পার্থপ্রতিম দাস-ভ্রমণ

Spread This

পার্থপ্রতিম দাস

সুধন ও বুড়ো বটের থান

শরীরটা বেশ কয়েকদিন থেকে জুত লাগছে না সুধনের। অন্ধকার থাকতেই ঘুম ভেঙে যায়। যদিও ভোরে উঠে বুড়ো সুধনের এখন কোনো কাজ থাকেনা। তাও ভোরে ওঠাটা অভ্যাস। ভোরবেলার প্রথম পাখির ডাক সুধনের কানে পৌঁছবেই রোজ। আর পাখিটাকে খুঁজতে সুধন কুড়ুল কাঁধে বেরিয়ে পড়ে অন্ধকার থাকতেই। শুকনো কাঠ পেলে কেটে নিয়ে আসে। কোনোদিন কোনো ফলমূল। আবার ভোরের দিকেই জন্তু জানোয়ারের ভয় বেশি। তাদের থেকে বাঁচতে কুড়ুল বেশ কাজে দেয়। কুড়ুল হাতে থাকলে সুধন বাঘকেও ডরায় না। তবে এ বনে বড় বাঘ এখন আর নাই। মহুলের সময় ভালুকের ভয় বেশি। ওই মাথা উঁচু করে থাকা হুলুক পাহাড়, ওই পাহাড়ের গা বেয়েই যেমন নেমে এসেছে জঙ্গল, তেমনই ওখান থেকে নেমে আসে ভালুক।  আর থাকে জল হলে অল্পটুকু জঙ্গল পরিষ্কার করা পাথুরে জমিতে ধান মকাই। তা সেসব ফসল পাকলে শুয়োর, হরিণ আর হাতির জ্বালাতন। রাত জেগে জেগে, মশাল জ্বেলে পাহারা দিতে হয় তখন। টিয়ার ঝাঁক মকাইয়ের খেতে পড়লে আর রক্ষা নাই। অনেক ফসল নষ্ট। নষ্ট কি??
তবু একটু মকাই, একটু ধান আর মহুল। এই তো সম্বল সারা বছরের। শুয়োরের দাঁতের দাগ সুধনের বাঁ-পায়ে এখনও স্পষ্ট। সেই রাতের কথা মনে পড়ে সুধনের কখনো কখনো। ছুটে পালানোর সময় একটা বড় শুয়োরের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছিল কাঠের মাচা। সুধন সমেত। সুধন উঠে পালাতে গিয়ে পড়েছিল আরেকটা শুয়োরের মুখে। হাতের কুড়ুলটা অন্ধকারে কোথায় ছিটকে পড়েছিল পায়নি খুঁজে। তাও শেষ মুহূর্তে লাফ দিয়েছিলো সুধন। তবুও পায়ে দাঁত বসানোটা এড়াতে পারেনি। রতন মশাল আর কুড়ুল হাতে এসে বাঁচিয়েছিলো। পায়ের সেই ক্ষত শুকাতে লেগেছিলো অনেকদিন।
কুড়ুল কাঁধে অর্জুন ঝোরার জলে হাত মুখ ধুয়ে নেয় সুধন। ওই ঝোরার ধারে বেশ কয়েকবার চিতাবাঘের  মুখোমুখি হয়েছে সুধন। যদিও চিতাবাঘেরা সাধারণত আক্রমণ করে না খুব ভয় না পেলে। তাও কুড়ুলের বাঁটে হাতটা শক্ত ও সাবধানি হয়ে যায় স্বভাব বশেই। বাঘ জল খেতে এসে বিরক্ত হয়ে চলে যায়। সুধনও হাঁটা দেয় নিজের রাস্তায়।
পায়ে পায়ে শিশিরের মাখামাখি। জঙ্গলও ধুয়ে দেয় সুধনের পা। সকালের নরম ভিজে আলোয় ঘুরছে প্রজাপতি, মৌমাছিরা। ফুলে ফুলে। এই বনে মধু হয় অনেক। চাক ভেঙে মধু পাড়ে সুধনরা। গারু বা মহুয়াডাঁরের হাটে মধুর দাম পায় বেশ। নিজেদেরও খাওয়া হয়।
পাখিটা তখনো ডাকছে। কী পাখি কে জানে! সুধন ঝোরা পেরিয়ে জঙ্গলের দিকে ঢোকে। এখনও ঠান্ডা লাগে ভোরের দিকে। শাল ফুলের গন্ধে জঙ্গল ভরে আছে। মাটিতে ছড়িয়ে শালের ফুল। মহুল এসেছে খুব এবছর। সারাবছর খাবার অভাব হবেনা ঠিক মতো কুড়িয়ে শুকিয়ে রাখলে। তবে ওই, ভালুকের ভয়। গেলবার বিজয়ের বউয়ের গলা বুক পেট সব ফালা ফালা করে দিয়েছিলো। বউটা বাঁচেনি। প্রতিবছরই প্রায় কেউ না কেউ ভালুকের কবলে পড়ে। কেউ কেউ বেঁচে যায়। কেউ কেউ বাঁচে না…
যে রাস্তা ধরে সুধনের যাতায়াত...

জঙ্গলের এটাই নিয়ম। খাবার জন্য লড়তে তো হবেই। আকাশে আলো ফুটছে। সামনে দিয়ে কয়েকটা হরিণ ছুটে গেলো। সুধন রাস্তার ধারে একটা গাছের গুঁড়িতে বসে। পাশে হাতের কাছে নামিয়ে রাখে কুড়ুলটা। গাছটা দুবছর হলো ঝড়ে উল্টেছে। কিন্তু মরেনি। সুধনরাও এভাবে বাঁচে জঙ্গলের নিয়মে। উল্টে পড়লেও মরে না সহজে। এ জঙ্গলের সব গাছ, সব জল, মাটি, পথ সুধন হাতের তালুর মতো চেনে। তিনকুড়ি বয়স পেরিয়েছে অনেকদিন হলো। এখনও চামড়া টানটান। কাঠ কাটতে বা বেশি হাঁটলে, হাঁপ ধরলেও শরীর শুয়ে পড়েনি। একজোড়া বন মোরগ আর মুরগি। অনেকক্ষন থেকে ঘুরছে একটু দূরে। মোরগটা মাঝে মাঝে সুধনের দিকে তাকাচ্ছে। ঘাড় উঁচু করে। মুরগি একমনে খাবার খুঁটছে। সুধনের নিজের যৌবনের কথা মনে পড়ে। এই জঙ্গলেই বড় হয়েছে সে। বিন্তির সঙ্গে এমনই ঘুরে ঘুরে বেরিয়েছে জঙ্গলে জঙ্গলে। ঠিক এক জোড়া মোরগ মুরগি যেন। সুধনও অমন করেই চারিদিকে নজর রাখতো। ঘাড় উঁচু করে, পেশী টান করে। হাতে কখনো এই কুড়ুল, কখনো তীরধনুক, কখনো শুধুই বাঁশের লাঠি। আর বিন্তি ছিলো অমনি কলকল। কথা বলতে বলতে একমনে মহুল কুড়াতো। কখনো পিয়েল বা হরিতকি। যদিও কেন্দ পাড়তে গাছেই উঠতে হতো সুধনকে। সে আজ অনেকদিনের কথা। বিন্তি মরেছে প্রায় সাতটা শীত পার হয়ে গেল। গ্রাম থেকে মেন রাস্তা প্রায় ন মাইল। তারপর গারুতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র, আরও আট মাইল। সেই মাচা বেঁধে, কাঁধে করে নিয়ে যেতে যেতে রাস্তাতেই মরে কাঠ হয়ে গিয়েছিলো বিন্তি। গারু পর্যন্ত যেতে হয় নাই। একেই রাত, তারপর গোটা রাস্তা জঙ্গল। গাঁয়ে কেউ অসুস্থ হলে বেজায় বিপদ। এখনও সেই মাচা বেঁধে, আগুন জ্বেলে, টিন ধামসা বাজাতে বাজাতে, জঙ্গলের রাস্তায় কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যেতে হয় সেই মেন রাস্তা পর্যন্ত। ওখানে কোনো গাড়ি পেলে ভালো। নাহলে বাকি আট মাইল আবার। এরাস্তায় আবার হাতি বেরোয় খুব। সামনে হাতি পড়লে বিপদ সবারই।

জঙ্গলে ভোর হলে

সুধন জানে তারা এ রকম করেই বাঁচে। তাও এখন তো কতো কিছু পাল্টে গিয়েছে। ফোন হয়েছে অনেকেরই, যদিও সবসময় নাকি ফোন লাগে না। লাগলেও এই জঙ্গলের রাস্তায় কেউ গাড়ি নিয়ে আসতেই চায় না রাতবিরেতে। হাতির সামনে পড়লে বিপদ গাড়িরও। সুধন ভাবে ওর যেন এমন না হয়। ওসব শরীর খারাপ টারাপে অনেক জ্বালা। অনেক লটাপটি। তারচেয়ে, জঙ্গলে হাতি ভালুক বা শুওরের দাঁতে মরা ভালো। যা যাবে একবারে চুকে বুকে যাওয়াই ভালো। জঙ্গলে জন্ম, জঙ্গলে মানুষ, মরলেও এই জঙ্গলেই। জঙ্গলের গন্ধ মাখা শরীর সুধনের। সে শরীর জঙ্গলের গন্ধেই মিশে যাক। পেছনে খুট আওয়াজে ঘাড় ঘোরায় সুধন। একটা ময়ূর দৌড়ে পালায় ঝোপের দিকে। কে জানে এদিকে কেন আসছিলো। সুধনকে দেখে অন্য রাস্তায় দৌড় দিয়েছে। এ জঙ্গল কতো প্রাচীন সুধন জানে না। শুধু জানে এ জঙ্গল তাদের, তারা এই জঙ্গলের। জঙ্গলের ধার থেকেই যে পাহাড়টা উঠেছে আকাশ মাথায়, বাপ- ঠাকুরদার মুখে শুনেছে সেই পাহাড় থেকেই একসময় তাদের মারাংবুরু এসে অর্জুন ঝোরার নরম মাটি দিয়ে তাদের পূর্বপুরুষদের গড়েছিলো। জঙ্গল রক্ষা করতে। পাহাড় রক্ষা করতে। সে অনেকদিন আগের কথা। সুধনরা তাই এখনও জঙ্গল পাহাড়ের রক্ষক। পাহাড়ের উপর তাদের মারাংবুরুর থান আছে। ফি বছর পলাশের সময় মেলা বসে। আশেপাশের গ্রাম থেকে সবাই আসে মেলায়। পাহাড়ের মাথা রঙে রঙে ঝলমল করে। সারাদিন চলে হাঁড়িয়া মহুলের নেশা। যুবক যুবতীদের হল্লা। ঢলাঢলি। জঙ্গলের আড়াল খোঁজে তারা। সাঙা ধরে তারা। সুধনের সেসব দিনের কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে। মনে মনে হাসে সুধন।

অর্জুন ঝোরা(কাল্পনিক নাম), গরমে শুকিয়ে যায় জল...
হুলুক পাহাড়, ওইখানে মারাংবুরু থাকে

মুরগি মোরগ দুটোকে আর দেখা যাচ্ছে না। অনেক পাখি ডাকছে। সেই পাখিটার ডাক আলাদা করে আর খুঁজে পাচ্ছে না সুধন। ভোরের জঙ্গলের বাতাসে একটা শিরশিরানি ভাব থাকে। সুধন উঠে পড়ে। কাঁধে ফেলে কুড়ুলটা। হাঁটা দেয় আবার। হাঁটতে হাঁটতে সুধন কুর্চিদয়ের দিকে যায়। আগে হয়তো অনেক কুর্চি গাছ ছিলো এই দহের আশেপাশে। তাই এই নাম। এখনও জঙ্গলে এদিক সেদিক কুর্চি ফুটে থাকে অনেক। কুর্চিদয়ে হাতি আসে চান করতে। কতবার দেখেছে সুধন। শুঁড়ে শুঁড়ে জল ছিটিয়ে ছিটিয়ে হাতিদের চান দেখতে সুধনের খুব ভালো লাগে। অনেকক্ষণ ধরে চান করে হাতিরা। সুধন আড়াল থেকে দেখে। কখনো গাছের ডালে বসে থেকে। হাতি থাকলে সুধন অনেক আগে থেকেই বুঝতে পারে। জঙ্গলই যেন ওকে বলে দেয় হাতিদের কথা। হাতির গন্ধও পায় সুধন। আরও অনেক গন্ধ পায় ও। জঙ্গলের নানান গন্ধ। এক এক কালে এক এক রকম গন্ধ। বিন্তির গায়ের গন্ধ পায় জঙ্গলে বসন্ত এলে। সে গন্ধ উদাস করে সুধনকে। জঙ্গলে তাদের নিজেদের একান্ত একটা জায়গা ছিলো। সেখানে তাদের যৌবনের অনেকটা কাটিয়েছে সুধন বিন্তি। সে জায়গায় একটা বুড়ো বটের নিচে, ঘরের মতো করেছিলো ওরা। বনের নানা জায়গা থেকে এনে অনেক ফুলের গাছ লাগিয়েছিল আশে পাশে। এখনও সেখানে ফুল ফোটে নানা জাতের। সুধন মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে বসে চুপটি করে। সে বুড়ো বট এখনও আছে। চালাটা নাই আর। গাছটা দেখলে নিজের কথা মনে হয় সুধনের। গাছের সঙ্গে সুধনের কানাকানি অনেকদিনের। সুধন এলেই বটের ঝুড়িতে ঝুড়িতে লাগে দোলা। ওর আর বিন্তির একটা দোলনাও ছিলো। বটের ঝুড়িতে ঝুড়িতে বেঁধে বানানো একটা দোলনা। তাতে লাগতো বাতাসের দোলা।

কুর্চিদহ(কাল্পনিক নাম), যেখানে হাতিরা চান করে
বুড়ো বটের থান যাওয়ার রাস্তা...(কাল্পনিক)
কুর্চিদয়ের দিক থেকে সুধন রাস্তা বদলায়। আজ ওই বুড়ো বটের তলাতেই গিয়ে বসবে খানিক। আজ বিন্তিকে মনে পড়ছে বারবার। বোধহয় ওই মুরগি মোরগ জোড়াকে দেখে! অমন তো কত দেখে। কই অন্যদিন তো এমন হয়না! আজ যেন সব চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে সুধন। বুড়ো বটের দিকে যেতে যেতে মনে হচ্ছে হয়তো বিন্তি ওই চালাতে বসে তার জন্য অপেক্ষা করছে। সঙ্গে মহুলের ঝুড়ি। বিন্তির গায়ের গন্ধ আরও স্পষ্ট হচ্ছে সুধনের নাকে। মহুলের  গন্ধের নেশার মতোই বিন্তির শরীরের নেশা লাগতো সুধনের। আজও যেন সেই নেশা লাগছে বুড়ো সুধনের শরীরে শরীরে। বিন্তি বিন্তি! মনে মনে ডাকে সুধন। জঙ্গল জুড়ে একটা বাতাস বয়ে যায় সর সর করে। শুকনো পাতার উপর দিয়ে। সরে যায় পাতারা সুধনের ভিজে পায়ের সামনে থেকে। ওই তো রাস্তা সোজা বুড়ো বটের নিচে গিয়ে থেমেছে। দুপাশে ছোটো ছোটো নীল হলুদ ফুল। রাস্তা গিয়ে যেখানে থেমেছে, সেখানে একটা পাথর ঘিরেও ফুল ফুটে আছে প্রচুর। কেউ যেন সাজিয়ে রেখেছে বসার আসন। নানা রঙের প্রজাপতি উড়ছে ফুল ঘিরে ঘিরে। পাতার ফাঁক দিয়ে দিয়ে সকালের মিঠে রোদ এসে পড়েছে পাথরে। ফুলে ফুলে। পাতায় পাতায়। প্রজাপতিদের পাখায় পাখায় সে রোদ রঙের ছটা জাগায়। বটের ঝুরি দুলছে বাতাসে বাতাসে। ওখানে কি বনদেবীর থান আছে! না তো, সুধন দেখেনি আগে। শুধু বিন্তি মরে যাওয়ার পর এখানে এসে একদিন বুড়ো বটের নিচটা সাজিয়ে দিয়েছিল ফুলে ফুলে। আর শালপাতার ডোঙায় রেখেছিলো মহুলের মদ। বিন্তিকে মনে মনে বলেছিলো এখানেই আসিস বিন্তি। দেখা হবে। এই বুড়োবট, এই বনদেবীর কোলে। এখানেই লেখা থাকবে বিন্তি সুধনের ভালোবাসাবাসি কথা। বুড়ো বটের ঝুরি, তার ছায়া। ফোটা না ফোটা ফুলেদের সঙ্গে। পাথরটায় গিয়ে বসে সুধন। একজোড়া ময়ূর ময়ূরী। এদিকে আসতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায় সুধনকে দেখে। সেই ময়ূরটা নাকি? তার সঙ্গিনীকে ডেকে এনেছে সুধন বিন্তির গোপন কুঞ্জে। তারা কেমন করে জানলো এই জায়গার কথা!!! ময়ূরটা স্থির দাঁড়িয়ে, গলা তুলে, ময়ূরী এগিয়ে আসে সুধনের দিকে। ময়ূরীর হাঁটায় সুধন দেখে বিন্তি হেঁটে আসছে যেন। সুধন স্থির তাকিয়ে, ঘাড় উঁচু করে…
কোথাও সুধনের বাড়ির মতো

(ছবি লেখকের )