সাদিক হোসেন-এর গল্প

Spread This

সাদিক হোসেন

অভিসারিকা
এই রাত্রি নেমে এল। আদ্যিকালের ভিটের আড়ালে গুপ্তঘাতকের মত ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যায়। তোমার পায়ের কাছে অনুগত বেড়াল ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে। দাদি ডেকে চলেছে কতক্ষণ। তবু তুমি সেদিকে তাকাও না। নিজের পায়ে বেড়ালের নরম চামড়ার ওম পেলে খামোকা হাসি পায় খুব। কিন্তু হাসতে গেলেই ভুলে যাও কেন এই পোড়া অন্ধকারে এতক্ষণ বসে রয়েছ। তোমার ভয় করে। আর ভয় পেলেই দেখতে পাও দাদির ডাক শুনে বেড়ালটা কেমন কান খাড়া করে তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। বেড়ালটা যেন এই অন্ধকার থেকে তোমাকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে বার করে দিতে চাইছে। তুমি বেড়ালটার পশমে হাত বোলাও। হাত বোলাতে বোলাতে দ্বিতীয়বার দাদির ডাক শুনেও কোনো কালো মহিষের পিঠে চেপে পানাপুকুরের পানিতে ডুব দিয়ে, সারা গায়ে জলঝাঁঝি মেখে, নরম পাঁকের ভেতর তলিয়ে যেতে যেতে ঘুমিয়ে পড়বার সাধ ছাড়তে পার না
অথচ ঘুমের ভেতর তুমি ঠিক ঘুমোতে শেখোনি কোনোদিন। তোমার বন্ধ চোখের পাতার ভেতরে হাওয়া আর মেঘ আর কালো মহিষের বাঁট থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসা দুধ আর এক ঝাঁক কাক উড়ে যায়। তোমার উদোম বুকের উপর কে যেন মরা মাছ রেখে চলে গেছে। কে এই মাছটা তোমার বুকের উপর রেখে চলে গেছে? তুমি বুঝি লোকটাকে শিস দিয়ে চলে যেতে দেখো। বড় রোগা ও অচেনা লাগে লোকটাকে। তুমি বল, কে? কেউ কোন উত্তর করেনা। তুমি আবার ডাক দাও। জবাব শোনবার জন্য কান পেতে থাক। তোমার নাকে মরা মাছের পচা গন্ধ আসে। সারা গা গুলিয়ে ওঠে। গা গুলিয়ে উঠলে নিজেকে মনে হয় পোয়াতি। তখনি বেড়ালটার প্রতি তোমার নজর আসে। বুঝতে পার, সেটি মাছটার লোভে তোমার বুকে লাফিয়ে উঠবে এখনি। কিন্তু তোমার সারা দেহ অবশ লাগতে শুরু করেছে। মাথা ম’জে যাওয়া কুয়োর মত ফাঁকা। তুমি নিজের মনেই বেড়ালটা কখন মাছটাকে তাক করতে গিয়ে তোমার বুক খুবলে নেবে, সেজন্য অপেক্ষা করতে থাক।
কিন্তু বেড়ালটা অতীব চালাক। সহজে লাফ কাটে না। তোমাকে আর একটু সময় দিয়ে জিজ্ঞেস করে, কেন?
তুমি বল, এমনি!
বেড়ালটা তোমার কথা শুনে ঠোঁট উল্টিয়ে মাংস খাবার দাঁত দেখায়। এতে তোমার বুক ঘনিয়ে আসে। চোখ বড় বড় করে বেড়ালটার দিকে তাকাও। বেড়ালটা মুখ নামিয়ে নিলে তাকে কোলে তুলে দাদির ঘরে ঢোকো।
বুড়ি তখন খাটের উপর বসে হাঁপাচ্ছে।
তুমি জিজ্ঞেস করো, ডাকতে ছ্যালে?
দাদি বলে, বাতাস কর। জানটা খালি হাঁকপাঁক করতেছে।
তুমি হ্যারিকেনের সলতেটা বাড়িয়ে দাদির মুখে হাতপাখা নেড়ে বাতাস করতে থাক। কখনো বলো, পানি খাবে?
দাদি দুদিকে মাথা নাড়ায়।
আবার বলো, বালিশে হেলান দেবে?
দাদি আর মাথা নাড়ায় না। বাতাস খেয়ে খানিক থিতু হলে পর বলে, হাগব।
তুমি হ্যারিকেনটা নিয়ে দাদিকে ধরে ধরে পায়খানায় নিয়ে যাও। দাদিকে পাদানিতে বসিয়ে হ্যারিকেনটা দরজার সামনে রাখ। বাগানে কার যেন শিস দেবার শব্দ শোনো। তারপর পানির শব্দে সম্বিত ফিরলে দেখো, হ্যারিকেনের কমলা আলোয় বেড়ালটা ছোকরা বালকের মত দাদির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তুমি গলা খাঁকারি দিয়ে বালকটিকে কাছে ডেকে নাও। বেড়ালটা তোমার দিকে চেয়ে হাসে।
দাদি বলে, এবার মোকে নে’ চল।
তুমি দাদিকে খাটে শুইয়ে দিলে দাদি বলে, জানটা এবার আরাম পেল।
তুমি বলো, মরা মাছ খাবে দাদি?
দাদি চমকে ওঠে।
তুমি এক গেলাস পানি দিয়ে আবার বলো, মরা মাছ না খেলি বেড়ালটা যে মোর উপর গোঁসা করবে দাদি। মোকে নিজের দাঁত দেক্কে ভেংচি কাটবে। মুই তখন ওনাকে কী জবাব দোবো, বলো?
এক ঢোঁকে পানিটা শেষ করে দাদি বলে, উনি যখন তোকে ভেংচি কাটবে, তখন মোকে ডাকবি।
এই তো, উনি ভেংচি কাটল! বলেই তুমি বেড়ালটাকে দাদির গায়ে ছেড়ে দাও।
বেড়ালটা দাদির পেটের উপর দাঁড়িয়ে মিয়াঁও মিয়াঁও করে ডাকে। সেদিকে তাকিয়ে দাদি কোমর উঁচু করে বলে, ভাগ্যিস উনি ছ্যালো। তা না হলি, মোর এই শুকনো বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ত কে?
তুমি রাগ দেখিয়ে বল, কেমন?
দাদি বলে, গল্প!
কীরম গল্প?
মরা মাছ কার দিকে চেয়ে কী কী বলে তা কি মুই জানি না!
দাদির কথা শুনে তুমি চুপ করে যাও। মনে হয়, দাদি বুঝি তোমাকে খোলাখুলি দেখতে পারছে।
তোমাকে চুপ থাকতে দেখে দাদি আবার বলে, রোজ সকালবেলা দাওয়ায় বসিয়ে তুই তো রোজ এত মলম লাগাস। কই তাতেও তো মোর পিঠের পোকাগুলো সরে না। মোর পিঠের পোকাগুলো এত গিজগিজ করে কীসের লেগে?
– মরা মাছের চোখ দিয়ে সেই সময় তুমি মোর দিকে তাকাও নাকি? মরা মাছের চোখ দিয়ে মোকে দেখতি কেমন লাগে?
দাদি পতপত করে ক’বার চোখের পাতা ফেলে। ইশারায় হ্যারিকেনের সলতেটা নাবাতে বলে তোমাকে কাছে ডাকে। তুমি কাছে গেলে বেড়ালটা দাদির পেট থেকে ঝাঁপিয়ে নেমে যায়। কম আলোয় তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে।
তুমি বলো, এখন মুই তোমার জোয়ান বয়সের মত করে হাঁটি?
দাদি মাড়ি বার করে হাসে।
তুমি আবার দরজার কাছে চলে গিয়ে, ওখান থেকে, দুহাত কোমরে তুলে দাদির কাছে আসো।
তোমার চলন দেখে দাদি আবার যৌবনে ফিরে যায়, উনি মোর ইউনুস ছ্যালেন। একবার মনিবের সাথে নেমকহারামি করে ঘরে এইছ্যালেন। ঠিক কী হইছ্যালো মুই তা জানিনা। কিন্তু দেখতুম উনি কেমন চুপ মেরে গেছেন। এমন আস্তে আস্তে গোস্ত চিবোতো, মনে হত, গোস্তর টুকরোটাকেও উনি যেন কষ্ট দিতে চাচ্ছেন না। মোর গায়ে হাত দিলি, হায় আল্লা, মনে হত কেউ যেন পায়রার বুকের লোম ছোঁয়াচ্ছে।
তুমি বেড়ালটাকে কোলে তু্লে পশমে মুখ ঘষতে ঘষতে বলো, এইরম?
দাদি হাসে। আবার বলে, একদিন পুকুরে গা ধুতে গিয়ে আর ফেরে না। কোথায় যে গেল কেউ বলতি পারে না। পরে শুনি, উনি যেই পুকুরে ডুব দিছিল, অমনি একটা কাতলা মাছ এসে ওনাকে গিলে নেয়। চল্লিশদিন পর্যন্তু উনি মাছটার পেটের ভেতরে নিখোঁজ ছ্যালেন। মাছটার পেটের ভেতরে উনি খালি আল্লা আল্লা করতেন। ওইসময় মাছটা একবারও গাল বন্ধ করেনি। তাই তো উনি নিঃশ্বাস নিতি পেরেছ্যালেন।
তুমি আবার কোমরে দুহাত তুলে খাটের চারপাশে ঘুরপাক খাও।
দাদি বলে, সেই মাছটার চোখ দে’ মুই তোকে দেখতি পাই। তোকে দেখলি মুই নিজেকে দেখতি পাই।
তুমি থেমে যাও। আর তুমি যখন মোকে দেখে তোমার যৌবনটাকে দেখ, তখন মুই কোখায় থাকি? মোকে দেখে কে?
দাদি বলে, অতকথা মুই কী জানি!
তুমি জাননা, তো কে জানে?
দাদি আর কথা কয় না। হ্যারিকেনের কাঁপা কাঁপা আলোয় তুমি আবার ঝিঁঝিঁপোকার ডাক শুনতে পাও।
বেড়ালটা তোমার পায়ের কাছে এসে বলে, কালো মোষের দুধ খাব।
তুমি তাকে মুখ ঝামটা দাও, ছোঁচা কোথাকার!
বেড়ালটা তোমার দিকে চেয়ে হাসে। তুমিও ভেংচি কাটো। তখনি পাশের ঘর থেকে আবার দাদির ডাক শোনা যায়। এই ডাক শুনেই তুমি বুঝতে পার, পরবর্তী অধ্যায়ে প্রবেশের সময় হয়ে এসেছে। সুতরাং, এখন সকাল। এয়াকুব কালো মোষের দুধ নিয়ে হাজির হয়েছে।
এয়াকুবকে আজ বড় মনমরা দেখাচ্ছে। রোজকার মত সে আর ‘খালা, ও খালা’ করে ডাক পাড়েনি। দু’বার দরজায় কড়া নেড়েই থেমে গেছে।
তুমি দরজা খুলে দেখ এয়াকুব।
এয়াকুব বলে, আজকে পাঁচপো দুধ দি’?
তুমি গামলাটা এগিয়ে দিলে সে মেপে মেপে তাতে দুধ ঢালে।
তুমি আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস কর, আজ এত মনমরা কীসের লেগে?
তা তো তুমি জানো।
রাহেলার লেগে তোমার বড় কষ্ট, না? রাহেলাকে পেতে আর কতদিন বাকি?
এয়াকুব তার কাহিনী শুরু করে, ঘরে ঝগড়া করে মামুর কাছে চলে এইছ্যালুম। মামুকে বললুম, তোমার মেয়ের সাথে মোর বে’ দেবে? মামু বলে, কোনটাকে বে’ করতি চাও? মামুর ছোট মেয়েটা দেখতি ভাল। বড় মেয়েটা নাকচেপ্টি। বললুম তোমার ছোট মেয়ে রাহেলাকে। মামু বলে, ঠিক আছে। তবে সাত বছর টানা মোর খাটালে খাটতি হবে। তাতেই দেনমোহরের টাকা উঠবে। মুই সাত বৎসর ওখানে খাটলুম। কিন্তু বে’র রাতে হল কি জানো? উনি ওনার বড় মেয়েটাকে পাইঠে দিলেন। পরদিন মুই মামুর কাছে গিয়ে বলি, এ কী মামু! মুই তো রাহেলাকে চেইছিলুম। মামু বলে, তা বড় মেয়ে থাকতি ছোটটাকে বে’ দি’ কী উপায়ে? মুই পায়ে ধরলুম, না, মামু, মুই রাহেলাকেই চাই। মামু কিছুতেই শুনবেক না। খালি বলে, খাটালে কাম করতি হবে। সেই থেকে মুই এখনও মামুর খাটালে কাম করতিছি।
তুমি দুধের গামলাটা নিয়ে বল, আর ক’বছর বাকি?
এয়াকুব হিসেব কষে, তিন বৎসর পাঁচ মাস সাতাশ দিন।
সে তো অনেকদিন?
হুম।
তখন তো তুমি বুড়ো হয়ে যাবে।
এয়াকুব ফ্যালফ্যাল করে তোমার দিকে চেয়ে হাসে। বলে, বুড়ো হব কেন? মোর গায়ে তো অনেক জোর। মুই রোজ পাঁচ পাঁচটা মোষকে পানাপুকুরে নিয়ে গিয়ে গা ধোয়াই। গা ধোয়াবার পর আবার তাদের খাটালে নিয়ে আসি। দুধ দুই। সেই দুধ আবার সাইকেলে করে ঘরে ঘরে দি’। মোর গায়ে জোর নাই?
এই সময় বেড়ালটা দুধ খাবে বলে ছোঁকছোঁক করছিল। এয়াকুব কথা বলার ফাঁকে হ্যাট হ্যাট করে সেটাকে তাড়ায়।
তুমি বলো, আহ, বেড়াল বলে কি ওটার মানুষের মত দুধ খাবার সখ হয় না?
তোমার কথার অর্থ বুঝে এয়াকুব আর দাঁড়ায় না। বলে, আজকে যাই। আরও অনেক ঘরে যেতি হবে।
এয়াকুব সাইকেলে বসলেই তুমি শিস দিয়ে ওঠ। এয়াকুব আর প্যাডেলে চাপ দেয় না, তুমি মোর শিস নকল করলে কী উপায়ে?
তুমি তৎক্ষণাৎ মুখ ফিরিয়ে নাও, আন্ধারে মোষের পিঠের উপর বসে যে মানুষ শিস দিয়ে তার আপনজনাকে ডাকে, সে কি সত্যিই মানুষ?
এয়াকুব এবার সাইকেল থেকে নেমে তোমার সামনে চলে আসে, তুমি মোষের দুধ খাও বলে তোমার গালটা গোলগোল আর নরম। যারা মোষের দুধ খায়, তাদের গাল এরম হয়।
তুমি এয়াকুবের আঙুলটা মুঠোয় নিয়ে বল, আর তুমি দুধ দোও বলে তোমার আঙুলগুলো এমন লকলক করতেছে। ঠিক যেন সজনে ডাঁটা। চাপ দিলিই শাঁস বেরোবে।
তুমি নখ দিয়ে চাপ দাও।
এয়াকুব চেঁচিয়ে ওঠে।
এইটুকুতেই লাগে?
লাগে তো।
তালে একটা কাম করতি পারবে?
কী কাম?
চুপ মেরে দেঁইড়ে থাক। একটু পর তোমাকে ঘরে ডেকে নেব। ততক্ষণ কতা কইয়ো না
শুধুমুদু দেঁইড়ে থাকব? মোকে যে আরও ক’জায়গায় যেতি হবে।
তুমি উত্তর না দিয়ে ফিরে চল।
তখন দাওয়ায় সকালের রোদ এসে পড়েছে। তুমি দাদিকে ধরে ধরে দাওয়ায় নিয়ে এসে জলচৌকির উপর বসিয়ে দাও।
শাড়ি সরিয়ে পিঠটাকে উদোম করে দাও। উদোম পিঠে পোকারা রোদ পেয়ে কিলবিলিয়ে ওঠে। পোকাদের নড়াচড়া টের পেলে দাদির গাল বেয়ে লালা ঝরতে শুরু করে। দাদি বলে, তক্করে মলম লাগা।
তুমি দাদির চোখে কালো কাপড় বেঁধে দাও।
দাদি অবাক। কী করতিছিস?
– মরা মাছ যাতে দেখতি না পায় সেই ব্যবস্থা করতিছি।
দাদি আর কথা বলে না। কিলবিলিয়ে ওঠা পোকাদের নিজেরই তৈরি করা অনায়াস মুদ্রা বলে তার মনে হয়।
তুমি এয়াকুবকে দাওয়ায় নিয়ে আসো।
এয়াকুব হাঁটতে গেলেই তাকে থামিয়ে দাও। বলো, বেড়ালের মত করে হাঁটতে হবে কিন্তু।
বেড়ালটা খানিক হেঁটে কীভাবে হাঁটতে হবে তা দেখিয়ে দেয়। এয়াকুব সেইভাবে হেঁটে দাদির সামনে আসে। তুমি এয়াকুবের আঙুলে মলম লাগিয়ে তা দাদির পিঠে লাগাতে বলো।
এয়াকুব তার ডাঁটার মত আঙুল দিয়ে দাদির পিঠে মলম লাগায়। কোঁচকানো চামড়ার ফাঁকে ফাঁকে পোকাগুলো গুটিয়ে গুটিয়ে যায়।
তুমি বলো, কেরম লাগদেচে দাদি?
দাদির গাল দিয়ে একনাগাড়ে লালা ঝরে পড়ছে।
তুমি সেইদিকে তাকিয়ে আবার জিজ্ঞেস কর, মরা মাছের চোখ যদ্দুর যেতে পারে, মুই কি তার থেকেও বেশি দূর যেতি পারি?
না।
তালে মুই এখন কোথায়?
দাদি সুড়ুত করে লালা টেনে বলে, তোর আঙুলে পায়রার বুকের লোম বেরিয়েছে।
তুমি চমকে ওঠো। 
বেড়ালটা এয়াকুবকে পথ দেখিয়ে দিয়ে বলে, যাও।
এয়াকুব চলে গেলে তুমি দাদির চোখের কাপড়টা খুলে দাও।
 
 
চারদিকে ঝুঁজকো সন্ধ্যা নেমেছে। দূরের দু’-একটা ঘরে বাতি জ্বলছে। দাদির ঘরে জ্বলা হ্যারিকেনের আলো তোমার গায়ে এসে পড়েছে। তাতে তোমার ছাওয়া লম্বা ভাবে বেঁকে গিয়ে দাওয়া পেরিয়ে বাগানে চলে এসেছে। সেই ছাওয়ার উপর কালো মোষের পিঠে বসে রোগা এয়াকুব শিস দিয়ে চলেছে। তুমি বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে সন্তর্পণে বাগানে চলে আসো। 
এয়াকুব তোমাকে দেখে বলে, মুই কিন্তু তোমার লেগে শিস দিচ্ছি না।
তালে কার লেগে শিস দিচ্ছ?
রাহেলার লেগে।
তা তো মুই জানি।
তালে?
তোমাদের বাগানটা এত ফাঁকা। এখেনে শিস দিলে কেউ জ্বালাতন করতি আসবে না।
এই তো মুই তোমায় জ্বালাতন করতি এলুম। 
তুমি তো ভালো।
তালে মোর আঙুলগুলোকে পায়রার বুকের লোমের মত করে দাও।
তুমি তোমার আঙুল ক’টা এয়াকুবের দিকে এগিয়ে দাও। 
এয়াকুব চালাকির সুরে বলে, এই মোষটার অত দুধ নাই গো।
তালে?
এয়াকুব সটান মোষের পিঠ থেকে নেমে তোমার কোল থেকে বেড়ালটাকে টেনে নেয়। তারপর তোমাকে মোষের পিঠের উপর বসিয়ে শিস দিতে দিতে এগিয়ে চলে।
বাগান পেরিয়ে তোমরা উত্তরদিকের রাস্তাটা ধর। সেই রাস্তা পেরিয়ে রেললাইনের পাশের সরু রাস্তায় ওঠো। এখানে বিশেষ বসতি গড়ে ওঠেনি। অমাবস্যা থাকায় দূরের রেললাইনের সিগন্যালের আলো ছাড়া সবদিক অন্ধকার।
অন্ধকারে তোমার সারা শরীর ঘামতে শুরু করে। তুমি মোষের পিছল চামড়ায় নিজের ঘাম মোছো। মোষটা মাথা দোলায়। একবার থামে। এয়াকুব শিস দিলে আবার হাঁটতে লাগে।
তুমি এক সরু পথের শেষপ্রান্তে এসে থামো। পথের একপাশে বিস্তীর্ণ মাঠ। অন্যপাশে কচুরিপানার কালো কালো পাতারা হাঁ করে তাকিয়ে রয়েছে।
এয়াকুব মোষের পিঠে দু’বার চাপড় মারে। তাকে ঠেলতে ঠেলতে পথ থেকে নামিয়ে পানাপুকুরের দিকে নিয়ে যায়।
মোষটা নামতে গেলে পিছলিয়ে যাও। ঝুরঝুর করে খানিকটা মাটি ধসে পড়ে। বিড়ালটা মিয়াঁও মিয়াঁও করে তোমাকে ডাকে। তুমি ভয় পেয়ে মোষটার শিং পাকড়ে ধরো। এয়াকুব কোন কথা কয় না। মোষটা আস্তে আস্তে পুকুরে নেমে যেতে থাকে।
তোমার হাঁটু অব্দি পানিতে ডুবে আছে। পায়ের তলায় কী যেন সরসর করে ওঠে। কানের পাশে একঝাঁক মশা ভোঁ ভোঁ করে উড়ে যায়।
তুমি আর এয়াকুবকে দেখতে পাও না। শুধু বেড়ালটার চোখদুটো যেন অনেক দূর থেকে আসা আলোর মত জ্বলা-নেভা করে।
তুমি মোষের পিঠে চিত হয়ে শুয়ে পড়। মোষটা পানিতে ডুব দেয়। তুমি ডুবে যেতে যেতে আর একবার উপরে তাকাও। সারা গায়ে, মনে হয় বুঝি, মেয়েমানুষের চুলের মত কচুরিপানার শিকড় জড়িয়ে যাচ্ছে। পা নাড়ালে জলঝাঁজি আঙ্গুলের তলায় সরে সরে যায়। মোষটা আচমকা নিঃশ্বাস ছাড়লে পানিতে ঢেউ ওঠে। তুমি দু’হাত দিয়ে কচুরিপানাগুলোকে টানতে থাক। ফিকফিক করে হাসো। তোমার হাসি শুনে এয়াকুব শিস দিয়ে ওঠে।
মোষটা পথে উঠে এলে তুমি তার পিঠ থেকে নেমে আসো। এয়াকুবের কাছ থেকে বেড়ালটাকে নিয়ে বলো, এবার মুই একলা যাব।
– রাস্তা চিনতি পারবে?
তুমি উত্তর দাও না। মোষটাকে নিয়ে এয়াকুব রাস্তায় মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত সেইদিকে তাকিয়ে থাকো। তোমার ভেজা শরীরের ভেতর বেড়ালটা ছটফট করে। তবুও তুমি তাকে ছেড়ে দাও না। আর একবার চারিদিক দেখে নিয়ে ফিরে চল।
কিন্তু ঘরের দিকে পৌঁছুলে তুমি খালি গুপ্তঘাতকের ডাক শোনো। গুপ্তঘাতকেরা ঝিঁঝিঁপোকার ডাক নকল করে ডেকে চলেছে।