সুমিত ভট্টাচার্য্য-র গদ্য

Spread This

সুমিত ভট্টাচার্য্য

মুহূর্তের প্রজন্ম
 ট্রেনসফরে জানলার ধার দিয়ে কেমন সাঁই সাঁই করে সরে যায় স্থান কাল পাত্র সেতু, যে জানলার ধারে বসে সেই বোঝে।  এইতো সবে একটা আধা গ্রাম আধা শহুরে জায়গা দিয়ে চলছিল, খানিক বাদেই আবার ধানের চাষ হওয়া ক্ষেত মাইল মাইল ছড়িয়ে। যেন সিনেমায় একের পর এক বদলে যাওয়া দৃশ্য। স্থানের মতো হকার থেকে বিকিকিনি, এমন কি বদলে যায় সহযাত্রীদের ভাষাও।  যে স্থান, সেখানের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বাদাম, মুড়িভাজা সব একই, শুধু বদলে যায় বিক্রেতার ধরন। কোনও শিশু গলা বাড়িয়ে দেখতে চায় আবার কেউবা জুড়ে দেয় বায়না। ট্রেনের পরিবেশটা জমাটিই থাকে। হ্যাঁ তবে, গন্তব্য যে নির্দিষ্ট তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু তাহলেই তো শেষ নয়। সব শেষ একটা নতুনের পথ রেখে যায়। মনে যে রেশটা থেকে যায় ওটুকুই তো খাঁটি আমদানি! ঠিক এভাবেই কত মুখ বদল হয়  এক জীবনে। একসময় ট্রেনকেও যে লাইন ছেড়ে দিতে হয়।

ওই বদল দেখা চোখের মতো এক চায়ের দোকান। চারটে দেওয়ালেই প্রায় তেলচিটে।দুটো নেড়ি কুকুর দোকানের সামনে ঘুরঘুর করে, বিস্কুটের জন্য। খদ্দের আসাযাওয়া, উলটোদিকে একটা পুরনো দেওয়াল, প্রত্যেক পাঁচ বছরে যার রঙ বদলে যায়। কেউ দাঁড়িয়ে কেউ বসে চায়ের ভাঁড়ে তুফান তোলে। কারও আবার অফিসের তাড়া। সদ্য চায়ের ভাঁড় ধরতে শেখা আঠারো বছরের তরুণ একটু বড় হতে চাওয়া গলায় বিস্কুটের বদলে সুখটানের অর্ডার দেয়। মুচকি হাসতে থাকা কাকা ঠিক জিনিসের সঙ্গে হাসি বিলোতে থাকে। মাঝে খিলখিলিয়ে হাসা স্কুলফেরতের দল হেঁটে কিংবা সাইকেলে পার হয়ে যায়। একটু এগিয়ে একদল ছেলে ক্যারাম খেলে। প্রত্যেকে গেম শেষ হলে টপাটপ চায়ের অর্ডার আসে। আবার সামনের আবাসনের একদল প্রবীণ এসে বিকেল জমিয়ে দেয়। কেউ চিনি ছাড়া তো কারও লাল চা, আবার হাজমোলা চাও করতে হয়। বিরক্তিহীন গলা আর এক অমায়িক হাসি দিয়ে বলেন “হবে হবে, দু’মিনিট।” সকলের প্রশ্নের জবাবে চা-কাকার ওই কথা “দু’মিনিট” এ যেন সেই দু’মিনিটের ম্যাজিক। আর ঠিক দু’মিনিটের মধ্যে হয়েও যায়। প্রবীণদের আয়েশ করে চায়ের আসরে ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান এলেই কাকা বলেন “খেলা তো খেলাই, তার আবার এত তর্ক কীসের?” হাহা করে হেসে ওঠা মুহূর্ত সত্যিই দারুণ হয়ে ওঠে। সন্ধ্যের দিকে প্রতিদিনের মতো উনুনের আঁচ একটু উসকে দিতে হয়। কিছু ছেলেপিলেও আসে এই সন্ধ্যের দিকে। তাদের আড্ডা প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে কিংবা বার্সেলোনা নাকি ম্যাঞ্চেস্টার। টুকটাক প্রেমে কেউ পড়লে মুখ দেখেই বোঝা যায়। কাকার চোখে ধরা পড়ে সবই, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। এসব দেখে কাকাও কি রোম্যান্টিক হয়ে ওঠে? সে জানার উপায় নেই।

 ঠিক কবে থেকে এই চায়ের দোকান তার তথ্য কিংবা ইতিহাস নিয়ে কারও বিশেষ মাথাব্যথা নেই। বেশকিছু জন চায়ের জন্যে আগাম বলে যায় রোজ, ওই ইঁট পেতে রাখার মতো আর কি! এখানে হোম ডেলিভারি নেই অতএব এসেই খেতে হয়। আড্ডাও চলে, জীবনও চলে তাল রেখে। চা-কাকা এবং তাঁর সহধর্মিণী বহু বদল দেখেছে এই দোকানের চোখ দিয়ে। পুরনো কাঠের দরজা, চৌকাঠ, বেঞ্চের মতো বসার জায়গা দেখলেই দোকানের বয়স আন্দাজ করা যায়। কাকাও কিন্তু সময়ের ট্রেনযাত্রীর মতোই। হয়ত এটা সবাই। তবু একটু একটু বদলাতে থাকা সমাজজীবন, চলনবলন এসবের রূপ থেকে রূপান্তর দেখে সময়ের এক জীবন্ত ডায়েরি হয়ে ওঠে আস্ত একটা জীবন। অনেক আগে যখন এলাকা খানিক জঙ্গল, গাছপালায় মোড়া, তখন থেকেই সময় সফরে  চা-কাকা। হয়ত তখন বিয়েও হয়নি। তখন পাড়া ব্যপারটা অন্য আবেশ নিয়ে থেকেছে। পাড়াময় একটা সুন্দর গল্প থাকে। আর চা হল তার আক্ষরিক রসদ। সারাবছর আবেগ লেনদেনের হিসেব কেউ না রাখলেও, হাসিগুলো থেকে যায় ওই ছোট্ট দোকানে। সিলিঙের কোণায় ঝুল,চৌকাঠের পাশে একটা মিনমিনে বিড়াল আর বাক্সে পড়ে থাকা খালি ভাঁড়। জমানো গল্পের শেষে সকলে গন্তব্যে পৌঁছে যায়। কিন্তু কাকার দোকান সেই কড়িবর্গা জমানাতেই। এখানেই চায়ের দোকান হয়ে ওঠে আস্ত একটা ট্রেন সফর। কতকত মুখ এসে চলে যায়। কেউ খানিক হল্ট নেয় তো কারও এক্সপ্রেস তাড়া; আর বদলে চলা সময়। এককালের মফস্ সলীয় গ্রাম্য ছিমছাম পরিবেশ থেকে ক্রমশ ঘনবসতি ও আকাশছোঁয়া ছাদের ডাক। সেই ছাদ পর্যন্ত কাকার নজর পৌঁছয় না। সুগারফ্রি জমানায় বিত্তশালী ইমারতের নিচে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চৌহদ্দি আর পপ্ গানে চা-কফির চুমুক। নিজস্ব কথা নেই, শুধু একটা স্মার্ট জীবন বেছে আত্মকেন্দ্রিক বেঁচে থাকার অভ্যেস।

 একটা নিজস্ব অহংকারহীন চায়ের দোকান থেকে বাইরের জগত দেখা মানুষটার ভেতরে অদ্ভুত কথা তৈরি হয়। কিছু কথা অস্থায়ী, কিন্তু কিছু টিকে যায়। ঠিক যেমনটা ট্রেনের যাত্রায় সহযাত্রী অনেক পাওয়া গেলেও, সহযাত্রী আর হাত বাড়ানো বন্ধুর এই তফাতটা থেকেই যায়। দীর্ঘদিন খদ্দের থাকা কোনও ব্যক্তি ক্রমে বন্ধু হয়ে উঠতে পারে, কিন্তু ঝাঁকে আসা খদ্দেরের বেশিরভাগই বহুতলীয় আবেগহীন ; তারা কেবল সহযাত্রীই থেকে যায়। রাস্তায় পিচ হলে দোকানের সামনে দাঁড়ানো যায় না,আবার ভোট এলে দোকানে প্রায় হাওয়া গরম  আলোচনা। এতো বাস্তবিক এক যাত্রারই অঙ্গ।  মাঝে স্টেশনের মতো সেলসম্যান আসে আর হাসির বিনিময় চলে যায় ফি হপ্তার অর্ডার নিয়ে। বিভিন্ন মুখের বিভিন্ন রূপের হাসি হলেও প্রকৃত হাসিটা লেগে থাকে চা-কাকার মুখে। বয়ামের শেষ বিস্কুটটা তরুণ এক খদ্দেরকে দিয়ে চায়ের জল চাপানো। উলটোদিকে তিনবন্ধুর অমুক থ্রিডি সিনেমার তমুক ভবিষ্যৎ।

 ভাঁড়ে শেষ চুমুক থেকে পরদিন সকালে নতুন ভাঁড় হাজির হওয়ার মাঝে একটা রাতের বিরতি। কিন্তু সেই সময়েও কি চা-কাকা বদলে যাওয়ার কথা ভাবে? খুব ভোরে উঠে কয়লা এনে উনুনে আঁচ দেওয়া, নিজস্ব সংস্কারে উনুনে একটু চিনি বা বিস্কুট দিয়ে শুরু হয় নতুন একটা দিন। খবরের কাগজওয়ালা দু’টো কাগজ দিয়ে যায়। আবার শুরু হবে শব্দের তুফান। কিন্তু ওই যে উনুনের আঁচে যে ধোঁয়া হয় ওতে মনের কথাগুলো বেরিয়ে আসে। খুব সকাল সকাল রাস্তায় লোকজন কম হওয়ার ফাঁকে কোনও এক বাচ্চা ছেলে স্টিকার সেঁটে দিয়ে যায়। কখনও সিনেমা আবার কখনও অন্যকিছুর। এলাকার প্রবীণতম মানুষটিও পায়ে হেঁটে আসে শুধু এই চায়ের টানে। দিনকাল বদলে গেলেও চায়ের স্বাদ আর কড়িবর্গার নিচে বসে জীবনের খাসতালুক নিয়ে আলোচনার স্বাদ বদলায় না। বাচ্চাদের স্কুল খোলার আগে গার্জিয়ানরাও মাঝপথে হালকা চায়ের স্বাদ নিয়ে যায়। দামি স্কুল অথচ পুরোনো দোকানে চা, কে জানে কোনও গোপন আত্মীয়তাই হয়ত স্বাদ ধরে রাখে মেজাজের! বয়স এখন খানিক নড়বড়ে হলেও চায়ের ওপর মালাই সবার সমান। আবার এমনও হয়, খাস্তা বিস্কুটের মতো মুচমুচে খদ্দের এসে দিন আরও উজ্জ্বল করে তোলে। ঠিক যেভাবে ট্রেনে দূরপাল্লার সহযাত্রী মেলে। 

 মনেরও যে বয়স হয় একথা বোঝে ক’জন! পলেস্তারা খসা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়া সেই একচিলতে দোকান হাসি দিয়ে বার্ধক্যের যতিচিহ্নগুলির কপাট বন্ধ করে রাখে। ধারের খাতায় কেউ বেশি কেউ কম, কিন্তু ঠিক সময়েই শোধ হয়ে যায়। মুঠোফোনের চটজলদি অর্ডারের দিনেও খবরের কাগজ হাতে নিয়ে মৌজ করে একভাঁড় চায়ের জন্যে আসা। দোকানের কিছু মেরামতিও হয় দরকার মতো। তবে এত হুজুগেপনার যুগে দাঁড়িয়ে সেই আদ্যিকালের এই দোকান যেভাবে চা-কাকা টিকিয়ে রেখেছে তার নেপথ্যে নস্টালজিয়ার হাতও বড় কম না। বর্ষার দুপুর হলে খদ্দের একটু কম হয়। কিন্তু গুনগুনিয়ে ওঠে ‘ মেরা কুছ সামান আপকে পাস পঢ়া হ্যায়’; কিংবা রেডিওতে বেজে ওঠা ‘রিমঝিম গিরে সাওবন’। সময় যত এগোয় মন তত পিছোতে থাকে। নিজের ইস্কুল জীবনের কথাও কি খুঁজে পায় কাকা আজকের ক্ষুদে ছাত্রদের দেখে? বর্ষার জল জমে যাওয়া দুপুরে একটু জিরিয়ে নেওয়ার ফাঁকেই, “কাকা তিনটে চা আর….”, এভাবে খদ্দের আসাযাওয়া। বৃষ্টি থামলে কেউ নিজের ছাতা ফেলে যায় কেউ পকেট চিরুনি। কাকার কাছে অবশ্য ওগুলো ফেলে যাওয়া নয়, আসলে সব স্মৃতি, যেন কেউ এসেছিল অসময়ে! সব স্টেশনে নির্দিষ্ট সময় বাঁধা থাকে। আবার নতুন নাম, ধানিজমি, খাল, মাঠ, তেমনই নতুন মুখ। একটানা ট্রেনের সেই ঝিক ঝিকঝিক শব্দে এগিয়ে চলা। আবার পিছনের স্টেশনে সখ্যতা বনে যাওয়া সহযাত্রীর নেমে যাওয়া তবু মনে লেগে থাকা রেশ। সেভাবেই খাস্তা,নিমকি, টোস্ট, পাউরুটি; কখনও চিনিছাড়াই মিষ্টি হাসি সময়কে ধরে রাখে আজকের সেল্ফি জমানায় মুহূর্তবন্দির হুজুগে চা-কাকাও অনেক মোবাইলের গ্যালারিতে থেকে যায় ইতিহাসের মতো। কল্লোল ওঠে ভেতর থেকেই, কিন্তু জীবনের ভার বইতে বইতে খানিক ক্লান্তও কি লাগে না? মেয়ের বিয়ে কিংবা পড়াশুনো, ছেলের অকারণ আবদার মিটিয়েই জেগে আছে আস্ত এক কথা বলার আঁতুড়ঘর। কখনও সুখটানের ধোঁয়ায় খুকখুক কাশি আবার কারও পরীক্ষার ফল ভালো হওয়ায় লাড্ডু। এভাবে ভালোবাসা আর বৈপরীত্য নিয়ে আড্ডাসুখের হেঁশেল চলে তার নিজস্ব রেললাইনে।

বিকেলের পর্বেও একই দস্তুর। তবে তখন ব্যস্ততা খানিক বেশি। আড্ডায় একের পর এক ভাঁড় শেষ হয় মৌতাত নিয়ে চলতে থাকে মেসি-রোনাল্ডো। উল্টোদিক থেকে সদ্য কলেজে পা দেওয়া এক তরুণ এসে কেক চা আর ইতস্ততভাবে সুখটানের অর্ডার দেয়। অনভ্যস্ত হাতে তরুণের সেই টান আর সুখ পর্যন্ত পৌঁছায় না। এসব দেখে ফিক করে কাকাও হেসে ফেলে। ক্রমশ সন্ধ্যে হয়ে আসলে রেডিওর টিউন বদলে যায়। মেজাজটাই যে আসল রাজা! চায়ের ভাঁড়ে তোফা এক চুমুক দিয়ে সদ্য অফিসে প্রমোশন পাওয়া কেউ গেয়ে ওঠে ‘জীবনকে দিন ছোটে সহি/ হমভি বড়ে দিলওয়ালে’, একটা আলতো হাসি খেলে যায় সবার মুখে। ট্রেনের জানলার ধারে সিট পাওয়া যাত্রী যেমন নিজস্ব আনন্দে মেতে যায়, এখানেও তেমনই। উনুনের আঁচ একটু উসকে দিয়ে কাকা নতুন এক খদ্দেরের চা বানাতে ব্যস্ত। পিছন থেকে আড্ডার মেজাজে আরেক বাবু বলে ওঠে “বুঝলে হে, জিন্দেগি লম্বি নহি, ইয়াদগার হোনি চাহিয়ে।” সফর চলতে থাকে, বদলায় শুধু প্রজন্ম।