পিউ মহাপাত্র-র গল্প

Spread This
Piu Mahapatra

পিউ মহাপাত্র

তেমনি করে ডাকলে পরে, ভুলব কেমন করে

‘বড়ি! ওওও বড়ি!!’ টিকি দেখা যায় না মেয়েটার ! ডাক দিলে তো আরোই নয় । “ডাকলে ওকে অমনি পাবে বুঝি ? ও তো ফেরে, পড়লে মা কে মনে।“

পেন, সাদা খাতা  সবাই অপেক্ষা করে থাকে। আমিও। কিন্তু হাঁক দিলে ও কখনও আসে না। কক্ষনো না । সেই ছোটোবেলা দিলীপ স্যার অঙ্কখাতা খুলে বারান্দায় অপেক্ষা করতে করতে এক কাপ চা খেতেন আর সঙ্গে দুটো মেরি বিস্কুট । বড়ি তখনো পা ধুচ্ছে মন দিয়ে। দ্বিতীয় চা এর কাপ এর ধোঁয়া কমে আসতে আসতে আরও দুটো মেরি বিস্কুট শেষ হয়ে যায় প্রায়। বড়ির তখন চুলে সিঁথি কাটা বাকি। এর পর আবশ্য দু-ঘা পড়লেই… তেমনি আবার দিদা যখন কুশি আমের বুক চিরে নুন হলুদ মাখিয়ে ছাদে শুকাতে দিতেন, তখন বড়ির আবির্ভাব ঘটত নিমেষে। উবু হয়ে দিদার গা ঘেঁষে বসে জুলজুল করে নুন, হলুদ, টক মিষ্টি ফালিগুলো টেরিয়ে টেরিয়ে দেখতে দেখতে , উদাসী বাউল জিজ্ঞেস করত, “শুকিয়ে গেলে থালায় ওদের কম লাগে তাই না দিদুন?” দিদা কিনা বড়ির দিদা, ঠিক বুঝতেন এ নিরীহ প্রশ্নের পেছনে কোন জটিল অভিসন্ধি লুকিয়ে। “শুকোতে হপ্তাখানেক লাগে দিদিভাই। তার আগে যদি কম কম লাগে তো, তখন আবার হরিয়াকে লাঠি হাতে ছাদে পাহারা দিতে বলতে হয়।”এই বলে দিদা একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। বিষ দৃষ্টি হানে বড়ি পাশে বসা গোলগাল,ফর্সা, ওর দেখা এ পৃথিবীর সেরা মিষ্টি মুখটাকে। তবু হপ্তা ফুরনোর আগেই থালায় আম কমতে থাকে হু হু। দিদা দেখেও দেখেন না। আর বড়ির মত ভালমানুষ তখন এ পাড়ায় ওই একটাই। তবু কোনো কোনো রাতে, কোনো অজানা কারণে পেটে ব্যথা হলে, বড়ি বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদলেই, দিদা থালা উলটে তেল , সাবান, জলের ফেনা তুলে বড়ির ছোট্ট পেটের গদগদ ঘিরে ঠাণ্ডা হাত বোলায় । ব্যথা কমতে সময় নেয় বইকি! আশেপাশে শত্রু পক্ষ আছে কিনা দেখে নিয়ে দিদা ফিসফিসিয়ে বলেন, “কী, আজ বুঝি নোলা বেসামাল ছিল?” ধরা পড়ে কান্না ডুকরে বাড়ে নাকি পেটব্যথায়, তা ঈশ্বর জানেন আর জানে ছাদের গুটিকয় কাক আর বড়ি !

‘বড়ি! ও বড়ি…বড়ি রে!!’ ডাক দিলে, হাঁক দিলে ও মেয়ে ট্যাঙ্কের তলায় সেঁধোয়। আমি অপেক্ষা করে থাকি। আমার ডায়রির পাতা বসে থাকে। পেন এর কালি শুকাবার উপক্রম হয়। না দেখা যায় ওকে, না দেখা যায় ওর ফর্সা খাটো টেপফ্রক। ঠিক এমনি হত গরমের ছুটির শেষ দিনে। বাক্স গুছানো, পোটলা বাঁধা । গ্রামের বাড়ির টানা বারান্দায় বাবা বসে, জ্যাঠামনির পাশে মা-ও ঘোমটা দিয়ে, থামের গা ঘেঁষে । আর খানিক বাদেই কলকাতা ফেরা যে! ‘বড়ি! ও বড়ি…বড়ি রে!!’ জেঠিমার হাঁক পুকুর পাড়ের নারকেল গাছগুলোর উঁচু ডগা ছুঁয়ে হতাশ হয়ে ফিরে আসে। বড়িকে পাওয়া যায় না কোথাও । বাস আসে , চলেও যায় । শহুরে মা বিরক্ত হন। এখানে ঘর লাগোয়া বাথরুম নেই যে। রাতে মায়ের কষ্ট হয় , ভয় ও। ‘এ মেয়ে তোমার বুকে চড়ে দাড়ি উপড়াবে একদিন বলে দিলাম ।‘ বাবার ভয়ার্ত ভবিষ্যতের বাণী রেখে মা আবার বাক্স ওপরে নিয়ে যান । আপাত মসৃণ গালে হাত বোলাতে বোলাতে বাবা নিশ্চিন্তের মুচকি হাসি হাসেন। বড়ির তখনো টিকি দেখা যায় না। শিব মন্দির পেরিয়ে ধুলো উড়িয়ে বাস চোখের বাইরে অদৃশ্য হলে, জ্যেঠিমা খাটের তলা থেকে টিনের চালের ড্রাম টেনে বার করেন। আধ হাত ডোবালে , চালের ভেতর লুকিয়ে রাখা নারকেলি সবেতা খান কয়েক বেরোয় । অন্ধকারে চালের ওমে পাক ধরে ওদের। মিষ্টি গন্ধ বেরোয় । বড়ি গুটিগুটি ফেরে সেই গন্ধে।  জ্যাঠাইমার গা ঘেঁষে বসে সেই  জুলজুল চোখে উদাসী গলায়  জিজ্ঞাসা করে ‘পেকেছে কী করে বুঝলে, কী করে, ও জেঠাইমা ?’ জেঠিমা কিনা বড়ির জেঠিমা , এ আপাত নিরীহ প্রশ্নের পেছনে যে গভীর নোলা জমে তা ঠিক টের পান । হালকা একটা নিশ্বাস ফেলে বলেন, ‘কী করে আর বুঝবো যদি না কেউ খেয়ে বলে?’ বড়ি গম্ভীর হয়ে দু হাত পাতে, জ্যাঠাইমাও কৃতার্থ হন।

‘দেব দু ঘা! ওই বড়ি, বড়িইইই।‘ ও ডাক দিলে ওঠে নাকি ! আমি বসে রই , আমার খাতার পাতা খোলা পড়ে । ‘বড়ি …ওঠ’ এতে বড়ি আরও গুটিসুটি মেরে পাশ ফিরে শোয় ।  মড়ার মত , আপাদমস্তক চাদর ঢেকে। একপ্রস্ত করে লক্ষীদি ডাকে , মা খুন্তি হাতে শাসিয়ে দিয়েই সকালের হেঁশেল সামলাতে ছোটেন । এমনকি বাবাও হাল ছেড়ে দেন। বড়ির কানে তখন গঙ্গার এঁটেল মাটি জন্মের মত ঠুসে ভরা। ‘যে মেয়ে সকালে ইতিহাস পড়তে হবে  বলে  হিসু আটকে বেলা আবধি মটকা মেরে থাকে তার ইহকাল পরকাল দুই লড়বড়ে । বিয়ে দিয়ে দাও এর ।‘ মা কে মাঝে মাঝে খনা মনে হয় বড়ির। একের পর এক নিদান তো নয়, বচন। তবু মুখের উপর চোপা করলেই মটকা মেরে থাকা ধরা পড়ে যাবে, তাই বিবাহের প্রস্তাবে শিউরে উঠলেও ঘুমন্ত কুম্ভকর্ণের অভিনয় চলতেই থাকে। ‘লালবাড়িতে দুধ আনতে যাব , কেউ যদি আসতে চায়, আসতেই পারে ।‘ দাদু মার হাত থেকে দুধ আনার ক্যানের ঢাকনাটা ঠিক করতে করতে কাকে উদ্দ্যেশে  করে বলেন, তা দাদুই জানেন। সোজা হয়ে কুম্ভকর্ণ জেগে ওঠেন। একটানে চাদর ছুঁড়ে ফেলে , বাসি মুখে কান এঁটো হাসি হাসে বড়ি। মা দেখে , মুখ টিপে হেসে, রান্না ঘরে ফিরে যেতে যেতে উপাধি দিয়ে যান , ‘নির্লজ্জ’ বেহায়া বড়ির তাতে নটকা এসে গেল । দাদুকে ছোট্ট কড়ে আঙ্গুল দেখিয়ে , ছুট্টে কলঘরে যেতে যেতে বলে যায়, ‘পিপি করে আসি, কেমন দাদু? যেও না কিন্তু খবরদার ।‘ লালবাড়ির গেট পেরলে , সবুজ লন। তাতে টুপটাপ শিউলি ঝরে পড়ে। চটি খুলে ছুটে ছুটে ফুল কুড়ায় বড়ি। দাদু বলেই চটি খুলতে দেয়। এদের সাদা গরুটার একটা লাল বাছুর হয়েছে। বড়ি তার নাম রেখেছে , লাল বাতাসি।  ওকে আটকে ওর মায়ের দুধ দুইলে বড্ড ছটফট করে ও। বড়ি ওর ছোট্টো টাক মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আশ্বস্ত করে, ‘কম নেব দেখো। অল্প, আধ পোয়া। বাকি সব তোমার…কেমন?’ এ শুনে বাতাসি খানিক শান্ত হয়। ওর টেপ ফ্রকে ফোঁৎ ফোঁৎ করে নিশ্বাস ফেলে। ফেরার সময়, দাদু কলকাতার ইতিহাস বলেন। জোব চার্নক , তিন টুকরো রুটির মত গ্রাম, আদি গঙ্গা বেয়ে একে একে  কখন নৌবাহিনী, কখন বাণিজ্যিক জাহাজ। ইতিহাস কেমন ‘জল পড়ে, পাতা নড়ে’ হয়ে যায় ফেরার পথে। এক হাতে দুধের ঢপ সামলাতে  সামলাতে , বড়ি দাদুর মুখের পানে চায়। বুড়ো লোকগুলো এমনি বেজায় ভালো, যে ভেবেই বড়ির চোখে জল আসে।  আস্তে করে দাদুর কড়ে আঙ্গুল জাপটে ধরে ও। কখনও যাবে না ছেড়ে ওদের ও…কখনোও না!!

বড়ি…ও বড়ি…বড়ি রে……!!! বেহুুঁশ জ্বরের ঘোরে কোনো কোনো ডাক ফিরে ফিরে আসে। বড়ি যেন শুনতে পায় কোনো এক কচি ছেলে নিচে জানালার খড়খড়ি ধরে করুণ মুখে ভিতর পানে চেয়ে, ‘বড়ি… এই বড়ি…আজও খেলতে যাবি নে। কালাদের বাগানে লিচুতে পাক ধরেছে যে। ওরা যে সব খেয়ে নিল। এই বড়ি শুনছিস ?’