সুকান্তি দত্ত-র গল্প

Spread This

সুকান্তি দত্ত

যাপনকথা
 
শিয়ালদা-নিউ দিল্লি দুরন্ত এক্সপ্রেসের টিকিট হাতে পাওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই দুঃসংবাদটা পেলাম, ছোটকা, আমার ছোটোকাকা, আর নেই। এই তো গত পরশু সন্ধের কথা, ছোটকার সঙ্গে প্রায় আধ ঘণ্টা ফোনালাপ সেরে মন কেমন বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছিল। তিন মাস আগের ঘটনায় ছোটকার ক্ষমাভিক্ষা, আরও কিছু কথা এবং শেষে হাউহাউ কান্না।
   আমার বাবারা চার ভাই, এক বোন। বাবা সবার বড়ো, তার অকাল-মৃত্যুর সময় আমার ক্লাস এইট। আমাদের তিন ভাইবোনের মধ্যে আমিই বড়ো, আমাদের মানুষ করতে মায়ের সে এক কঠিন সংগ্রামের দিন। তিন কাকাই যথাসাধ্য আমাদের পাশে থেকেছিল, কিন্তু সত্তর দশকের সে সময় উদ্বাস্তু কলোনির জীবনযাপনে আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের আন্তরিকতা-কর্তব্যবোধে ঘাটতি না থাকলেও সংসারে অভাব-অনটন বিস্তর, তাই সাধ আর সাধ্যের ফারাক ঘোচানো ছিল খুবই মুশকিল। একমাত্র ছোটকাই ছিল ব্যতিক্রম। বিদেশি কোম্পানির চাকরিতে তার মাইনে সে যুগে ঈর্ষণীয়, পরে প্রমোশন পেয়ে কলকাতা ছেড়ে দিল্লির অফিসে যোগ দিয়ে  সে মাইনে বাড়তে বাড়তে এমন অঙ্কে পৌঁছায়, মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনে তখন তা অকল্পনীয়।
 আমার জ্ঞানত ছোটকাকে আমি এ-বাড়িতে একসঙ্গে থাকতে দেখিনি, বাবার মামারা অবস্থাপন্ন ছিলেন,   ছোটকার কলেজজীবন থেকে সে-বাড়িতেই কেটেছে, চাকরি পেয়ে বালিগঞ্জে মেসে থাকত, পরে বাবার মৃত্যুর কয়েক বছর পর দিল্লি চলে যায়। সেখান থেকেই নিয়মিত আমার বইখাতা, স্কুল-কলেজের মাইনে, জামাকাপড় ইত্যাদি বাবদ টাকা পাঠাত। বালিগঞ্জের মেসজীবনে ছুটিছাটার দিন তার বড়ো বউদির রান্না খেতে হইহই করে চলে আসত। হাতে জোড়া ইলিশ কিংবা পাঁঠার মাংস। দশ কাঠার প্লটে খানিকটা বেড়ার খানিকটা চুন-সুড়কি-ইটের গাঁথনির উপর টালি ছাওয়া বাড়িতে বাবা আর মেজোকাকার দুই পরিবার, সেজোকাকা তো তখন শিলঙে, সেসব দিন খুশিতে রঙিন, হইহই কাণ্ড।
   ক্যারম কম্পিটিশন হত, প্রত্যেকবার ছোটকাই ফার্স্ট। ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ইংরাজির অনার্স,  স্মার্ট ইংরাজি বাচনে আমরা ভাইপো ভাইঝিরা মুগ্ধ থাকতাম সকলেই। বস্তুত তাকে মডেল করেই আমারও ইংরাজিতে এম.এ। মাঝে মাঝে এলিয়ট কিংবা কিটসের কবিতা আবৃত্তি করে শোনাত, কিছুই বুঝতাম না তখন, তাই ভক্তি ও মুগ্ধতা আরও বাড়ত। কখনও চমকে দিত নতুন নতুন ধাঁধায়, রবীন্দ্র সঙ্গীত অপছন্দ তার, কিন্তু ভাঙা ভাঙা গলায় গেয়ে উঠত আখতারিবাঈর গজল কিংবা বড়ে গোলাম আলির ঠুংরির দু-এক কলি, টেস্ট ক্রিকেটের সব পরিসংখ্যান ঠোঁটের গোড়ায়—তাই  ছোটকা আসা মানেই তাকে ঘিরে জমজমাট মজলিশ, ছোটকা সূর্য আর বাকি সব গ্রহ উপগ্রহ!
কিন্তু তবুও বালক থেকে যুবক হতে হতে ক্রমশ আমি অনুভব করতাম বাবা-কাকাদের থেকে ছোটকা মানসিকতায় যেন অন্যধরনের মানুষ। ভেতরে ভেতরে চাপা প্রবল অহংবোধ, সবাইকে ছাড়িয়ে অনেক ওপরে ওঠার তীব্র অস্থিরতা। দিল্লিতে যাওয়ার পর প্রথম প্রথম বছরে একবার কলকাতায় আসলেও, ক্রমশ সেটা দাঁড়ালো দু-তিন বছরে একবার। বিয়ে হল দিল্লিতে, শ্বশুর মশাই অফিসেরই এক বড়োকত্তা। কাকির সঙ্গে কোনোদিনই এদিককার আত্মীয়-স্বজনদের সম্পর্ক সহজ হতে পারেনি, তখনকার দিনের তুলনায় অতি-আধুনিকা, আমাদের বোধহয় খুব গাঁইয়া-টাইয়া ভাবত!
    বিয়ের পর থেকে ওরা এখানে আসলে সাধারণত রাত্রিবাস করতে চাইত না, আলিপুরে কোম্পানির গেস্ট হাউসে থাকত। বছর গড়ায়, কঠিন সংগ্রামের দিন শেষ করে আমি সরকারি স্কুলে মাস্টারিতে ঢুকলাম। ভাই দেবুও ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে ভালো চাকরিতে। বিদিশা এল আমার বউ হয়ে, সেও পড়ায় মর্নিং স্কুলে। মোটামুটি স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত জীবন। নব্বুই দশকের গোড়ার দিকের কথা এ সব, লক্ষ করতাম ছোটকাও অনেক পালটে গেছে, আগে যা কিছু চেপে রাখত, তা আর চাপতে চাইছে না এখন। সমসাময়িক বাংলা-বাঙালি-কলকাতার প্রতি তাচ্ছিল্য সর্বদাই, আমাদের প্রতিও তাচ্ছিল্য, দুর্দিনে পাশে থাকার জন্য কৃতজ্ঞতা থাকলেও স্বাভাবিকভাবেই আগের সেই মুগ্ধতায় ক্রমশ ভাঁটা পড়ছিল আমার।
  দিল্লিতে থাকার কয়েক বছর পর থেকে কিছু অদ্ভুত অভ্যাস গড়ে উঠেছিল, স্নান করত না, জল খেত না, জলের বদলে ফলের রস খেয়ে থাকত, কারণ জিজ্ঞেস করলে, উত্তর না দিয়ে মিটিমিটি হাসত। মাঝেমাঝে তর্কাতর্কি হত নানা বিষয়ে, প্রায়ই বলত, বাঙালির কিস্যু হবে না, বাঙালি অলস ফাঁকিবাজ, রাজনীতি করেই জাতিটা শেষ হয়ে গেল! এ সব শুনতে শুনতে গা-সহা হয়ে গিয়েছিল। একদিন হঠাৎ বলে বসল, বাঙালি গোল্লায় গেছে সখী সখী রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়ে!
  সখী সখী? মানে?
মানে? ওই যে—সখী ভালবাসা কারে কয়! হাতে পায়ে নাচের মুদ্রা এনে গলা সরু করে বলল।
  আমি হেসে বললাম, তোমার সখীফোবিয়া আছে জানতাম না! তা তুমি, খরবায়ু বয় বেগে বা বাঁধ ভেঙে দাও, শোনোনি? ওগুলোও তো রবি ঠাকুরের গান!
  দূর দূর! রবীন্দ্রসঙ্গীত মানেই কেমন একটা প্যানপেনে ন্যাকা ন্যাকা ভাব!
  তাই! তবে তুমি গজল ঠুংরি শোনো কেন? ও সব শুনে কি তোমার রক্ত গরম হয়ে যায়?
  উত্তর এড়িয়ে বলে, বাঙালির দরকার শক্তি সাধনা, কালী মা কালী, বুঝলি অপু, বৈষ্ণবী প্রেম বিলিয়ে কিস্যু হবে না! বাপের ব্যাটা বাঙালির মধ্যে দু পিস, ওই যা হওয়ার হয়ে গেছে, আর হবে না, নেতাজি আর বিবেকানন্দ!
  আমি মুচকি হেসে বলি, এঁরা দুজনেই বাঙালির কাছে খুবই শ্রদ্ধেয়, কিন্তু কালীভক্ত রামপ্রসাদের গানে প্রেম-ভক্তি কি কম? আর বিবেকানন্দও তো জীবে প্রেমের কথাই বলেছেন।
  খুবই অস্থির হয়ে ওঠে দীননাথ দাশ থেকে ডিএন দাশ হয়ে ওঠা আমার ছোটোকাকা, ভাইপো যে এ ভাবে তর্ক করবে ভাবতে পারেনি। উত্তেজিত স্বরে তুই থেকে তুমিতে চলে গিয়ে বলে, তোমরা খালি তর্ক করতেই শিখেছ, চায়ের দোকানে আড্ডা আর রাজনীতি, রাশিয়ায় দেখলে তো কি হল? সোশ্যালিজমের ধাপ্পাবাজি আর চলবে না!
    ছোটকা যতই উত্তেজিত আমি ততই শান্ত, বললাম, এত বড়ো দেশ, এত গরিব মানুষ, অল্প কিছু মানুষের হাতে এত টাকা আর সম্পত্তি! কোন পথে গেলে মানুষ অন্তত দুবেলা দুমুঠো খেয়ে বাঁচবে বলো দেখি?
শোনো, এ দেশের সবচেয়ে বড়ো সমস্যা জনসংখ্যা, জনসংখ্যা কমাতে হবে, দরকার হলে জোর করে, সবাইকে লাইন দিয়ে দাঁড় করাও আর কামানের মুখে উড়িয়ে দাও!
  কাকে উড়িয়ে দেবে কামানের মুখে?
  এ দেশে যত গরিব হাভাতে অশিক্ষিত রুগ্ন মানুষ আছে তাদের উড়িয়ে দাও! যারা থাকবে তারা ভালোভাবে বাঁচুক!
  বটে! তোমার থিয়োরিটা প্র্যাকটিসে আনার চেষ্টা করে দেখ দেখি, কী হয়? তোমাকেই না আবার কামানের মুখে—
  চুপ কর! বেশি কথা বলিস না!
  এরকম তর্কাতর্কি দেখা হলেই লেগে থাকত। দিল্লিতে বেঙ্গলি অ্যাসোসিয়েশন, কালীবাড়ি ইত্যাদি সংগঠনের কাজে খুবই পরিশ্রম করত। বহু গরিব মানুষকে আর্থিক সাহায্যও দিত, অথচ তাদেরই উড়িয়ে দেওয়ার কথা বলত! ফুটপাথে পড়ে-থাকা অসহায় অসুস্থ মানুষকে নিজের বাড়িতে এনে সেবা শুশ্রূষা  বা প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি করার ঘটনাও ওর জীবনে বেশ কয়েকটি আছে, তবে সে সব নিয়ে বড়াই ছিল খুব বেশি। আত্মপ্রশংসা বড়ো কানে লাগত। দিল্লিবাসের প্রথম পঁচিশ-তিরিশ বছর কোম্পানির দেওয়া একটা বড়ো ফ্ল্যাটে থাকত। যতবার সেখানে গেছি, দেখতাম এলাকার মুদি দোকানদার থেকে ইস্ত্রিওয়ালা, ডাবওয়ালা লস্যিওয়ালা সবাই ছোটকাকে চেনে জানে, নমস্কার করছে, সমীহ করছে। কারণ ডাবের দাম দশ টাকা হলে ছোটকা বিশ টাকা দিচ্ছে, ইস্ত্রিওয়ালাকে একশো টাকার নোট বাড়িয়ে দিয়ে ফেরত টাকা নিচ্ছে না, এমন খদ্দেরকে দেখে সকলেই একটু অতিরিক্ত খাতির করবে তাতে আর আশ্চর্য কী! যে কোনো ভাবেই হোক সকলের কাছ থেকে খাতির পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাতেই বোধহয় এসব করত! তবে ঘুষ বা কালো টাকা ছিল না ওর, সবই সৎ পরিশ্রমের উপার্জন, বড়োই বিচিত্র ছিল মানুষটা!
 কাকাতো ভাই মিলটন, আমার থেকে বছর পনেরো ছোটো, সেও এক বিচিত্র জীব! পোশাক-ফ্যাশন-চুলের ছাঁট, সে সব না হয় ছেড়ে দিলাম কিন্তু তার কথাবার্তা চিন্তাভাবনা খাওয়াদাওয়া সবই আমাদের বাড়ির সবার কাছে অদ্ভুত লাগত। যেমন, সপ্তাহে কমপক্ষে পাঁচদিন দুবেলা পাঁঠার মাংস তার মেনুতে থাকবেই। পরিমাণ? দুপুর থেকে রাত মোট দেড়-দু কেজি! সন্ধেবেলা আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে ফ্রিজ থেকে বের করে একটু গরম করে নিয়ে হয়তো চার-পাঁচ পিস খেয়ে ফেলল, একঘণ্টা পর আবার একইরকম, এ রকম হয়তো চলতে থাকল রাত এগারোটা পর্যন্ত। কোনো কোনো দিন তার সঙ্গে ওয়াইন বা হুইস্কি চলছে! সেও সেভেন ফিফটির একটা বোতল পুরো খতম! আরও আশ্চর্য, ছোটকা বা কাকি কেউ ওকে বারণ করত না! ছোটকাও হয়তো দু-পিস মাংস মুখে পুরে দু-পেগ হুইস্কি মেরে দিল আড্ডা মারতে মারতে!
  স্প্যানিশ গিটার খুব ভালো বাজাত, জ্যাজ-রকের ভক্ত, একটা মিউজিক ব্যান্ডে ছিল, গান-বাজনাই পেশা, অ্যাডফিল্ম টিভি-সিরিয়ালে সুর করতে শুরু করেছিল, হোটেল-রেস্তোরাঁয় নিয়মিত শো করত, কিন্তু পঁয়ত্রিশে পড়তে না পড়তেই প্যাংক্রিয়াস প্রায় বিকল, আরও নানা রোগ, মাংস তো দূরের কথা, সারাদিন ওট খেয়ে থাকতে হয়। অসুস্থতায় গানবাজনার দফারফা, চিকিৎসায় লক্ষ লক্ষ টাকার খরচে ছোটকা জেরবার, পরে খানিক সেরে উঠলেও নিয়মিত ওষুধে প্রতি মাসে বিপুল খরচা।
 মিলটন তার বাপের চেয়ে দু কাঠি ওপরে গিয়ে অতীত বর্তমান কোনো সময়ের বাংলা বাঙালি ভারত ভারতীয়দের কিছুই ভালো দেখত না। ছোটকার সঙ্গে তর্ক করা যেত, কিন্তু মিলটন এমন সব কথা বলত, আমি তর্কে যেতাম না, শুধু হাসতাম।
  বছর দশ আগের কথা, পুজোর ছুটিতে দিন কয়েকের জন্যে ছোটকার বাড়ি গেছি, সকাল এগারোটা, তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি মিল্টন, ওর ঘরে গেলাম ডাকতে, খালি গায়ে একটা জাঙিয়া পরে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, এসি বোধহয় কুড়ি-একুশে দেওয়া, ঘরে ঢুকে বেশ শীত শীত করছে, দেখলাম জেগেই শুয়ে আছে, কী একটা পাশ্চ্যাত্য বাজনা বাজছে, কানে বড়ো লাউড লাগছিল। দু-এক কথার পর বললাম, বাজনার ভল্যুম একটু কমিয়ে দেওয়া যায় না?
কেন? ভালো লাগছে না? বেসুরো লাগছে?
তা নয়, আমি শুধু ভল্যুম কমিয়ে দিতে—
এটা এই ভল্যুমেই শুনতে হয়, এ তোমাদের রবিশঙ্করের পিড়িং পিড়িং সেতার নয়।
আচ্ছা বেশ, অনেক বেলা হল, ওঠ, আমি চা পাঠিয়ে দিতে—
পালাচ্ছ কোথায়? শোনো বাজনাটা।
না, ভালো লাগছে না, মাথা ধরে যাচ্ছে।
  তোমাদের কান-মাথা সব বেসুরো হয়ে গেছে, তোমরা তাই ওয়েস্টার্ন মিউজিক ধরতেই পার না।
  তা নয়, খুব বেশি না হলেও, আমি মোৎসার্টের মুনলাইট সোনাটা শুনেছি, বেটোফেনের সিম্ফনি, ক্লিফ রিচার্ডের গান শুনেছি—
   ও সব তো অনেক পুরনো, রিসেন্ট এজের কিছু শুনেছ? শোনোনি, শোনো অপুদা, তোমাদের ভারতীয় গানবাজনার সবটাই বেসুরো, বড়ে গোলাম থেকে কিশোর কুমার কেউ সুরে গায় না।
 আমি হো হো হাসি দিয়ে বেরিয়ে আসি, মিলটন একনাগাড়ে ইংরেজি বুকনি ঝাড়তে থাকে।
  রিটায়ার করার পর ছোটকা কোম্পানির দেওয়া ফ্ল্যাট ছেড়ে দিল্লি-নয়ডার বর্ডারে মেট্রো স্টেশনের কাছে দোতলা বাড়ি করল, অনেক বছর আগে প্লটটা কিনে রাখা ছিল। বছর গড়ায়, মিলটনের আয় অতি সামান্য, অসুস্থতার জন্য কয়েক বছর মিউজিক লাইন থেকে সরে থাকায় কাজ পায় না, নতুন ছেলেমেয়েরা বাজার দখল করে নিয়েছে, হোটেল-রেস্তোরাঁ থেকেও আগের মতো ডাক আসে না। কাকি আর মিলটনের ওষুধের পিছনেও বিপুল খরচ, ক্রমশ ছোটকার ঠাটবাট কমে আসছে টের পেতাম।
  বহু বছর আগেই বাবা-কাকাদের জমি-বাড়ি আমরা আর মেজকাকার পরিবার ভাগ করে নিয়েছি, বাকিদের কিস্তিতে টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে টাকার সঙ্গে আরও কিছু টাকা দিয়ে ছোটকা আমাদের বাড়ির কাছেই দু কাঠার একটা প্লট কিনে রেখেছিল। সে প্লটও বেচে দিল দু বছর আগে। আমি একটু খোঁচা মেরে বললাম, বেচলে কেন? ভবিষ্যতের কথা কে বলতে পারে! যদি কোনোদিন পৈত্রিক বাড়ির কাছাকাছি এসে থাকতে ইচ্ছে করে, বড়োলোকদের তো দু-তিনটে বাড়ি থাকে!
  সেই প্রথম ছোটকাকে একটু মচকাতে দেখলাম, বিষণ্ণ স্বরে বলল, টাকার খুব দরকার হয়ে পড়েছে রে! ওষুধ চিকিৎসার যা খরচ, আমার তো পেনশন নেই, জমা টাকার সুদে আর কুলোচ্ছে না, কিছু দামি শেয়ার ছিল বেচে দিয়েছি। তা ছাড়া দিল্লি ছেড়ে এ জীবনে অন্য কোথাও আর থাকা হবে না রে।
  কাকি মারা গেল বছর দুই আগে। দিল্লি গিয়েছিলাম, দেখলাম খুবই ভেঙে পড়েছে ছোটকা, ভাবছি বাড়ি বেচে দেব, কোটি টাকা দাম পাব, ছোটো একটা বাড়ি কিনে বাকি টাকা ফিক্সড করে দেব, তাতে আমি চোখ বুজলে মিলটন অন্তত না খেয়ে মরবে না।
 দুজনেই চুপ আমরা, নভেম্বরের বিকেল ফুরিয়ে আসছে, বাতাসে হালকা-হিম, ব্যালকনিতে বসে আছি, রাস্তার ওপারে পার্ক, বাচ্চারা হুটোপাটি করছে। হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠল ছোটকা, নেতাগুলো ব্রিটিশের সঙ্গে মিলে শেষ করে দিল আমাদের।
  মানে?
  দেশভাগ! দেশভাগ! সব এলোমেলো হয়ে গেল! রাজশাহিতে বাবার কী পসার ছিল, একডাকে চিনত সবাই, শিব ডাক্তারের নাম শুনলে সবাই ভক্তিভরে মাথায় হাত ঠেকাত, সব ছেড়েছুড়ে আসতে হল—অভাব আর অভাব! সে সব তোরা ভাবতে পারবি না! বাবার মন ভেঙে গেল—মামাদের দয়ায় আমি পড়াশোনাটা তবুও যা হোক—
  আমি চুপ, একটু পরে মৃদু স্বরে বলি, সব দোষ নেতাদের আর ব্রিটিশের?
  তা নয় তো কী? ক্ষমতার লোভে ব্রিটিশের বদমায়েশি মেনে নিল!
  আচ্ছা ছোটকা, আমরা বাঙালিরা হিন্দু-মুসলমানে যদি মিলেমিশে থাকতে পারতাম, কে আমাদের দেশ ভাগ করতে পারত? আমাদের কোনো দায় নেই? রবীন্দ্রনাথ তো সেই স্বদেশি যুগ থেকেই বলছিলেন—সে সময়ের ইতিহাস যদি—
  চুপ কর! তোর ইতিহাসের আমি ইয়ে করি!
  অসম্ভব উত্তেজিত দেখে আমি আর কথা বাড়াইনি সেদিন। আর শেষবার, মাস তিন আগে এল আমাদের বাড়ি, বহু বছর পর মিলটনও এল তার সপ্তাহ দুই পর। ছোটকা আগেই ফোনে জানিয়েছিল আমাদের বাড়ির কাছাকাছি ফ্ল্যাট কিনতে চায়। আমি এক প্রমোটারকে বলে রেখেছিলাম, সে আমার ছাত্রও ছিল। ফ্ল্যাট দেখল ছোটকা, আমাদের বাড়ি থেকে দেড়-দু কিলোমিটার দূরে। ফ্ল্যাটের দরজা-জানলা, কিচেন- লিভিং রুম নিয়ে নানা কথা ছোটকার, খুঁত ধরল, আর্কিটেকচার, প্ল্যান ও মডার্ন লিভিং নিয়ে নানা জ্ঞান বিতরণ করল।
  প্রমোটার ছেলেটি যথেষ্ট ধৈর্যশীল, সব শুনে বিনয়ের সঙ্গে জানাল, দাদু আপনি যে ভাবে চাইছেন যতটা পারি ঠিক করে দেব, তবে এক্সট্রা কিছু টাকা দিতে হবে।
  ছোটকা খুশি, আমায় বলল, নয়ডার বাড়ি বেচা ফাইনাল হয়ে গেছে, আমি ফিরে গিয়ে রেজিস্ট্রি হলেই তোর অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেব আর প্রমোটারকে বলল, কাজ শুরু করে দাও, এক্সট্রা যা লাগবে পেয়ে যাবে।
  আমি আপত্তি জানাই, আগে অ্যাডভান্স দেওয়া হোক, তারপর—
প্রমোটার জিভ কাটে, না, না, স্যার, আপনার কাকা, আজ না হয় কাল টাকা তো পাবই। আমি কাজ শুরু করে দিচ্ছি।
  সে চলে যেতেই আমি বললাম, তুমি তাহলে পাকাপাকি এখানেই থাকবে?
  হ্যাঁ।
  কেন জানি না একটু খোঁচা দিতে ইচ্ছে হল, বললাম, যাক, তা হলে শেষ জীবনে এসে বুঝলে বাংলা, বাঙালি, এখানকার আত্মীয়-স্বজন খুব খারাপ না! এ সব ছেড়ে দূরে একা একা বাঁচা খুব কষ্টকর, তাই তো?
  মিনমিন স্বরে বলল, দূরে গেছি কি সাধ করে? চাকরির বালাই বড়ো বালাই!
  কিন্তু ছোটকা, মিলটন রাজি হয়েছে? ওকে সব খুলে বলেছ তো?
  এখনও সব খুলে বলা হয়নি, তবে ও তো বোকা নয়, আমি চোখ বুজলে, ওর পাশে কে থাকবে বল? এখানে বিপদ আপদে তোদের পাবে, বুঝবে নিশ্চয়।
  দিন কয়েক পর মিলটন আসতেই এক সকালে আমার বসার ঘরে একসঙ্গে তিনজন, আমিই কথা তুললাম, মিলটন, ছোটকা তো বাড়ি বিক্রি ফাইনাল করে ফেলেছে।
  কী?
  হেডফোনটা খোল, চেঁচিয়ে বলতে পারব না।
  হেড ফোন খুলে সোফায় গা এলিয়ে পা লম্বা করে মেলে দেয়, কী হয়েছে?
  ছোটকা নয়ডার বাড়ি বিক্রি করে চল্লিশ লাখে ফ্ল্যাট কিনছে এখানে।
  হোয়াট! বুড়ো বয়েসে সেনিলিটি—কী বলে–ভীমরতি!
  কেন? ভীমরতি কেন? বাকি টাকা ফিক্সডে রাখবে, সুদের টাকায় বাকি জীবন চলে যাবে তোদের।
  এখানে ড্যাডের সঙ্গে থাকব? এখানে! এই ভাগাড়ে!
  চোয়াল শক্ত হয় আমার, তবু ধৈর্য ধরে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই ছোটকা মিউমিউ করে বলে, তা—থাকবি কোথায়? বাড়ি বিক্রি না-করে খাবি কী?
  বাড়ি তো বিক্রি হবেই, এক কোটি নয়, আরও বেশি, চৌধুরীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে—
  ছোটকা একটু জ্বলে ওঠে, গলা তুলে বলে, চৌধুরী! ওই দালালটা! ও তো চিটিংবাজ একটা!
  সে চিটিংবাজ মাগিবাজ যাই হোক—তোমার মাল্লু পেলেই তো হল।
আমি বলি, আচ্ছা, সে না হয় বিক্রি হল, মাল্লু পেলি, তারপর থাকার একটা জায়গা দেখতে হবে তো, এই ভাগাড়ে না হয় না এলি, কিন্তু—
  সে সব ভেবে রেখেছি—গোয়ায় ফ্ল্যাট কিনব, সীবিচে বারমুডা পরে বসব, বিয়ার খাব আর গিটার বাজাব, গোয়ার ওয়াইনও খুব ভালো।
  তবে তো তিন মাসের বেশি বাঁচবি না, এখনও কত ওষুধ গিলতে হয় সে খেয়াল—
  আরে না, রোজ নয়, মাঝে মাঝে—গোয়া গোয়া বিউটি কুইন গোয়া! গোয়ার লাইফ স্টাইল এখানে এই ভাগাড়ে—সরি অপুদা, কিছু মনে নিও না—এখানে এ সব চলবে কী?
  ছোটকা ফের বলে, তা হলে আমাকেও তো গোয়ায় থাকতে হবে, এই বয়েসে অচেনা অজানা নতুন জায়গায়—
  হোয়াট! কে নেবে গোয়ায় তোমাকে? ইউ ওল্ড হ্যাগার্ড! বুড়ো ভাম! তুমি যেখানে খুশি থাকো!
  এইবার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল আমার, জুতিয়ে তোমার মুখ সিধে করে দেব! অনেকক্ষণ সহ্য করেছি, বাপ-দাদার সঙ্গে কী ভাবে কথা বলতে হয় শেখোনি? জ্যাঠা-কাকার শহরকে তোমার ভাগাড় মনে হয়! বাপের সম্পত্তি বিক্রি করে তুমি ফুর্তি করবে আর বাপকে বলবে বুড়ো ভাম!
  ক্রমশ গলা চড়ছিল আমার, বউ ছেলে সবাই ছুটে এল, আমায় এই মূর্তিতে সচরাচর দেখেনি ওরা। গলা নামিয়ে মিলটন বলে, আমরা বাপ-ব্যাট্যা এ ভাবেই কথা বলি, তুমি এর মধ্যে নাক গলাচ্ছ কেন?
  তোমায় ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে পেটালে বুঝতে পারবে কেন নাক গলাচ্ছি! জানোয়ার!
  বউ আমায় ভেতরের ঘরে টেনে নিয়ে আসে। রাগ নিভল না, ধিকিধিকি জ্বলতেই থাকল। বিকেলে ছোটকা বলল, অতটা উত্তেজিত না হলেই পারতিস।
  আগুনে পেট্রল পড়ে ফের, টানটান হয়ে উঠে বসি আমি, মানে? ওর প্যাঁদানির দরকার ছিল কম বয়েসে, ওটা পড়েনি বলেই এত বাড়! তোমাদের অবাধ প্রশ্রয়েই ওর শরীর শেষ হয়েছে আর একটা অসভ্য তৈরি হয়েছে!
  দ্যাখ অপু, আমাদের দিল্লির হাই-সোসাইটিতে—
  নিকুচি করেছে তোমার ছাই-সোসাইটি!
  ছোটকা চুপ কিছুক্ষণ, ফের বলে, অপু, আমি ঠিক করলাম ছেলে যখন চাইছে না, আমি এখানে ফ্ল্যাট কিনব না।
  বটে! এ দিকে প্রমোটার তো তোমার কথায় ফ্ল্যাট অদল-বদলের কাজ শুরু করে দিয়েছে, তার কী হবে?
  সে যা খরচ পড়েছে তা নয় আমি—
  খরচ! সেটাই কি একমাত্র ব্যাপার? পুরো ব্যাপারটা কী রকম হুইমজিক্যাল হল! ও আমার ছাত্র ছিল, কত সম্মান করে আমায়, তুমি আমার কাকা বলে এক পয়সাও অ্যাডভান্স না নিয়ে বুকিং ছাড়াই কাজ শুরু করে দিল—
  সে দিন মুখের আগল ছিল না আমার, যা-তা বললাম, সারা জীবন যা মনে ছিল কিন্তু বলতে দ্বিধা করেছি সব উগরে দিলাম, ছোটকা চুপ, প্রতিবাদ করেনি। তিন মাস পর গত পরশু ফোন, মিলটন রোজ অশান্তি করছে, গায়ে হাত তুলছে, নগদ টাকা পয়সা কেড়ে নিয়েছে, বাড়ি ওর নামে লিখে দিতে হবে, ছোটকা আসতে চাইছে আমাদের কাছে, কিন্তু শরীরের যা অবস্থা একা আসার ক্ষমতা নেই, আমি যদি গিয়ে নিয়ে আসি।
  কাঁদতেই কাঁদতেই ছোটকা বলে চলেছিল, মিলটন বুঝতে পারছে না, আমি চলে গেলে ওর কী হবে, মদ-মাংসের ফোয়ারা ছোটাবে, সব টাকা উড়িয়ে ফেলবে, নিয়মিত ওষুধ কে খাওয়াবে ওকে? বেঘোরে মরবে ছেলেটা! আমার ছেলে খারাপ নয়রে, একটু অবুঝ, ওর সঙ্গীসাথীরা খুব খারাপ, ওরাই বদবুদ্ধি দিচ্ছে।
 ছোটকার কান্না ও কথায় আমি যুগপৎ বিরক্ত-আশ্চর্য হতে থাকি। মিলটন তো পঁয়তাল্লিশ ছুঁতে চলেছে, ছোটকার কাছে অবুঝ খোকা এখনও! আমিও তো ছেলের বাবা, বাবারা কি চিরকাল কোনো না কোনোভাবে ধৃতরাষ্ট্রই হয়?
  মন বিষণ্ণ হয়ে গিয়েছিল, অনুশোচনাও হচ্ছিল, তিন মাস আগে অত কুকথা—সত্যি হলেও—বলা কি ঠিক হয়েছিল? আফটার অল কাকা, দুঃসময়ে পাশে ছিল, আর কবছরই বা বাঁচবে, না-হয় ভুল করেছে, অন্যায় করেছে, কিন্তু আমিই বা তাঁকে কড়া কড়া কথা শুনিয়ে কী ভালো কাজ করলাম! আর-একটু সংযত কি হওয়া উচিত ছিল না আমার?
ফোনে কথা হওয়ার একদিন পরেই টিকিট কাটতে দিলাম। বেশ কয়েক মাস ছোটকাকে আমাদের কাছে রেখে সেবা যত্ন করব ভেবেছিলাম। খবর এল সব শেষ। সকাল দশটা নাগাদ মিলটন বেরিয়েছিল, বিকেল তিনটে নাগাদ বাড়ি ফিরে এসে দেখল বাথরুমের ভেতর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। মৃত্যুর খবর মিলটন আমায় দেয়নি, অন্য এক আত্মীয় মারফত জানলাম। মনে প্রশ্নও থাকল, স্বাভাবিক মৃত্যু নাকি অন্য কিছু? এতদূর থেকে এ নিয়ে তদন্তের ব্যবস্থা করার অবস্থায় নেই আমি।
  কেমন একটা জীবন কাটিয়ে গেল ছোটকা! এত অর্থ, মেধা, অহংকার, সব কোথায় ভেসে গেল! বিশেষ করে শেষ জীবনটায় কেবল হাহাকার অসম্মান শূন্যতা! এ কেমন যাপন?
  টি এস এলিয়টের একটি কবিতার দুটো পঙক্তি মনে পড়ল, কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে পড়ার অনেক আগেই ছোটকার কণ্ঠে যে-কবিতা বহুবার শুনেছি—
  Where is the life we have lost in living?
  Where is the wisdom we have lost in knowledge?