শুভংকর গুহ-র ভ্রমণ

Spread This

শুভংকর গুহ

দরুয়া
দরুয়া এক প্রবাহিত স্রোত, জল নয় যেন সাদা ধবধবে তুলোর মতো জলটুকরো ছড়িয়ে চলে যাচ্ছে বনবাসী কন্যার মতো। ডানদিকে পলমহুয়া বাঁদিকে সদুনিয়া পাহাড়ি গ্রাম। এই দুটি গ্রাম অতিক্রম করার পরে কিছুটা দূরে গিয়ে সে বাঁক নিয়ে থমকে দাঁড়ায়। ডানদিকে মানিকপুর গ্রাম আর বাঁদিকে গড়জোড়া গ্রাম। এই দুইটি গ্রামের মধ্যিখান দিয়ে এগোলে, ঝাঁঝাঁ, জশিডি যাওয়ার রেললাইন। এই রেললাইনের ওপরে দরুয়া নদীর ব্রীজ।

দরুয়া এগিয়ে চলে, ছোটো ছোটো টিলা, ধোঁয়াশায় ঢাকা দূরের পাহাড় শ্রেণি – উপত্যকার ভাঁজে ভাঁজে টোমাঘাট, নওয়াডিহ, খদরা, গোপালপুর, মহেশমারা, সিন্ধুয়া, চমিরডিহ রতনপুর, কুঞ্জশির নানান গ্রাম অতিক্রম করে, দেওঘরের দিকে দরুয়া পাহাড়ি মালভূমি শহরের ছোঁয়া পায়। সেখানে সে তার গতিকে নিয়ন্ত্রণ করে, সাময়িক বিশ্রাম নেয় তারপরে সে চলে যায় তার আদিপুরুষ অজয় নদের সঙ্গে দেখা করতে।

পলমহুয়া গ্রামে পৌঁছনোর আগে সদুনিয়া পাহাড়ি গ্রাম টপকে এলাম। পাহাড়ি পথ ভেঙ্গে,  বাঁক নেওয়ার ঝুঁকি, টাল সামলে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই পলমহুয়া। নভেম্বর মাস, বন জঙ্গল জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে হাতির দল। পাথরের খাঁজে খাঁজে বুনোধান মানে গণেশধান লকলকিয়ে উঠেছে। গণেশধান হাতি খুব ভালো খায়। গ্রামগুলি টপকে আসতে গিয়ে দেখে এলাম উঠোন জুড়ে কাজ চলছে। কেউ জংলি পাতা দিয়ে চাটাই তৈয়ারের কাজ করছে, কেউ তালগাছের পাতা দিয়ে ঝুড়ি বানাচ্ছে। কেউ ধান ছড়িয়ে হাতে লগি নিয়ে বসে আছে। কেউ আবার বকরি শুয়োর নিয়ে ঢালু পথ ধরে নেমে যাচ্ছে।
আমার সহচর দক্ষিণ বিহারের পরিচ্ছন্ন যুবক, নাম তার লালন ঠাকুর। নদীর নামটি সে আগেই জানিয়েছিল। দরুয়া। পাহাড়ি নদী। প্রবাহ তার পিতৃপুরুষের দিকে, অজয়ের দিকে।
পলমহুয়া গ্রামের পূর্বদিকে পাহাড় ঘেঁষে নদীটি কাঠবেড়ালির পিঠের শান্ত দাগের মতো, মাদারির হাতের খেলার মতো জড়িয়ে গেছে। আগেই জেনে এসেছিলাম, পাশের গ্রাম চন্দনায় একজন আনাজপাতির দোকানদার যে গাধার পিঠে সামান চাপিয়ে নিয়ে আসে, ভয়রো যুগলপ্রসাদ, তার দোকানের সামনে মহুয়া গাছের নিচে ক্ষণেক শ্বাস নিচ্ছিলাম, তিনি আমাকে জানালেন, এখানকার আদিবাসীরা মনে করে, দরুয়া অজয়ের বিচ্ছিন্ন ও হারিয়ে যাওয়া সন্তান। সে হাজার বছর ধরে সন্ধান করে চলেছে নিজের পিতৃদেবকে, পাহাড় টিলা পার হয়ে তার গতি তাই কখনো অশান্ত আবার কখনো শান্ত। এখানকার অনেক ছোটো ছোটো নদী কেউ অজয়ের পত্নী কেউ বা কন্যা আবার কেউ পুত্র। আসলে দরুয়া পাহাড়ি মেঘ ধোঁয়াশা বৃষ্টির ও ঝর্ণার সন্তান। বর্ষাকালে সে দুরন্ত হলেও নিজের চলার পথ থেকে সামান্য সরে গেলেও গ্রামের আঙ্গিনা ও উঠোনে প্রবেশ করে না। শীতকালে অনেকটা কাকচক্ষুর মতো বিমর্ষ।
পলমহুয়াকে দেখে প্রথমে একটি পরিত্যক্ত গ্রাম মনে হয়েছিল। মুণ্ডা আদিবাসী সম্প্রদায়ের গ্রাম। দরুয়ার পাশে, কাঠকুটো শুকনো ডাল পাতা দিয়ে, গোলাকার ঝুপড়ি, ঝুপড়ির সামনে উঠোন। কেউ কোথাও নেই যেন, এমনকি টিলার ঢালু ধরে নেমে যাওয়া পথের ওপরে কেউ নেই। জনচিহ্নহীন গ্রাম, শুধু বাতাস শির শির, কোথাও কাঠকুটো পুড়ে যাওয়া গন্ধ। উঠোনের মধ্যিখানে কাঁচা আমের আঁটি, শুকনো শালপাতার ডোঙ্গা, ছাগল শুয়োরের নাদি। উঠোনে গাছের ডালের সাহায্য নিয়ে, কুটির গড়ে তোলা হয়েছে। আর বৃক্ষগুলিকে এমন ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেন কুটিরেরই অংশ।
গাছের ডালে শুয়োর ছাগল ও শিয়ালের চামড়া ঝোলানো আছে। লালন ঠাকুর জানালো, এই দিকটা গ্রামের প্রায় শেষ সীমানা। এখানকার গ্রামগুলির নিয়ম হল, সীমানার শেষে কুটির গড়ে তোলা হয়। যাতে জংলি জানোয়ার ও বুনো ফলের সহজেই নাগাল পাওয়া যায়।
আমি বললাম,– এরা দূরের শহরের থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন।
কেন বিচ্ছিন্ন ? সোনপুরের মেলায় পলমহুয়ার গ্রামের লোকজনকে দেখালাম না ? গণ্ডাক নদীর সেতু পার হয়ে যাচ্ছিল এক পাল শুয়োর নিয়ে।
কাউকেই দেখছি না যে ? গ্রামে কি কেউ থাকে না ?
কেন থাকবে না ? গ্রামের সবাই কাজে গেছে। শিকারে গেছে। কাঠকুটো সংগ্রহে গেছে। দরুয়া থেকে পানি আনতে গেছে। এখানে সবকিছুই জঙ্গল থেকে সংগ্রহ করে নিতে হয়।
একটি ঝুপড়ির ওপর থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখলাম। লালান ঠাকুর বলল,– চলুন ওইদিকে যাই। মনে হচ্ছে কেউ আছে ওখানে।
ঝুপড়িটির সামনে আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। চারদিকে ঘিরে থাকা স্বল্প উচ্চতার  টিলা পাহাড়গুলিকে দেওয়ালের মতো দেখতে লাগছিল। সবুজ ধোঁয়াশার মধ্যে, নীল জলরঙ   সাদা জলজ পাতার ওপরে যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনিই। রঙের প্লাবন নেমে এসেছে, পলমহুয়া গ্রামের উঠোনে। মোট ত্রিশ বত্রিশটি কুটিরের এক যৌথ উঠোন। লাল পাথুরে মাটি দিয়ে নিকোনো। চারদিকে ব্যারিকেডের মতো, গাছের শক্তপোক্ত ডাল দিয়ে ঘিরে রাখা। জারুশিলা, পবনশিলা, বিষ্ণুশিলা, মাতা রুমকিনি শিলা – এমন নানান কাল্পনিক নামের টিলা পাহাড়গুলি গ্রামবাসীদের মহাকাল।
চমকে উঠলাম খস খস শব্দে। পিছনে তাকালাম। বৃদ্ধ, নিজের দেহের ওজনে সামনের দিকে ঝুঁকে আছেন। গহিন পালিশ করা তামাটে শরীর। চওড়া কাঁধ, উচ্চতায় খাটো। কোঁকড়ানো চুল, পাথরের পাটাতনের মতো চ্যাপ্টা নাক। শক্ত গাছের ডাল হাতে। দেহের ওজন সামলাচ্ছে। কুটিরের খোলা মাটির অলিন্দে – কুঠার, বল্লম, কাঠের ছুঁচালো ফলা, কাস্তে কোদাল খুরপি, ভোজালির মতো খুপরি। তার সাথে বৃদ্ধের সন্দেহজনক দৃষ্টি।
কে রে তোরা ?
লালন ঠাকুর বলল,– কত বছর হয়ে গেল সোনপুরের মেলায় যাচ্ছ না হাতি নিয়ে।
বৃদ্ধের চোখে ও কপালে অনেকরকম ভাঁজ উঠে এল। চোখের ওপরে, হাতের তালুর ছাওনি রেখে, — কে ? কে ? কে রে তুই ?
লালন ঠাকুর উত্তর দিল,– কোনহার ঘাটের বালক।
ও কোনহার ঘাটের ? হ্যাঁ, হ্যাঁ, অনেক বছর যাওয়া হয় নি আমার। কি যেন নাম তোর ?
লালন ঠাকুর।
একটা হাতি বিক্কিরি হল না, তুই গয়ারুর সাথে কথা বলে পাকা করে নিলি।
গয়ারু কোথায় ? দেখছি না যে ? গয়ারু কি এখন পলমহুয়ার সর্দার ?
আমি কি মরে গেছি ? আমিই সর্দার। আমি মরে যেতে বেশি দিন আর বাকি নেই। আমাদের জাত পাহাড়ের মতো দীর্ঘায়ু হয় না। আমি মরে গেলে, গয়ারু নায়া হবে।

বৃদ্ধ স্মিত হাসল। হাসির মধ্যে তার মাটির মতো দেখতে কয়েকটি দাঁত, এঁটো বিগ্রহের মতো লাগছিল দেখতে। আমি লালনের কাছে জেনে নিলাম, নায়া কথার অর্থ হল সর্দার। লালন ঠাকুরের সঙ্গে গয়ারুর হাতি কেনাবেচার লেনদেন আছে। গয়ারু জঙ্গল ঘুরে, শহর ঘুরে ঘুরে হাতির শাবকের সন্ধান দেয়। গয়ারুর কাছে সংবাদ পেলে, লালন জঙ্গল অতিক্রম করে, পলমহুয়ায় চলে আসে। অনেকদিনের যাতায়াত। লালন ঠাকুর দক্ষিণ বিহারের হাতি বিক্রির  দালাল। এখানে আসলে হাতির ভালো সন্ধান পাওয়া যায়। আশেপাশের অনেক গ্রামে হাতির লালন পোষণ হয়। সব পোষা হাতি। হাতি বাচ্চা দিলে, স্থানীয় প্রশাসনকে জানাতে হয়। না হলে, হাতির বাচ্চাকে বনবিভাগ তুলে নিয়ে যায়। বনবিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানানোর কাজে গয়ারুকে সাহায্য করে লালন ঠাকুর।

বৃদ্ধ অনেকটাই দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল, — কি সব দিন ছিল। গ্রামে মাত্র কয়েকজন থাকত, বাকি সব চলে যেতাম হরিহর ছত্রজির মেলায়। এ বছর গেল কয়েকজনের একটি দল, শুয়োর নিয়ে। বাকিরা সবাই থেকে গেল গ্রামে।
লালন ঠাকুর বলল,– এই বছর তাই, পলমহুয়ার কাউকেই দেখি নি মেলার মাঠে। এক দলকে দেখলাম গণ্ডাক নদীর সেতুর ওপর দিয়ে একপাল শুয়োর নিয়ে যাচ্ছে।
আমি এখন যাই না বলে, ওরা বায়না ধরল পূর্ণিমার চাঁদকে উঠোনে নামিয়ে আনতে। তারপরে যুবক যুবতীর বিবাহ হল। সে এক পাহাড়ি পুণ্য কর্ম। একজন সাতদিন পরে ফিরল,  হরিণ শিকার করে। অতটুকু হরিণ, সবার কি পাতে পড়ে ? তাই ওরা শিয়াল শুয়োরের মাংস ফেলে দিল রান্নার কড়াইয়ে।
লালন ঠাকুর আমাকে জানাল, – ওদের বিবাহের অদ্ভুত এক নিয়ম আছে। ওরা বিবাহের দিন নির্বাচন করে, সম্পূর্ণ চাঁদের দিন। বিকালে সূর্যাস্তের আগেই বিবাহ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সমস্ত আচার আমোদ ফুরিয়ে নেয় গ্রামবাসীরা। রাতের দিকে পূর্ণিমার আলো ঝক ঝকে হয়ে উঠলে, ছেলেটিকে ছেড়ে দেওয়া হয় গভীর জঙ্গলের ভিতরে। নববধূটি জঙ্গলের ভিতরে নিজের বরকে খুঁজে নেয়।
তারপরে ওরা এক পক্ষকাল গভীর জঙ্গলের ভিতরে বিচরণ করে বেড়ায়। পরস্পরের মন ও শরীরের সঙ্গে নিজেরা বিলীন হয়ে যায়। পনের দিন পরে ওরা নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য সমস্ত যোগ্যতা অর্জন করে ফিরে আসে গ্রামে।
একটি পাথরের ওপরে ফাঁসকাঠি লাগানো আছে। ওখানে খরগোশ বা পাখি বলি দেওয়া হয়। বহুবছর আগে ওখানে হিংস্র পশু বলি দেওয়া হত। এখন বনের পশু বলি দিলে বনবিভাগের লোকজন এসে শাসিয়ে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাবে।
এই ফাঁসকাঠির নিচে পাথরটিকে ওরা দেবতা হিসেবে মান্য করে। পাথরটিকে প্রায় সিন্দুর দিয়ে লেপে দেওয়া হয়েছে। চারপাশে পাখির পালক দিয়ে সাজানো হয়েছে। কিছু শুকনো বুনোফুল পড়ে আছে পাথরের ওপরে। ওদের বড় দেবতার নাম বোংগা। এ ছাড়া বিবাহ উৎসবে বোঙ্গা সিঙ্গা দেবতার উপাসনা করে।
বহুবছর আগে এক স্থানে ওরা বেশিদিন থাকত না। স্থান পরিবর্তন করে নিত। কিন্তু এখন সরকারি অনেক নিয়ম হয়েছে। জঙ্গলের যেখানে সেখানে স্বাধীনভাবে থাকা যাবে না। এখন তাই ওরা পলমহুয়ায় এক পুরুষ ধরে আছে।
দুপুর গড়িয়ে আসছিল। বিকেল ও সন্ধ্যা এখানে ঝুপ করে নেমে আসে। এখান থেকে দেওঘর স্টেশন অনেক দূরের পথ। লালন আমি পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে এলাম। এতক্ষণ সঙ্গে ছিল বলে মনেই হয় নি। হঠাৎ দেখলাম, দরুয়া আমাদের সাথে আর নেই। চুপিসারে সরে গেছে। নিজের আদিম পিতৃপুরুষের সঙ্গে এখানকার নদী উপনদীগুলি দেখা করতে চলে যায় নীরবে শব্দহীন। আমি লালন ঠাকুরকে বললাম,– আর কি দেখা যাবে না দরুয়াকে ?
এই পথে আর পাবেন না। দরুয়া দুর্গমে সরে গেছে। আমরা বলি হারিয়ে গেছে।
যতক্ষণ সঙ্গে ছিল, ছিল খল খল জলের শব্দ। দরুয়ার প্রবাহিত দৃশ্য ও স্রোতের শব্দ আমার কল্পনার মধ্যে আশ্রয় নিল। চারদিকে পাহাড়ি হুম হুম উপস্থিতি অনেকটাই প্রচ্ছন্ন হয়ে এল। পাহাড় যত দূরে সরে যায় ততই আকাশের রঙ নিয়ে নেয়। তখন বহুদূরে সে মেঘের মধ্যে নীল হয়ে যায়। আর বুনো গ্রাম শহরে ফিরে গেলে, লেখার খণ্ড হয়ে যায়।
লালন ঠাকুর বলল,– কি কুড়োলেন ?
আমি মনে মনে বললাম,– কল্পনার কাকচক্ষু ।
 
 
[ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত]