বৈশাখী নার্গিস-এর কবিতা

Spread This

বৈশাখী নার্গিস

পার্ট ওয়ান (দন্ত বৈকল্য)
‘পৃথিবীটা নাকি ছোট হতে হতে … ড্রয়িং রুমে রাখা বোকা বাক্সতে বন্দী’। আরে দাদা দাঁড়ান, দাঁড়ান। কে বলল শুধু বোকা বাক্সতে বন্দী। সে তো আমার আপনার ছোটবেলায় ছিল। এখন কি আর সে অবস্থা আছে। খানিক গলা চড়ালেই তো বলবেন। ওই শুরু হল আদিখ্যেতা, ন্যাকামো। আরে মশাই ভাঁড়ামোর কি আর শেষ আছে।
আপনিই নাহয় স্যাটেলাইট কেবলের তারে জড়িয়ে গেছেন। কিন্তু এখনকার ছেলেছোকড়ারা কি তাই। হ্যাঁ জানি, ঠিক ধরেছি। আপনি আবার বলবেন, কেন আপনি বুঝি ঘাড় নীচু করে থাকেন না। নাহ, না সে থাকবো নাই বা কেন। এত কিছু এখন হাতের মুঠোয়। আঙুল ছুঁয়ে দিলেই তো ওই সব, আরে ওই যে সব দেখতে পাওয়া যায়। আর খোলসা নাই বা করলাম।
তারপর দাদা বলুন কোথায় যাবেন আপনি। ঠিকঠাক ইন্সট্রাকশন দিয়েছেন তো তাকে। যা দিনকাল পড়েছে। আপনাকে আবার অন্যগ্রহে না ফেলে আসে।
কপালের ভাঁজে লিখে রাখা আছে যত কালিমা। এই যে রুচি গেলো, শিল্প গেলো সব নিয়ে স্লোগান দিচ্ছে সব জানলায় জানলায়। আমি বলি কি, আপনি জানলাটাই বন্ধ করে দিন। হোক না উত্তরের জানলা। এখন তো শীতকাল। উত্তুরে হাওয়ায় হিম অনেক। তাই বন্ধ করুন।(অবশ্য এইসব আদিখ্যেতা না দেখতে চাইলে)।
মনের আবার অনেক মর্জি আছে। আমি আপনি কি কিছু করতে পারি। হাতের তালুতে সব… হ্যাঁ সববব…
ওই দেখুন আপনার অহং বলছে পৌঁছে গেছেন আপনার গন্তব্যে।

পার্ট টু (ল্যাদমার্কা ক্যাবলাকান্ত)
বাব্বাহ! যা শীত পড়েছে। তার ওপর এই যে মাথায় জাম্বোমানের মতো এত্ত কাজ। অফিসে মাঙ্কি টুপি পড়ে গেলেও রেহাই নেই। ঠিক চোখ পড়ে যাবে বসের। সে যাক। বসের চোখ আছে সারা অফিস জুড়ে। ও হ্যাঁ আমার মাথার ওপরেও।(আপনি এখন সিসিটিভি ক্যামেরার অধীন) আচ্ছা এই বসজ্ঞ্যামির মতো আসুন না একটা নেহাত কেলটুস মার্কা ওষুধ তৈরি করি। যার থেকে আমি, আপনি বলতে পারি- আপুনিচ ভগওয়ান হ্যায়। তারপর আসতে পারে লবিজ্ঞ্যামির গল্প। আর নাহলে নেহাত বকলমে ক্যাবলাকান্ত। রাতভর বৃষ্টি পড়লেও আপনি বিছানায় শুয়ে আছেন। তারপর এক এক করে গরম এলেও ল্যাদ। বিলকুল ল্যাদ খেয়ে টপ্পা শুনছেন। আর শীত। আহা। গরম গরম ফুলুড়ি, ফুলকপির চপ আর খাস দার্জিলিং থেকে আনা চায়ে পাত্তি। উফ জমে একেবারে ক্ষীর। আর তারপর এক এক করে অর্ডার করছেন, এই রামলোচন, সিঙ্গারা লাও, চায়ে লাও, কফি লাও।
আপনার স্বপ্ন থেকে এবার নেমে আসুন। পথভর্তি গাড়ি। আপনার হাঁটতেও ল্যাদ, কথা বলতেও ল্যাদ। আপনি ল্যাদে পিএইচডি করে ফেলতেও পারেন। কেউ আপত্তি জানাবে না। আপনি আগামী শীতেও স্নান করবেন না। ক্যালেন্ডারে লিখে রাখুন নো স্নান। তার চেয়ে তিনপাত্তি খেলুন। খেলুন লুডো। আর নাহলে ওকলাপোকলা টিংটিং।
ও হ্যাঁ, স্নানের কথা আসতেই, মাথায় বাজ। হ্যাঁ এই মেঘলা দিনেও। তবে ভর সন্ধে বেলা বলে নয়। আমি সকাল বেলাতেও হলফ করে বলতে পারি। আপনি আজ ওমুখো হননি। শুধু নমো নমো করে এসেছেন।
…তবে যাইহোক আপনার ডিওটা কিন্তু ভীষণ খুশবুদার।

পার্ট থ্রি (মনবৈকল্য)
যে মুহূর্তে উত্তর কলকাতার দুপুরের ভেতর দিয়ে এলাম একছুট্টে হরিণীর মতো ভেসে গেলো রোদ। বিকেলে যখন তার সংবাদ এলো। সে আসছে। পাশের বাড়ির জিউক বক্সে বেজে উঠল
সজনি সজনি রাধিকা লো… দেখ অবহুঁ চাহিয়া। শিরশিরে বাতাসের মতো শিহরিত হল চারদিক। আমার চোখে উঠল কাজল। ঠোঁটে লাল রঙ। মৃদু গান গেয়ে দুলে উঠলাম আবেগে।
পিনহ ঝটিত কুসুমহার,
পিনহ নীল আঙিয়া।
পশ্চিমের আকাশে তখন সূর্য যাব যাব করছে। আমার শাড়ির আঁচলে তখনও অর্ধেক দিন। লুটোপুটি খাচ্ছে আধো ঘুম। হঠাৎ দেখি কারা যেন গাইছে,
সহচরি সব নাচ নাচ
মিলন-গীতি গাও রে,
চঞ্চল মঞ্জীর-রাব
কুঞ্জগগন ছাও রে।
আমি কেঁপে উঠলাম থরথর। গালে ফুটে উঠল রক্তিম আভা। তাকে ভাবলেই তো ডুবে যেতে চায় মন দীঘির গভীরে।
সজনি অব উজার মঁদির
কনকদীপ জ্বালিয়া,
সুরভি করহ কুঞ্জভবন
গন্ধসলিল ঢালিয়া।
কতক্ষণ যেন চেয়ে ছিলাম এভাবে। খেয়াল হল এই যে অবশ, জ্বরো ভাব দুপুর থেকে। তার জন্যে স্নান হয়নি। হয়নি সন্ধে প্রদীপ জ্বালানো। পশ্চিমে আবীরের খেলা। ঠিক তার নরম আদরের মতো।
কেন সে এভাবে অপেক্ষায় রাখে। কেন বোঝে না মন। কেন বোঝে না চোখের ভাষা। কেন তাকে ছাড়া অন্ধকার নেমে আসে।
আমি চেয়ে থাকি পথে। জানলায় রেখে আসি অপেক্ষা। নিয়ন আলোর পথ ধরে সে আসবে।
মৃদুল গমন শ্যাম আওয়ে,
মৃদুল গান গাহিয়া।
আমি গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠি। শিশির বিন্দু ফুঁটে ওঠে ঘাসে। নিস্তব্ধ চাঁদ পেরিয়ে আসে একটা গোটা দিনের অপেক্ষাি