ফাল্গুনী ঘোষ-এর প্রবন্ধ

Spread This
Falguni Ghosh

ফাল্গুনী ঘোষ

রহিন এক আশার নাম
 
উৎসব মানুষের জীবনচর্যার প্রতিফলন। এক্ষেত্রে দেশ কাল ভেদে একই রীতি। পৃথিবীর লৌকিক ইতিহাস তাই বলে। বাকি রয়ে যাওয়া ধর্মীয় পরাকাষ্ঠায় অনেক রাজনৈতিক হিসেব নিকেশ। কিন্তু সাধারণ মানুষ হিসেবের গন্ডিতে বিশ্বাস, আনন্দ, উৎসবকে বন্দি রাখে না কখনই। অতি সহজেই এবং অপ্রয়োজনেই  বিস্তর আদান প্রদান হয়ে থাকে। অতীতেও হয়েছে। ঠিক একারণেই হয়ত পূর্ণতা, আনন্দের আশ্বাস খুঁজে নিতে কোনো ধর্মীয় বিধান অপ্রয়োজনীয়। প্রয়োজন গভীর আস্থার,  বিশ্বাসের। বিশ্বাসে ভর করে শুরু হয় পরব। বারো মাসে তেরো পার্বণ। একথা নেহাতই প্রবচনের মধ্যে গন্ডিবদ্ধ। বাস্তবত; পালা পার্বণের সংখ্যা অগুনতি। সমগ্র বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, পরগণা আজও তার সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষিকেন্দ্রিক পাল- পরব, বিধি নিয়ম মানুষের যাপনবোধে অঙ্গীকৃত হয়ে তাকে গড়ে তুলেছে। উৎসব মানুষের, মানুষ উৎসবের। হয়ে ওঠা এভাবেই সম্পন্ন হয়। আমজনতার কাছে কৃষিপ্রধান উৎসবের একটা অন্যতম পরিচিত নাম নবান্ন। কিন্তু এহঃ বাহ্য। অঞ্চলভেদে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় আলোর আড়ালে যাপিত উৎসবের দিকে মোড় ঘোরালে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকতে হয়।  এরকম উৎসবও আছে, কই আগে কর্ণগোচর হয়নি এই ভেবেই সে স্তব্ধতা।
অথচ সেই উৎসব ঐ বিশেষ জেলা ও অঞ্চলের অস্থি মজ্জায় প্রবাহিত। একথা জানতে পারি উৎসবের আঙিনায় গিয়ে দুদন্ড বসলেই। আর সেটাই সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্ত। কারণ চৈত্র বৈশাখের খর তাপে যেখানে  মাটি ফুটিফাটা হয়, একফোঁটা জলের চিন্তায় কপালে ভাঁজ পড়ে, সেখানে জৈষ্ঠ্যের সূচনাতেই বীজ বপন ও আকাশে বৃষ্টি আনয়নের হাজার একটা পরব থাকাটাই স্বাভাবিক। যাদের জীবনবোধে ঝাঁ চকচকে শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, ফ্ল্যাট বাড়ির ছবি নেই, নেই মাল্টিপ্লেক্সের একাকী আনন্দ, তারা যৌথ উদ্যোগে আনন্দিত হয় এরকম উৎসবের সাড়া পেলেই। বছরভর ফসল ফলানোর প্রস্তুতিতে কোনো একাকিত্ব, স্বার্থপরতা ছোবল বসাতে পারে না। যৌথ যাপন ঘিরে রাখে মানুষগুলিকে। মানভূম অঞ্চলের এরকম এক যৌথ যাপনের নামই রহিন উৎসব। প্রসঙ্গত মানভূমের লোককবি অকাট্য কটি কথা সুরে বেঁধেছেন—
“চৈতে খরখর
বৈশাখে ঝড়-পাথর
জ্যৈষ্ঠে যদি তারা  ফুটে
তবে জানবি বর্ষা বটে…”
যদিও জ্যৈষ্ঠে বর্ষার আগমনের দেরি, তবুও মানভূমের সাবেক কৃষিজীবী ভরা গ্রীষ্মেই রহিন পরবের আহ্বান করে। রহিন এখানে কৃষিবর্ষের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরব। মাসের তেরো তারিখ সেজন্য উৎকৃষ্ট দিন ধার্য হয়েছে। এদিন মাটিতে লাঙ্গল দিয়ে বীজ ছড়ানোর দিন। তামাম পুরুলিয়া ও ঝাড়খন্ড লাগোয়া মানুষদের দৃঢ় বিশ্বাস যে এইদিন চাষের জমিতে বীজ ফেললে ভালো ফসল হয়। পোকা লাগে না। তাই তারা গেয়ে ওঠে—
“বার দিনে বারনি, তের দিনে রহনি।
দে ন দাদা ঠেঙা কাট্যে , বহু যাবেক বাগালি।“
লোক উৎসবের নামটি রহিন বা রোহিন বা রহইন বা রহনি। এত প্রকার নামের প্রধান কারণ হয়ত স্থানবিশেষে উচ্চারণের তারতম্য হতে পারে। অথবা আত্মীকৃত হয়েও অন্যত্র অন্য কোনো ব্যাখ্যায় তাকে খুঁজে পাই কিনা সেটাও দেখার বিষয়। তবে মূল কথাটি হলো রহিন অর্থে রোহিণী নক্ষত্র। এইসময় সে নক্ষত্র নাকি পৃথিবীর কাছে আসে। পুরাণমতে রোহিণী হলধরের মা । ভারতীয় বিশ্বাসে শ্রীকৃষ্ণের জেষ্ঠ ভ্রাতা বলরাম হলেন কৃষিদেবতা। তাকেই হলধর বলা হয়। সুতরাং রোহিণী নক্ষত্রে বীজ ছড়ালে দেবতা বৃষ্টি দেবেনই এই দৃঢ় বিশ্বাস। খনা, বরাহমিহিরের দেশে এটাই বোধহয় স্বাভাবিক। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কৃষিকাজে প্রকৃতি নির্ভরশীলতা ও তিথি নক্ষত্রের প্রভাব সুবিদিত।
মানভূমে পয়লা মাঘ আখাইন যাত্রার দিন থেকে অঞ্চলের কৃষিবর্ষের সূচনা । অক্ষয় তৃতীয়ার দিন হয় ‘বীজ পূন্যাহ’ বা বীজ ছড়ানোর আনুষ্ঠানিক সূচনা। আর রহিনের দিন থেকে শুরু হয় পুরোপুরিভাবে  বীজতলা তৈরির কাজ । আগে যারা ‘বীজ পূন্যাহ’ করতে পারেননি তারা এই শুভ দিনে কাজটি সেরে নেন।
রহিন পুজোর দিন সকাল থেকেই গ্রামাঞ্চলে সাজো সাজো রব ওঠে। বাড়িঘর লরানো হয়। গোবরছড়া দিয়ে ঘরবাড়ি ঝকঝকে করে লেপাপুঁছে পরিষ্কার করার পদ্ধতিকেই ‘লরানো’ বলে। উঠোন, বাড়িঘর লরানোর পর সম্পূর্ণ বাড়ি ও তার আশপাশের গলি জুড়ে গোবরগোলা জলের বেড় দেওয়া হয়, এই বিশ্বাসে যে  সাপখোপ, পোকা মাকড়ের উপদ্রব হবে না। কোনো খারাপ হাওয়া বা অপদেবতা ঘরে ঢুকতে পারবে না। বাড়ির সকলে খালি পেটে রহিন ফল খায়। রহিন ফলকে অনেকে আষাঢ়ি ফলও বলে। এই ফল খেলে সাপের বিষ লাগেনা সেই বিশ্বাস। এরপর বৃষ্টি নামলে, বীজ পোঁতা হলে মাঠে ঘাটে চাষে জলেই কাজ এদের। পায়ে পায়ে সাপখোপের আনাগোনা হবে, সেকারণে বিশ্বাসের সাথে জড়িয়ে যায় জীবন।
বাড়ির মেয়েদের মধ্যে একজন কেউ উপোস করে থেকে স্নান সেরে ভিজে কাপড় পরে নতুন টোকায় ক্ষেতের মাটি নিয়ে আসে। এই মাটিকে রহিন মাটি বলা হয়। নতুন টোকা অবশ্যই লাগে, টোকা হলো বাঁশের তৈরি পাত্র। রহিন মাটি আনার সময় কথা বলা, হাসি বা দাঁত দেখানো নিষেধ। এ মাটি খুবই পবিত্র তাই কেউ যদি নিয়ম ভাঙে তাহলে মাটি ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে মাটি আনতে হবে। মাটি আনার পর তা প্রত্যেক বাড়ির দরজা, তুলসী মঞ্চ, গোবর কুঁড় ইত্যাদি স্থানে দেওয়া হয়। বীজতলায় বোনার জন্য নিয়ে যাওয়া ধানের মধ্যেও এই মাটি দেওয়া হয়, এই বিশ্বাসে যে বীজতলায় পোকামাকড়দের উপদ্রব কম হবে।
রহিনের মাটি আনার সাথে সাথেই এইদিন মনসাদেবীর পুজোর দিন হিসেবেও পালন করা হয়। প্রচলিত ধারণা এই যে জিহুড় অর্থাৎ আশ্বিন সংক্রান্তির দিন পৃথিবীর সমস্ত সাপ বৃষ্টির জল পান করে শীতঘুম থেকে জেগে গর্তের বাইরে আসে। তাই রহিনের দিন জল হবেই বলে অঞ্চলের মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস। প্রসঙ্গত বলা যায়, এই বিশ্বাস শুধু মানভূমের কিছু অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। বীরভূমের গ্রামাঞ্চলেও জ্যৈষ্ঠ সংক্রান্তির দিন বাড়ির আশেপাশে গোবর জলের বেড়ি দেওয়া হয়। দরজায় দরজায় নিমফলসহ নিমগাছের ডাল রাখা হয়। সেদিন সজনে শাক, কেলেকোঁড়া ভাজা আর আমড়ার টক অবশ্যই খেতে হয়। আষাঢ়ী বা রহিন ফল হলো আসলে কেলেকোঁড়া ফল। বীরভূমের আঞ্চলিক বিশ্বাস সম্পূর্ণত মনসাকেন্দ্রিক। মনে করা হয় যে এই সমস্ত খাবার খেলে আর গোবর জলের বেড়ি দিলে সাপ ও বর্ষাকালীন বিষাক্ত পোকামাকড়ের  আক্রমণের থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
আসলে কৃষিজীবী মানুষের সাধারণ ভয় ভাবনা অঞ্চলভেদে একই । বীরভূমের বেড়ি সংক্রান্তি লৌকিক উৎসব তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। যাই হোক রহিন উপলক্ষ্যে অন্যান্য গ্রামীণ দেব দেবীরও পুজোর ব্যবস্থা করা হয়। গ্রামের মঙ্গল ও শস্যকামনায় পায়রা-মোরগ-ভেড়া বলি দেয় গ্রামবাসীরা। দিনের বেলায় সেজন্য প্রায় প্রত্যেক ঘরেই মাংস ভাতের ভোজ। কেননা উৎসব অর্থে শুধুই নিয়ম পালন নয়। উৎসব অর্থে বিনোদন , ভুরি ভোজনও ।
‘ছোল- বাঁদরি’ বা ‘রহিন-নাচ’ রহিন উৎসবের অন্যতম বিনোদন।  গ্রাম ঘরের ছোটো ছোটো ছেলেরা মুখে কালি- ঝুলি মেখে, গায়ে ন্যাকড়া জড়িয়ে, নকল চুল দাড়ি লাগিয়ে সং সেজে, ভাঙা টিন বাজিয়ে, ছড়া বলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে  চাল-আলু-তেল-টাকা সব আদায় করে। অনেক সময় চাষা-চাষানীর কৃষিজীবন গাথা নাটক করে দেখায়। মজাদার অঙ্গভঙ্গিসহ কৌতুকের ভাঁড় থেকে রস গড়াতেই থাকে। নাচের সাথে যে ছড়াগুলো তারা বলে তার বিষয় বৈচিত্র লক্ষ্য করার মতো। কয়েকটি ছড়া নিচে উল্লেখ করা হলো—
১। ই ডাঙ্গায় উ ডাঙ্গায়, পিয়াল পাক্যেছে।
যাস না বুড়ি পিয়াল খাত্যে, শিয়াল খেপেছ্যে।।
২। শাগ রাঁধতে বল্যেছিলে কচু রেঁধ্যেছে।
সুআদে সুআদে(স্বাদে) বহু খায়্যে ফেল্যেছে।।
৩। আম ধরে ধপা ধপা, তেঁতুল ধরে বাঁকা।
পূব দিগে দেখ্যে আলি , রাঁড়ির হাতে শাঁখা।।
৪। আড়্যে আড়্যে যায় রে ভালুক, ভুকু(উইপোকা) কুঁড়্যে খায়।
৫। হাট গেলাম, বাজার গেলাম, কিনে আনল্যাম লাউ।
লাউ খাঁয়্যে অমুকের মা করে হাউ হাউ।।
৬। আসলা পাতের দশনা
করলা পাতের দনা
দানায় দানায় মদ পিয়ালো
হিললো কানের সোনা……
লক্ষ্য করার মতো বিষয়, নেহাৎ মুখে মুখে রচিত হলেও সামাজিক অনুষঙ্গ, পুরাণ, লোক-সাংবাদিকতা কৃষিকর্ম সব বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যাবে ছড়াগুলোর মধ্যে। এর চেয়েও যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো মানভূমের বিশ্ববিখ্যাত ছৌনাচের আদি রূপ এখানেই লুকিয়ে আছে। কারণ এই নাচের সঙ্গে ছেলেগুলো লাঙল চালানো, মই দেওয়া, ধান রোয়া, ধান কাটা, ঝাড়া, ঘরে তোলা সবকিছু যেভাবে অভিনয় করে দেখায় তা খুবই উপভোগ্য। এমনকি ফসল নষ্ট হলে কীভাবে কাঁদে, ফসল ভালো হলে কীভাবে হাসে, ফসল তোলা শেষে কীভাবে শ্বশুরবাড়ি যায়— বড়দের এসব আবেগ অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত অনুকরণের বহিঃপ্রকাশ ছেলেরা যেভাবে ঘটিয়ে থাকে তা একথারই সাক্ষ্য বহন করে যে এগুলোই ছৌনাচের আদি রূপ।
এসব নাচ গানের বিনোদন অন্তে রাত্রিবেলা ঘরে ঘরে কচড়া পিঠের স্বাদে মানভূমবাসী মাতোয়ারা হয়। কচড়াপিঠে হলো মহুয়ার ফল ও চালগুড়ি দিয়ে তৈরি একপ্রকার খাবার। কোনো কোনো জায়গায় আবার মনসামঙ্গলের আসর বসে।
এইযে পরবের খুঁটিনাটিকে কেন্দ্র করে জমাট হয়ে ওঠা গ্রামজীবন, সেখানেও আজকাল ভাঙন ধরেছে।  পড়াশোনা করে বাইরে চাকরি জোটানোর তাগিদে তারা নিজেরাই তাদের এসব ঐতিহ্য সংস্কৃতি প্রায় ভুলতে বসেছে। কারণ সভ্য সমাজের কাছে এসব নেহাতই গেঁয়ো ব্যাপার। সাথে যুক্ত হয়েছে যন্ত্রসভ্যতায় প্রযুক্তির আগ্রাসন যদিও বা কোথাও কেউ কেউ এ ঐতিহ্য বজায় রাখছে, তবু নিজেরা মুখে ছড়া বা গান গাইছে না। স্মার্টফোনে বিচিত্র যন্ত্রানুষঙ্গে বেজে উঠছে চটুলগান। বাংলার লোকজ যাপনে এর চেয়ে দীনতার আর কিছু নেই।
অথচ এই রহিন পরবের আদি রূপটি প্রকৃত অর্থেই বন জঙ্গল, ফসল বাঁচানোর উৎসব। আমাদের দেশের প্রকৃতি পূজক আদি বাসিন্দা সারনা ধর্মীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরব রহইন। এই সম্প্রদায় প্রকৃতির পুরুষ শক্তিরূপে বুঢ়া বাপ হর বা শিবের পুজো করে। অপরদিকে সৃজনশীল শক্তিরূপিণী মহামাই হরি বা ধরিত্রী মাতার পুজো করে। এদের মিলিত শক্তি ছাড়া সৃষ্টি অসম্ভব।
কৃষিসভ্যতা সৃষ্টিকারী কুড়মীরা হরের আগমনের দিন হিসাবে পরিগণিত করে এই দিনটিকে। হরহরির মিলনে ধরিত্রীমাতা হরিকরণ বা সবুজীকরণ হয়। তাই অনুচররা আনন্দ করে। বাড়ি বাড়ি নৃত্য করে। একে রহইন নাচ বলে। সাপখোপের দল হরের সাথে আসে বলে রহইন ফল ভক্ষণ করে ও বিষাক্ত সাপের হাত থেকে বাঁচার জন্য গোবরের বেড়ি দেয়। এরপর থেকেই  কৃষি কাজের সূচনা। তাই এই পরব নিতান্ত গ্রাম্য উৎসব তো নয়ই, এর মধ্যে আদিম কৃষিজীবী মানুষের বাস্তবসম্মত, পরিবেশনির্ভর , যুক্তিবাদী ভাবনা লুকিয়ে আছে।