হলে ঘোরাঘুরি করছে। তাকে দেখে লেজ নেড়ে দৌড়ে এল। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে রামমোহন বাথরুমে চলে গেল। দাঁত মাজতে মাজতে যে ঠিক করল এই ছানাটাকে সে নিজের কাছে রাখবে। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে চা-ডিম সেদ্ধ​ খেয়েই রামমোহন সোজা গেল ভোলার দোকান। গোটা দশেক পার্লে জি বিস্কুটের প্যাকেট আর সস্তা চাল কিনল এক কেজি। কিনে ফিরে এল বাড়ি। ছানাটা লেজ নেড়ে ওয়েলকাম করল। রামমোহন খুব খুশী হল। ওকে সোফায় তুলে একটা একটা করে বিস্কুট খাওয়াতে থাকল। ফুল্লরাদি এসে ছানাটাকে দেখে বলল, ‘একে আবার কোত্থেকে জোগাড় করলে?’ রামমোহন বলল​ ‘জোগাড় করিনি, নিজেই এসেছে।’ ফুল্লরাদি ছানাটার মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বলল​ ‘যাক, অ্যাদ্দিনে তোমার একটা সঙ্গী হল।’ রামমোহন কিছু না বলে অল্প হাসল​। ফুল্লরাদিকে বাড়িতে থাকতে থাকতেই সে গেল মন্টুর চিকেন শপে। চল্লিশ টাকার ছাঁট কিনে বাড়ি ফিরল। আজ দোকান খুলতে তার খানিক দেরি হবে সে আগেভাগেই বুঝেছিল। ফুল্লরাদি কুকারটা মেজে দিয়ে গেছে। যে ছাঁট মাংস ভালো করে ধুয়ে একটা বড়ো পাত্রে রেখে ডিপ ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিল। শুধু ক​য়েক​ পিস বাইরে রাখল। তারপর চাল আর মাংস অল্প হলুদ দিয়ে কুকারে বসিয়ে দিল। চারটে সিটির পর গ্যাস বন্ধ করে দোকান খুলল। সাড়ে নটা বেজে গেছে। তা যাক। ছানাটার দু-বেলার খাবার তো তৈরি। গতকাল ছিল কালীপুজো। বাজির আওয়াজে বড্ড ভ​য় পেয়েছে ছানাটা। কি আর করা যাবে! ছানাটার নাম রেখেছে মাটু। এরমধ্যে রামমোহন বেশ ক​য়েকটা বড় কাজ করেছে। গোপালকে ডেকে বাড়ির সদর গেটের নিচের দিকে অ্যালুমিনিয়ামের পাত লাগিয়েছে। এখন মাটু চাতালে খেলা করতে পারবে কিন্তু বাইরে যেতে পারবে না। বাইরে গাড়ি-টাড়ি যায়। রামমোহন ভয় পায়। ভেট ডেকে মাটুর চেক আপ করিয়েছে আর ওদিকে ধর্মতলায় গিয়ে একটা পেট শপ থেকে ডগ শ্যাম্পু আর বকলস্ কিনে এনেছে। দোকানের লোকটা বলেছে হপ্তায় একবার স্নান করালেই হবে। পেট শপের ঠিকানা আর ভেটের নাম্বার দিয়েছিল গগাই। রামমোহন নিয়ম করে দিয়েছে ঠিক সকাল আটটায় এক প্যাকেট পার্লে জি বিস্কুট, বারোটায় লাঞ্চ, চারটেয় আবার বিস্কুট আর সাড়ে আটটায় ডিনার। দুপুরে মুরগি-ভাত আর রাতে দুধ​-ভাত। সন্ধেবেলা লেবুদার চায়ের ঠেকে যাওয়ার আগে এখন রোজই মাটুকে নিয়ে পাড়ায় খানিক চক্কর মারে সে। এতক্ষণ মাটু হলে ঘুরছিল। রামমোহন বেডরুমে বসে চা খাচ্ছিল। এবার লেজ নাড়তে নাড়তে চলে এল বেডরুমে। রামমোহন টুক করে ওকে বিছানায় তুলে নিল। ডগ শ্যাম্পুর গন্ধটা কিন্তু বেশ! রামমোহনের মুখ হাসিতে ভরে উঠল।

বারো

শীত প​ড়ে গেছে​। রামমোহন পুরনো কম্বলটা আলমারী থেকে বার করে ছাদে দিয়ে এল​। রোদ খাক খানিক যদিও ন্যাপথলিন দেওয়াই​ ছিল​। দুপুরে রান্নাবান্না সেরে ভাবল বুকর‍্যাকটা একটু ঝাড়পোঁছ করবে। খুব ধুলো পড়েছে। আজ রবিবার। তার ছুটির দিন​। র‍্যাক থেকে বইগুলো নামাতে নামাতে হঠাৎ সে খুঁজে পেল​ একটা পুরনো পত্রিকার তিনটে সংখ্যা। পেয়েই বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল​। এই পত্রিকা সে আর তার কলেজের বন্ধুরা মিলে করেছিল। সেই কবেকার কথা। সে প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। এক লহমায় সুতীর্থ-অম্লান-প্রণব-বোধিদের মুখগুলো ভেসে উঠল​ তার চোখের সামনে। তারা সবাই ছিল ব্যাচমেট, বাংলা ডিপার্টমেন্ট। এই তিনটে সংখ্যাই হয়েছিল। ফার্স্ট সেকেন্ড আর থার্ড ইয়ার মিলিয়ে। ওহ্! সাহিত্য নিয়ে তাঁদের সেই আড্ডা-তর্ক-লেখা বাছাই-প্রেসে যাওয়া-প্রুফ দেখা সে এক আলাদা উন্মাদনা ছিল বটে! ঝাড়পোঁছ তার মাথায় উঠল। হাত দিয়ে চাপড় মেরে ধুলো ঝেড়ে সংখ্যা তিনটে নিয়ে চলে এল হলে। সোফার ওপর বসে পত্রিকার একটা সংখ্যা তুলে নিল​। পত্রিকার নাম ‘কুটিঘাট’। নামটা তারই সাজেস্ট করা। তার মনে পড়ল সেই সময় গঙ্গার ধারে কুটিঘাটই ছিল তাঁদের প্রিয় হ্যাং-আউট। কলেজের পর তারা পাঁচ বন্ধুতে চলে যেত কুটিঘাট। তারপর সেখানে বসে মুখোরুচি থেকে কেনা চপ-মুড়ি দিয়ে চলত তাদের আড্ডা-তর্ক। সেই থেকেই নামটা তার মাথায় আসে। পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা সম্পাদকমণ্ডলী। তার মধ্যে বন্ধুদের সাথে জ্বলজ্বল করছে তার-ও ভালো নাম। দ্বৈপায়ন চট্টোপাধ্যায়। ওহ্! কতকাল যে কেউ তাকে তার ভালো নামে ডাকেনি। তিনটে সংখ্যায় তিনটে গল্প লিখেছিল রামমোহন। সে গল্পগুলো পরপর পড়তে থাকল​: সন্দীপনের ভ্রম ভোররাতে বৃষ্টি হয়েছে। খোলা জানালা দিয়ে ঠান্ডা হাওয়া আসছে। সন্দীপনের শীত শীত করে। রোমগুলো খাড়া হয়ে যায়। বিছানা ছেড়ে উঠে বসে। আড়মোড়া ভাঙে। শার্সির সামনে দাঁড়ায়। অনেক্ষণ শার্সির দিকে তাকিয়ে নিজেকে মাপতে থাকে সন্দীপন। শার্সির রঙ সকালবেলার দিকে ঘন হলুদ বলে মনে হয়। নিজের শরীরের আড়ালে একটি নারী শরীর স্পষ্ট হয়। সন্দীপনের বোধ করি হ্যালুসিনেশন আছে। শার্সির সাথে ওর কথা চলে নিয়মমাফিক। ঘরের আনাচ কানাচ কেমন যেন স্যাঁতসেঁতে হয়ে আছে। দেওয়ালের ছবিগুলো সন্দীপনকে ভ্রুকুটি করে। সন্দীপন পালিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছে। সন্দীপন প্রাণভরে তার ঘ্রাণ নেয়। আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে থাকে। উপরের কিছুদূর বৃষ্টির ফোঁটা দেখা যায়। তারপর আর দেখা যায় না। একটা শূন্যতা সন্দীপনকে গ্রাস করে নেয়। কাল রাতে সুচেতনার ফোন এসেছিল। ওর প্রশ্নগুলো অচেনা লেগেছিল সন্দীপনের। উত্তরে গলা কেঁপেছিল। সন্দীপনের এ জড়তার ব্যাখ্যা শূন্যতার কাছে নেই। কখনও কখনও নিজের হেঁটে আসা পথটা ভুল মনে হয় সন্দীপনের। কোন কোন পূর্বস্মৃতি ওকে পীড়া দেয়। প্রাণপণে ভুলতে চায় নাটকের সেইসব দৃশ্য পারে না। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলে। বাইরে ঘাসের ওপর বসেছিল সন্দীপন। পায়ের কাছে দুটো একটা ঘাসফুল। উজ্জ্বলতা ওর খুব প্রিয়। ভেজা ঘাসে হাত বোলাচ্ছিল। ঠোঁট দুটো নড়ছিল। বোধ হয় গান করছিল। হঠাৎ শিহরিত হয়ে ওঠে সন্দীপনের দেহটা। চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। তির তির করে কাঁপছে। সেই প্লুতস্বর স্নায়ুসূত্রে আঘাত করে ফিরে যাচ্ছে। প্লুতস্বরের উৎস ওর জানা নেই। শুধু মাধ্যমটুকু সম্বল করে সন্দীপন কানে পাতে। প্লুতস্বর সুরেলা নয়, মিহি অথচ কর্কশ। ধন্দে পড়ে যায় সন্দীপন। রাত-বিরেতে ছায়া-প্রচ্ছায়া নিয়ে অহেতুক কল্পনা সন্দীপনের স্বপ্নদোষ ঘটায়। কিন্তু তখনও ওর দরজায় প্লুতস্বর ধাক্কা মারে। সন্দীপন স্পষ্ট শুনতে পায়। শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ করে শুয়ে থাকে। নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নিজেই অস্বস্তিতে ভোগে। স্নানের সময় সন্দীপন অনুভব করে নারী শরীরের উপস্থিতি। সখ্যতা ও সঙ্গম। আবারও প্লুতস্বর ওর গোটা শরীরটাকে আঁকড়ে ধরে। সরীসৃপের মত এঁকে বেঁকে ওর স্নায়ুসূত্রে প্রবল আঘাত করে। শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়। নির্জনতাই সন্দীপনের অসুখ। যার বুক পকেটে ছত্রাক থাকে। এই সব ছত্রাক যে কোনও মাধ্যমেই বেরিয়ে পড়ে পকেট থেকে। ওর টেবলে-বিছানায়-রোমকূপে এদের শীতল অস্তিত্ব। সন্দীপনের স্নায়ুরোগ তীব্র হয় ছত্রাকের বংশবৃদ্ধিতে। এদের ব্রিডিং জোনটা আবার সন্দীপনের মস্তিষ্ক। তাই ও অসহায়। নির্জনে নিভৃতে পাগলের মতো ছটফট করে। প্লুতস্বর ওর শিরায় উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। মস্তিষ্ক বিকার থেকে ভ্রমতাড়িত সন্দীপন ছুইটে যায় শার্শির ভেতর। প্লুতস্বর শার্শিতে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে ঘরে। একলা প্লুতস্বর ছত্রাক মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। উপলের খিদে বাইরের ছোট্ট ঘরটায় উপল সারাদিন-সারারাত বসে থাকে। জানলা দিয়ে চরসের নীল ধোঁয়া বেরিয়ে আসে। শরীরের সমস্ত শিরা-ধমনীর মধ্যে দিয়ে রক্তপ্রবাহ আর মাথার মধ্যে চিনচিনে ব্যাথা। আঙুলগুলো চলতে থাকে অনর্গল- উপলের ডায়েরি। নেশার লিমিটিং স্টেজে উপলের খিদে পায়। ভয়াবহ রাক্ষুসে খিদে। ঘরের এককোণে ইজেল-ক্যানভাস। ইতস্তত রঙ-তুলি জড়ো হলে ক্যানভাস ধাত্র হ​য়ে ওঠে। উপল​ খানিক লাল রঙ ছিটিয়ে দেয় ক্যানভাসে আর খিদের মুখে। তীব্র হয়ে ওঠে খিদে, পাকস্থলী চেপে ধরে। সবুজ-কালো-নীল এঁকে এঁকে ক্যানভাসে চড়তে থাকে। খিদে ঘিরে নেয় উপলকে আস্তে আস্তে। এসবই ক্যানভাসের একপাশের ব্যাপার। আর একপাশ আগাগোড়া ফাঁকা থাকে। যাবতীয় ডায়ালামা এই অংশ ঘিরেই। দাউ দাউ করে খিদের আগুন জ্বলে উঠলে হলুদ হয়ে যায় ফাঁকা জায়গা। তুলির আঁচড়ে হলুদ গাঢ় হয়-ঘন হয়। ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং উপল নিজেই বাড়িয়ে তোলে খিদে। গোটা ঘরময় হলুদ ছড়িয়ে পড়ে। ক্যানভাসের ফ্রেম ভেঙে চুরমার। সব রঙ ফিকে, অর্থহীন। বেবাক উপল দু-হাতে মাথার চুল খামচে ক্যানভাসের সামনে। খিদের চোটে গোটা ঘরময় দাপাদাপি করে। তুলি খসে যায়। হলুদ রঙ ছিটকে লাল মেঝেতে। এরপর উপলের বুড়ো আঙুলে একটা ফাংগাস গজায়। আতঙ্কিত উপল আঁতিপাঁতি করে খুঁজে বের করে পুরনো হাতমোজা। হাত ঢাকে এবং প্রকাণ্ড হাঁ এর মধ্যে গিলে নিতে থাকে হলুদ ক্যানভাস। পিত্ত ক্ষরণ স্পষ্ট টের পায়। হাত দুটো পকেটে পুরে ফেলে। খিদে উঠে আসে অন্ত্র থেকে খাদ্যনালী বেয়ে। অসহ্য খিদে। ও উবু হয়ে বসে পড়ে। পকেট থেকে হাত বের করে হাতমোজা দুটো খেয়ে ফেলে। খিদে চাপা পড়ে ফের চাগাড় দিয়ে ওঠে। রোমগুলো খাড়া হয়ে যায়। আর উপল জন্তুর মতো থেবড়ে বসে হাতময় গজানো ফাংগাসগুলো গোগ্রাসে খেয়ে চলে… অশ্বমেধ ধু ধু চারণভূমি ছড়িয়ে আছে নক্ষত্রের আলোয়​। কক্ষপথ ধরে একে একে বৃষ্টিমন্ত্র ঘোড়ারা উঠে এল। তাদের নিষ্পলক চোখে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের সঞ্চার। আকাশের বোবা রঙ চুইয়ে পড়ছে আস্তাবলের আনাচকানাচে। একপাশে হলুদ ঘাসের বিছানায় বুড়ো সহিসের কুঁজো শরীরটা। কোমরের গোঁজ থেকে বুড়ো হ্যাঁচকা টানে এক বোতল রাম্ বার করে আনল। এরপর সহিসের গলার নলির আন্দোলন এবং আগাগোড়া বোতল শেষ হলে মুখে এক তীব্র বিকৃতি। চোখের কোণে খানিক নোনাজল। ঘোড়ারা নিয়ন্ত্রণ মেনেছে। জকিদের ইশারায়-পেটের দু’পাশে বুটের খোঁচায় লাগামের টানে গলফ সরঞ্জাম বা হার্ডলগুলো অবিরাম চারপেয়ে কৌশল। ট্র্যাক-শোরগোল-হাততালি-বাজি জিতে-হেরে একঘেয়ে দৌড়। ঘোড়ারা অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। সহিস রাত নামিয়ে আনে হাতে ,মুদ্রায়। দলাই মলাই গোটা রাত। মাংসপেশীগুলো সচল হয়-রক্তপ্রবাহ কোষে কোষে ছড়িয়ে পড়ে শীর্ণ হাত বেয়ে। এই সময় সহিসকে বিড়বিড় করতে দেখা যায়, বিশেষত ঘোড়াদের কানে মুখ ডুবিয়ে। সহিসের চোখের নিচে অনেক আঁচড়। চোখের তারা সবসময় ঘোলাটে-পাংশুমুখ কিছুটা রক্তাভ। সময়-অসময় সহিস আস্তাবলের দেওয়ালে চেয়ে থাকে, রামের নেশায় তার চোখের মধ্যে চোখ তৈরী হয়। দেওয়ালে ফুটে ওঠে সুদূর নক্ষত্রলোক, চারণভূমি আর প্রস্তরযুগীয় সেইসব ঘোড়া যাদের কেশর ছিল আরো বড় ও ঘন, তাদের উদ্দাম গতি, প্রান্তরের পর প্রান্তর ডিঙিয়ে নিষিদ্ধ পরিক্রমা আর সমবেত রমন। রতিক্রিয়ার সময় আস্ফালন, চোখগুলো খুব লাল হয়ে যেত মদ্দাগুলোর আর মাদীদের তীব্র শীৎকার ভেসে আসত… এরপর ধাতুপাত। আস্তাবলের চতুর্দিকে তখন কঠিন শীত ঝরে খুব। অবশেষে এই শীত স্থিতি পায়। দৃশ্যের জন্ম- মত্যু যুগপৎ ঘটে চলে। আড়াই ঘর চালের পদ্ধতি বিষয়ক জ্ঞান সহিসের পর্যাপ্ত তবু গরমিল মনে হয় সারিবদ্ধ নিয়মে দাঁড়িয়ে পড়া এবং ব্ল্যাঙ্কফায়ার। এক লক্ষ্যমুখী অবান্তর দৌড়। যেন ঘোড়াদের পায়ের ওপর পা গজায়। এই পায়ে কোনো সন্ধি নেই,, কোনো ধমনী নেই। এখন উলম্ব ঘুম। সহিস একলা জেগে বসে। কড়া মদ তলানি পড়ে আছে। টলমল পায়ে উঠে পড়ে। এক এক করে প্রত্যেক ঘোড়ার কানে মুখ ডুবে যায়। বিড়বিড় করে ওঠে সহিস। এক অবাস্তব স্মরণ প্রক্রিয়ায় একে একে অন্তর্ভুক্ত হয় রণক্ষেত্র-রণশিঙা-অসি- গোলা-বারুদ মধ্যযুগীয় ঘোড়াদের ক্রম অভিজ্ঞতার প্রবাহ। সহিস এই প্রবাহধারা ঘুমের মধ্যে ঢেলে দেয়। গল্পের মতো বলে চলে। সহিসের গল্প রাতভোর চলে। পরদিন ভোর হয়ে এলে আবার ঘোড়ারা দানাপানি পায়। বাঁশ দিয়ে গলায় ঢেলে দেওয়া হয় কড়া মদ। বোতলের পর বোতল। ঘোড়ারা ধীরে ধীরে প্রতিযোগী হয়ে ওঠে এইভাবে… দিন ফুরিয়ে রাত নামে আঙুলের কড় বেয়ে বেয়ে। ঘোড়ারা আবার পায়ের ওপরকার পা খুলে ফেলে। আস্তাবলে চুপ করে দাঁড়িয়ে দেওয়ালে চোখ রাখে। অলৌকিক স্তব্ধতা ফিরে আসে। চোখ নিষ্পলক হয়ে যায়। ঘোড়া-জীবনের ক্রম অভিজ্ঞতা ভিড় করে আসে স্তব্ধতায়। সহিসের অদম্য স্পৃহায় এক এক করে দৃশ্যত হয় ঘোড়াদের জীবনচর্চার পাপ-পুণ্য-ইতি-নেতি আর তার সংশ্লেষে থেকে উঠে আসে তাদের জাতীয় ইতিহাস। এইসব ইতিবৃত্ত একদিন লিপিবদ্ধ হবে জেনে জলছাপ হয়ে রয়ে যায় আস্তাবলের দেওয়ালে দেওয়ালে আর দরজায় শাপগ্রস্ত সহিস, তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে সময়ের ভগ্নাংশ ছিটকে ছিটকে প​ড়ে অনর্গল… এতদিন পর গল্পগুলো পড়ে তার একটু কাঁচাই লাগল। তবে সে যে কখনো মৌলিক কিছু লিখেছে বা লেখার চেষ্টা করেছে এটা ভেবে বেশ খুশী হয়ে উঠল। অনেকদিন আগে হারিয়ে যাওয়া সেই দ্বৈপায়নকে যেন খুঁজে পেল আবার। তারপর মনে মনে ভাবল: সে তো আবার কিছু লিখতে পারে। না, কোথাও ছাপানোর জন্য বা কাউকে প​ড়ানোর​ জন্য নয়। শুধুমাত্র নিজের জন্যই। লেখার মধ্যে যে এক অদ্ভুত আনন্দ আছে তা সে আগেই টের পেয়েছে। রামমোহন উঠে পড়ল। স্নান করতে গেল। মাথায় জল ঢালতে ঢালতে ঠিক করল যে ছেলেবেলার মত বানিয়ে বানিয়ে গল্প সে আর লিখবে না বরং এবার সে তার নিজের কথা লিখবে। মাটুর কথা লিখবে। তার বন্ধুদের কথা লিখবে। এই পাড়া-প্রতিবেশীর কথা লিখবে। ক্রমাগত বদলে বদলে যাওয়া চারপাশের কথা লিখবে। ছাদ থেকে কম্বলটা নামিয়ে এনে রামমোহন মাটুকে খাবার দিল। মাটুর খাওয়া হলে নিজেও মুরগি-ভাত মেরে আধশোয়া হ​য়ে শুয়ে প​ড়ল বিছানায়​। আয়েশ করে কম্বলটা টেনে নিল গায়ে। লেখার আইডিয়াটা মাথায় অসার পর থেকেই মনটা বেশ চনমন হ​য়ে আছে তার। বিড়ি ধরিয়ে লম্বা টান দিল​ একটা। ভাবতে হবে একটু বিষ​য়টা নিয়ে। বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে লেখাটা কীভাবে শুরু করবে তা মনে মনে সাজাতে থাকল। ঝিলের ধারে কিছুক্ষণ পায়চারী করে পাড়ায় ফিরে এল। আজ আর সে তাসের আড্ডায় যাবে না। মহামায়া মিষ্টান্ন ভান্ডার থেকে সিঙারা-নিমকি খেয়ে বাড়ির পথ ধরল​। লেখার প্রথমটুকু মোটামুটি সাজিয়েই এনেছে সে। বাড়ি ঢোকার আগে দোকান খুলে একটা নতুন খাতা আর পেন নিল​। বাড়ি ঢুকে মাটুর গায়ে-মাথায় একটু হাত বুলিয়ে হাত​-মুখ ধুয়ে এককাপ লিকার চা নিয়ে সোজা চলে গেল বেডরুমে। খাটের ওপর গুছিয়ে বসে চায়ে একটা লম্বা চুমুক​ মেরে খাতার প্রথম পাতায় রামমোহন গোটা গোটা হরফে লিখল: দ্বৈপায়ন আজকাল। তারপর পাতা উল্টে দ্বৈপায়ন লিখতে শুরু করল…