শুভেন্দু দেবনাথ-ভ্রমণ

Spread This

শুভেন্দু দেবনাথ

রোদ পড়েছে পাহাড় চূড়ায় কাঞ্চনজঙ্ঘা
সর্বনাশা পাহাড় এবার আমায় খাবি খা।
সালটা ২০০৪ এর একেবারে শুরু। দিল্লি থেকে ফিরেছি কলকাতায় ২০০৩ এর একেবারে শেষ দিকে। আইটির চাকরি ততদিনে আমাকে মানসিক ভাবে একেবারে শেষ করে ফলেছে। হাঁফিয়ে উঠেছিলাম দিল্লির দ্রুতগতির জীবনের সঙ্গে। তখনও দিল্লিতে বিডিএনসিআর (Bengali at Delhi and NCR) গ্রুপের সঙ্গে পরিচয় হয়নি আমার। চন্দননগরের বাড়িতে ফিরে আবার সেই চেনা কলকাতার চৌহদ্দিতে ঢুকে পড়েছি। রোজ সকালে ৮টা ২০ র বর্ধমান লোকাল ধরে হাওড়া সেখান থেকে রবীন্দ্রসদনে আড্ডা, আবার রাত ১১টা ৪৪ এর শেষ ট্রেন ধরে বাংলা মদ কিংবা গাঁজা কখনো স্প্যাজমোপ্রক্সিভন বা এন১০ এর নেশায় ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ি ফেরা আর মায়ের চিৎকার। হাঁফিয়ে উঠেছিলাম এখানেও। মাথার ভেতর চাড়া দিয়ে উঠছিল পুরোনো নাটকের নেশা। এদিকে পকেট গড়ের মাঠ। কখনো বন্ধুদের কাছ থেকে মায়ের অসুখের নাম করে অথবা অন্য মিথ্যে বলে টাকা নিয়ে চলছিল জীবন। কীভাবে চলছিল জানি না। কারণ সবসময় যে টাকা পাওয়া যেতো তাও না। কারণ তখন অনেকেই ধরে ফেলেছিল আমার চালাকি। চুঁচুড়া টু হাওড়া স্রেফ মামার রেলগাড়ি মানে সোজা ডাব্লিউটি। আর হাওড়া থেকে কখনো কেউ চেনা বেরিয়ে গেলে বাস এর টিকিট এর ব্যবস্থা হয়ে যেতো। নচেৎ ১১ নম্বরই ভরসা। অনেকবার বাসেও ডাব্লিউটি হয়েছি। ভিড়ের ভিতর শৈল্পিক নৈপুণ্যে নিজেকে আড়াল করেছি, নইলে পুরোনো টিকিট মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে রবীন্দ্রসদন। কন্ডাক্টার টিকিট চাইলে অবলীলায় হাঁ করে চেবানো টিকিট দেখিয়েছি, সেটা সেই বাসেরই কিনা ধরা ছিল কন্ডাক্টরের বাবার অসাধ্য। ফলে সেও চুপ আর আমিও গন্তব্যে। এই যখন অবস্থা সেই সময় পাড়ার বাচ্চুদার সঙ্গে দেখা। নানা রকম সাংস্কৃতিক চর্চা করতাম বলে পাড়ায় তখন এসব ব্যাপারে আমার খোঁজ পড়ত। সেই সময় চন্দননগরে সৃজন বলে একটা নাটকের দলের সদস্য ছিলেন বাচ্চুদা। তো সেই বাচ্চুদার সঙ্গে দেখা। বলল একটা নাটকের জন্য তোকে চাই। রাজি হয়ে গেলুম। বাচ্চুদার সঙ্গে একদিন পৌঁছালাম রিহার্সালে। আমার অভিনয় ওদের ভালোও লাগলো।
কিন্তু অভিনয় করা আমার বেশিদিন হলো না। কারন পকেট খাঁ খাঁ। ডিরেক্টার ধীমান দা স্নেহবশত আমাকে বললেন নাটক পরে করবি আগে চাকরি কর। তিনি এক বন্ধুর কাছে পাঠালেন ঠিক কলামন্দিরের উল্টোদিকের পেট্রোলপাম্পের গায়ে একটা অফিসে। সেখানকার ম্যানেজার ধীমানদার বন্ধু। চালাক চতুর এবং খুব ভালো মিশতে পারতাম বলে চাকরিটা আমার হয়ে গেলো। চায়ের বাগানের চাকরি। যেতে হবে দার্জিলিং। তার আগে কলকাতায় হবে ট্রেনিং। কি ট্রেনিং? না বসে বসে চায়ের নাম মুখস্ত, তাদের কোড মুখস্ত সেই সঙ্গে তাদের দাম এবং গুণাগুণ। বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল। সারাদিন ওই সব মুখস্ত করা তারপর মাঝে মাঝে সিনিয়রের সঙ্গে বেরিয়ে মার্কেট সার্ভে। ১৫ দিনের মাথায় ঠিক হলো এবার আমি যাব আসল জায়গায়। জায়গাটা হলো অরেঞ্জভ্যালি টি গার্ডেন দার্জিলিং। পছন্দ হলো চাকরি। আইটির কচকচানি থেকে মুক্ত। যথা সময়ে কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে চেপে শিলিগুড়ি। সেখানে লোকাল ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করাতে তিনি একটা টাটাসুমোর ব্যবস্থা করে দিলেন। যাত্রী ৬ জন, মাথা পিছু ১২০টাকা ভাড়া। শিলিগুড়িতেই খেয়ে নিলাম সামান্য কিছু। তারপর চেপে বসলাম ড্রাইভারের পাশে। চুপ করে বসে থাকা আমার স্বভাববিরুদ্ধ ফলে কিছুক্ষণের মধ্যে ভাব জমে গেলো ড্রাইভারের সঙ্গে। রাস্তায় মাঝে গাড়ি থামিয়ে খাওয়া হলো দুপুরের। তারপর পাহাড়ের বাঁক থেকে বাঁক ঘুরপাক খেতে খেতে পৌঁছলাম সেই স্বপ্নের দেশে। খুঁজেপেতে বের করলাম লোকাল অফিস। প্রথমে আমার কয়েকদিন পোস্টিং হলো দার্জিলিং পোস্ট অফিসের কাছে আমাদের এক শোরুমে। সেখানে কিছু ট্রেনিং করার ছিলো। আর লোকাল অফিস আমার থাকার ব্যবস্থা করলো পোস্ট অফিসের গায়ের ম্যাডামের গেস্টহাউসে। বাঙালি সেই অপরূপা ভদ্রমহিলা বেশ ভালোই ব্যবসা ফেঁদেছিলেন সেখানে। সমস্ত বাঙালি যারা কাজের সূত্রে দার্জিলিং-এ ছিলেন অধিকাংশই ম্যাডামের বোর্ডার। সেই অপরূপা (ওনার নামও অপরূপা)বিধবা নিঃসন্তান ম্যাডামের সঙ্গে পরে আমার একটা অন্যরকম সম্পর্ক হয়। যাতে পরে সেই গেস্টহাউসের অন্য বোর্ডারদের আমি ঈর্ষার পাত্রও হয়েছিলাম। বিশেষ করে  ৫৮ বছর বয়েসি এক নিপাট ভদ্র বাঙালি স্টেটব্যাঙ্ক ম্যানেজারের। যাই হোক শুরু হলো আমার কর্মজীবন। শোরুমে টুরিস্টরা আসেন। তাদের চা নিয়ে বোঝাতে হয় আমাকে। দেশীয় টুরিস্ট তো বটেই বিদেশি টুরিস্টদেরও সামলাতে হতো। প্রথমে নানা রকমের চা দেখাতে হতো তারপর দু চার রকমের চা শো-রুমে রাখা টি- মেকারে বানিয়ে তাদের খাওয়াতে হতো। তারপর যদি পটাতে পারতাম তাহলে কেল্লা ফতে। শোরুমে আমরা তিনজন ছিলাম। স্থানীয় মহেশ ভাই (নেপালি নয় উড়িষ্যার মানুষ, জন্ম দার্জিলিং এ) আর নেপালি ধনুষ। জাপানি কাস্টমার এলে মহেশ ভাই ভাঙা ভাঙা জাপানিজে তাদের বোঝাতো। এই কাজে দীর্ঘদিন থাকতে থাকতে নানান বিদেশি ভাষা অল্প অল্প বলতে পারত। জাপানি কাস্টমার এলে চায়ের নাম বলতো তারপর বলতো “ইবায় কো দো যাকো…” অর্থাৎ কিনা ১০০ গ্রামের দাম……। কত রকমের চায়ের নাম, কত রকম তাদের দাম। মাঝে মাঝে দাম শুনলে চুঁচুড়া মফসসলের ছেলে আমি ভিরমি খেতাম। গ্রীন টি, হোয়াইট টি, অরেঞ্জ হোয়াইট টি, অরেঞ্জ টি, ফার্স্ট পিক, সুইট বাসিল, ফ্লাওয়ারি ব্রোকেন পিকো কত প্রকার ভেদ। সব থেকে দামি ছিল হোয়াইট টি। সেই সময় প্রায় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকায় ১০ গ্রাম। দুটি পাতা একটি ফুলের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া হাল্কা সোনালি রঙের চ্যাপ্টা একটা পাতার মত কুঁড়ি।
মহেশ ভাইয়ের হাতে পড়ে অল্পদিনেই আমি চৌখশ হয়ে উঠেছিলাম। আর ততদিনে আমি প্রেমে পড়েছিলাম অপরূপা ম্যাডামের। তিনি ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী। কমন খাবার জায়গায় রাতের দিকে সবার খাওয়া হলে এক কাপ চায়ের অর্ডার দিয়ে আমি লিখতে বসতাম। উনিও কাউন্টারে বসে কাজ করতে করতে লক্ষ্য করতেন আমাকে। শেষে আমি লিখি জেনে পড়তে চাইলেন। ধীরে ধীরে অসমবয়সি দুজন মানুষের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে উঠলো। সব কাজ সেরে ১১টার পর তিনি আমাকে ডাকতেন তার ঘরে। তারপর ফায়ার প্লেসের আগুনের ধারে বসে চলত আমাদের নানান আড্ডা– কখনো তার জীবনের, কখনো আমার জীবনের, কখনো সেই আড্ডা চলত গান নিয়ে সাহিত্য নিয়ে। ধীরে ধীরে কখন যে আমরা একে অপরের অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলাম তা বোধ করি বোঝা মুশকিল ছিল। সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে মন থেকে ছড়িয়ে পড়েছিল শরীরে। তার সঙ্গেই নিউ ইয়ারের রাতে মাতাল হয়েছিলাম লোকাল মদ ছাং এর নেশায়। বয়সে বড় হবার দরুণ তিনি ছিলেন আমার প্রতি স্নেহশীলা,একটা হালকা শাসন অনেকটা ঠিক মায়ের মতন খানিকটা প্রশ্রয় মেশানো ধরা পড়ত তার আচরণে।
এরপর আমার জায়গা হলো আমার প্রধান কাজের জায়গায়। অরেঞ্জভ্যালি টি গার্ডেনে। দিনভর কুলি কামিনদের সঙ্গে পাতা তোলার কাজের তদারকি। বেলা পড়লে বাগান থেকে যখন হেঁটে ফিরতাম গেস্ট হাউসের দিকে, তখন চোখে পড়তো অদ্ভুত সব দৃশ্যাবলি। কোথাও একদল নেপালি তরুণ তরুণী রাস্তার পাশে বাঁধানো বেদিতে বসে গিটার বাজিয়ে গাইছে নেপালি গান “ মন কো কুরা লাই বাধি নারাখা / গাথো পারি জালা চাট্টা শুনাই দেউ /রিমিঝিমি সাঞ্ঝা ইয়ো সামঝা মানাইমা / ঘাম ছায়া ওরিপারি রাহালা মানাইমা”।
কোথাও তিন চারটি ছেলে মেয়ে গাঁজা ভরা সিগারেটে টান দিচ্ছে,মাঝে মাঝে বসতাম ওদের সঙ্গে, কোথাও ঘরে ফিরছে ক্লান্ত পুরুষ নারী। টুরিস্টদের আনাগোনার ভিড়ে বিকেলের সূর্য কাঞ্চনজঙ্ঘার পিছনে মিলিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
চিরকালই আমি ইতিহাসের ভক্ত। কিন্তু কোথাও বেড়াতে গেলে কিংবা কেটে পড়লে আমি কোনদিনই মন্দির মসজিদ কিংবা কোন স্থাপত্য দেখতে যেতাম না। এসবের ইতিহাস আমাকে তেমনভাবে টানেনি কোনদিন। যা আমাকে চিরকাল টেনেছে তা হলো মানুষের ইতিহাস, সভ্যতার ইতিহাস। যেখানেই গেছি খুঁজে বেরিয়েছি সেখানকার মানুষের গল্প, তাদের কালচার, তাদের জীবনের ইতিহাস। আর খুঁজে বেরিয়েছি সেই শহরের বেড়ে ওঠার গল্প, সেই শহরের উন্নতির ধাপে ধাপে ওঠার গল্প। দার্জিলিং এর ইতিহাস আমাকে প্রথম শুনিয়েছিলেন ফাদার জেমস। ৭০ এর কাছাকাছি এই মানুষটি কাছে পিঠেরই এক চার্চের পাদরি ছিলেন। রোজ সন্ধ্যেবেলা তিনি বেড়াতে বেরোতেন, ক্লান্ত হলে বসতেন রাস্তার ধারে ওই ছেলে মেয়ে গুলোর একটু তফাতে। এভাবেই একদিন এই অসমবয়সি মানুষটি আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন।, আর যে মানুষটি আমাকে দার্জিলিং এর গল্প শোনাতেন তিনি সুখলাল তামাং। স্থানীয় এই মানুষটির একটি ছোট কিউরিও শপের দোকান ছিল আমাদেরই শোরুমের পাশে। আমি ফাঁকা থাকলে মহেশ ভাইকে বলে যেতাম ওই দোকানে। ফাঁকা থাকলে বৃদ্ধ গল্প শোনাতেন আমাকে। এভাবেই একদিন জেনেছিলাম টয় ট্রেনের ইতিহাস। এই খেলনা রেলের পথ নির্মাণ শুরু হয়েছিল ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে। আমার জন্মের ঠিক একশো বছর আগে। এবং দু তিন বছরেই এর কাজ শেষ হয়েছিলো। এই রেল পথের প্রথম আকর্ষণ হচ্ছে লুপ। এই লুপ অনেকটা ফাঁসের মতন। পাহাড়ের গা ভেদ করে এগিয়ে গেছে এই লুপ। পাহাড় কে সাপের মতন জড়িয়ে ধরে খেলনা গাড়িকে উপরে উঠে যাবার পথ করে দেওয়া হয়েছে। এই লুপ ছাড়াও টয় ট্রেনের আরো একটি আকর্ষণ হলো জিগজ্যাগ। স্যার অ্যাসলে ইডেন এবং ফ্র্যাঙ্কলিন প্রিস্টেজ এই দুজনে মিলে এই রেলপথের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই কাজ যখন পুরোদমে চলছে তখনই দেখা দেয় এক অদ্ভুত সমস্যা। পাহাড় বাধা হয়ে দাঁড়ালো তাদের সামনে। পাহাড়ের গায়ে পাক খেয়ে ওঠাও যায়না আবার পাহাড় কেটে মাঝখান দিয়েও পথ বের করা যায়না। দুই সাহেবের দাড়ি চুলকেও সমাধান বের হয় না, মাথার চুল ছেঁড়াও বৃথা। তখন একদিন স্যার অ্যাসলের স্ত্রী তাকে পরামর্শ দেন পাহাড় যখন এগোতে দিচ্ছে না তখন কাম ব্যাক। সমাধান খুঁজে পেলেন সাহেব। শুরু হলো পিছিয়ে আসা। পৃথিবীর রেল পথের ইতিহাসে তৈরি হলো এক নতুন জিনিস যার নাম রিভার্স। স্থানীয় ভাষায় জিগজ্যাগ। পাহাড়ে ওঠার মুখে বন্ধ রাস্তায় ট্রেন দাঁড়িয়ে পড়ে, লাইনম্যান সিগনাল হাতে দাঁড়ায়। লাইন বদলের নির্দেশ দেয়। পিছিয়ে আসে ট্রেন। আবার লাইন বদলে এগিয়ে যায়। এই ভাবে ধীরে ধীরে আগুপিছু করতে করতে খেলনা গাড়ি উপরে ওঠে, তারপর জিগজ্যাগ পেরিয়ে আবার স্বাভাবিক গতিতে পাহাড় চিরে এগিয়ে চলে ট্রেন। শিলিগুড়ি থেকে সুমো দার্জিলিং এর যেখানে এসে থামে সেই জায়গাটা থেকে দার্জিলিং পোস্ট অফিসের পথটা অনেকটা চড়াই। আমি আর ফাদার বিকেলের দিকে এই রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে যেতাম ম্যালে। সন্ধ্যের মুখে সেই ম্যালেই আমরা জিরিয়ে নিতাম খানিক, তারপর ফাদার তার গন্তব্যের দিকে এগোতেন, সন্ধ্যের প্রেয়ারের কাজে। এই ম্যালেই গল্প করতে করতে ম্যালের ঠিক উপরেই একটা টিলা থেকে ভেসে আসতো ঘন্টার আওয়াজ। সামনে কুয়াশার রহস্যে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা আর পেছনে ধূপধুনোর গন্ধে মাতোয়ারা ঘন্টার আওয়াজ সন্ধ্যের মুখে ম্যালটাকে কেমন যেন মায়াময় করে তুলতো। একদিন বৃষ্টিভেজা বিকেল বেলায় ম্যালের ছাউনিতে আটকে পড়া ফাদার আমাকে শুনিয়েছিলেন ওই মহাকাল মন্দির আর দার্জিলিং এর ইতিহাস। বলেছিলেন তুমি তো হিন্দু মন্দিরে যাওনা? সেদিন ফাদারকে বলেছিলাম আমার কাছে ধর্ম হচ্ছে মানুষ। তিনি কি বুঝেছিলেন জানিনা শুধু চোখ বন্ধ করে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন গড ব্লেস ইউ মাই সান। তারপর সেই মায়াময় সন্ধ্যেতে শুনিয়েছিলেন গল্প। মহাকাল অর্থাৎ দুর্জয়লিঙ্গ মহাদেব। ওই টিলাটিরও নাম দুর্জয়লিঙ্গ। এই পাহাড়ে ছিল দোর্জ নামক আদিবাসিদের বাস তাঁরাই এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। দোর্জেদের স্থাপন করা শিবলিঙ্গের নাম থেকেই দোর্জেলিঙ। আর এই দোর্জেলিঙই লোকমুখে ভাঙতে ভাঙতে আজকের দার্জিলিং। এ হলো স্থানীয় ইতিহাস। এই ইতিহাসের অন্য আরেকটাও ইতিহাস আছে। তা হলো তিব্বতী ভাষায় দোর্জ হচ্ছে বজ্র আর লিং শব্দের মানে স্থান।সব মিলিয়ে বজ্রের দেশ। মেঘেদের ঘরবাড়ি এই দার্জিলিং তাই বজ্রের দেশ তিব্বতীদের কাছে। আর সেই দোর্জেলিঙ থেকেই ভেঙে বাঙালির স্বপ্নের দেশ দার্জিলিঙ। বাঙালিরা জানলে পুলকিত হবেন যে এই দার্জিলিঙ নিয়ে তাদেরও নিজস্ব ইতিহাস আছে। আর তা হলো এই পাহাড়ের মাথায় দুর্জয়েশ্বর নামে এক শিব মন্দির ছিল। গোর্খাদের আক্রমণ থেকে সেই শিবকে রক্ষা করতে স্থানীয় এক পুরোহিত তাকে একটি গুহায় লুকিয়ে রাখেন তার থেকেই এই জায়গাটার নাম হয় দুর্জয় লিঙ্গ যা পরে লোক মুখে দার্জিলিং নাম নেয়। ফাদার আরো জানান ১৭৬৮ সালে এই পাহাড় ঘেরা অঞ্চলে গোর্খাদের অভ্যুত্থান ঘটে। ভারতের উত্তরে পাঞ্জাব থেকে ভুটান হয়ে হিমালয়ের পার্বত্য তরাই অঞ্চলে বিস্তীর্ণ তাদের সাম্রাজ্য ছিল। পরে এটাই হয় বর্তমানের নেপাল। এরা ছিল ভীষণ দাঙ্গাবাজ দুর্ধর্ষ এক জনজাতি। ১৮১৪ সালে ওয়ারেন হেস্ট্রিংস এদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন, প্রথমে সুবিধা করতে না পারলেও পরে গোর্খারা আত্মসমর্পণ করে। সন্ধি হয়, কিন্তু এরা বাগে আসে না। সবসময় এরা ইংরেজদের ব্যতিব্যস্ত করে রাখত। সেই সময় ইংরাজ সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেন লয়েড আসেন এখানের দায়িত্বে। তিনি সমস্যা মেটাবার বন্দোবস্ত করেন। এই জায়গাটি তার ভালো লেগে যায়। ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির অনুমতি নিয়ে তিনি নেপালের রাজার কাছ থেকে জায়গাটি নিয়ে নেন। ১৮৩৫ সালে ১ ফেব্রুয়ারি দার্জিলিং ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই হলো দার্জিলিং এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। সুখলালজি আর ফাদারের কাছ থেকে এত কিছু শিখেছি যা এ জীবনে কোনদিন ভুলে যাবার নয়। এরপরও আমি একবার দার্জিলিং গিয়েছিলাম সুখলালজি মারা গিয়েছিলেন, ফাদারও চলে গেছিলেন কেরালার কোন এক চার্চে। সেই ফাদার যিনি একজন ক্রিশ্চান পাদরি আর এক নেপালি কন্যার গোপন ভালোবাসার ফসল ছিলেন। যিনি চিরকাল বিশ্বাস করেছেন “নাইদ্যার ফাদার নর মাদার অনলি হিউম্যান ক্যান মেক দেয়ার ওন আইডেনটিটি”। সেই ফাদার যিনি আমার আঙুলে বুনে দিয়েছিলেন গিটারের সুর।
 
খেলনা গাড়ি
Orange Valley Tea Estate

বাগানের কুলি কামিনদের সঙ্গে অল্প কদিনেই আমার বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। আর দার্জিলিংকে আমি কখন নিজের শহর ভাবতে শুরু করে দিয়েছিলাম। যদিও আমি বাগানের বাবু গোছের লোক, কিন্তু কেন জানিনা কুলি কামিনরা আমাকে তাদের লোক বলেই ভাবত। কি জানি হয়তো ওদের সঙ্গে সহজেই ভেদাভেদ ভুলে মিশে যেতাম বলে। ওরা আমাকে ডেকে নিয়ে যায় সন্ধ্যে হলে ওদের বস্তিতে। মদ আর ওদের আন্তরিকতায় সন্ধ্যায় নাচ গানের আসর শুরু হয়। কোন দিন ওদের সঙ্গে নাচি কোনদিন শুধুই দেখি, কোন দিন রাত বাড়লে ঘরে ফিরি, আবার কোনদিন ছাং (লোকাল মদ)এর নেশায় চুর ওদের বস্তিতেই রাত কাটিয়ে দিই। মনে পড়ছে এমনি এক মাতাল দিনে যখন ক্লান্ত নারী পুরুষ এলিয়ে পড়েছে ছাং এর টানে হঠাৎই একটা নরম কিন্তু কর্কশ হাত আমাকে টেনে নিয়ে গিয়েছিল এক ঝুপড়ির সামনে। ঝাপসা আলোয় দেখি কুসুম। চা বাগানে পাতা তোলার কাজ করে, টি প্রসেসিং এর লেবার ইউনিটে কাজ করা নির্মলের স্ত্রী। বুঝতে পারিনি প্রথমটায়, জড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করি “তোপাই কে চাহনুহুঞ্ছ (কী চাই তোর)?” খানিক আমার দিকে তাকিয়ে হেসে ওঠে কুসুম। তারপর ততোধিক জড়ানো গলায় বলে “মলাই মায়া গর।” নেশায় টলোমলো আমি চমকাই, বলে কী এ মেয়ে? ওকে ভালোবাসবো? ছাং এর নেশায় শিথিল গলায় জোর আনি, “ তোপাই কে কুরা গর্দে ছন” (কি বলছিস তুই)? ঘর জান” ( ঘরে যা)। হিসহিসিয়ে হেসে ওঠে পাহাড়ি সাপ। “মেরো ঘর কাহা ছ, মেরো মনিস কোহি গর্ণ সকদৈন। ম রাত দওয়ারা রাত জ্বল ছু। হরেক দিন ওহাঁলে মাতেকো র নিদ্রামা, তর ম সুত্ন সকদৈন। ইয়হ এক ঘর ছ” (আমার ঘর কোথায়, আমার মরদ কিছু করতে পারে না। আমি রাতের পর রাত জ্বলছি, প্রতিদিন মাতাল হয়ে ঘরে ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে, কিন্তু আমি ঘুমোতে পারি না। এটা কি একটা ঘর)। কী বলব বুঝতে পারি না। বুঝতে পারছি বিপদ ঘনিয়ে আসছে, আমি ধীরে ধীরে গভীর খাদের কিনারে এসে দাঁড়াচ্ছি; আমার আর পরিত্রাণ নেই। কুসুম আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায় ঝুপড়ির ভিতর। বেশিক্ষণ যুঝতে পারি না, আমিও ঝাঁপ দিই অতল খাদের মধ্যে। তারপর আর কিছু মনে নেই। সকালে যখন ঘুম ভাঙে, দেখি সকালের হালকা ঝকঝকে কাঞ্চনজঙ্ঘার কপালে চুমু দিয়ে কাঠের ঝুপড়ির ফাঁক গলে আমার বুকের উপর আদুরে বেড়ালের মত লুটোপুটি খাচ্ছে রোদ। উঠে বসি। এক গ্লাস চা হাতে নির্মল আসে। মুখে একগাল হাসি। আমি ওর ঝুপড়িতে রাতে থেকেছি সেই কৃতজ্ঞতায়, সেই সম্মানে সে গর্বিত। কাঞ্চন ছোঁয়া রোদ ওর গাল থেকে একরাশ কৃতজ্ঞতা নিয়ে ঝরে পড়ছে। আমি মাথা তুলতে পারি না। সে চা এগিয়ে দেয় বলে, “সাব জি কুসুম তপাই লাগি চিয়া পাঠাউন”( কুসুম আপনার জন্য চা পাঠিয়েছে)। ফুটন্ত চায়ের গ্লাস হাতে ধরি কিন্তু চুমুক দিতে পারি না। একটা অপরাধবোধ কাজ করে মনের ভেতর। সামনে ফুটন্ত চা, কিন্তু সারা শরীরের ভেতর একটা কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে‌ যা আমার ভেতর অব্দি কাবু করে ফেলেছে। আমাকে তৈরি হয়ে আসতে বলে নির্মল রওনা দেয় বাগানের পথে। আমি বেরোলে কুসুম ঘর বন্ধ করে বাগানে যাবে। কোন রকমে চা গিলি, মুখে জল দিয়ে জামা প্যান্ট পরে রেডি হচ্ছি কুসুম ঢোকে ঘরে।

 ওর সমস্ত মুখে যেন কাঞ্চনজঙ্ঘার রং লেপে দিয়েছে কেউ। এতো উজ্জ্বল, এতো রঙিন ওকে আগে কখনো দেখিনি। চোখ ফেরাতে পারিনা। বুঝতে পারি ওই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে আমি আবার তলিয়ে যাবো। আমি চোখ বন্ধ করে নিই। কিন্তু আমার সাধ্য কী চোখ বন্ধ করে থাকি। বন্ধ চোখেও আমি দেখতে পাই সোনালি কাঞ্চনজঙ্ঘার ঢেউ খেলানো গিরিচূড়া। মেঘহীন আকাশে রোদের হাতছানি দিয়ে আমাকে ডাকছে। মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছিলো। বেরিয়ে আসি নির্মলের ছাউনি থেকে। বাগানের দিকে হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে বলতে থাকি, আর নয়, আজ রাতে আর নয়, আর আসবো না আমি এদের বস্তিতে। কিন্তু সন্ধ্যে হবার পর থেকেই কে যেন আমার পা দুটিকে টানতে থাকে কুলি বস্তির দিকে। আমি আবার হাজির হয়ে যাই সেই গোল করা আগুন, বাটি ভরা ছাং আর মাদলের তালে তালে দুলতে থাকা গরিব মানুষগুলোর মধ্যে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বোধহয় আমি পাগল হয়ে যেতাম। কারণে অকারণে হাজির হতাম নির্মলের ঝুপড়ি ঘরে, এমনকি বাগান বন্ধের দিনেও কুসুমকে ডেকে পাঠাতাম আমার কোয়ার্টারে। কিন্তু আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল আমার উপরওয়ালার সিদ্ধান্ত। আমাকে যেতে হবে গ্যাংটক। নতুন শোরুমের তদারকিতে। সেখানে চালু করতে হবে আমাদের নতুন ব্রাঞ্চ। চলে আসার দিন কুলি কামিনরা ভিড় করে এসেছিলো আমার কোয়ার্টারে। ওদের ভিড় দেখতে দেখতে অবাক হয়ে ভাবছিলাম, এই দেড় বছরের দার্জিলিঙের বাসে কীভাবে যেন জড়িয়ে পড়েছিলাম ওদের সঙ্গে। ওদের সুখ-দুঃখ, অভাব-অনটনের মধ্যে আমিও যেন কীভাবে একদিন ওদের লোক হয়ে গিয়েছিলাম। তখনো জানিনা গ্যাংটকে আমার জন্য আরো এক ভয়ংকর অপেক্ষা করে আছে। যা আমাকে মৃত্যুর মুখোমুখি টেনে দাঁড় করাবে। এর কিছুদিনের মধ্যে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম।

Flower in a tea plant at a Darjeeling Tea plantation
Silver Needle White Tea
আজ যখন লিখতে গিয়ে এই মাঝ রাতে আমি স্মৃতিমেদুরতায় আক্রান্ত, তখন স্মৃতির হলদে অ্যালবামের পাতা ওলটাতে ওলটাতে আমার ফেলে আসা দার্জিলিং আর চা বাগানের দিন যাপনের স্মৃতিতে কাজ ফেরতা সেই বিকেলগুলো, সেই কুলি বস্তি, রাতের ছাং, মাতাল সেই আগুন আর উদ্দাম নাচ আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে আর আমার কানে বেজে উঠছে সেই নেপালি গানের সুর…………
“আঁখা তিমরো মায়া বকি আলঝেলা
শুখি জ্বালা আশু ঝাট্টা শুনাই দেউ
মন কো কুরা লাই বাধি নারাখা
গাথো পারি জালা চাট্টা শুনাই দেউ
চাট্টা শুনাই দেউ”
ঠিক সন্ধে নামার মুখে...

(ছবি গুগুল থেকে সংগৃহীত)