তীর্থঙ্কর নন্দী-র গল্প

Spread This

তীর্থঙ্কর নন্দী

ভার্চুয়াল গল্প
ভার্চুয়াল গল্প কী এবং কেমন! প্রথম ভার্চুয়াল গল্প কবে লেখা হয়! একজন ভার্চুয়াল গল্প লেখক কীভাবে গল্প শুরু করে ইত্যাদি নানাবিধ কথা এই বিষয়ে উঠে আসে। নিচে একটি গল্পের কথা বলা হল।
            আজ রোববার। গত বেশ কিছুদিন যাবত ঋতু অফিস যায় না। যায় না ব্যক্তিগত কিছু অসুবিধার জন্য। ফলে বাড়ি বসেই অফিসের কাজ করে। অফিস বাড়িতে উঠে আসে। অফিসের কাজের আগে পরে ঋতু বাড়ির কিছু কিছু কাজ সারে। যেমন বাজার করা জামাকাপড় পরিষ্কার করা ইত্যাদি। আবার   সন্ধ্যায় সুমনাকে নিয়ে ঘুরতে বেরয়। বিভিন্ন ধরণের মাস্ক মাঝে মাঝে কেনে। স্যানিটাইজার কেনে। হাত দস্তানা কেনে। সবই এখন অবশ্য জরুরি হয়ে ওঠে। কতদিন যে নিজেদের এইভাবে সাজিয়ে রাখতে হবে ঋতু সুমনা বুঝতে পারে না। এই মহারোগের বিদায়ের কোনও সংবাদ কানে এখনও আসে না। ওষুধও বেরোয় না। ফলে নিজেকে নিজেদেরকে যথাসম্ভব সাবধানে রাখা।
 ছুটির দিন বলে রাস্তাঘাট এমনিতেই ফাঁকা। তার ওপর মহারোগের তো ভয় আছেই। ঋতু সুমনা টুকটাক জিনিস কিনে লম্বা কালো রাস্তা ধরে বাড়ি চলে আসে। বাড়ি এসে ভাল করে হাত পা ধোয় চা খায় গান শোনে। গানে মন ভাল রাখার চেষ্টা করে। সতেজ রাখে। জানে মন ভাল থাকলেই শরীর ভাল থাকে। এই দুঃসময়ে শরীর মন ভাল রাখাটাই প্রধান কাজ। বাইরের ঠাণ্ডা হাওয়া জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে ঋতু সুমনাকে আরাম দেয়। দুজনে বারান্দায় এসে বাইরের পরিবেশ দেখে। সন্ধ্যারাতের শহর দেখে। এই শহরেই দুজনে বড় হয়। মানুষ হয়। পাঁচ বছর আগে থেকে দুজনে একসঙ্গে থাকে। দুজনের স্মৃতি এই ফ্ল্যাটে জড়িয়ে। শ্বাস-প্রশ্বাস জড়িয়ে। আপাতত সব ঠিকঠাক চললে দুজনেই এই ফ্ল্যাটে জীবনটা কাটিয়ে দিতে বদ্ধপরিকর। এই দুজনের কথা জানা যায় লোকমুখে মানে ঋতুর বন্ধু সুহানের কাছে। সুহানই দুজনের গল্প বলে। সরাসরি ঋতু সুমনাকে সেও চেনেনা। পাঠক বিচার করে বলুক এই ধরণের ছোট গল্পটিকে কি ভার্চুয়াল গল্প বলা যেতে পারে!
সাহিত্যের ইতিহাস ঘেঁটে বহু বছর আগেকার একটি গল্প পাওয়া যায়। গল্পটির লেখকের নাম পাওয়া যায় না। তখন নাকি গল্পে লেখকের নাম রাখা হত না। গল্পটি এইরকম।
 পাহাড়ের কোলে কতগুলি পরিবারের বসবাস। অন্তত কুড়িটি পরিবার তো হবেই। পাহাড়ি ভাষায় তারা কথা বলে। সকলে সেই ভাষা বুঝতে পারে না। প্রতিটি পরিবারের মানুষ পাহাড়ি জঙ্গল থেকে কাঠ এনে সমতলে বিক্রি করে। পরিবারগুলি যে খুব সচ্ছল তা নয়। কোনওরকমে দিন আনে দিন খায়। তাছাড়া সমতলের মানুষরা একটু শিক্ষিত বলে কাঠ কিনে সঠিক মূল্যও দিত না। থোক হিসেবে মুল্য ধরে দিত। ফলে ওই কুড়িটি পরিবার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিতই থাকত। পরিবারগুলির তাই কোনওরকমে দিন চলত। কিন্তু গরিব হলেও মানুষগুলির মন খুব উদার। সমতল থেকে কেউ বেড়াতে গেলে তাকে প্রচণ্ড আদর যত্ন খাতির করে। ঢালে চাদর বিছিয়ে বসতে দেয়। চা আনে। খাবার দেয়। গল্প করে। রাত্রিবাসও করার অনুরোধ করে।
              এইরকম কুড়িটি পরিবারের ভিতর একটি পরিবারের আর্থিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হয়। পরিবারটি দিন দিন ঝিমিয়ে পড়ে। পরিবারের মোট লোকসংখ্যা চার। দুটি শিশু। বাবা মা। শিশু দুটির ভিতর একটি ছেলে একটি মেয়ে। একদিন রাতে বোধ হয় মধ্যরাতে শিশুদের বাবা আর্থিক অনটনের জন্য মাথা ঠিক রাখতে না পেরে এক জঘন্য কাণ্ড করে বসে। মধ্যরাতে সেদিন আকাশে চাঁদ নেই। অমাবস্যা। আশেপাশের কোনও মানুষজন যাতে টের না পায় শিশুদুটিকে নিয়ে দূরে অনেক দূরে নিয়ে পাহাড়ের প্রায় মাথায় উঠে যায়। তারপর সেইখান থেকে দুটি শিশুকে ধাক্কা মেরে গড়িয়ে ফেলে। শিশুদুটি কান্নায় গড়াতে গড়াতে পাহাড়ের কোলের ঝর্ণার জলে হারিয়ে যায়। কোথায় হারায় কেউ জানে না।
বাড়ি গিয়ে ভদ্রলোক খুব নির্লিপ্তভাবে ঘুমিয়ে থাকা স্ত্রীকে দেখতে দেখতে দুই হাতের আঙুল দিয়ে গলা টিপে ধরে। গলায় ফাঁস নিয়ে মহিলা ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। রাত যখন প্রায় ভোর হয় ভদ্রলোক মুরগি কাটার ছুরি নিয়ে নিজের হাতের শিরা কেটে ফেলে। ঘর রক্তে ভেসে যায়। ভোর হলে সেই রক্ত বাইরে চলে আসে। আশেপাশের মানুষ রক্তচিহ্ন দেখে ছুটে আসে।
              শোনা যায় ঝর্ণার জলের তোড়ে মৃত শিশুদুটিকে পাশের পাহাড়ি গ্রামে পাওয়া যায়। আর্থিক অনটনের জন্য একটি পরিবারের শেষ হয়ে যাওয়ার কথা বাকি উনিশটি পরিবারের মুখ থেকে নাকি শোনা যায়। এই শেষ হওয়ার গল্প কি ভার্চুয়াল!
ভার্চুয়াল গল্প কবে থেকে লেখা শুরু হয় সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। উত্তর আধুনিককালে একটি গল্পের কথা নিচে বলা হল।
এই শহরের দক্ষিণে থাকে রিদিম। বেশ অভিজাত পরিবারের ছেলে। ভাল চাকরি করে। দামি গাড়ি নিয়ে অফিস যায়। রাস্তায় পা রাখলেই পারফিউমের গন্ধ রিদিমকে চিনিয়ে দেয়। রিদিমের নিজস্ব পারফিউম আছে। নিখুঁত শেভ করে বাড়ি থেকে বেরোয়। মনে হয় রোজই শেভ করে। ছয় বছর আগে মানালিকে বিয়ে করে। মানালিও এই শহরের দক্ষিণে থাকে। রিদিমদের তিনটে বাড়ির পর। মানালির সঙ্গে প্রণয় চলে তিন বছর। শেষে আনুষ্ঠানিক বিয়ে। বিয়ের দেড় বছরের মাথায় পুত্র সন্তান। নাম অরি।
             এখন শরৎকাল। বর্ষার আকাশ ধুয়ে মুছে সাফ। ঝলমলে নীল আকাশ শহর ঢেকে রাখে। পুজো পুজো গন্ধ সবদিকে। আগে যেখানে প্রতি শনি রবি রিদিম মানালি অরি একসঙ্গে গাড়ি নিয়ে জয়রাইডে যেত এখন সেই ছবি উধাও। শোনা যায় মানালি অরিকে নিয়ে অন্যপুরুষের সঙ্গে থাকে এই শহরের পূর্বপ্রান্তে। চব্বিশতলার ফ্ল্যাটে। চব্বিশতলা থেকে শহরটিকে অনেক নিখুঁত ছোট লাগে। চোখে মানালি পুরো শহরটিকে ধরে রাখতে পারে। রিদিমের সঙ্গে কেন ব্রেকআপ হয় সেই সব কথা সঠিক কেউ বলতে পারে না। কেউ জানেও না কার দোষ।
 ফলে শরতের মিষ্টি সকালে রিদিম একাই গাড়ি নিয়ে বেরয়। আজ রবিবার। ছুটি। ময়দানের সকাল অনেক মনোরম। রিদিম গাছের নিচে গাড়ি পার্ক করে ঘাসে পা রাখে। ইদানীং প্রতি রবিবার ভোরে ময়দানে চলে আসে। পরিষ্কার অক্সিজেন নেয়। হাল্কা শরীর চর্চা করে। পরিষ্কার অক্সিজেন নিয়ে নতুন একটি জীবন শুরু করার কথা ভাবে। অফিসেতে চূর্ণী ঢলেই আছে। চূর্ণীকে একটু পাত্তা দিলেই আরও কাছে এসে যাবে। শরীর চর্চার ফাঁকে অনেক কথা মাথায় আসে। সব কথা মনেও রাখে না। কিন্তু চূর্ণীর কথা মাথায় ঘুরতে থাকে।
              ময়দানে ঘোড়াগুলি চক্রাকারে ঘুরে ফিরে সবুজ কচি ঘাস খায়। রিদিম ঘোড়া দেখতে দেখতে ভাবে চূর্ণীকে কীভাবে অ্যাপ্রোচ করা যেতে পারে। একদিন কি লাঞ্চে ডাকবে! কোথায় ডাকবে! ডাকা যেতে পারে নিউটাউনে মানে নতুন শহরে। ওখানেও এখন অনেক ভাল ভাল রেস্টুরেন্ট আছে। বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। চোখের সামনে থেকে কখন যেন কালো বাদামি সাদা ঘোড়াগুলি অদৃশ্য হয়ে যায়। রিদিম বোঝে সকাল অনেক হল। এখন ফিরতে হবে।
              যতটুকু জানা যায় এই গল্পের লেখক থাকত দক্ষিণ শহরেই। রিদিমের সঙ্গে লেখকের কখনও সরাসরি আলাপ পরিচয় হয় না। যতটুকু জানতে পারে পাড়াপ্রতিবেশীর কাছ থেকেই। তবে রিদিম চূর্ণীকে বিয়ে করে কিনা সেই খবর পাওয়া যায় না।
ভার্চুয়াল গল্প কয় প্রকার! কীভাবে তাদের ভাগ করা যায়! এ বিষয়ে একজন গল্পবিশেষজ্ঞই ভাল বলতে পারে। তবে এই বিষয়ের ওপর মনে হয় এখনও বেশি আলোকপাত করা হয় না। তাই বইবাজারে বইমেলায় এখনও কোনও বই পাঠকের চোখে পড়ে না। প্রকাশকেরা কিন্তু বসে থাকে। কবে এই ধরণের গবেষণামূলক লেখা নিয়ে কোনও বিশেষজ্ঞ তাদের কাছে হাজির হয়। বাজারে নাকি এই ধরণের বিশেষ বই এর কদর আছে।
              জিতেন আর হিতেন দুই ভাই। থাকে ডুলু গ্রামে। ডুলু গ্রাম শহর থেকে অনেক দূর। বাসে লাগে তিনঘণ্টা। গ্রামটি বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। চাষের জন্য সকলেরই ট্রাক্টর আছে। গ্রামে আলো আসে বহুবছর আগে। মূল রাস্তাটি মানে যেটি থানা পোস্টঅফিস যায় সম্পূর্ণ পাকা। গ্রামের ভিতরের রাস্তাগুলিও ভাল। সুরকির। রোলার দেওয়া। বর্ষায় কোনও কষ্ট হয় না। গ্রামের স্কুলটিও ভাল। সরকারি স্কুল। টানা বারো অবধি ছেলেমেয়েরা পড়তে পারে। কো-এড।
  বাস স্ট্যান্ড থেকে জিতেন আর হিতেনদের বাড়ি যেতে সময় লাগে মাত্র পাঁচ মিনিট। হাঁটা পথে। দুই ভাইয়ের পাশাপাশি বাড়ি। চাষের জমি দুজনেরই বাড়ির পিছনে। জিতেন আর হিতেনের মা যতদিন জীবিত ছিল ততদিন পর্যন্ত খাওয়া দাওয়া হত এক হাঁড়িতেই। মায়ের মৃত্যুর পর হাঁড়ি আলাদা হয়ে যায়। মোট ছয় বিঘাও ভাগ হয়ে তিন বিঘা তিন বিঘা হয়। মাঝে থাকে বুনো গাছের সারি। সীমানা হিসেবে।
              মার মৃত্যুর পরেই দুই ভাইয়ের ভিতর টুকটাক বিবাদ লেগেই থাকে। কখনও ভাল জমি উর্বর জমি জিতেন কেন নেয় এই নিয়ে। কখনও সীমানা নিয়ে। হিতেন নাকি তিন বিঘার অল্প কম জমি পায় ইত্যাদি। কিন্তু বিবাদ থাকলেও মিলও প্রচুর। জিতেনের মেয়ের বিয়েতে হিতেন পুরো খাওয়ার টাকা দেয়। আবার হিতেনের ছেলের মুখেভাতে জিতেন সব খরচ করে। হিতেনকে এক পয়সাও খরচ করতে হয় না। গ্রামের মানুষদের দুই ভাইয়ের ভাল সম্পর্কের ছবি দেখলেই চোখ কেমন টাটিয়ে ওঠে। আবার বিবাদ দেখলেই চোখে যেন আনন্দ উথলে পড়ে।
              গতবছর কালীপুজোর দিন গ্রামের একটি দুঃসংবাদ মানুষের কানে এসে পৌঁছয়। কালীপুজোর সকালে একটু ঠাণ্ডা পড়ে গ্রামে। গ্রামে পুজো পুজো ভাব। এই ডুলু গ্রামে একটাই পুজো হয় বড় করে। পুজো হয় মাঝরাতে। গ্রামের মানুষেরা পুজো দেখতে তাই রাত জাগে। সকাল হতে না হতেই নাকি জিতেন আর হিতেনের ভিতর প্রচণ্ড কথা কাটাকাটি বিবাদ শুরু হয়। বিবাদের কারণ গ্রামের মানুষেরা বলে সেই জমির সীমানা নিয়েই। কথা কাটাকাটি বিবাদ শেষ পর্যন্ত নাকি হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যায়। সকালের এই হাতাহাতি গ্রামময় ছড়িয়ে পড়ে।
মাঝরাতে পুজো শুরু হয়। গ্রামের ছেলেমেয়ে পুরুষ মহিলা সবাই পুজোর জন্য জেগে। পুজোর ভিতরেই কে বা কারা পুজো মণ্ডপে দুঃসংবাদটি বয়ে আনে। দুঃসংবাদটি হল জিতেন তার নিজের জমির আমগাছে গলায় দড়ি দেয়। আর হিতেন নিজের জমির আম গাছে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে থাকে। এই দুঃসংবাদ পেয়েই মানুষ হৈ হৈ করে দুটো ভাইয়ের বাড়ি আসে। জমিতে আসে। সবাই দেখে সত্যি সত্যি দুই ভাই ঝুলে থাকে আমগাছে।
             এই গল্পটি একটি ছোট পত্রিকায় ছাপা হয় প্রায় তিরিশ বছর আগে। যে লাইব্রেরি থেকে জোগাড় হয় সেখানে উই পোকা প্রচুর বই নষ্ট করে। গল্পটির লেখকের নাম পাওয়া যায় না। তবে লেখক জিতেন আর হিতেনকে নাকি সরাসরি মোটেই চেনে না। এমনকি কখনও চোখেও দেখেনি। গ্রামের মানুষের কাছ থেকে শুনে শুনে লেখক গল্পটি লেখে। এই ভার্চুয়াল গল্পটি কোন শ্রেণীতে ভাগ হয় সেটিই এখন দেখার। সবাই অপেক্ষা করি সেই গবেষণামূলক বইটি কবে বাজারে আসে! কোন বইমেলায় পাওয়া যেতে পারে বইটি।