প্রতিভা সরকার-এর গল্প

Spread This

প্রতিভা সরকার

কাকচরিত

এই দাঁড়কাকটির বাসা রাস্তার ধারের দেবদারু গাছে। গোটাকতক কুটো, লম্বা করে ছেঁড়া প্লাস্টিকের ফালি এইসব দিয়ে আবছা গোলাকার। পাশের ডুমুর গাছটায় থোকা থোকা ডুমুর পাড়তে লাঠি হাতে ছেলেপুলে উঠলে কাক আর কাক-বৌ বেজায় চেঁচায়। অস্থির হয়ে পাশের ন্যাড়া গাছের ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে লাফিয়ে যায়। সামনের ফ্ল্যাটের বৌটি বোঝে বাসায় ডিম আছে। এটা তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানোর সময়।

ফ্ল্যাটের বৌটির সঙ্গে কাকের একটা বোঝাপড়া আছে। রাস্তার উল্টো দিকে দুটো ফ্ল্যাট বাড়ির মধ্যে ছ’ ফুটের তফাৎ। এমনি সারি সারি কতো ফ্ল্যাটবাড়ি। এদিকের চারতলার জানালার কার্নিশে বসলে নীচুতে উল্টোদিকের তিনতলার ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের ভেতর কাক বৌটিকে সকালে উঠেই দেখতে পায়। চা করে, অন্যমনস্ক হয়ে চিনি গোলে। চামচের ধার কাপের গায়ে লেগে মিষ্টি আওয়াজ ওঠে ঠুনঠুন। কাক ঘাড় কাত করে নজর করে। জানে কিছুক্ষণ পরেই  জানালা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলা মাছের কানকো বা ডিমের সাদা খোসা মাটিতে পড়ার আগেই তাকে ডানা মেলে ছোঁ মারতে হবে।তারপর কার্ণিশে বসে একপায়ে এঁটে ধরে থাকা আর ঠুকরে খাওয়া।
 
খাবার শেষ করে কাক উড়ে যায়। এদের দুপুরের খাওয়া কখন সারা হবে ঠিক আন্দাজ আছে তার। বৌটি তার জন্য কিছু না কিছু জানালা দিয়ে ফেলবেই সে জানে। বিকেলে চা খাবার সময় এক আধখানা বিস্কুটও। ফলে রাস্তার ধারের হোটেল, বাজার দোকান সব বন্ধ হলেও কাককে একেবারে খালি পেটে থাকতে হয় না কখনো। বৌয়ের দয়ায় কিছু না কিছু জুটেই যায় তার।
যেমন সন্ধ্যেয় কাঠির গোল বাসায় লম্বা ঠোঁট ডানার ভেতর ঢুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার আগেও তার কিছু না কিছু জুটে যায় এবাড়ির ছাদে। বৌটি তখন ছাদের হরেক টবে জল দিতে ওঠে। বালতির ভেতর লকলকে লাউগাছ, বিরাট টবে বেগুন গাছ, কালো বেঁটে লংকার চারা, লম্বা সবুজ লংকার চারা সবেতে সাদা পাইপে জল ছেটায় বৌ। গাছের গোড়া খুঁড়ে ঘাস তোলে শেকড়শুদ্ধ, পাটের হালকা দড়িতে কুমড়ো গাছ বেঁধে দেয় রেলিংয়ের সঙ্গে। লাল টম্যাটো, যারা এই অসময়েই রঙ ফলাবে বলে ঠিক করেছে, তাদের খুঁজে বার করে পাতার আড়াল থেকে। মেদহীন চ্যাটালো পেটের ওপর ঝুলে থাকা ম্যাক্সির বিরাট পকেটে একটা একটা করে চালান করে।
কাক ওকে একটুও ভয় পায়না। লক ডাউন, লক ডাউন চেঁচামেচিকে ক- বর্গের প্রাধান্যযুক্ত নিজের ভাষায় সে শুনতে থাকে কক কাউন, কক কাউন। সে লক বা কক যাইই হোক না কেন হোটেল বাজার বন্ধ হয়ে গিয়ে বড় জলকষ্ট হয়েছে কাকের। উড়ে যেতে হয় সেই আটকে পড়া মেট্রো শ্রমিকদের ডেরা অব্দি। সেখানেও পাশের নালার জল বড় নোংরা। তাই দিনের শেষে এই ছাদে তার জলতেষ্টা মেটে। বৌয়ের হাতে ধরা পাইপ অন্য গাছের গোড়া খুঁজে নিলেই কাক উড়ে গিয়ে বসে আগের টবটিতে। মাথা কাত করে চোঁ চোঁ করে টেনে নেয় গোড়ায় জমা জল। বৌ ফিরেও দেখে না।
শুধু তো জল নয়। বৌয়ের ম্যাক্সির পকেট থেকে রোজ বেরোয় আতপ চাল, ডাল বা গম। সেদিন কাক আর কাকনীর সঙ্গে ডুমুর গাছের চ্যাঙড়া কাকটাও দু ঠ্যাঙে লাফিয়ে বেড়ায় সারা ছাদময়। বৌটা কাউকেই কিছু বলে না। কিছুদিন আগে অব্দি এই ছাদ থেকে মেট্রো রেলের আনাগোনা দেখা যেত। সেইদিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তার টিকালো নাকের পাটা কাঁপতো তিরতির, কাক বুঝতো বৌ এবার কাঁদবে, হাপুস কাঁদবে। কাঁদতে কাঁদতে তার ঘাড়ের ওপর হাতে জড়ানো খোঁপা খুলে বুকের ওপর চুল ঝাঁপিয়ে পড়তো। লম্বা লম্বা আঙুল চোখের ওপর রেখে বৌ ডুকরে ডুকরে কাঁদতো।সূর্য অস্ত যাবার আগে ডালিম ফুলের আলোতে সেই কান্না কি যে অপূর্ব লাগতো, গম খাওয়া ছেড়ে কাক হাঁ করে বৌকে দেখতো, ফুলে ফুলে ওঠা পিঠ দেখতো। কপালে ঘামে আর কান্নায় লেপটে যাওয়া সিঁদুরের দাগ দেখতো। কাকের গলার নিচে যেখানে কালো আর ছাই রঙের রোঁয়া মিশেছে একসঙ্গে, সে জায়গাটা ছাদের হু হু বাতাসে কাঁপতো তিরতির তিরতির।
এখন তো মেট্রো ফেট্রো সব বন্ধ। ফলে বৌ আসে, গাছে জল দেয়, কাকেদের খেতে দেয়, কুমড়ো ফুল তোলে, লংকা তোলে, তারপর চুপ করে বসে থাকে অনেকক্ষণ। দেরি হলে কোনোদিন তার শাশুড়ি উঠে আসে, তাকে বকাবকি করতে করতে। কোনোদিন ছিমছাম সুপুরুষ, কিন্তু ভীষণ কড়া চোখের স্বামী। এরা এলেই কাক উড়ে গিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে। আর দেখে পাশের ছাদে স্কিপিং করে রোজ যে অল্পবয়েসি ছেলেটি এদের দেখলেই সেও তড়িঘড়ি সিঁড়ি বেয়ে নেমে যায়, নয়তো টুপ করে বসে পড়ে দেওয়াল ঘেরা ছাদে।
কেন তা কাক জানে না। বৌ  কোনোদিন ওদিকে তাকিয়েছে কিনা কাক জানে না। সে আপনমনে জল দেয়, বসে থেকে সূর্যের ঝড়তিপড়তি আলোটুকু গায়ে মাখে। না মেখে পারে না বোধহয়। নাহলে সেদিন নামতে দেরি হচ্ছিল বলে ওর বর এসে দুকথার পর এতো জোরে চড় মারলো, মনে হল বৌ ছিটকে পড়ে যাবে। কোনোরকমে সে সামলে নিল, কিন্তু কা কা করতে করতে কাক উড়ে গেল পাশের ঘেরা ছাদে। সেখানে পুচ করে পটি করে দিয়ে লাফিয়ে ঘুরে বসতেই দেখে দেওয়ালে গা মিশিয়ে বসে আছে সেই হুঁশিয়ার স্কিপিংওয়ালা। পায়ের কাছে জড়ামড়ি করে পড়ে আছে তার স্কিপিংয়ের দড়ি।
কক কাউনে মানুষের অশান্তি বাড়ে কিনা কাক জানে না। প্রত্যেক সন্ধ্যেয় বাসায় উড়ে যাবার আগে তাকে কিন্তু আগের মতোই বেজায় প্রেমে পায়। সে কাকনীর ঘাড়ের রোঁয়ায় ঠোঁট ডোবায়, ঠুকরে পোকামাকড় উদরস্থ করে। ঠোঁটেঠোঁটে চুমু খায়। পাশাপাশি বসে থাকে অনেকক্ষণ।তারপর জল খাওয়া সেরে উড়ে যায় দেবদারু গাছে। তার পেটের নীচে একটি, কাকনীর পেটে একটি, দুটি ডিমকে উষ্ণতায় মুড়ে এক ঘুমে কাবার করে দেয় রাত্রি, খুব ভোর ভোর ডানা ঝাড়বে ব’লে।
সেদিন হঠাত সন্ধ্যের আগে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি নামল। বৌ জল দিতে দিতে হাতের পাইপ ফেলে কল বন্ধ করল। বৃষ্টির ধরন দেখে মনেই হচ্ছিল, বেশিক্ষণের জন্য নয়। তাই বোধহয় গাছেরা যথেষ্ট জল পাবে না এই বিবেচনায় বৌ দাঁড়িয়ে গেল সিঁড়িঘরের সানশেডের নিচে। ঠিকই, বৃষ্টি থেমেও গেল চটপট। আকাশটা উড়ন্ত ছেঁড়া মেঘ আর মেঘের আড়াল থেকে চুইয়ে পড়া কমলা আলোয় অপরূপ হয়ে উঠলো।
কাক তার অল্পভেজা ডানা দুটোকে শুকিয়ে নেবে বলে টাটা স্কাইয়ের গোল চাকতির ওপর এমন ভাবে অন্য ছাদের দিকে মুখ করে বসল যাতে ঈষৎ ফাঁপানো ডানারা থাকে সূর্য ডুবে যাবার দিকে। আগেই তার নজরে পড়েছে মেঘভাঙা কমলা আলোর আভাস।। আর তখনই কাকের নজরে পড়ল স্কিপিং-ছেলেটি হাঁটু মুড়ে ঘেরা ছাদের প্রান্তে মাথাটুকু খালি জাগিয়ে তার মোবাইলে বৌটির ছবি তুলছে পটাপট। বৌ তখন তার মুখোমুখি শেডের নিচে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে আছে উড়ন্ত মেঘের দিকে। খেয়ালই নেই যে বৃষ্টিতেও নিচে নামেনি বলে যে কোনো মুহূর্তে উঠে আসতে পারে তার স্বামী বা শাশুড়ি।
বেজায় রাগ হয়ে গেল কাকের। দেওয়ালের ওপর ভাসানো মাথাটিকে টার্গেট করে সে মারলো এক ঠোকর। শালাকে সে ক বর্গে এনে বলল কালা, তারপর আর এক ঠোকর। কালা, তোমার জন্য ভালোমানুষ বৌটা মার খাবে আর তুমি লুকিয়ে ফটোক তুলবে। কভি নেহি কথাটা কাকের ডাকে হয়ে গেল ককি কেহি। সাহস থাকে তো যা না শালা, এ ছাদ থেকে ও ছাদ অব্দি ফাটিয়ে দিয়ে চেঁচিয়ে ওঠ, তোমাকে আমার ভাল লাগে। হয়তো বৌটার নরক যন্ত্রণার কিছুটা উপশম হবে কারো তাকে ভাল লাগে জানলে। তা না, কেবল চুরিয়ে দেখা আর লুকিয়ে ফটো তোলা !
শক্ত ঠোঁটের ঘায়ে বেদম যন্ত্রণা।
হাউমাউ করে উঠল স্কিপিংওয়ালা, তারপর দুহাত মাথায় ঢাকা দিয়ে সে কী দৌড় !  মোবাইল ফেলে যাচ্ছিল, অর্ধেক রাস্তা থেকে ঘুরে এসে সেটা নিয়ে গেল।
এই হুটোপাটিতে বৌ ধারে এসে ঝুঁকে পড়ল। কাকের উত্তেজিত ওড়াউড়ি দেখে কী ভেবে দুহাতে তালি দিল দুবার। তারপর কিছু বুঝতে না পেরে নিচে নামার তোড়জোড় করতে লাগলো। পাইপ গোটালো। কল খুলে হাত পা ধুলো। তারপর নিচে নেমে যাচ্ছিলো , তখনই ট্যাঙ্কের মাথার ওপর থেকে কাক পিছু ডাকলো “ক্ক কররর ক্ক”। যেন বলতে চাইলো, বুঝলে কিছু ?  তোমাকে ভালো দেখতে চাই।
বৌ মুখ ফিরিয়ে তার দিকে চাইল। কোনোদিনও কাক তার মুখে যা দেখেনি সেই পশলা বৃষ্টির মতোই প্রায় অদেখা একটুকরো চিকচিকে হাসি বৌয়ের পাতলা ঠোঁটে খেলা করতে দেখে কাক আনন্দে লাফাতে লাফাতে আবার ডানাদুটো ফাঁপিয়ে নিল। বৌয়ের ঠোঁট হাসছিল, নাকের নাকছাবি হাসছিল, চোখও হাসছিল। এই প্রথম কাকের মনে হল এই হাঁ কাত্তিক বৌটিও বোঝে কে ওর ভালো চায়।
যেটুকু আলো লেগে আছে তাতে ডানাগুলো শুকিয়ে যাক বাবা,  নইলে বোকা মানুষ যেমন ভেজা চোখে  ঘুমুতে যায়, কাক তেমন ভেজা ডানা মুড়ে ঘুমুতে যেতে পারবে না।