নির্মল হালদার-এর গদ্য

Spread This

নির্মল হালদার

অনেক দূর অনেক কাছে
 
লেখাপড়া অসমাপ্ত রেখে ঘুরে বেড়াই। কী খুঁজছি, কী খুঁজছি না , কিছু না জেনেই ঘুরছি। কবিতার ভূত মাথায় ছিল না তখনো। তবে এইটুকু মনে আছে কবিতার বীজ জন্ম নিচ্ছে ভেতরে ভেতরে। তার একটা শব্দ আমি পাচ্ছি।
 
বাবা নেই। আমার একমাত্র অভিভাবক আমার বড়দা। দ্বিতীয়বার হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দিতে বললো। আমি ফর্ম ফিলাপ করেও পরীক্ষা দিলাম না। ইচ্ছে করছিল না পড়াশোনা করতে। কেবলই একটা জানলা। দেখতে পাই, ট্রেন আসছে। থেমেও যায় স্টেশনে। আবার শুরু করে চলতে। ছোট্ট স্টেশন যেন বা মায়ের ছোট ছেলে। মা ছাড়া কাঁদছে। আমি শুনতে পেয়ে মন খারাপ করি। তো, মন খারাপ ভেতরে চেপে রেখে ঘুরে বেড়াই।
বড়দার বন্ধু  কালোদা একদিন রাস্তায় ডেকে জানতে চাইলো, তোকে এত বিষণ্ণ লাগে কেন? আমি কোনো উত্তর দিইনি।
 
ওই যে শুনলাম বিষণ্ণ শব্দটি তারপর থেকেই ঢুকে গেল আমার মাথায়। আমি তাকে ছাড়তে পারি না। আমার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। আমি তোমায় ছাড়বো না।
 
আমাদের যৌথ পরিবারেও তখন ভাঙ্গন ধরেছে। স্পষ্ট হয়ে গেছে দেয়ালে মেঝেতে। ঘর ভরা ঝুলকালিতে। পরিবারের সবার মুখেই কালো ছায়া। আমি লক্ষ্য করি। আবার লক্ষ্য করি না।
 
রাস্তায় পড়ে থাকা শাদা কাগজ তুলে নিয়ে পকেটে রাখি। যদি লেখা আসে মাথায়। হঠাৎ? রাস্তায়? তখন কাজে লাগবে। কবিতার বীজ মনে হচ্ছে ডালপালা মেলবে। তাই কি? স্পষ্ট করে কিছুই বুঝতে পারতাম না।
 
আমাদের একটা দোকান আছে তখনও। গোলদারি দোকান। তিন দাদাই বসে। আমাকে বসতে বলা হলে, নানান অছিলায় পালিয়ে বেড়াই। কোনো ভাবে টিকিটের দাম জোগাড় করে একা একা সিনেমা। সিনেমার ব্যাপারে বেশ নেশাড়ু ছিলাম। আজও আছি।
 
বড়দা আমার আচরণ দেখে মিউনিসিপ্যালিটির জায়গায় একটা গুমটি বসিয়ে দিলো। আমাকে ঠেলে দিলো রোজগারের দিকে। সকাল থেকে রাত অবধি একা। কখন খদ্দের আসবে।
 
সেই গুমটিতে নিত্যব্যবহৃত জিনিসপত্র থাকতো। যেমন, হাতা খুন্তি কড়াই। তাওয়া। বেলুন চাকি। বেলনা। আর থাকতো, কাঁচের চুড়ি। এই কাঁচের চুড়ি  বড়দার পরিকল্পনায় কেন যে এসেছিল। আমি বিরক্ত হয়েছি, যখন কোনো মেয়ে বা মহিলা এসে চুড়ি দেখতে চাইতো। পছন্দ হলে, পরিয়ে দিতে হবে। সেও বড় অস্বস্তির কাজ। বরং কাপ ডিশ বিক্রি করতে গেলে মনে মনে আমিও চা খেয়েছি।
 
একেকদিন এমন হয়েছে, এক পয়সাও বিক্রি হয়নি।
রাস্তার ধারে প্রায় সদরে বলা যায়, আমার দোকান অথবা গুমটিতে বসে থাকা। লোকজন দেখি। রঙের বাহার দেখি। শাদা-কালো ছায়া দেখি। হঠাৎ করে নিচু হয়ে দু-একটি পংক্তি। অন্তরে খুশির ঝিলিক। আমার মুখ উজ্জ্বল করে।
 
আমার কাছে নূপুর আসে।
 
পরিবারের একমাত্র পুত্র সন্তান। বড়দার বড় ছেলে। তখন অব্দি একটি ছেলে। আমার কাছে এসেই বলে, পয়সা দে। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করি, সারাদিন কিছুই তো বিক্রি হয়নি, কোথায় পাবো পয়সা! সে তত জেদ ধরে,দে ন——
দশটা পয়সা দে। দে ছোটকা।
ফুটফুটে গোপালের মতো এক শিশু আমার কাছে হাত পাতছে—–আমি আমার অক্ষমতাকে দেখাতে পারি না। আমি তার হাতে আমার সারাদিনের ব্যর্থতা দিতে পারি না। কী করেই বা দেবো, নূপুরের কাছে তখন  ১০টা পয়সা যে অনেক। সে হয়ত বাদাম কিনবে। বুট ভাজা মটর ভাজা কিনবে। সে হয়ত কুল কিনতেও পারে। সে কেবলি ঘ্যানর ঘ্যানর করে যায়—–ছোটকা দে ন দশটা পয়সা।
পয়সা খুঁজতে নূপুর বাবার কাছে যেতে পারেনি। অন্য দুই কাকার কাছেও যেতে পারেনি। আমার কাছে পাবেই এই ভরসায় এসেছে বিকেলের দিকে। আর বলেও যাচ্ছে: ছোটকা দে দে—–
এই নূপুরের নামকরণ করেছিল আমার মা। মায়ের ভাবনায় ছিল পরিবারের প্রথম এক নাতি, সে যেন ভগবানের পায়ে নূপুর হয়ে থাকে। সেই ভাবনা আজও মধুর হয়ে আছে।
শিশুর সেই ছোট্ট হাত ফর্সা ও কোমল হাত আমার দিকে বাড়ানোই আছে। আমি তাকে আজ অব্দি ১০ টা পয়সা দিতে পারিনি। কেবলি কানে বাজে: ছোটকা—-ছোটকা—-
অনেক দূর অনেক কাছে
______________________
গরুর গাড়িতে চড়ে কোথাও যাওয়া কী যে আনন্দের ছিল,
চলেছে তো চলেইছে ——-
টঙস—টঙস—-
শৈশব থেকে কৈশোর কাঁসাই পারে বনভুজনা। আমরা তাই বলতাম। আসলে, বনভোজন।
তেলেডিতে বনভোজন। আমাদের পাড়ার ষোলআনা থেকে প্রতিবছর আয়োজন করতো । পাড়ার সবাই যাবে।
মেয়েরা বাদ দিয়ে সবাই।
ভোরের আঁধার থাকতে থাকতে গরুর গাড়িতে উঠে পড়েছি। আমরা ছোটরা।
আমরা হেঁটে যেতে পারবো না।
গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকতো কালী মন্দিরের কাছে। বড়রা কেউ এসে উঠিয়ে দিতো। সাবধান
করেওছে, জলে নামবি না।
যদিও শীতের সময় কাঁসাইয়ের জলে পা ভিজতো শুধু।
শহর থেকে কাঁসাই অনেকটাই দূর। আমাদের ছোটদের কাছে আরো বেশি দূর। মন ছটফট করতো, কখন যে পৌঁছোবো। খেতে হবে মুড়ি বুট সিদ্ধ।
শালপাতের ডোঙলায় সাজিয়ে দিচ্ছে নগি সেন।
আমাদের পাড়ার মিষ্টি দোকানদার। ইয়া ভুঁড়ি। তেমনি মোটাসোটা।
নগেন্দ্রনাথ সেন যে ছোট করে
নগি সেন বড় হয়ে জেনেছি।তার দোকানে বিকেল হলেই, দু–পয়সার নিমকি–বোঁদে।আহা।
তখন বিকেলের দিকে দোকানে থাকতো পাগল সেন। আমরা বলতাম পাগল দা।
তেলেডি পৌছেই বালিতে ছুটোছুটি।তারপর জল ও বালি ছোঁড়াছুঁড়ি করে হাঁপিয়ে
উঠেছি।
বড়দের মধ্যে কেউ একজন এসে স্নান করিয়ে দেয়। হি –হি করে কাঁপছি।
পাড়ে উঠেই দেখি , খিচুড়ি বাঁধাকপির তরকারি চাটনি
খাসির মাংস রেডি।
কেউ একজন বলে, ছোটরা খেতে বসে যাও।
দেখতে পাই, পাতায় খাবার সাজিয়ে কেউ একজন বন–বুড়িকে দিতে যাচ্ছে।
আমরা কেউ কেউ পলাশতলে
ঘুমিয়ে পড়েছি। শীতের বেলা জলদি ফুরিয়ে যাচ্ছে। আমার গায়ে হাত দিয়ে ডাকছে মেজদা: চল্ চল্—-
চোখ কচলে চারদিকে তাকাই,
কাঁসাই নদীর জলে সূর্যাস্তের রঙ বয়ে যায়।
পলাশতলে বন-বুড়ির খাবারে
শুকনো পাতা পড়েছে।
উঠে পড়েছি গরুর গাড়িতে।
বইছে ঠান্ডা বাতাস। মেজদা
আমার গায়ে জড়িয়ে দেয় চাদর।
তখন তো আর সোয়েটার ছিলনা। মোজা ছিলনা।শীতের সময় খড়িওঠা গা।শরীরে নখের দাগ ঘষলেই,
শাদা শাদা রেখা।
সেই সমস্ত রেখাকে খুঁজতে খুঁজতে এতদূর। চারদিক ফাঁকা হয়ে গেছে।
গরুর গাড়িটা আছে যদিও।
মেজদির শ্বশুর ঘর বেগুনকোদর মায়ের সঙ্গে গিয়েছি অনেকবার। মাঝপথে
বাস থেকে নেমে গেলে, গরুর গাড়ি।
কোনো গতি নেই।
মন্থর হয়ে চলেছে, সেই তার
অহংকার।
অহংকার আরো আমাদের  গাঁ–ঘরে গরুর গাড়ি নামক বাহনটি অবশ্যই প্রয়োজন।
ফাল্গুন-চৈত্র এলেই ধান জমিতে গোবর সার নিয়ে যাবে গরুর গাড়ি। ধান হলে
গরুর গাড়িতেই আসবে।
ওই গাঁয়ে ডাক্তার আছেন, এই গাঁ থেকে চিকিৎসার জন্য রোগীকে নিয়ে যাওয়া হবে গরুর গাড়িতেই।
কাছের শহর থেকে দোকানের মাল আসবে গরুর গাড়িতেই।
সাপ্তাহিক হাটে দোকানি মাল নিয়ে যাবে গরুর গাড়িতেই।এই এক বাহন তখনকার দিনে
খুবই মানানসই ছিল।
গরুর গাড়ির গাড়োয়ান ছিল
পরিবারের সদস্য। সেই গরুর দেখভাল করতো। সে শুধু
গাড়োয়ান ছিল না,ছিল গাড়োয়ান কাকা।
এখনো গরুর গাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেও সম্পর্কটা
ছিঁড়েই গেছে বলা যায়। কারোর কারোর গাড়ি আছে যদিও। দেখে মনে হয়, কোনো
আদর যত্ন পায়না। ট্রাকটার এসে গেছে বহুদিন।
আমি অবশ্যই গরুর গাড়িতে যাচ্ছি বনভুজনা করতে তেলেডি। আমি অবশ্যই আওড়ে যাই:
কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি।