উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়-এর অনুবাদ

Spread This

উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়

মানুষের মুখ

অঁতন্যা আর্তো

গ্যালারি পিয়ের লোয়েবে ১৯৪৭ এর জুলাই মাসে আর্তোর ছবির এক প্রদর্শনী হয়। সেই প্রদর্শনী উপলক্ষে আর্তো একটি নিবন্ধ লেখেন। অনুদিত অংশটি সেই নিবন্ধের সংক্ষিপ্ত মুখবন্ধ।

এই নিবন্ধটি প্রকাশ করে ভ্যানগঘের প্রতি আর্তোর সবিশেষ শ্রদ্ধা।

আর্তোর রেখা চিত্রে মুখের আদলের থেকে উঠে আছে কঠিন হাড় আর গভীর অন্তর্ভেদী চোখের দৃষ্টি, যা প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে স্পর্ধা, অর্থাৎ যা কিনা পুনরায় সূত্রায়িত করে জড় জগতকে, ব্যক্তিগত সৃজনের গতিময়তায়।

অনুবাদঃ উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায়

শক্তি নিঃশেষ হলে যা দাঁড়ায় মানুষের মুখ তাই, মৃত্যুর এক ভূমিখণ্ড, আকারের জন্য আমাদের পুরনো বিদ্রোহ কখনও শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ হয়নি, যে আকার শরীরের নয়, অন্য কিছুর।

সুতরাং একজন চিত্রকরকে বিদ্যায়তনিক বলে তিরস্কার করা আমার কাছে খুবই উদ্ভট। সেই চিত্রকর হয়তো উৎপন্ন করেই চলেছে মুখাবয়বের আকৃতি। কেননা এছাড়া অন্য কিছু করা তার পক্ষে সম্ভব না, যেহেতু সে এখনও সেই প্রতিকৃতি খুঁজে পায়নি যা নির্দেশ করবে অথবা বিস্তারে বর্ণনা করবে মানুষের মুখ।

এর অর্থ মানুষের মুখ তার সঠিক আকৃতিটি খুঁজে পায়নি।

তাই চিত্রকরের দায়িত্ব মানুষের মুখটি এঁকে ফেলা। স্বাভাবিক তার মুখের আকৃতিতে সেই এক নাক, দুটি ঠোঁট, দুটি চোখ আর কানের দুই গহ্বর, যেটা অনেকটা কফিনের চারখোলা দরজার মতন।

সত্যি সত্যি মানুষের মুখ বহন করছে অন্তর্লীন মৃত্যুর দাবি। শিল্পীর দায়িত্ব সঠিক অর্থে সেটিকে রক্ষা করা আর পরিবর্তে নিজেরই আকৃতি মুখকে ফিরিয়ে দেওয়া।

হাজার বছর ধরে মানুষের মুখ কথা বলছে আর নিঃশ্বাস নিচ্ছে।

তবু ধারণা হচ্ছে, যা সে জানে, মানুষের মুখ সে কথা বলেনি।

শিল্পের ইতিহাসে আমি কোনও চিত্রকরকে দেখিনি যে মানুষের মুখকে দিয়ে কথা বলাতে পেরেছে। এমন কী হান্‌স অলবেইন অথবা ডোমিনিক আগ্রেও পারেনি। এই দুই চিত্রকরের প্রতিকৃতিগুলি শুধুই পৃথুল দেওয়াল যারা প্রাচীন নশ্বর স্থাপত্য শিল্পকলা সম্বন্ধে কোনও ব্যাখ্যাই দেয় না, যে স্থাপত্য ঠেস দিয়ে থাকে চোখের পাতার খিলানে, অথবা নিজেকে গেঁথে রাখে গোলাকার সুড়ঙ্গের কর্ণ গহ্বরে, দুই দেওয়ালচিত্রের মাঝখানে।

একমাত্র ভ্যানগঘ সফল হয়েছিলেন মানুষের মাথা থেকে এঁকে তুলতে সেই প্রতিকৃতি, যা ছিল চাপা হৃদয় শব্দের বিস্ফোরক রকেট।

যা কিনা প্রকৃত অর্থে তার নিজেরই।

নরম টুপিতে ঢাকা ভ্যানগঘের মাথাটি নৈর্বক্তিক ও চিত্রকলার সমগ্র প্রয়াসকে বাতিল করে দেয়। যে ছবিগুলি তার পরেও আঁকা হবে, সময়ের অন্ত পর্যন্ত সব নৈর্ব্যক্তিকতা নাকচ হয়ে যায় এখানে।

কেননা এই মুখচ্ছবি অনেকটা লোভি জল্লাদের মতো, যাকে নিক্ষেপ করা হয়েছে কামান গোলার মতো চূড়ান্ত ক্যানভাসের ভূমিতে…

যেটি আকস্মিকভাবে নিজেকে স্তব্ধ হতে দেখ-

একটি শূন্য চোখে

এইভাবে ফিরবো অভ্যন্তরে

সম্পূর্ণভাবে সত্যের বিভ্রমকে নিঃশেষ করে। যেখানে নৈর্ব্যক্তিক ও নিরাকার চিত্রকলা আমাদের আনন্দ দেয়…

এই জন্য আমার আঁকা প্রতিকৃতিতে

সবার আগে ভুলেছি নাক, মুখ, চোখ, কান, চুল আঁকতে, চেষ্টা করেছি এমন এক মুখ আঁকতে যে কিনা আমার সঙ্গে কথা বলে যাবে শোনাবে সেই গোপনতা

সে প্রাচীন মানব ইতিহাসের গল্প, যা এতদিন মৃত বলে অলবেইন ও আগ্রের মাথায় বসে ছিল

কখনও কখনও মানুষের মাথার কাছাকাছি আমি এঁকে ফেলেছি সেই গাছগাছালি

পশু-পাখি কেননা আমি জানিনা কোন সেই সীমানা যা মানুষের নিজস্বতাকে থামিয়ে দিতে পারে

বস্তুত আমি শিল্পকলা থেকে সরে এসেছি, সরে এসেছি শিল্পশৈলী ও প্রতিভা থেকে, যা আপনারা এই সমস্ত চিত্রলেখায় দেখতে পাচ্ছেন। আমি বলতে চাই যারা এদের শিল্পকলা বলবে, অথবা নান্দনিক উত্তেজনার বাস্তবতা বলে মনে করবে, তাদের জন্য নিশ্চিত নরক বাস রয়েছে।

কোনও ছবিই প্রকৃতপক্ষে শিল্পের কথা বলছেনা।

সবগুলি শুধুই খসড়া, আকস্মিকতায় বিবিধ দিকে এঁকে বেঁকে গেছে,

আমি চেষ্টা করিনি আমার রেখাগুলিকে অথবা এইসব ছবির ফলাফলকে নিখুঁত করে তুলতে কিন্তু, চেয়েছি শুধুই এক ধরনের প্রত্যক্ষ সরল রৈখিক সত্যকে প্রকাশ করতে, যার একই রকম মূল্য রয়েছে। ধন্যবাদ জানাচ্ছি- শব্দগুলিকে, লিখিত বাক্যবন্ধকে, গ্রাফিক শৈলীকে আর আকারের পরিপ্রেক্ষিতকে।

এইভাবে প্রচুর রেখাচিত্র শুধুই কবিতা ও প্রতিকৃতির মিশ্রণ, লিখিত অব্যয় আর প্লাস্টিক মৌল বস্তুর সঙ্ঘতি, মানুষ ও প্রাণীকূলের যৌথ আহ্বান।

এইভাবে আমরা মেনে নেবো বর্বরতার রেখাচিত্রগুলিকে, যা কিনা গ্রাফিকশৈলীর বিশৃঙ্খলা, যা কোনওদিনই শিল্পকলার সঙ্গে নিবিড় ছিল না, কিন্তু আন্তরিক ছিল রেখার স্বতস্ফূর্ততার সঙ্গে…

তথ্যসূত্রঃ

(১) হান্‌স অলবেইন- জার্মান চিত্রশিল্পী, যিনি উত্তরের রেনেসাঁ শৈলীতে কাজ করেছেন। ১৬শ শতাব্দীর শিল্পীদের মধ্যে প্রতিকৃতি আঁকার ক্ষেত্রে তিনি সর্বোত্তম।

(২) জঁ অগিস্ত ডোমিনিক আগ্রে- একজন নব ধ্রুপদি ফরাসী চিত্রকর।

গ্রন্থসূত্র- ওয়াচ ফিন্‌ডস এন্ড র‍্যাক স্ক্রিম ওয়ার্কস ফ্রম দ্য ফাইনাল পিরিয়ড, অতন্যা আর্তো

প্রকাশক- একসজাস্ট চেন্ডা, বোসটন- ১৯৯৫।

অঁতন্যা আর্তো

থিয়েটার অফ ক্রুয়েলটির জনক অঁতন্যা আর্তোর লক্ষ্য ছিল দর্শকের স্বাভাবিক অবস্থান থেকে সরিয়ে নিষ্ঠুরতা সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে দেওয়া। পরবর্তী থিয়েটার ব্যক্তিত্বের উপর আর্তোর প্রভূত প্রভাব অস্বীকার করা যাবে না। এই প্রসঙ্গে স্মরণে আসে স্যামুয়েল বেকেট, জাঁ জেনে এবং পিটার ব্রুক। প্রাথমিক সুররিয়ালিস্ট লেখক গোষ্ঠীর সঙ্গে আর্তোর নিবিড়তা রাজনৈতিক কারণেই ম্লান হয়ে আসে এবং নিজস্ব থিয়েটার দর্শন নিয়ে ইউরোপীয় থিয়েটারে তিনি অন্তর্ঘাত ঘটান যেহেতু তৎকালীন ফরাসী থিয়েটার নিয়ে তাঁর যথেষ্ট বিরক্তি ও ঘৃণা ছিলো। আর্তো বিশ্বাস করতেন মানুষের আভ্যন্তরীণ ‘ট্রমা’ প্রকাশ করার জন্য ভাষা যথেষ্ট নয়। সুতরাং আর্তোর থিয়েটারের সংলাপ আর্তনাদে পরিবর্তিত হয়ে যায়। অস্পষ্ট শব্দ, চিৎকার এবং আর্তরব দিয়ে তাঁর চরিত্ররা নিজেদের অস্তিত্বকে প্রকাশ করে।

লেখক পরিচিতি

১৯৫৮’র কলকাতায় জন্ম। লেখাপড়া, সাক্ষর হয়ে ওঠা, বেঁচে থাকার পথ নেওয়া এই ধূসর শহরে। অক্ষর শিল্পের সঙ্গে সখ্যতা ৭০-এর শেষাশেষি, যদিও মাঝে বহুদিন লেখার বাইরে থেকেছেন। ”সা সা” মিউজিক ম্যাগ এবং সিনেমা বিহশ্যক গ্রন্থ নির্বাচিত ”এফ” এর সম্পাদনা করেছেন। সিনেমা ও মিউজিক ছাড়া এই লেখকের প্রথম পছন্দ কবিতা আর দ্বিতীয় পছন্দ বিবিধ মহান নেশারুর সাথে কালক্ষয়।

প্রকাশিত বই

তাই শূন্য, শূন্যতা (কাব্য উপন্যাস)

বকুল বাগান(কাব্যগ্রন্থ)

সন্নাসী ও গুপ্তচর (কাব্যগ্রন্থ)

রাতের বায়োস্কোপ (কাব্যগ্রন্থ)

কোহল বারোয়াঁ (উপন্যাস)

স্টিমরোলার কিম্বা ভায়োলিন (কাব্যগ্রন্থ)

অঁতন্যা আর্তো