অমৃতা চট্টোপাধ্যায়-ভ্রমণ

Spread This
Amrita Chattopadhyay

অমৃতা চট্টোপাধ্যায়

একটি ডায়রি অথবা ব্যক্তিগত ভ্রমণ : ২    
ক্লাস সেভেন এইট। মুখচোরা। নতুন জায়গায় একটু পিছনে থাকা প্রকৃতির। আকাশ ভরা চোখগুলো নিয়ে শুধু দেখে। আর চোখ বুজলে একলাফে আরব্যরজনির কার্পেটে বসে মেঘের রাজ্য। যাইহোক, আরব্যরজনির কার্পেট না হলেও সেবার এসেছিল এম ভি হর্ষবর্ধন। বাবা মা ঠাকুমার সঙ্গে এক স্বপ্নপুরী। কলকাতা ডক থেকে কাঠের সিঁড়ি উঠে গেছে জাহাজের ওপরে। একটা চাপা উত্তেজনা। নির্ধারিত কেবিনে জিনিসপত্র রেখে এক দৌড়ে ডেক। অনেক সিনেমায় তার দেখা। আদরে চোখ বোলাতে থাকল মিতুল। জাহাজ ছাড়ল বিশাল ভোঁ আওয়াজে। তিনরাত চারদিন জাহাজে। গন্তব্য পোর্ট ব্লেয়ার। এই বিকেল নাগাদ আমরা চলতে শুরু করে ছিলাম। জাহাজ চলছে। চারদিকে ঘোলা ধূসর। মনখারাপ করা গঙ্গা জল। প্রথমে বেশ সেই জাদু কার্পেটে বসেছি মনে হচ্ছিল। যতই ডাঙার থেকে দূরে যেতে থাকলাম, ওই ঘোলাজল গাঢ় হতে থাকল মন ততই ঘোলাটে। বুঝতে পারলাম মাটির সঙ্গে একটা অদ্ভুত যোগ আছে। ছোটবেলার ‘কুমীর তোর জলকে নেমেছি’ সেটা খেলাই ভাল। প্রথম রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে শুয়ে পড়লাম।
মন খারাপ করা জল
এম ভি হর্ষবর্ধন
পরদিন সকালে ঘোলা রঙ কাটিয়ে নীলের আনাগোনা। কিছুক্ষণ পর নীল নীল এত নীল… মনে হচ্ছিল এক গ্লাস জলে পুরো এক শিশি সুলেখার ব্লু ব্ল্যাক উলটে দিয়েছি।
চলেছি চলেছি চলেছি… ঝিম ঝিম… জল জল জল… ঘোর… একটা নেশা। ওই নীল জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সম্মোহিত হয়ে পড়ছি। একটা ঘোর চেপে ধরছে…
আমি কিন্তু ঠিক এমনটা নই। ব্ল্যাকবক্সের মধ্যেও একটা আলোর ছিদ্র খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যাই। জানিনা- এই কিছুদিন সেই জীবনানন্দ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, পারমিতাদি যে কথাগুলো বলত, সেগুলো যেন বুঝতে পারছি।
নীল সমুদ্র
ওর শীত করছে। হিমেল হাওয়া ছুঁয়ে যাচ্ছে আমাকে। শীত শীত লাগছে। একটা ফাঁকা ধানক্ষেত- ধান কাটা হয়ে গেছে। মেঠো ইঁদুরগুলো জ্যোৎস্নায় full exposed  হয়ে দৌড়ে বেড়াচ্ছে খাবারের খোঁজে। দূরে ধুলো আর কুয়াশা মেশানো ধোঁয়াশার চাদর। ওদিকে কিছুই দেখা যায় না। গরম চাদর হাতড়াচ্ছি পাচ্ছি না! তাড়াতাড়ি কিছু খোঁজার চেষ্টা করছি, কিছুই পাচ্ছি না… এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে ফেলছি গোছানো টেবিল। খুব তাড়া! কীসের? সময় চলে যাচ্ছে। মৃত্যু আসন্ন। ধোঁয়াশা এতোটাই ঘন যে ওপার দেখা যায় না। আমি খাপখোলা তরোয়াল দিয়ে ধোঁয়াশা কাটানোর চেষ্টা করে চলেছি। আমি জানি এটা একটা সাজানো মৃত্যু জাল। ঠিক মায়াজালের মতো। প্রতিদিন যে মায়াজাল কাটিয়ে তিতিক্ষা অভ্যাস করার চেষ্টা করি- ঠিক সেইভাবে মৃত্যুজালও কাটানো দরকার। আগেও বলেছি, কেউ আসে না! আসে শুধু সময়। তাবলে সময়ের আগে সময়কে ডাকা কেন! হিমেল হেমন্তের ধারণার সঙ্গে, চিরবসন্তের সাধনা কি করা সম্ভব নয়? তোর বাড়ির সাদাকালো ধূসর Scandinavian interior এর টিল রঙ, সেটা নাহয় আমার বহু বাড়ির riots of colours থেকে ধারই করলি। ক্ষতি কী?
চোখের সামনে একটা উজ্জ্বল আলোর বল। ঘোর একটু কাটলো। এতো আর এক নেশা। একটা মায়াবী আলো চারদিকে। সমুদ্রের জল চিকচিক করছে। সেদিন পূর্ণিমা ছিল। ঠিক রঙের মত চাঁদও হাত বাড়ায় আমাকে ছোঁবে বলে… আর আমিও মেখে নিই হালকা আদরে।
এম ভি হর্ষবর্ধনে খাওয়া দাওয়া এলাহি। আগের দিনে চাঁদের নেশা কাটিয়ে কোনোরকমে বসলাম ব্রেকফাস্ট টেবিলে। চিকেন স্ট্যু আর সামনে রঙিন টিভি গান গেয়ে চলেছে।
বাবা
রোববারের সকাল মোঙলি  দেখতে দেখতে ব্রেকফাস্ট। ব্রেকফাস্টে থাকত, টেঙরির স্যুপ আর পাঁউরুটি বা আটার লুচি আর সাদা আলুর তরকারি। তারপর সেই মহাভারত কথা। আমরা ওই সময় ভাড়া থাকতাম হাওড়ার ভটচায্যি পাড়া। আমাদের ছিল সাদাকালো টিভি। রঙ মাখতে চিরকালই ভালো লাগে। এক দৌড়ে চলে যেতাম দোতলায় বাড়িওলাদের ঘরে। রঙিন টিভিতে মহাভারতের পুরো স্বাদ আস্বাদন করতাম এক পলকে।
আমাদের বাড়িওলা- কখনও মনে হয়নি। দিদু দাদু মানামাসি আর মন্টুকাকু। এই ছিল আমাদের বাড়িওলা। দাদু ছিল রিটায়ার্ড সেন্ট্রাল ব্যাঙ্ক কর্মচারি। দিদু আঁটোসাঁটো স্পষ্টবাদী। যেন একাই সংসার টেনে চলেছে। মানামাসি কলেজ আর মন্টুকাকু চাকরিপ্রার্থী যুবক। আমার অবাধ আসাযাওয়া ছিল ওদের বাড়ি। মানামাসির নেওটা ছিলাম আমি। দিদুর কাছে আমার আবদার আমাকে কোলে নিয়ে রান্না করতে হবে। ওই গনগনে আগুনে এক কড়া তেলে কীভাবে লুচি বা ভাজাভুজিগুলো নাচতে থাকে, সেটা আমাকে দেখতে হবে। মানামাসির বিয়ে হয়ে গেল। মায়ের ঋণ শোধের সময় থেকে গাড়িটা চলে যাওয়া অব্দি, আমাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি ওইদিন। মানামাসি চলে গেলে, দুচোখ ভাঁটার মত লাল করে ছাদের অন্ধকার এককোণ থেকে নেমে এসেছিলাম। সেইদিন থেকে বিয়োগের অঙ্কটা শিখতে শুরু করেছি।
আমরাও উঠে এলাম ওই বাড়ি থেকে নতুন বাড়িতে। বাড়ি ঠিক না বাসা। এক বাসা থেকে অন্য বাসা। ঠিক পাখির মত। ঝড়ে বাসা ভাঙে আবার বাসা। সময় মাঝে মাঝে ঝড় আসে। একটা ব্যাপার আছে। বাসার পর বাসা- জীবনকে স্থিতিশীল করে না, সেটা যেমন একদিনে খুব বিরক্তিকর আবার নতুন আলো নিয়ে আসে। আর প্রতিবার এই নতুন আলোর সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে আরও আরও আরও সোনা খাঁটি হয়।
যাকগে, বাসার গল্প ঠিক বলছিলাম না। বলছিলাম দিদু দাদুর গল্প। যোগাযোগ ধীরে ধীরে কমতে থাকল। খবর পেলাম দাদু মারা গেছে। মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে দেখা করে এল। বছর গড়ায়। আমি বড় হই। যোগাযোগ কমতে কমতে বছরে একবার বা তারও কম। শুনলাম মন্টুকাকুর বিয়ে হয়েছে। আবার আমি আর মা দেখা করতে গেলাম। এখনও পর্যন্ত গল্পটা ডালভাতের মতই যাচ্ছিল।
কিছুদিন পর শুনলাম মন্টুকাকুর বউ খুন হয়েছে। দিদু ওকে পছন্দ করত না। সে অতীব সাধারণ চুপচাপ পুতুল। হিমেল শান্ত। দোষ ছিল নিচু জাতের। অর্থনৈতিক ভাবে দিদুদের থেকে বেশ কমজোরি। মন্টুকাকু ভাব করে বিয়ে করে। চূড়ান্ত আপত্তি অতিক্রম করে কোনোমতে পাড়া আর মেয়ের বাড়ির চাপে।
রাগ জমতে থাকে। রাগ জমে জমে ঘেন্নায় পরিণত। কিন্তু পুঞ্জীভূত ঘেন্না কতটা নির্মম, কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে, যে সেটা ততক্ষণ প্রশমিত হয় না যতক্ষণ বালিশের চাপে অক্সিজেনের অভাবে শেষ শ্বাসটুকু না বের হয়ে যায়। শরীর নিথর। সেই হিমেল শান্তি সেদিন একেবারে শান্ত করেছিল ওকে। এক পাশবিক কাণ্ডের উত্তরে আর এক পাশবিক দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছিল ভটচার্যি পাড়া।
মন্টুকাকু সাদাসিধে লোক। কিছুই জানত না। অফিস থেকে ফিরছিল। পাড়ায় ঢুকতেই একরাশ ঘৃণা রাগ আছড়ে পড়েছিল ওর ওপর। ( দিদুকে পাড়াতে কেউ পছন্দ করত না, তার মুখরা স্বভাবের জন্য।) শেষে মন্টুকাকুর হাত গাড়ির পিছনে বেঁধে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে পাড়ার বাইরে বের করে দেওয়া হয়েছিল। সবকটা পাঁজরের হাড় গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল আমার সাদাসিধে মন্টুকাকুর, একটা নিচুজাতের মেয়েকে বিয়ে করার অপরাধে। যে আমাকে ছোটবেলায় খাইয়েছে। যার কোলে আমি বড় হয়েছি। সে কী করে কারোর নিথর হয়ে যাওয়ার কারণ হতে পারে!
আজ বুঝতে পারি দিদুর সাহায্যের দরকার ছিল। হাত কেউ বাড়ায়নি সেদিন। সবাই এড়িয়ে গেছে। রোগ বেড়েছে। আমি স্বপ্ন দেখি এমন একটা অবস্থার, যেখানে হাত বাড়ানো থাকবে অথচ মুঠো থাকবে খোলা। একটা বন্ধুত্বপূর্ণ মুক্ত সহাবস্থান।
ওই সবুজ জঙ্গল দেখা যায়। তিনদিন জলজ জীবন যাপনের পর প্রথম দ্বীপ দেখা গেল। ঘোরটা কাটতে শুরু করেছে। ঝিম ঝিম তাধিম তাধিম কাটিয়ে নীল সবুজ মিশে এক টগবগে জীবন্ত প্রাণ।
বাবা আর আমি