শুভদীপ মৈত্র-র গল্প

Spread This

শুভদীপ মৈত্র

আসলে যা ঘটে বা ঘটে না
রতন ভূতে বিশ্বাস করে। অ্যাপার্টমেন্ট-এর পাহারাদার আনোয়ারও করে। না করে উপায় নেই তাদের। এই যে এতগুলো গল্প বা বলা ভালো গালগল্প ইংরেজিতে যাকে  ‘অ্যানেকডটস’ বলে তার উৎস তারা বলবে কী করে? আর, সত্যিটা কী তা নিয়ে যখন টানাহ্যাঁচড়া শুরু হবে তখন সেসব হ্যাঙ্গাম সামলাবে কে? হ্যাঙ্গাম ভদ্রলোকদের জন্য এক, ওদের জন্য আলাদা।  মোদ্দা কথা হল  ভূতে পাওয়া গল্প হলে সমস্যা কম। তা এ এক তেমন গল্প বটে যা রতন যে অ্যাপার্টমেন্ট-এর বাইরে ইস্তিরি করে বা আনোয়ারের মুখ থেকে আপনারা শুনতে পাবেন – তাদের একটু হাত ফাঁকা থাকলে অথবা যখন লোকজন বিশেষ নেই সময়টা সত্যি তাদের একান্ত নিজেদের। গল্প যা খাস ভূতের মুখ থেকেই শোনা গেছে।
গল্পের শুরু
 ওরা দু’জন বাড়িতে আসবে এটা জানা ছিল, এবং জানা ছিল ওদের সম্পর্কে। ওরা বলতে ধরুন একটা করে নাম দেওয়া যাক, সা আর রে অথবা সু আর কু, আচ্ছা রে আর মি থাক – একটু বিলিতি বিলিতি হল। তা ওদের আসার বিষয়টা নিয়ে সবচেয়ে উৎসাহী ছিল আমার বউ। রে আর মি দু’জনেই বিখ্যাত মানুষ, এক ধরনের সেলিব্রিটিও বটে, (যদিও হাওড়া পেরোলে আর তাদের কেউ চেনে কি না বলতে পারব না) যদিও বয়স্ক তবু তাদের নিয়ে শহরের অনেক লোকের উৎসাহ ও আদিখ্যেতার শেষ নেই।
তা ধরুন সেটা আমারও যে একেবারে ছিল না তা নয়, না হলে আমিও বা ডাকব কেন তাদের, বা আসতে প্রশ্রয় দেব – আসলে আমিও সদ্য শহরের নতুন ওঠা আধুনিকতম ফ্ল্যাটে, ডুপ্লে স্টাইলের বাড়িতে এসেছি, বিজ্ঞাপন জগতে কিছু নামডাক হয়েছে, তাছাড়া একটু আধটু কাগজটাগজ ওয়েবজিনটিন-এ লেখা, ইন্টারভিউ বেরিয়েছে – কাজেই নিজেকেও ভাবছি জাতে উঠলাম। তবে এই লোকগুলোকে নিয়ে আমার সন্দেহ ছিল, এরা হল জন্ম ঢ্যামনা আমি কী করে পেরে উঠব এদের সঙ্গে? একটু দূরে দূরে থাকাই ভাল মনে করতাম, কিন্তু পারা গেল না।
তাছাড়া আমার স্ত্রী, সে সদ্য একটি বুটিক খুলেছে, এমন কিছুই না ওই এক বন্ধুর গ্যারাজের একটি অংশে, কিন্তু তাও তো ‘বুটিক’ অর্থাৎ দোকান নয় কাজেই তারও একটা সুপ্ত বাসনা… না না ঠিক সুপ্ত বাসনা বলা ঠিক হবে না বরং বলা ভালো সেও এই পরিকল্পনার হিস্যা, না কি আসলে তোমার কর্ম তুমি কর মা। আমি এখন আর নিশ্চিত নই। সোশ্যাল মিডিয়া, ফেসবুক, হোয়াটস্‌ অ্যাপ, ইন্সটাগ্রাম ইত্যাদি মারফত সে যে একেবারে এদের অপরিচিত ছিল তাও নয়, আর সুন্দরী মহিলাদের এঁরা মনে দুঃখ দেবেন এমন অসভ্য, অনাগরিকও নন। কাজেই রে ও মি-র আমার বাসায় শুভাগমন যে ঠিক কার প্ররোচনায় তা নিয়ে ফয়সালা করা কঠিন। ফোনে বা চ্যাট-এ তাদের সঙ্গে আমার বউয়ের মিষ্টি মিষ্টি কী কথাবার্তা হয়েছে তা তো আর আমি জানি না।
তা যাক আয়োজন তো করতেই হত যখন বাড়িতে ডেকেছি। হায় কেন যে ছাতা ডেকেছিলাম। রে, তার স্ফীত মধ্যপ্রদেশ, বেঁটে শরীর ও চকচকে টাক নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকলেন সঙ্গে কয়েজন সাঙ্গোপাঙ্গ, সন্ধ্যে সাতটা বাজে তখন, কাঁটায় কাঁটায় সময়ানুবর্তী কিন্তু সঙ্গে ধামাধরা। সত্তর ছুঁইছুঁই বয়স কাজেই সে ভারে একটু থপথপে। কিন্তু দুষ্টুমিষ্টি একটা হাসি, আমি বলতে যাচ্ছিলাম সুস্বাগতম স্যার, তারপর স্যারটা কোনো রকমে গিলে নিলাম। যেমনটা অভ্যাস, তাছাড়া রে নামজাদা শিক্ষাবিদ, তাত্ত্বিক, প্রাবন্ধিক আরো কত কী, কত লোক এঁকে স্যার বলে, এঁর কাছে কেন কোনো দিন স্কুল কলেজেই না পড়ে – এমনই শিক্ষার গৌরব। তা হোক আমার অমন করে বলা সাজে না, আর ইনিও সেটা পছন্দ করেন না, বলেন এসব বাহুল্য উষ্ণতার অন্তরায়।
রে আমার উপর কতটা সদয় বলতে পারব না, আর তাঁর চারপাশে আমার মতো কত আছে, কত আসে কত যায় – একটা অভ্যাসগত হৃদ্যতা বজায় অবশ্য তাঁর থাকে, কিন্তু কখনোই তাকে নিকটবৃত্তে ঢুকতে দেন না, আমায়ও দেননি সেভাবেই – বোধহয় তাই সঙ্গে কয়েক জনকে নিয়ে আসা, বোর হয়ে গেলে অন্তত তাদের সঙ্গে কথোপকথনে থাকা যাবে। ঘরে ঢুকে অবশ্য তার সুচারুবিন্যাস ও সুরুচির সাজগোজে খুশিই হয়েছেন মনে হল। তবে এসব টাকা থাকলে করে দেওয়ার লোক আছে তাও তিনি ভালই জানেন। তারপর তাঁর চোখ পড়ল গৃহকর্ত্রীর দিকে। ওহো বলা হয়নি তার নাম লাই-লা, তা সে দু’হাত জড়ো করে বুকের কাছে নমস্কারের ভঙ্গিতে, যেন সেই অজন্তা বা গ্রীস বা কোনার্কের মূর্তি। একটা শিফনের লাল শাড়ি ও লাল ব্লাউজ স্প্যাগেটি কাটের, গলায় হোয়াইট মেটালের একটা হার যার পেন্ডেন্ট ঠিক বুকের সন্ধির উপর চিকচিক করছে, ঢেউ খেলানো চুল একদিকে ফেলা কাঁধের উপর যার নিচে ব্রুচ দিয়ে আটকানো আঁচল। ঠোঁটে রক্তিম লিপস্টিকে লেগে হালকা হাসি যা চোখের কোণেও। রে আনখশির ভালো করে মাপলেন তাকে। এ তাকানোকে মাপন ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না। কিন্তু লাই-লা বোধহয় প্রস্তুত ছিল, তাই একটুও টাল খেল না।
শাবাশ, মনে মনে বললাম, কারণ প্রথম পরীক্ষায় পাস আমরা। রে লেদারের নরম কাউচে জমিয়ে বসল, পাজামা ও কুর্তার উপরের হাতকাটা খাদির কোটটা খুলে রেখে।
রে ও তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা মজলিশ জমাতে জমাতে ঘরটার বর্ণনা দেওয়া যাক। ভাল কথা আমার বউ বেশ খুশি কারণ তার মাথায় হাত বুলিয়ে রে বলেছে ‘সংসার সুন্দর হয় রমণীর গুণে’। তা এই ড্রয়িংরুম বেশ কেতার তার এক কোণ দিয়ে ঘোরানো সিঁড়ি উঠে গেছে উপরের বেডরুমে। সিঁড়ির তলা দিয়ে গেলে বাথরুম, একপাশে ওপেন কিচেন ও তার সামনেই রট আইরনের ডাইনিং টেবিল। এই যে ঘরের মাঝখানটায় রে ও তাঁর চ্যাঙাব্যাঙারা গজল্লা করছে নিচু সোফাগুলোয় বসে, তার সামনে একটা সেন্টার টেবিল – টেবিলের উপর একটা পিতলের ছোট ঘট ও তাতে কিছু টাটকা ফুল রাখা।
দরজা দিয়ে ঢুকতে একটা কাঠের বক্স শ্যু র‍্যাক তার উপরও ফ্লাওয়ারভাস রয়েছে কাট গ্লাসের। ওই দেওয়ালটা টানা যাতে বেশ কিছু যামিনী, যোগেন, গগনেন্দ্রর প্রিন্ট বাঁধানো। ওই দেওয়াল দিয়ে সোজা এগোলেই সিঁড়িটা। ঘরটা হলদে মিঠি আলোয় উজ্জ্বল এখন। নানাবিধ আলো ও ল্যাম্পশেড-এ মায়াময়। এমন ঘর সিনেমাটিনেমায় দেখা যায় বলে যাদের ধারণা তাদের বলি এ মধ্যবিত্ত সন্দেহ, আনোয়ার জানে এমন ঘর হয় ফাইফরমাশ খাটতে গিয়ে, রতন জানে কারণ ডেলি তাকে ইস্তিরি-মারা কাপড় দিতে যেতে হয়,  তাই তাদের কাছে এ বর্ণনা অবাস্তব বা ফিল্মি নয় মোটেই।
এবার ঘরের থেকে চোখ ফেরানো যাক। এতক্ষণে রে বেশ জমিয়ে বসেছেন। আমি তার জন্য দামি হুইস্কি আনিয়ে রেখেছিলাম – ব্ল্যাক ডগ। না গ্লেন জাতীয় কিছু সাধ্যে কুলোয়নি, তাতে অবশ্য তিনি নারাজ হননি কারণ অনুপানে লাই-লার নিজের হাতে তৈরি চিংড়ি মাছের চপ, মোচার চপ ইত্যাদি ছিল। ‘আরে এ তো কালিকার চপের থেকেও উৎকৃষ্ট দেখছি, নাহ মেয়েটার গুণ রয়েছে,’ এ কথায় পুলকিত, অবশ্য তার আগেই রে-র বাক্যবিন্যাসে, বাচন পটুত্বে সম্মোহনিত…থুড়ি সম্মোহিত (আমার বাংলার এই ভুল লজ্জার বা ঠাট্টার, আমার পিছনে এ নিয়ে অনেকেই হাসাহাসি করে জানি) হয়েই রয়েছে সে।

কাউচ সদৃশ সোফায় রে হেলান দিয়ে বসেছিলেন। তাঁর আশেপাশের চেয়ারে, মোড়ায় বসে বাকিরা। আমি সবচেয়ে দূরে বসে তাঁর থেকে বরফ, সোডা, জল ইত্যাদির যোগান দিতে হচ্ছে। তিনি লাই-লাকে ডাকলেন তাঁর কাউচে এসে বসতে, আরে বয়স হচ্ছে আমার, চোখে কি আর আগের মতো দেখতে পাই? তা বলে এমন সুন্দরীকে একটুও দেখতে পাব না এ কি ঠিক? বলে সোফাটা চাপড়ালেন। লাই-লা অল্প হেসে উঠি কিন্তু উঠি না-য় দোনামোনা করল খানিক। রে বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললে, সৌন্দর্যের কোনো বিকল্প নেই, আর্ট বলো আর্ট, সমাজ বলো সমাজ, রাজনীতি বলো রাজনীতি, যেখানে সৌন্দর্যবোধ নেই তার সমঝদার নেই সেখানে কিচ্ছু হবার নেই, শুকনো শুকিয়ে যাবে সব, বলে আবার লাই-লার দিকে তাকিয়ে বললেন, কই? এবার লাই-লা সলাজ হেসে তাঁর কাউচের বিপরীত ধারটায় গিয়ে বসল। রে নিজের হাতে একটা গ্লাস নিয়ে হুইস্কি-সোডা মিশিয়ে তার দিকে বাড়ালেন – সে মদ্যপানে খুব দড় নয়, তবু রে-র বাড়ানো গ্লাসটা হাতে নিল। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম, মদ জিনিসটা সে খুব ভালো সামলাতে পারে না, আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতে সে হাসল। বুঝলাম ভয় নেই সে বুঝেই পান করবে।

বাকিরা বেশ বিভোর হয়ে আছে আড্ডায়, নেশায় ও রে-তে। নরক-গুলজার যাকে বলে। আস্তে আস্তে বুঝলাম তারা নিজেদের মতো মশগুল হয়ে গেছে গালগল্পে – আমি তার খুব যে কিছু বুঝছি তা নয়, তাদের বৃত্তের বাইরের লোক আমি ফলে ধরতে পারা মুশকিল। আমি ক্রমশ সেই আড্ডার বাইরের লোক হয়ে উঠছি। লাই-লার অবশ্য সে হাল নয় কারণ রে মাঝেমধ্যেই তাকে দু-এক কথায় বুঝিয়ে টেনে নিচ্ছিল সেই কথোপকথনে, লাই-লাও হেসে, চোখ বড়বড় করে নানা অভিব্যক্তিতে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করছিল তাছাড়া তাকে অন্তর্গত করতে এদের কারই বা আপত্তি থাকবে স্বয়ং রে যাকে অভয় দিয়েছে।
রে-র আমোদিত গলা শুনে মনে হল নেশাটা তার জমেছে। অবশ্য মাতাল সে হয় না সহজে এ কথা সবাই বলে – এই বয়সেও সে যে পরিমাণে গলাধঃকরণ করে তাতে গড়পড়তার উলটে যাওয়ার কথা। রে গড়পড়তা নয় কোনো দিকেই। মৌতাতে আধবোঁজা চোখে বিড়বিড় করে কবিতার লাইন আউড়ালেন, আমার অচেনা। তারপর হঠাৎ লাই-লার দিকে ফিরে বলল, সুধা হয়ে ওঠে মদ তখনই যখন তা সুন্দরীদের হাতে মিশ্রিত হয়, অন্তত ফিটজেরাল্ড সাহেবের সাকি বালক নয়, আর আমি তাকে এ ব্যাপারে সমর্থন করি। বলা বাহুল্য লাই-লা ব্যাপারটা না বুঝে অল্প হাসল। রে হাতের ফাঁকা গ্লাসটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললে, দেবী প্রসন্ন হউন। লাই-লা ব্যাপারটা বুঝেছে এবার, সে আর কী করে বলতে বাধ্য হল, আমি এর হিসেবটিসেব বুঝি না, এ বাবা ভুল করে ফেলি যদি। রে হাসল। মাথায় বাম হাতটা বুলোতে বুলোতে বলল, বেহিসেবি হতে আমার আপত্তি নেই তা যদি একান্ত আপনার হাতে হয় মালেকায় মেহফিল। কিন্তু এত লোক এখানে তারা বঞ্চিত হবেন যে, বয়সকালে আপনাকে ও বোতলকে একত্রে তুলে নিয়ে গিয়ে আরব দস্যুর মতো পান করতাম, তবে সাধারণ্যে কি সম্ভব। সবার হো-হো হাসির মধ্যে লাই-লা দেখলাম ব্লাশ করল, কথার পারদর্শিতায় সে পারবে কেন?
বাঞ্চোত বুড়োটা এভাবে ফ্লার্ট করছে সবার সামনে, রাগও হচ্ছে কিন্তু আমার কিছু করার নেই। বুড়োটা কিন্তু পটিয়ে ফেলেছে লাই-লা ড্রিঙ্কস বানানোর জন্য, শেখাতে সে যতটা তৎপর আমার বউও ততটাই আগ্রহী। বাকিরা আমরাও চাই, হোক হোক বলে গ্লাস বাড়িয়ে দিয়েছে।
কাট গ্লাসের পাত্রগুলো টেবিলের উপর হাঁ করে রয়েছে যেন, কতগুলো হাঁ মুখ অপেক্ষা করছে। বোতল নিয়ে লাই-লা সন্তর্পণে ঢালার চেষ্টা করতেই রে বললে না অমনভাবে নয় গ্লাসে আর বোতলের মুখ যেন লিপলক করবে, বলে তার হাতে গ্লাস ধরাল একটা তাও পছন্দ হল না এবার বললে আচ্ছা গ্লাস আমি ধরছি বলে বাম হাতে গ্লাস নিয়ে ডান হাতের আঙুল দিয়ে লাই-লার বোতল ধরা আঙুল জড়িয়ে শেখাতে লাগলো। নিঃশব্দে গ্লাস ভরে উঠল লাই-লা একটু ঝুঁকে রে ঘন হয়ে বসে তার পাশে নানা রকম তথ্য দিচ্ছে হুইস্কি, সোডা, মিশ্রণ ইত্যাদি নিয়ে। সবাই ধন্য ধন্য করছে, সুরা সুন্দরী, সাকি খাপে খাপ…ভিতর ভিতর আমি গরগর করছি শালারা এত নির্লজ্জ।
সবার হাতে গেলাস লাই-লাও দেখলাম একইরকমভাবে গ্লাস তুলল, পুলকিত কারণ রে বলেছে, এই সুধা আজ লাই-লার মতো অপরূপ হলো। পারেও লোকটা এত কথা যোগায় কোত্থেকে!
আমি কমিউনিকেশন-এর কেজো তত্ত্ব জানি, বিজ্ঞাপন টুকটাক লেখা সেসব তাতে চলে যায়, কিন্তু রেটরিক কী জিনিস তা আমার জানা ছিল না। সে এক উচ্চমার্গের চর্চা, প্লেবিয়ানদের জন্য নয়। হাজার হাজার বছর ধরে ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত মালিকেরা এর চর্চা করে গেছে তা তাদের অনায়াসসাধ্য সিসিরো থেকে ঘরে বাইরে-র সন্দীপ যা পারে আমি কী করেই বা পারব। হয়তো অন্য ক্ষেত্র হলে আমিও চমৎকৃত হতাম, কিন্তু এখন ঝাঁড় জ্বলছে। তখন কি জানতাম যে এই সামান্য কথার পাঁয়তাড়াই রাতের শেষ দুর্ভোগ নয় আমার।
ন’টা, সোয়া ন’টা নাগাদ রে ঘড়ি দেখলেন তারপর বললেন মি এখনো এলো না দেখছি। বলে তার সাঙ্গোপাঙ্গদের দিকে তাকালেন, আজ আড্ডা এখানেই ভঙ্গ হোক, রাস্তাঘাট ভালো নয় আজকাল তোমাদেরও বাড়ি ফিরতে হবে। অবশ্য আমি একটু বসছি মি-র সঙ্গে দরকার আছে, সে আসবে কখন কে জানে? লাই-লা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, এখুনি আসবে আমায় মেসেজ করল তো মিনিট পনেরো আগে। রে ভ্রূ তুলে তাকালেন লাই-লার দিকে কী একটা বলতে গিয়েও বললেন না।
বাকিরা বেরোনোর তোড়জোড় করছে, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, টয়লেটটা একটু দেখিয়ে দাও। আর হ্যাঁ গৃহকর্ত্রী তুমি বাকিদের বিদায় জানাও। আমি উঠে গিয়ে ওনাকে দেখিয়ে দিলাম, ধীর পায়ে তিনি আমার পিছু নিলেন। বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনি আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, মি-কে কি তোমরা আগে থেকে চেনো? আমি মাথা নাড়লাম, হুম আর গৃহকর্ত্রী? আমি আবার মাথা নেড়ে বললাম না তেমন আলাপ নেই আমাদের কারোরই। রে মাথা দোলাতে দোলাতে বললেন তাই বুঝি, তবে সামলাতে পারলে ভাল, বিশেষ করে সামনে এমন, তা হোক দেখা যাক। বলে মুচকি হেসে এগোলেন স্বস্থানের দিকে। তিনি এখন বেশ স্বচ্ছন্দ যেন এই পার্টিটা ওনারই পরিকল্পনা আর তিনি অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টরের মতো সঞ্চালিত করছেন আমাদের। আমি কি কোনোদিন এর মতো হতে পারব – এই অনায়াস নেতৃত্ব দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হবে, সবার মধ্যে এভাবে একজন বিশিষ্ট হয়ে ওঠা? সেই ইচ্ছে ভিতরে আছে বলেই তো এদের কাছাকাছি পৌঁছনোর চেষ্টা।
গল্পের ক্লাইম্যাক্স
রে নিজের জায়গায় ফিরে বসার খানিক পরেই ডোরবেল বাজল। লাই-লা উঠে গিয়ে দরজা খুলল। বাইরে থেকে মি-র গলা শুনতে পেলাম কী বলল তা বুঝলাম না তবে লাই-লা হেসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গেই মি ঢুকল না ঘরে, লাই-লা ঘাড় নেড়ে নেড়ে কিছু বলছে, তারপর তার প্রবেশ। সোয়েডের জ্যাকেট আর জিন্স পরা বছর পঞ্চাশের পুরুষ বেশ খানিক লম্বা এবং সামান্য ভুঁড়ি। তবু আকর্ষক।
সে গটগট করে হেঁটে রে-র সামনে দাঁড়াল, ঝুঁকে একটা বাও করে প্রশ্ন করল ‘কী খবর প্রভো?’
রে দু’হাত তুলে আশীর্বাদের ভঙ্গি করল। এদের কান্ডকারখানা বোঝা ভার। মি-টা মদ খেয়ে আছে – অবশ্য সে আর নতুন কি, সূর্য ডোবার পর না কি অন্য পানীয় ভদ্রজনের জন্য নয় তাতে পেডিগ্রি নষ্ট হয় – আমি জানতাম  সে জিনিস কুকুরদের থাকে, মানুষেরও হয় তা এঁরাই ঠিক করেছেন, অবশ্য কুকুরদের সঙ্গে এদের মিল আরেকটা রয়েছে বটে, তবে সেটা ভদ্রসভায় বলা যায়  না, অন্তত বলতে যে দক্ষতা লাগে সে পটুত্ব আমার নেই।
দু’এক পাত্তর আমারো পেটে পড়েছিল, মি-কে ঠিক কি বলেছিলাম মনে নেই তবে সেটা তার পছন্দ হয়নি বোধহয়, অন্তত আমাকে পাত্তা দেওয়ার মতো মনে হয়নি তার। আর তার পাত্তার কেন্দ্র যে লাই-লা তা বুঝতে অসুবিধাও হয়নি, আমার কেন, কারোরই না।
মি এক জায়গায় বসার বান্দা নয়, পায়চারি করে এদিক ওদিক ঘুরছিল, নেড়েচেড়ে দেখছিল এটা সেটা – লাই-লাকে শোনাচ্ছিল তার দেশ বিদেশ ভ্রমণের গপ্প, তার নাটক, লেখালেখি ইত্যাদি। লাই-লাও বেশ মুগ্ধ। রে এরমধ্যে নানা কথায় আমাকে টেনে রেখেছিল। আমার অস্বস্তি টের পেয়েছে বুড়ো। মি-কে মদ অফার করতে সে পাত্তা দিল না হিপ ফ্লাস্ক বের করে গলায় ঢালল নিজের আনা পানীয়। কী খায় কে জানে, আমার রাগ হলেও চেপে গেলাম। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে আর এই ফস্টিনস্টি ভাল লাগছে না – বললাম, ‘এবার পার্টি শেষ হোক।’ মি অদ্ভুত চোখে তাকাল ‘এ কী গ্রাম্যপনা’। নাইট ইজ ইয়ং – আর এখনই বাঙালি ঘুমবে। রেগে কী একটা বলতে যাচ্ছিলাম রে আমার হাত চেপে ধরল। ‘হ্যাঁ আর বেশিক্ষণ গৃহকর্তা কর্ত্রীকে অত্যাচার করা ঠিক হবে না’ তারপর আমার দিকে ফিরে বলল ‘একটু নিভৃতে গিয়ে আমাদের কথা সেরে নেওয়া যাক?’ কী বলব বুঝলাম না, রে-র সঙ্গে আমার দরকারও আছে, নেক্সট বিজ্ঞাপনের জন্য রেকমেন্ড সে করলে নিশ্চিন্ত। আমাকে দোনামোনা দেখে খিকখিক করে হাসল মি, ‘কী একলা বৌকে আমার হাতে রেখে যেতে সাহস হচ্ছে না বাঙালি-বাবু?’ বলে লাই-লা যে চেয়ারে বসে তার শোল্ডার রেস্ট ধরে ঝুঁকে দাঁড়াল – লাই-লার ঘাড়ের কাছে তার মাথা – কাঁধে নিশ্বাস পড়ায় লাই-লা স্টিফ, মুখ লালচে, হাসার চেষ্টা করছে। রে বলল, ‘তুমি ঐখানে যে পিয়ানো আছে তাতে সুর তোলো দেখি। লাইলাকে বরং তোমার গুণের একটু পরিচয় দাও বকবক না করে। ওর মাথা না খেয়ে একটু সুর মূর্চ্ছনা দাও। আমরাও উপভোগ করি।’
মি দু’হাত তুলে একটু সরে বলল, ‘ব্যস ঠিক আছে, খাওয়া খাইয়েতে না হয় নেই। যদিও একা এমন হরিণীকে পেলে ছেড়ে দিতে আছে না সে খুশি হবে?’ ‘ধ্যাৎ’ বলে লাই-লা উঠে এগিয়ে গেল পিয়ানোটার দিকে, ‘আসুন একটু আপনার বাজনা শোনা যাক।’ তার টলমলে গতিময় শরীরের দিকে মি তাকিয়ে, আমার কাঁধ ধরে টানল রে। আমি সিঁড়ি দিয়ে উপরের ঘরে উঠতে উঠতে শুনলাম পিয়ানোয় চমৎকার সুর তুলছে মি, নেশা করে থাকলে কী হবে আঙুল একেবারে তৈরি। কী বাজাচ্ছিল জানি না। একটানা নয়। থেমে থেমে। একেকবার একেক রকম। নিচ থেকে হাসির আওয়াজ আসছিল – আমি রে-র সঙ্গে কথা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলাম, রে-ও বুঝেছে খুব বেশি সময় নেয়ওনি হয়তো মিনিট পনেরো কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল অনন্তকাল। সব মিটিয়ে নিচে আসতে দেখি সর্বনাশ।
মি  টুলে বসে পিয়ানোর সামনে, পিয়ানোর মিউজিক র‍্যাক-এর সামনে হুইস্কির বোতল, লাই-লা পিয়ানোটার একপাশে দাঁড়িয়ে সেটার গায়ে হেলে। দু’টো গ্লাস তার হাতে যার একটা থেকে মি মাঝে মাঝে বাজাতে বাজাতেই চুমুক দিচ্ছে। যেন বিশাল ক্যারদানি। লাই-লা হাসছে। আমি দাঁতে দাঁত ঘষে এগিয়ে গেলাম তাদের দিকে। লাই-লার চোখ লালচে, নেশাতুর। ‘দ্যাখো, মি বলেছে আমায় শেখাতেও পারে, আমি পারব।’ তাকে প্রায় থামিয়ে মি বলল, ‘না সত্যিটা বলো, এমন সুন্দর আঙুলগুলো সব কিছুই ভাল বাজাতে পারবে, গুড ফর এনি কিজ,’ বলে মুখ বাড়াল গ্লাসের দিকে। লাই-লা একটু লজ্জা পেল বোধহয়, কিন্তু এখন পিছনোর উপায় নেই, তাই সাহস পেতে একটু বেশি ঝুঁকল, যেন স্বাভাবিক, মি চুমুক দিতে থাকল, চোখ লাই-লার বুকের খাঁজে ঘোরাফেরা করছে। আমি আর তাকাতে পারলাম না। একটা সিগারেট বের করে ধরালাম।
মি গ্লাস থেকে মুখ তুলে বলল, ‘আহ,’ তারপর নাক কুঁচকোল, ‘এমন সুগন্ধির মধ্যে বিচ্ছিরি একটা টোব্যাকো, ছিঃ ক্লাসলেস, বাইরে গিয়ে খান, আমার আর এই সুন্দরীর গন্ধের আমেজ নষ্ট হচ্ছে।’
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। কিছু বলার আগেই লাই-লা বলে উঠল, ‘প্লিজ একটু বাইরে গিয়ে সিগারেটটা খাও না।’
পিয়ানোর পাশ দিয়ে বেরিয়ে একটা করিডোর, ওখান দিয়ে নিচে নামার সিঁড়ি রয়েছে, আমি একবার ভাবলাম বেরিয়ে যাই, তারপর কী ভেবে আরো কয়েকটা টান দিয়ে ফেলে জুতোর তলায় পিষলাম, ফিরতে দেখি মি উঠে দাঁড়িয়েছে, ‘এইসব ব্রুটগুলো মজাই নষ্ট করে,’ আমার চোখ ঝাপসা লো লাইটে অবয়বগুলো নড়ছে, কাঁপতে কাঁপতে বললাম, ‘কী বলতে চান আপনি?’ সে লাই-লার কোমর জড়িয়ে বলল, ‘তোমার বউ এখন আমার সঙ্গ চাইছে একটু। এতে বোকা বরের মতো করছ কেন?’
ওর কথা শেষ হতে না হতেই আমি সামনে ঝাঁপিয়ে কলার ধরলাম, লাই-লা ডুকরে উঠল। ধ্বস্তাধ্বস্তির মধ্যেই শুনলাম রে-র গলা ‘ব্যাস। এনাফ।’
আমি মি-কে ক্যালালাম না। চেয়ারে ফিরে বসলাম। পাথরের মতো। আসলে নিরুপায়। মাথা ঝিমঝিম করছে। মি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল লাই-লাকে ‘এইজন্য সব জায়গায় যাই না আমি। নেহাত রে আসবে, আর তোমার একটা ক্লাস আছে ভেবেছিলাম।’ বলে সে বাইরে, চলে গেল কি না জানি না, আমি দেখতে পাইনি।
লাই-লা দরজার পাশে দেওয়াল ধরে টেবিলে ভর দিয়ে কাঁদছে, আঁচল মেঝেয় লুটোচ্ছে ‘প্লিজ, যেও না, এভাবে এমন সুন্দর সন্ধ্যেটা নষ্ট হবে, রে আপনি কিছু করুন।‘’
রে তার পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিল, ‘কাঁদে না ছি। ওকে এখন যেতে দাও। কিচ্ছু হয়নি।’ বলতে বলতে স্পষ্ট দেখলাম আরেক হাতে কাঁধটা জড়িয়ে ধরল, লাই-লার পিছনে তার উরুসন্ধি সেঁটে। মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে। ড্রাই হাম্প করছে! লাই-লার কান্না বন্ধ। অবাক হয়ে ঘুরতে যেতেই কানে কানে কী একটা বলল রে, চুপ করে গেল লাই-লা। ফোঁস ফোঁস ফোঁপানোর আওয়াজ। আর রে বলে চলেছে, ‘কিচ্ছু হয়নি, কিচ্ছু হয়নি,’ বলতে বলতে কোমরের নিচের অংশ সঞ্চালনা করতে থাকল আরো দ্রুত। আমি আর কিছুই বলার মতো অবস্থায় নেই। লাই-লার কান্নার আওয়াজ বদলে যেতে থাকল। গলা ও নাক দিয়ে অন্য রকমের ফোঁপানি।
কতক্ষণ এটা চলল হিসাব নেই আমার। তবে মি আবার ফিরে এসেছিল। রে-কে এক নিশ্বাসে বলল, ‘নিচে কিকি-র সঙ্গে দেখা। দ্যাট বিচ স্টেস হিয়ার টু। বলছে চলে এসো মদ আছে। আমি বল্লাম তারপর তো ভাগিয়ে দেবে তোমার মরদ। বুক দুলিয়ে হাসল। রে যাবে, প্রভো?’ রে হাসল। তারপর মি-র হাত ধরে বলল, ‘আচ্ছা দেখা যাবে এখন এখান থেকে চলো’
লাই-লা চুপচাপ বসে। সামনের সোফায় আমি। দু’জনের কাউকে কিছু বলার নেই। চোখের জলে কাজল ধেবড়ে গেছে, আঁচল দুমড়ে কোলের উপর, গলা ও কাঁধের কাছে লালচে দাগ।
এসব কি সত্যি, না হ্যালুসিনেট করেছিলাম, না কি পুরোটাই আমার বানানো – একটা প্রতিশোধের গল্প? এসব কথা অবশ্যই পরে উঠেছিল কিন্তু তা পরেই বলব’খন। সে রাতে আর তেমন কিছু ঘটেনি। ওহ হ্যাঁ শুনেছিলাম নিচের বাড়িতেও মি আরো হট্টগোল করে, দারোয়ান ডাকতে হয় তবে এর বেশি কিছু নয়, বুঝলাম এরা অভ্যস্ত এতে, আর ঘরের কেচ্ছা ঘরেই থাকা ভাল, বিশেষ করে সমাজের মান্যিগণ্যিদের।
তা আমিও কি তাই চাইনি? কিন্তু তা হল কই?
গল্পের শেষ
সব কিছুই স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। অন্তত তেমনটা মনে করা যেতেই পারে। সেদিন রাতের ঘটনাপ্রসঙ্গ আমরা কেউ আলোচনা করিনি। আমরা, মানে আমি ও লাই-লা। বাকিদের ব্যাপার জানি না, রে-র সঙ্গে এক দু’বার কাজের কথা হয়েছে অবশ্য – লাই-লাকেও দেখলাম ব্যস্ত, বোধহয় তার বুটিক নিয়ে।
তারপর সেই দিনটা। সন্ধ্যাবেলা ইনস্টাগ্রামে দেখি লাই-লা ও মি, সঙ্গে রে-ও আছে। আমি কী করব বুঝলাম না। লাই-লা বাড়ি ফিরতে তাকে প্রশ্ন করতে যাব, কী প্রশ্ন করব জানি না। লাই-লাই হেসে বসাল আমায় চেয়ারে – ‘শোনো’ বলে সে নিজে আমার সামনে বসল, ‘রাগ কোরো না, তুমি ইনস্টাগ্রাম দেখেছো জানি, কথাটা মন দিয়ে শোনো, রে-র একটা গল্প নিয়ে সিনেমা হবে। অন্য রকমের কাজ, মি অভিনয় করছে, আমাকেও চায় নিতে এবং…’
‘এরপরও’ আমি চেঁচিয়ে উঠতে গেলাম, লাই-লা থামিয়ে দিল, ‘পুরোটা শোনো, বলছি না অন্য রকমের কাজ, কথা হল তোমাকেও চায় ওরা।’ ‘মানে!’ আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম, এর আবার নতুন কী ‘তোমাকেও একটা চরিত্রে ভেবেছে। আমি, মি, তুমি একটা স্যুররিয়াল গল্প…’ সে চুলের মধ্যে দিয়ে হাত বোলালো, আদুরে গলায় বলল, ‘প্লিজ না বোলো না।’
আমি গদি আঁটা চেয়ারে টিকটিকির মতো সেঁটে গেছি, ‘তুমি, তুমি, করতে বললে এত কিছুর পরও!’
‘ওহ প্লিজ’ সে হাতপাখা নাড়ানোর মতো তার চেটোটা নাড়াল, ‘ওসব কেউ মনে রাখে না কি?’ আমি চেয়ার থেকে ওঠার আগেই সে এসে ঝুঁকে আমার গলা জড়িয়ে ধরল, ‘ভুলে যাও ওসব, কিচ্ছু হয়নি সোনা, কিচ্ছু হয়নি, সেদিন সবাই একটু বেশি ড্রিঙ্ক করে ফেলেছিলাম…’ সে যখন ফিসফিস করে আমার কাছে বলছিল, আমি তার মুখ থেকে মদের গন্ধ পেলাম, হালকা, পারফিউম-এর গন্ধের সঙ্গে মিশে, আমি আর কিছু বলতে পারলাম না – ক্রমশ যেন অক্টোপাসের শুঁড়গুলো একটা একটা করে জড়িয়ে নিচ্ছে – লাই-লা, রে, মি সব্বাই – আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।
সিনেমায় মি ও লাই-লা প্রেমিক, আবার লাই-লা ভালবাসে আমাকে, একজন গল্পকার গল্পটা বদলে বদলে যাচ্ছে, সে দেখছে আর অপছন্দ হলে বদলে দিচ্ছে সিন, রে সেই লেখক – তার চোখের সামনে মি, লাই-লা আর এই অধম শরীরে শরীর লাগিয়ে – যেন অর্কেস্ট্রায় কাউন্টার পয়েন্ট (যা রে আমায় বোঝাচ্ছিল), শুধুমাত্র একটা শাড়ি জড়ানো লাই-লা, মি-র হাত তার পাছা আঁকড়ে – এ দৃশ্য আমার পক্ষে সম্ভব নয়, আমি বাথরুমে বমি করতে থাকি, ফিরে এসে বাড়িতে সারা গা জ্বরে টলছে। ঘরে ফিরেছে লাই-লা ও মি – ওরা আমাকে কী সব বলল, মি চাবির রিং ঘোরাতে ঘোরাতে বেরিয়ে গেল। আমার কোনো উপায় নেই আর। খোলা বারান্দা থেকে নিচে, আকাশ অনেকটা, অনেকটা মুক্তি শরীরে ঝটকা মেরে ভরকেন্দ্র বদলাতেই, আহ মুক্তি…
ব্যাপারটা নিয়ে গুজুরফুসুর বেশ হয়েছিল। যদিও আমি নেশাগ্রস্ত ছিলাম এ কথা অজানা থাকেনি। অ্যালকোহলিজম, ডিপ্রেশন কথাগুলো উড়ে বেড়ায় এখন।
শেষ পাত
দারোয়ান আনোয়ার বা ইস্তিরিঅলা রতনের পক্ষে এত ভালভাবে গল্প বলা সম্ভব কি না সেটা এখন ভেবে দেখার, সত্যিই কি ওই হাউজিং এস্টেট-এ কোনো প্রেতাত্মা ঘুরে ঘুরে গল্পটা জানাচ্ছে?
পুরো গল্পটার সঙ্গে যেটা বলার রয়েছে সেটা হল যে রতন বা আনোয়ারেরও কিছু বক্তব্য থাকতে পারে – সেটা যোগ করলে অবশ্য নিটোল কথনের মজাটা থাকে না তবু সেটাও শোনা যাক।
রতন যেমন জানিয়েছিল লাই-লার সঙ্গে সে মি-কে দেখেছে এই গল্প শুরুর আগেই। তার ইস্তিরির দোকানের পাশে মি দুপুরবেলা গাড়ি দাঁড় করিয়েছে এবং লাই-লা তাতে উঠেছে এসে বেশ কয়েক বার। এবং মি, লাই-লা ও মৃত স্বামীকেও সে একবার অন্তত দেখেছে। আনোয়ার অবশ্য কখনোই এদেরকে দেখেনি বরং মাতাল অবস্থায় ফিরতে দেখেছে তাদের, ঝগড়া করতে দেখেছে, এমনকি একবার থাপ্পড় মারতেও দেখেছে লাই-লার গালে।
এসব শুনে আমরা সিদ্ধান্তে এসেছি ভূতেরা সব সময় সত্যি কথা বলে না – তাছাড়া সত্যির প্রয়োজন কীসের এত, আমরা কেউ চিত্রগুপ্ত নই। বরং আজকাল লাই-লাকে দেখা যায় নানা সোশ্যাল ওয়ার্কে, নানা পার্টিতে, একজিবিশন-এ – একা, একাই, ঝলমলে, সুন্দরী, আলাপ করতে ইচ্ছে হয় মদির চোখ, উত্তেজক শরীর, আলো ছড়ানো হাসি – কিন্তু ভয় হয়, কী জানি, আমরা সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ। অনেকেই কি এই ভয় পায়? সে খবর আমরা নিইনি। তবে শেষ একটা খবর দিতে পারি – ওদের সিনেমাটা একদমই চলেনি, না হলে না ফেস্টিভালে।