অংশুমান-এর গদ্য

Spread This
Anshuman dey

অংশুমান

বীজ ও পাথর

একধরনের মানস, প্রকারভেদ, যখনই কোন পারফরমেন্স-এর মুহূর্তে এসে দাঁড়াই, সবকিছু যেন ফাঁকা হয়ে আসে। দৃশ্যের পর দৃশ্যঝড় বয়ে এনে ক্যানভাসের সামনে দেখি অন্ধকার। ব্রাশ থরথর করে ওঠে। যেমন এই লেখার শুরু থেকেই মনে হচ্ছে, যা যা লিখবো ভেবেছিলাম, মনে নেই। মাথার ভেতর এক শূন্য কোলোসিয়াম, আর অ্যারেনায় একটা বিন্দুর মত বসে আছি। কোনো যোদ্ধা নেই, দর্শক নেই, বাজি লাগানোর কেউ নেই। রাজদরবার থেকে কেউ আসেনি। কিন্তু খেলা দেখার জন্য আসিনি, আমাকে লিখতে হবে। জানি, একটা মাত্র শব্দের উৎপত্তি হলেই আমি তাকে ছুঁড়ে দেব কোলোসিয়াম-এর নৈর্ব্যক্তিকে। শুনব প্রতিফলন। একটা শব্দের প্রতিফলন কি সেই শব্দটাই? ধরা যাক আমি চিৎকার করলাম, ‘বীজ’, যাবতীয় প্রাচীর, ভাঁজ, জ্যামিতি থেকে কি আমার কাছে বীজই ফিরে আসবে? এত ঘামরক্তের ইতিহাস, এত ক্রীতদাস-দাসী বীরত্বের অণু-পরমাণু কি আমাকে বীজ-ই ফিরিয়ে দেবে? তবু তো আমি চিৎকার করেছি ‘বীজ’, আর মাথার অ্যারেনায় ঘুরপাক খাচ্ছে একটা বীজ। বীজ শব্দটা কি সূত্রপাতের ক্ষেত্রে উপযোগী?

এমনও তো হতে পারে আখখা পৃথিবীকে আমি উর্বর ভেবে নিচ্ছি। উর্বর মানেই সম্ভাবনাময়। সম্ভাবনা বীজেও আছে চারা হওয়ার, চারায়ও আছে গাছ হওয়ার, গাছেও আছে আসবাব হওয়ার, আসবাবে আছে অ্যান্টিক হওয়ার। কিন্তু যা অ্যান্টিক তার আর কিছু হতে পারার সম্ভাবনা আছে কি না। অর্থাৎ প্রতিফলনের প্রথম চক্র শেষ কি না। একেকটা শব্দের আচরণ এখানেই শেষ কি না।  এভাবে উত্তরকে প্রশ্নে বদলে আমি জিইয়ে রাখছি বীজ কে, অনবরত। তার ধারণাকে। আগের মুহূর্তে যাকে তৈরি করে চরাচরে গেঁথে দিলাম, পরের মুহূর্তে সে ধারণা হয়ে গেল। কৃষ্টি যদি বাস্তব ছিল আর ধারণা তার ভবিষ্যৎ, তবে বাস্তবের আগে কী ছিল? পূর্বধারণা।

হয়

শূন্য-বাস্তব-ধারণা

নাহয়,

ধারণা-বাস্তব-ধারণা।

পূর্বধারণা বিমূর্ত, পরবর্তী ধারণা আবেগ ও  আশাময়। বিমূর্তকে মানে দেওয়ার ক্ষমতা আমার আছে। এ একপ্রকার ধৃষ্টতা। কব্জির জোর। কব্জির জোরে আমি স্বতঃস্ফূর্ততাকে হেরফের করতে পারি, পৃথিবীকে বানাই খেলাঘর। এবং লক্ষ্য করি, এ কেমন স্বাভাবিক। কোন কোন ভাবের মধ্যে কতটা বৈরি ঢুকে আছে স্থানকালের ভাঁজে। কেমন ঝড়! প্রত্যাশাহীনতা অভ্যেস করতে গিয়ে স্বচ্ছ হ্রদের স্থিরতায় চালিয়ে দিলাম পাথর। প্রতিটা ছলকে যাওয়া স্পর্শ, প্রতিটা স্পর্শ আন্দোলন, প্রতিটা আন্দোলন স্রোত, প্রতিটা স্রোতের মৃত্যু হ্রদের পাড়ে। না, তা নয়, আবার প্রতিফলন ও উৎসের দিকে ফেরা। উৎসমুখি হতে হতে হতে মিলিয়ে যাওয়া, না কি লুকিয়ে যাওয়া। রূপান্তর। জানি ওই স্রোত থেকে অনন্তকালের জন্য হ্রদের কোন মুক্তি নেই।

শূন্য – স্রোত – স্রোতের সীমা।

আকাঙ্ক্ষা – আন্দোলন – রূপান্তর।

এমন কব্জির জোর, অস্তিত্বের দম্ভ!

বীজ থেকে পেতে চাই আসবাব। স্পর্শ থেকে পেতে চাই রূপান্তর। জলের ভেতর পাথরের সমাধি। কংক্রিটের ভেতর কণ্ঠের বিলীন। আকাঙ্ক্ষা – সৃষ্টি/ধ্বংস –  ফল – ফলের ধারণা। বিনির্মাণ – আকাঙ্ক্ষা – স্পর্শ।

এও একধরনের মানস, প্রকারভেদ। যখন পারফরমেন্স-এর মধ্যে এসে পড়ি, একটা বৃত্ত তৈরি হয়। একটু আগে যা বললাম, আর একটু পরে যা বলব তা একে অপরকে টানে। যেমন এই মুহূর্তে যে বৃত্তে আছি, তা চাইছে ঐ শুরুর শব্দের কাছে ফিরি, কেন্দ্রে। অর্থাৎ বীজ, তাকে ভাঙ্গি, কেন বীজ? নারী বা পুরুষ যাই হোক, হোক জড়, চিনি ভেঙে চিনি, বা বরফ ভেঙে বরফ। জানি এই বৃত্ত থেকে নিস্তার পেতে গেলে আমাকে বদলে দিতে হবে কেন্দ্র। অভিকর্ষ আর অপকর্ষ সাম্যে আসতে দেব না। আমি মহাকর্ষের সাহায্যে ধীরে ধীরে। মৌত-কা-কুয়া ধীরে। অ্যারেনায় পৌঁছে ছুঁড়তে হবে কোনো সম্ভাবনাহীন শব্দ। যে কোনো পারফরমেন্সের আমি বদলে দিতে চাই শুরুয়াত। যাতে বদলে যায় সঞ্চার, বদলে যায় বর্তমান। তবেই পারব অবস্থানহীনতা। যার অবস্থান আছে তার মধ্যে কোনো সম্ভাবনা আছে কি না। যার সম্ভাবনা আছে তার কোনো অবস্থান আছে কি না। এই প্রশ্ন একটা ম্যাট্রিক্স।  প্রত্যেকটা পারফরমেন্সে আমি একটা ম্যাট্রিক্স তৈরি করতে চাই। যার একেকটা গ্রিড, সম্ভাবনা থেকে অসম্ভবের দিকে যায়। এও এক মানস, আকার।

কোনো শব্দ কি আছে যার কোনো প্রতিফলন নেই? এমন কোনো সুর যার আরোহ বা অবরোহ নেই? এমন কোনো বিন্দু যেখান থেকে রেখা হয় না? প্রতিটা পারফরমেন্সের শেষে আমি প্রমাণ করতে চাই, এই পারফরমেন্সের কোন শুরুয়াতই ঠিক ছিল না। অথচ আমাকে শুরু করতে হয়েছিল। শুরুতেই ধরে নিতে হয়েছিল আমি সৃষ্টিশীল। অর্থাৎ প্রাকৃতিক, স্বাভাবিক। ধরে নিতে হয়েছিল শেষে হয় হাততালি না হয় খিস্তি শুনব। কিন্তু প্রতিটা পারফরমেন্সের মাঝে এসে আমি চরমভাবে চাই, শেষে সবাই মৌনতা নিয়ে বেরিয়ে যাক। কিছুই হয়নি শুধু তাদের বুকের হ্রদে একটা পাথর টুপ করে ডুবে গেছে যেন। কানের ভেতর শুধু একটা চিৎকার ঢুকে হারিয়ে গেছে, শরীরের রোঁয়ায়, বীজ। আমি চাই তারা খেলাঘরে ফিরে ভাবুক একটা বীজ আর একটা পাথর দিয়ে কিছুই করা যায় না। অন্তত আগুন তো নয়। সব পারফরমেন্সের পরে আমি চাই প্রকারান্তরে প্রতিটা মৌনতায় আরেকটা অসম্ভব পারফরমেন্স শুরু হোক। হাততালির মধ্যে কি সম্ভাবনা আছে? খিস্তির মধ্যে সম্ভাবনা আছে কি? আমি ট্রাপিজ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়বো, সাঙ্গ হবো। না, তা নয়, আবার ঝুলন্ত জালের থেকে প্রতিফলিত হব। ট্রাপিজের দিকে।

লিখতে বসে আমি ভাবি আকাঙ্ক্ষা খারিজ করব। ভাবি বীজের বদলে অ্যান্টিক থেকে শুরু করা প্রকারান্তরে বুজরুকি। ভাবি পাঠকের সামনে সাদা পাতা ধরিয়ে দেওয়া মানে একটা অসম্ভব লেখার প্রক্রিয়া কি না। এমন একটা লেখা যা শুরুই হয়নি কি না। আর শুরু হয়নি বলেই শেষ হয়নি কি না। পাঠক কি সাদা পাতা ছুঁড়ে দিয়ে খেলাঘর থেকে বেরিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকবেন কি না। চিৎকার না থাকলে নৈঃশব্দ্যের প্রতিফলন অবৈজ্ঞানিক কি না। না কি প্রতিফলনও মৌনতা? না কি মৌনতা বলে কিছু নেই? আমরা কিছু না কিছু চিৎকার করেই চলেছি। গাছ, মাটি, জল সবাই চিৎকারই করছে কি না। জলের ভিতর সেই পাথর কি কথা বলে চলেছে জলের সাথে? অথবা নিজের সাথে। দর্শকের অনুমান কি নিজের সাথে ছল? আদৌ কি কোন স্টেজ ছিল? জানি দু-একজন পাঠক সাদা পাতা দেখে হাততালি দিলেও, বেশিরভাগই খিস্তি করবেন। তাকে একটা রূপ দিলে তিনি তার রূপান্তর করতে পারতেন। ধ্বংস করতে পারতেন। মাপজোক করতে পারতেন সমাপতনের হার। পাঠকের অনুমান আমিই। আমি লিখতে লিখতে ভাবি আমারই সমাপতন। আমাকেই মাপজোক করছি আমি।

খুব আনন্দ হয়, খুব যন্ত্রণা হয়। কে বলেছে অ্যান্টিক-এর কোনো সম্ভাবনা নেই? আমার পাঠকের অনুমান পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়তে পড়তে ভাবছে, অ্যান্টিকও হয় উইপোকার কলোনি। সে সভ্যতা শেষ হলে, সব হয় মাটি। এই পাহাড়ের কোনো তল নেই। ফিরতি স্রোত পরবর্তী স্রোতকে আটকায়। প্রতিটা ফিরতি স্রোত সুইসাইড স্কোয়াড। যার ব্যাক-আপ নেই। থাকলে বিপন্নতা থাকত না। যেই ট্রাপিজ থেকে ঝাঁপ দিচ্ছি, আপনি থ্রিলড হচ্ছেন। রক্তমাংসে তৈরি হৃদয়ের গা বেয়ে যেন শিরশির শৈত্যপ্রবাহ। হাত কাঁপছে হাততালির জন্য, ঠোঁট কাঁপছে খিস্তির জন্য। আর তখনই আমি পারফর্মার, ভিখিরির মতো টুপি খুলব আর

আপনি বিছানা থেকে পড়ে যাচ্ছেন। দরজা থেকে পড়ে যাচ্ছেন। এমনকি প্রস্রাবকালীন বুঝতে পারছেন আপনার ভারসাম্যহীনতা। একটা ফ্রেমবিহীন জানালায় বসা পাখির মতো দৃশ্যত, বস্তুত ও ভাবে এক ভোররাতের মাতাল আত্মাকে খামচে ধরে বেলাইনে চলেছে তো চলেছে। এমতাবস্থায়, সাধারণত কোন বাঘ, একঝাঁক পায়রা বা এক স্বল্পবসনা তন্বীকে আপনার চোখের সামনে থেকে ভ্যানিশ করে নিয়ে যাই। টিম্পানি বেজে ওঠে। বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখি আকাশ ক্রমশ বিস্তার করছে। লেখার শেষে বুঝি, শূন্য থেকে শূন্যে উপনীত এক স্বসংঘর্ষ যাকে নৈঃশব্দ্য থেকে বড় বলা যায় না… কিন্তু সাদা কাগজ হাতে ধরে প্রশ্ন করি কিছুই না থাকলে নিজেকে শুরু করতাম কোথায়! আর আপনি টুকরো করার মতো কিছু পেতেন কি না।