সোমনাথ ঘোষাল-এর গল্প

Spread This

সোমনাথ ঘোষাল

চাঁদ ভাঙা জল         
 বিষণ্ণ চাঁদ উঠে আছে। মাথার কার্নিশে। ভাঙা খিড়কির ফাঁক দিয়ে মন খারাপ নামে। হাতের তালুতে। মাখামাখি করে উড়ে যাবে সেই রাত। তারের গা বেয়ে পুরোনো বাড়ির ছাদে। গায়ে গায়ে লেগে আছে ঘরদোর। চেনা কেউ। নাহলে জামা কাপড় দেখে মনে হয়। বাড়ির মায়াকথা। লোটন মাটি ছুঁতে শিখেছে। সারাদিন বিভিন্ন মানুষের মুখ দেখে, ভাবে ছাঁচে ফেলা যাবে কি না! এই বছর চারটে ঠাকুরের কাজ পেয়েছে। ভাগাভাগির ঘরে। ওর ঠাকুর চারখানা। ছোট ঠাকুর। গতবার অনেকগুলো ঠাকুর ছিল। এবার দাদারা দেয়নি। আইবুড়ো ছেলে। চারটেই অনেক। তাও ভাগ আছে। ভাড়া বাড়ি হলেও। অনেক জায়গা। কালীচরণ লেনের পুরোনো লোক। লোটন শুয়ে শুয়ে চাঁদের আলো দেখছে। আর কদিন পর মহালয়া। তিরিশ পেরিয়ে সদ্য হাত পাকিয়ে নাক চোখ মুখ আয়ত্ত করেছে। এখনও শরীরের গড়ন বাকি। ছেলে ঠাকুর হলে সমস্যা হয় না। লোটন ছেলেদের শরীর দেখে নেয়। নাহলে নিজের। মা বলতো কার্ত্তিক। কিন্তু মেয়ে ঠাকুরের শরীর বানানো সমস্যা। লোটন শরীর না ছুঁলে মাটি দিতে পারে না। কাঠামোয়।
ঘরের দেয়ালের এককোণে কিছু কেন্নো বেরোয়। স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ। রোদ বিশেষ আসে না। এই জলের সময়। পোকামাকড়ের আনাগোনা বাড়ে। কিন্তু ভ্যাপসা গরমে লোটন মাটিতেই শোয়। বাইরের ঘরে। কারোর সঙ্গে বনিবনা নেই। লোটন নিজেকে শিল্পী ভাবে। আর্ট কলেজ পাশ করে ভেবেছিল নতুন কিছু করবে। যেমন সবাই ভাবে। কিন্তু হয় না। লোটন সেই না হওয়ার দলে। চেনা গল্পের ছকে পড়ে সেই বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিচি। সবাই তাই বলে। আসলে লোটনকে দাদারা কাজ দেয় না। কারণ সেটা ঠাকুর নয়! দুটো কেন্নো জড়িয়ে শুয়ে আছে। মনে হয় ওরা করছে! আঙুল দিয়ে লোটন নেড়ে দেয়। আরও কুন্ডলী পাকিয়ে ওঠে। লোটন মাসির কথা ভাবে। মরে গেছে। তাও ভাবে। কারণ মাসি এলেই পাশে শুতো। আর বাকিটা ছিল কল্পনা। মুড়ি খেতে খেতে ঠোঙাটা ফুলিয়ে ফাটায়। ভাবে কেন্নোটা মরে যাবে। মাসি কেন মরে গেল? লোটন আবার ঘর অন্ধকার করে চাঁদের আলো দেখে। হাঁ করে গিলতে গিলতে গুঁড়ো গুঁড়ো স্বপ্ন পড়ে থাকে। লালকালো মেঝেতে। মনে হয় কেন্নো দুটো রঙ তুলে মিশে গেছে। লোটন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। একটা আস্ত শরীর খুঁজতে থাকে প্রতিটা বাড়ি আলো কার্নিশে।
মরার ঘাটে বসে। একটা বিড়ি ধরায়। এখানে ছায়াদের আনাগোনা বেশি। ঘাটের শেষ সিঁড়িতে গায়ে কাঁচা আলো মাখা লোক। মুখবাঁধা। গঙ্গার জলে সারা শরীর নিভিয়ে নিচ্ছে। কাঁচা কাঁচা আলো ছড়িয়ে যায় রাতের সিঁড়িতে। লোটন আস্তে আস্তে এগোতে থাকে লোকটার দিকে। জিভ দিয়ে চাটতে থাকে সমস্ত আলো। অন্ধকার ক্রমশ গাঢ় হয়ে গেলে মৃত ছায়াদের আয়তন বাড়ে। সিঁড়ির ভাঁজে ভাঁজে লেগে থাকে আজন্ম খিদে। খিদের আলো। আলো নিভে আসে শিরায়। লোটনের বাঁড়া ধরে কচলাতে থাকে লোকটা। আলো গলতে যায়। লোটন কেন্নোর মতন লোকটাকে জড়িয়ে ধরে।
মাটিতে জমতে থাকে মৃত আলো। লোটনের শরীর গঙ্গার পাড় ছুঁয়ে আছে। জল লাগছে শরীরে। মাটিতে। পোকামাকড় ভীড় করতে থাকে। গাছের ছায়া ঢেকে দেয় সিঁড়ি। নক্সাকাটা রাতে লোটন পড়ে থাকে। লোকটা মাটি লেপটে শরীরে। কাঠামোর ওপর শুইয়ে লোটন প্রতিমার আকারে। লোটনের নিটোল দুটো স্তন। মাটির যোনি। ঊরু। সারা শরীর মাটি লেপটে আছে। কাঠামোতে। পূর্ণিমার আলোতে লোটনের শরীর কাঁপতে থাকে। কাঁপতে থাকে আলো। জলের পাড়। যৌনাঙ্গ ক্রমশ ভিজতে থাকে আলোতে। লোটনের মাটির শরীর। ছোটবেলায় যেভাবে মাসিকে খুঁজে যেত। ঠাকুরের মতন দেখতে! লোটন ঘুমিয়ে থাকে। মাটির মতন। কাঠামোর শরীরে।
পূর্ণিমার জলে এইভাবেই মৃত আলোরা বেঁচে ওঠে। গঙ্গার শরীর বেয়ে বেড়ে ওঠা ছায়ারা লোটনের আলোমাটি খুঁজে দেয়। কাঠামোর শরীরে।