কিরীটি মাহাত-র প্রবন্ধ

Spread This

কিরীটি মাহাত

হারিয়ে গেল আষাড়িয়া সুর, টাঁইড় গীত
পশ্চিম সীমান্ত বাংলার পুরুলিয়া জেলা তথা সাবেক মানভূমকে বলা হয় গানভূম।এই অঞ্চলের লোকসমাজ ও সংস্কৃতি এক আশ্চর্য গানের ভুবন।নৃত্য ও সঙ্গীতময় এদের প্রাত্যহিক জীবনচর্যা-উৎসব, পরবপালি,লোকাচারও তাই। এদের সমাজ ও অর্থনীতি পুরোপুরি কৃষিনির্ভর। কৃষিই একমাত্র উপায় ও অবলম্বন। হয়তো এই কারণেই বারোমাস জুড়ে যে সকল পরবপালি,লোকউৎসব, আচার-অনুষ্ঠান রয়েছে তা সবই হলো কৃষিভিত্তিক। আখান থেকে মকর,ভানসিং রহিন, জাওয়া-করম, বাঁদনা যার অন্যতম। এই সকল পর্ব বা অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক গীতগুলিকে আমরা তাই কৃষি বা কর্মসঙ্গীত হিসেবেই গণ্য করতে পারি। তবে এই অঞ্চলে আরও এক প্রকার গীত শোনা যায় যেগুলিকে ঋতু পর্যায়ের গান বলেও দাবি করা যায়। যার মধ্যে অন্যতম হল সারহুল,টাঁইড় বা কবিগান,পাঁতাশালিয়া ঝুমুর,উধোয়া এবং চাঁচর গীত। এইগুলিকে ঋতুভিত্তিক বলা যায় এই কারণেই যে,অন্য কোনো ঋতুতে এই গান গাওয়া যায় না বা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই ঋতু পর্যায়ের গীতগুলির অন্যতম হল কবি বা টাঁইড় গীত।কবি বা কবিতা বলতে সাধারণত পদ বা পদকর্তা অর্থ বোঝায়।তবে বেদে কৃষককেও কবি বলা হয়েছে।সে অর্থে কবি হল কৃষকের গান।হয়তো এই কারণে অনেকে একে ধান রোয়ার গান বলেও অভিহিত করে। আর ‘টাঁইড়’ শব্দের অর্থ ডাঙা বা মাঠ। উঁচু খোলামেলা ভূমি। এই গান ঘরে বা বাড়িতে গাওয়া নিষিদ্ধ। ক্ষেত, বিল, টাঁইড়, টিকরে গাওয়া হয় বলেই হয়তো এর আর এক নাম টাঁইড় গীত। অবশ্য স্থান ও অঞ্চলভেদে একে ‘হুদি’ও বলা হয়ে থাকে।
        যাইহোক, কবি বা টাঁইড় গীত হল একটি প্রাচীন পর্যায়ের গান। যার গড়ন বা পদ মাত্র দুইটি। ভারতীয় সঙ্গীতের এটি দ্বিপাদিকা পর্যায়ের গীত।বর্ণবিন্যাসে নির্দিষ্ট নিয়ম বা বিধি না থাকলেও অন্তমিল রয়েছে প্রায় সব গীতে। সাধারণত কৃষিকাজে যুক্ত শ্রমিকরা(মেয়ে বা ছেলে) সমবেতভাবেই এই গান পরিবেশন করে থাকে। এইটিই রীতি, তবে এককভাবেও যে কেউ পরিবেশন করতে পারে। গানের বিষয়-সাধারণত নর-নারীর যৌন নিবেদনমূলক, লৌকিক প্রেম, ভালোবাসা প্রধান।তবে সমাজ ও জীবনের সহজ কথাও এতে সহজভাবে ব্যক্ত হয়। অনেক সময় একজন বা একপক্ষ গানের মাধ্যমে প্রশ্নও ছুঁড়ে দেয় অন্য পক্ষকে।অন্য পক্ষ গানে তার উত্তর জানায়।প্রাণ খুলে উচ্চকন্ঠে এই গান গাইতে হয়।বন,পাহাড়,ডুংরির দেশে বিলে ক্ষেতে এই গান প্রতিধ্বনিত হয়ে চারিদিক মুখরিত করে তোলে।ক্ষেতের কামিন সাঁঝবেলায় এই গান গাইতে গাইতে ফিরে আসে ঘরে। যদিও এই গান আর এখন বেশি শোনা যায় না।
                  ১
ডাঁঢ়া নদীর মাঝখানে হে
সত্যি বন্দি কইরব দুজনে হে।
                  ২
দে ছাতা আমি ধরি হে
টেঁপের আড়ে ঘর চল তুমি হে। 
                    ৩
চল যাব মরিচ বনা হে
আনব মরিচ বিকব দুজনা হে।
                     
                    ৪
দে-ন বিড়ির দর কইরে হে
ছেল্যা কাঁদছে পরের ছাঁচতলে হে।
                     ৫
শাল পাতে পলাশ পাতে হে
মরণ আছে সতীনের হাতে হে।
        
                       ৬
কি দিলি পলাশ পাতে হে
ঝুরা মিশি লাগে না দাঁথে হে।
 
                        ৭
বড় পাকা আলা ঝালা হে
নাঙের ছেল্যায় ঘর করে আলা হে।
 
                          ৮
কুইল খাবি গটা গটা লো
ভাদর মাসে খেলাবি বেটা লো।
 
                            ৯
গাই পালে ছাগল চরে হে
ঐ ছাগলে মন পাগল করে হে।
 
                          ১০
সিঁকার মুড়ি সিঁকায় রইহল লো
কাঁথা কাপড় কে পাড়ে দিবেক লো।
 
                          ১১
আমি জানি না বার জ্বালা হে
শিখাঞ দিল থুভড়া খালভরা হে।
 
                           ১২
নাঙের বেটা সিপইতা রে
সিঁকাই তুলা রইল গুড় পিঠা রে।
 
                           ১৩
তকে দেখেছি শিশু কালে রে
নাম জানি না ডাইকব কি বইলে রে। 
                        ১৪
তকে ছাইড়ব না জীবন গেলে হে
ভাব কইরেছি এক গলা জলে হে।
                    ১৫
উঠ ধনি সকাল হল্য লো
ভুড়কা তারা দুয়ারকে আল্য লো।
                       ১৬
হামকে বিহা দিল শিশু বরে হে
ঘুমাঞ গেল খাইট বাজু ধইরে ্য হে।
                         ১৭
কিনে দে নারকেলের ছড়া হে
জল আইলে ডাঁঢ়াব কথা হে।
                          ১৮
তর ভিতর মনে খল আছে হে
উপরে বালি তলে জল যাছে হে।
                           ১৯
রিমি ঝিমি বরষা পড়িছে হে
খনে খনে হামার মনে পড়িছে হে।
                           ২০
লুবুর লুবুর বিলাতি পাকা হে
অ-তুঞ খাঁয়ে লে বাবুর কাকা হে।
                          ২১
জল দে জল দে পরাণ গেল হে
জল দিঞে পরাণ হ’রে লিল হে।
                           ২২
যা-ন বেলা সট করে ্য হে
ছেল্যা কাঁদছ্যে পরের ছাঁছ কলে হে।
                          ২৩
ছেল্যা ফেইলে দে তালতলে হে
দেখি ছেল্যায় কাকে বাপ বলে হে।
                           ২৪
ডাঁঢ়া ডুঁটু বড় তলে গো
গরু মেশাঞ আসি গাইপালে গো।
                           ২৫
জল দে বাড়ীর বাইগনে হে
ছেঁছকি করে ্য দিব ধরনে হে।
                           ২৬
কি বললি অনেক ধুরে হে
শুনতে পাই না শীতলি হাওয়াতে হে।
                           ২৭
কথা যাছি ছেল্যার কাকা হে
আনে দিবি জড়া কেঁদ পাকা হে।
                           ২৮
পুরুল্যাটার এই ধারা হে
বহিন বিকে লেয় হালের কাড়া হে।
                     ২৯
হালের কাড়া মরে ্য গেল হে
বহিন বিকা বিফলে গেল হে।
                       ৩০
তর মায়া আহাট মারে হে
ঘরে যাঁয়ে দিস বারুণ করে ্য হে।
                        ৩১
তর মরদ ঘরে আছে লো
আমার সঁগে মুহের ভাব আছে লো।
                       ৩২
লাইন ধারে লাই লতা গো
রাইত ঘুমালে সকালে বেটা গো।
                       ৩৩
ধান রু মনের মন দিঞে লো
ডাইল রাঁধেছি কলের জল দিঞে লো।
                        ৩৪
ভাতের ডালা কই আল্য লো
গুণিনের কি বেটা হইল্য লো।
                        ৩৫
পুরুল্যার কামিনী গো
হল্যদ তেলে ডুব দিব আমি গো।
                       ৩৬
সতীনের মাঞ মরেছে গো
লিল ধুঁয়াটা উড়ছে আকাশে লো।
                        ৩৭
এক সিঁথানে দু মাথা হে
তাউ বললি না অন্তরের কথা হে।
                        ৩৮
চল্যে গেলিস ফিটা করে ্য হে
তর বিনু কি সকাল হল্য না হে।
                        ৩৯
তর পিরিতি জনমের আগুন হে
লাগল আমার পাঁজরায় ঘুইন হে।
                        ৪০
ভাভের গাছের হরতকি রে
আর ভাভিস না দু-দিনকে যাছিরে।
                       ৪১
বইল্যে ছিলি কই আলি রে
টিনের আগুড় ভুলুকে ভালি রে।
                        ৪২
তর মনে আমার মনে হে
লেখে দিব কালি কলমে হে।
                       ৪৩
টাংনায় রুপু পাইখ দলে হে
পাইখ দলে ন শিশু শ্যাম দলে হে।
                    ৪৪
শ্যামের গামছা নাই ভাবে মরি হে
পাড়ঁই পুন্ঞ্চায় টানাইছি নুড়ি হে।
                      ৪৫
আসিস ত হবেক দেখা হে
না আসিস তো এই দেখার দেখা হে।
                       ৪৬
শ্যামকে  মরতে দিব না হে
আম ডাল ভাঙে শ’য়ে ঝাঁপ দিব হে।
                        ৪৭
বাগালের বউ হব নাই হে
টাঁইড়ে মরলে খবর পাব নাই হে।
                        ৪৮
যা কেনে কথা যাছি হে
এমন ভাতার বাছে রাখেছি হে।
                        ৪৯
কাল লয় কাল সনা হে
কালর সঁগে যায় কত জনা হে।
                        ৫০
ভাব করেছি এক গলা জলে হে
তকে ছাড়ব নাই জীবন গেলে হে।
                         ৫১
মাথা বাঁধে দে মায়ের মসি গো
কাসে হাবড়া রেল দেখে আসি গো।
                        ৫২
রেল খালাসির বউ হব হে
বাজু দলাঞ ভাত দিতে যাব হে।
                         ৫৩
ডালিম পাকায় রস ভরা হে
খাতে বললে খায় নাই খালভরা হে। 
                        ৫৪
ডালিম পাকে ঘোর হল্য হে
এ ভাগনা তর মামা কই আল্য হে।
                      ৫৫
পুরুল্যারি অলি গলি হে
কন গলিতে শ্যাম গেল চলি হে।
                       ৫৬
কে আছে তর মাঁই-মসি হে
কেউ ছুয়াই নাই রাঁধা বেসাতি হে।
 
 
 
শব্দার্থ: 
  ডাঁঢ়া- দাঁড়ানো
  টেঁপ- শাড়ির আঁচল
   আলা-ঝালা- প্রচুর
    নাঙ- স্বামী
   থুভড়া-  অবিবাহিত
   ভুড়কা তারা- ভোরের তারা
    ডুঁটু- মৃত গাছের ভেঙে যাওয়া ডাল     
বহিন বিকে- বোনের বিয়ে দিয়ে
আহাট- ইশারা
রু- রোপণ করা
গুণিন- মালিকের স্ত্রী
সিঁথান- বালিশ
আগুড়- কপাট
ভুলুক- ফাঁক ফোকর
টাংনা- দোলনা
ভাতার- স্বামী
বেসাতি- তরকারি
 
 
 
 
 

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.

Lorem ipsum dolor sit amet, consectetur adipiscing elit. Ut elit tellus, luctus nec ullamcorper mattis, pulvinar dapibus leo.