বৈশাখী নার্গিস -এর গল্প

Spread This

বৈশাখী নার্গিস

ড্রিম হান্টার
স্বপ্নটা আমি দেখছি, না স্বপ্নটাই আমাকে দেখছিল। বুঝতে পারছিলাম না। আর শুধুমাত্র একদিন দু’দিন নয়। রোজ রোজ দেখছে। আর আমি বোকার মত শুধু স্থির হয়ে আছি। শরীর, মন আমার সঙ্গে আছে কিন্তু মাথা কিছুতেই আমার আয়ত্তে নেই। কী ভাবছি, কেন ভাবছি। কী করছি, কেনই বা করছি। কিছুই বুঝতে পারছি না। অনেকক্ষণ ধরে হয়ত রাস্তা মাপছি। কিন্তু বুঝতে পারছি না কোনদিকে যাব বা যাওয়া যায়। সব রাস্তাই সমান। হুসহাস গাড়ি চলছে। সঙ্গে হর্ন। যা শুনলে পিলে চমকে যায়। কয়েকদিনের কাঁচা পাকা দাড়ি নিয়ে ভাবছি সিসিডিতে গিয়ে এক কাপ ক্যাপুচিনো অর্ডার দিয়ে ফেলি। সম্ভবত সেটাও একটা বহুদিন আগের দেখা স্বপ্ন। মোদ্দা কথা আমি আমার স্বপ্নের ভেতর হাঁটছি, খাচ্ছি দাচ্ছি ঘুমোচ্ছি। এরকমও লাইফ হতে পারে।
আজকাল আর পার্স নিয়ে ঘুরি না। পকেটে একটা সোনার কয়েন আছে। তাতেই চলে যায়। কিছু কিনতে গেলেই ভুলে যাই, কী কেনার ছিল। রেজার কিনতে গিয়ে বিস্কিট কিনে ফেলি। আয়নায় যখন নিজেকে সুন্দর দেখি। বেশ অদ্ভুত লাগে। নিজেকে সুন্দর দেখাটাও বুঝি রোগ। কী সুন্দর চোখ, ঠোঁট, চওড়া চিবুক। থুতনিতে একটা তিল। আর শেভ করা গাল। নিজেই নিজের প্রেমে পড়ে যাই মাঝে মাঝে। অথচ আজ পর্যন্ত একটা প্রেমিকাও টিকল না। রঙিন স্বপ্ন সবাই দেখল, দেখাল এক এক করে। আমার তবু টনক নড়ল না। যে কে সেই। একদিন ঘরে থাকি তো দশদিনই বাইরে। গুলিয়ে ফেলি সবকিছুই। কেমন একটা স্বপ্ন স্বপ্ন ভাব। দুধওয়ালা, পেপারওয়ালা জানলার ওপার থেকে হাঁক দিলেই ঘুম ভেঙে যায়। জানলার কাচ ভেঙ্গে যে দু-একটুকরো আলো এসে পড়ে মেঝেতে। তার সঙ্গে একচোট ঝগড়া করে ফেলি সাত সকালেই। একটা আধ খাওয়া বিস্কিটের মতো বিছানা ছেড়ে উঠি ঘুমের বারোটা বাজিয়ে। তারপর আর কী- ওই জল তোলা, চা বানানো, নিউজপেপারের কড়কড়ে ভাঁজ খুলে গরম চায়ে চুমুক। নিপাট একটা দিনের শুরু। যেখানে কোনও সমস্যা নেই। শুধু উলটো-পালটা স্বপ্ন ছাড়া।
সেদিন হঠাৎ বলা নেই কওয়া নেই গুজরাট চলে গিয়েছি। পকেটে খুচরোর টানাটানি। হিসেব করে চললে ওই দশ- বারোদিন। তার মধ্যেই যদি এই দুম করে এক অন্য জায়গায় চলে যায় কেউ। কেমন দেখায় একটা। তার চেয়ে বড়ো কথা ঘোরার জন্যে ল্যাভিশ ড্রেস চাই তো, আর পকেটে খোকা। মোট কথা তবুও দেখতে শুনতে ভালো হোটেলেই ঘর পেয়েছি। সকাল সকাল ঘুরতে বেরিয়ে মরুভূমির আশপাশ বেশ ভালোই লাগল। তারমধ্যেই খবর পেলাম হোটেলে হামলা হয়েছে। বেশ ভয়ের ব্যপার। কিন্তু কোথায় কী। ভয়ডরের বালাই নেই একটুও। দিব্যি হাজির ওই গুলি ছোঁড়াছুঁড়ির মধ্যেই। একজনের কাছ থেকে বন্দুক কেড়ে নিয়ে শুরু করেছি গুলি চালানো। অনেকক্ষণ যুদ্ধ চলার পর। শুনতে পেলাম কে যেন দরজা ধাক্কা দিচ্ছে, ওমা! দেখি কী কাণ্ড। দুধওয়ালা তিন চার বারের বেশি আমাকে এসে ডেকে গেছে। হাঁক শুনতে না পেরে সে দরজায় দুমদাম কিল দিতে শুরু করেছে। আর তাতেই আমার স্বপ্নের ভেতর ঝড় শুরু হয়েছে। বিছানাতেই পড়ে আছি। কোথায় ভাবলাম একটু রেস্ট নিয়ে বিকেলে রাজস্থানের বিখ্যাত নাচ দেখতে যাব। তা না বেজার মুখ করে দরজা খুলতে চলে গেলাম।
দিনের বেলা চরকিপাক খেতে খেতে এ রাস্তা, ও রাস্তা ঘুরে যখন হাঁপিয়ে উঠি চৌরাস্তার মোড়টায় এক গরম জিলিপির দোকানে পা ছড়িয়ে বসতে কী যে আরাম লাগে। এ এক রোজকার রুটিন। তারপর শ-পাঁচেক জিলিপি কিনে রাস্তার ছেলে মেয়েদের ভাগ করে দেওয়া। সেও বেশ আনন্দের। স্বপ্নের দিনগুলো বেশ কেটে যাচ্ছে তার মতো। গভীরভাবে দেখতে গেলে এই স্বপ্নগুলোই বাঁচিয়ে রেখেছে নিশ্বাসের মতো। যদি আদিম কোনও মানুষ হতাম। এই মুহূর্তে কী করতাম। বড়জোর গাছের পাতা জড়িয়ে হাতে কুঠার নিয়ে শিকারে বেরোতাম। শুধুমাত্র খাওয়ার জোগাড় করা ছাড়া আর কীই বা কাজ থাকত তখন। এখনও তাই করছি খাওয়ার জন্যে লড়াই।
তবে হ্যাঁ এই যে বিকেলবেলার ঠেক- তার সঙ্গে চা আড্ডা। এ সব থাকত না। কেমন মুষড়ে থাকি বন্ধুদের সঙ্গে থাকলে। ওরা বলে আমার মধ্যে সেন্স নেই কোনও। আমি হাসতে জানি না। তাই বলে যে চুপচাপ থাকি তার ফায়দা তারা কখনও তোলে না তা নয়। কে কী বলল তাতে কিছু যায় আসেনা আমার। আমি দিন আনি, দিন খাই- স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নের ভেতর ডুবে থাকি। কারো কিছু বলার নেই।
সেদিন হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে গেছি। রেললাইন বাস-ট্রাম ডিপো ধরে গঙ্গার ধারে। তারও দূর। ফোনের সিগনালও পৌঁছয় না সেখানে। দেখছি একটা মস্ত কারখানা। জং ধরা লোহার পাত। পুরোনো হয়ে যাওয়া গেট। তার চেয়েও পুরোনো দেওয়াল। দেওয়ালগুলো যেন কথা বলে উঠবে। সেই অলস দুপুরের ঝগড়া, অন্যের ঘরের কুটকাচালি। হঠাৎ হুড়োহুড়ি পড়ে গেলো। তার মধ্যে গরম। লঞ্চের আওয়াজ, লোকজনের চেঁচামেচি। বেশিরভাগই ধুতি-ফতুয়া পরা। হাতে চটের ব্যাগ। খাবার থলে বোধহয়। কেমন ভাবলেশহীন হাঁটছে। যেন বহুযুগ ধরে হেঁটেই চলছে। আমার সামনেই একটা বটগাছ তার ঝুরি মেলে আছে। ফেরার কোনও তাড়া নেই বলে গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বসে পড়লাম। কোথাও একটা যাওয়ার ছিল, কিন্তু কেন যে যেতে ইচ্ছে করছে না। জানি না। বসে বসে ভেবেই চলেছি। এমন সময় একটা লোক এসে জিজ্ঞেস করল। ভায়া, এখানে বসে কেন? কারখানার সময় যে পেরিয়ে যাচ্ছে। ও, হ্যাঁ তাই তো। ঘড়ি দেখতে যাব। এমন সময় দেখি হাত আটকে আছে কোথাও। ঘেমে নেয়ে একসা হয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। লোডশেডিং। ঘড়িতে আটটা বাজে।
রোজগারের কথা ছেড়ে দিলাম। কাজ করি অ্যাকাউন্টে। মাসিক বেতন ছ’হাজার টাকা। আপাতত সেটাও বন্ধ। কলকাতায় এই টাকায় ভদ্রভাবে থাকা যায় না। একদিক জোটে তো আর একদিক খালি হয়ে যায়। তাই মাসে তিন হাজার ভাড়ায় এই ঘরে এসে থাকা। একদিকে পচা খালের বয়ে যাওয়া। সূর্যের আলো এসে পড়লেও হাওয়ায় বিষাক্ত গন্ধে টেকা দায়। তবু আছি। শতচ্ছিন্ন হয়ে আছি। বেঁচে থাকার জন্যে আছি। সকাল দশটায় বেরিয়ে সাতটায় ঢোকা। তারপর ঘুম আর স্বপ্ন তো আছে।
এই যেমন বাসে চেপে এখন যাচ্ছি, কোথাও একটা। অফিস ফাঁকি দিয়ে। বেশ লাগছে। আচ্ছা, বাসের জানলার ধারের সিটটা সবার এত প্রিয় কেন? অবশ্যই আমারও। তার জন্যে আজ ঝগড়া পর্যন্ত করেছি। সে যাক গে। নিজের ভেতর ডুবে যেতে অনেক বেশি ভালো লাগে আজকাল। আমার মতো একলা থাকা মানুষের জন্য এ তো বিলাসিতাই বলতে হয়। যে সবসময় পকেটে সোনার কয়েন নিয়ে ঘোরে। আর দীর্ঘবিরতি খোঁজে। অনেকদিন ধরেই ভাবছি নীলকে একটা চিঠি লিখব। তা আর হয়ে উঠছিল না। নাওয়া নেই-খাওয়া নেই। সেদিন দুপুরে সাদা পাতা নিয়ে বসেও গেলাম লিখতে।
প্রিয় নীল,
হয়তো সামনে অনেক পথ বাকি আছে। তবুও তুমি এখন সন্ন্যাসীর জীবন বহন করছ। দু-মুঠো চাল-একটা আলু সেদ্ধ তোমার অন্ন সংস্থানের জোগাড়ে উঠে পড়ে লেগেছে। কষ্টে আছ। কিন্তু ভেবে নাও, এসব তোমার নিজস্বী। কানের কাছে শতেক আওয়াজ। কুমন্ত্রণা দিয়ে যাচ্ছে নানাবিধ লোভ। ঝাঁ চকচকে গাড়ি, প্রাসাদোপম বাড়ি, দামি মোবাইল ইশারায় ডাকছে। অথচ, তুমি একটা চৌখুপি ঘরে জপ করছ- ভালো থাকার মন্ত্র। আসলেই কি ভালো থাকার মন্ত্র আছে কোনও। অস্থির হয়ে উঠছ কখনও। তবুও অসীম ধৈর্য্য আবার তোমায় শান্ত করে তুলছে। আসলে, তুমি জানো, যত বন্ধু সংখ্যা কমবে- নিজের সঙ্গে কথা বলার চাহিদা বেড়ে যাবে। তুমি দিন-রাত দেওয়ালের কান্নার আওয়াজে চমকে উঠবে। কখনও বা বুঝতে চাইবে জানলার ওপারের পৃথিবীর রোমহর্ষক জীবনযাপন। ভালো থাকার মতো একটা অগোছালো সময়কে দূর থেকে মেপে নিয়ে তুমি বিবাগি হও। এখনও তোমার চোখে চাতালের আড্ডা। আমি শেকড় সমেত স্মৃতিগুলো নির্মূল করে দিতে চাইলেও, পারিনি। ব্যর্থ চেষ্টার মধ্যে দিয়েই ট্রেনলাইনে ডাউন ট্রেনের পাস হয়ে যাওয়া। তোমার কাঁধে তখন ব্যাগ, ঘেমে নেয়ে একসা। পেটের ভেতর বোতলটা চালান করে একঘুম দিয়ে ওঠা পাগলটাও কেবল হারিয়ে যায়। স্টেশন খোঁজে এক বিদঘুটে নামের। বংশপরম্পরায় তো কেউ পাগল হয়ে আসেনি। বাধ্য ছাত্রের মতো ট্রেনে চেপে যাও, মুখোমুখি বিষণ্ণতাকে নিয়ে। আমার এবার ছুটি নেবার পালা। একটার পর একটা অফিস ডিউটি কামাই করি, উৎসবে মুখ ডুবিয়ে রাখি ভিন্ন মরশুমে। তারপর গালে হাত দিয়ে জানলা মাপি। আমার মুখে ফুটে ওঠা চিন্তার কোলাজ মুছে নিই সাদা রুমালে। তোমার ট্রেন ততক্ষণে কু-ঝিক-ঝিক।
যাই হোক, অনেকক্ষণ জ্ঞান দেওয়া হল তোমাকে। বয়সে অনেকখানি ছোটো হলেও বিশেষ কারণেই বন্ধু হয়ে উঠেছিলে। চলে যাওয়ার পর অনেকদিন মুখ দেখাদেখি বন্ধ। সে যাক গে। এবার যদি দেখা হয়। অনেক কথা বলব।
ইতি তোমার বিশেষ বন্ধু
কোথাও যেন একটা পড়েছিলাম…
“দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে,
দেওয়ালও ঘুরে দাঁড়ায়”।
কিন্তু মনে পড়ছে না কেন জানি না। আজকাল এমন হয়েছে। অনেক কিছুই ভুলে যাই। সেদিন কে যেন বেশ বলল- মাথা থেকে বাড়তি কিছু জিনিস ছাঁটাই করো, নাহলে মনে রাখার সমস্যা দেখা দেবে। আমিও তাই বিশেষ কিছু আর মনে রাখার চেষ্টা করি না।  একটু আগেকার জিনিস কয়েক মুহূর্তেই ভুলে যাই। আসলেই যে তা ভুলে যাই তাও নয়। মনে পড়ে না। অনেক চেষ্টার পর নাম মনে পড়লে, নিজেই লজ্জিত হয়ে পড়ি।
সবসময় মনে হয়েছে, এক বিশাল শূন্যতার ভেতর একটা লম্বা রেখা ধরে হাঁটছি। আমার ছায়া ক্রমশ আমাকে পেরিয়ে যেতে যেতে অনেক দূর। ধু ধু প্রান্তরে একটা মাত্র ক্যাকটাসের গাছ। আর বহুদূরে এক দিগন্ত বিস্তৃত আয়না। যার মধ্যে নিজের ঝকঝকে শরীর। নিজেকে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়ছি। তবুও চোখ মেলে দেখছি। এক অনুচ্চারিত শব্দের খোঁজে সামনে তাকালেও, সেই শব্দের উৎস খুঁজে পাচ্ছি না। আমি কেবল দৌড়চ্ছি। দৌড়তে দৌড়তে একসময় হাভাতের মতো হাত তুলে অনির্দিষ্টের দিকে চেয়ে বলছি- জল- একটু জল।
‘আমার বিস্ময় পৃথিবীকে ঋতুমতি করেছে
মন্ত্রমুগ্ধ জামা খুলে নিয়েছে ঐশ্বরিক মিথ’।
এক ভোরবেলা স্বপ্ন দেখে আতঙ্কে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। গলা শুকিয়ে কাঠ, হাতে-পায়ে জোর নেই। মাথা ঝিমঝিম করছে। সেদিনের সেই স্বপ্নটা ভুলতে পারিনি কখনও। ট্রেন একটা টানেলের ভেতর যেতে যেতে অন্ধকার ভেদ করে পৌঁছে গেছে গোলাপি শহরের স্টেশনে। লোকগুলোর মুখে এক অদ্ভুত ছায়া। আমি নেমে পড়লাম কাউকে কিছু না জানিয়ে। তারপর হাঁটতে হাঁটতে শহরের এক প্রান্তে এক জনসভায় দেখতে পেলাম সাদা পাঞ্জাবি বক্তৃতা দিচ্ছে। যারা শুনছে, তাদের প্রত্যেকের হাতে অ্যান্ড্রয়েড। সেদিকেই তাদের মনোযোগ। কেউ আর কথা শুনছে না কিছু। চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। এই বুঝি তেড়ে উঠবে। হঠাৎ সেখানে ধুলোর ঝড় উঠল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বুম্‌। আমার এক হাত দূরে একটা মানুষ কাতরাতে কাতরাতে পড়ে গেলো। তারপর আরও একজন। আমি উলটো দিকে ঘুরে পালাতে যাব, দেখি কেউ আমার পা টেনে ধরেছে। আমার পালিয়ে যাওয়ার মতো শক্তি নেই। মনে হচ্ছিল, ধুলোর ঝড়টা এবার আমায় গ্রাস করবে। একসময় দেখলাম, একটা জমাট অন্ধকার আমার বুকের ওপর নেমে আসছে। ছোঁ মেরে তুলে নেবার আগে পর্যন্ত আমি হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলাম।
তখনই ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আমার। আসলে কী, সেদিনই প্রথম ভয় পেলাম। ভয়ের কথা একমাত্র নীলকেই জানালাম। তাও আবার চিঠিতে। সে চিঠি কবে তার কাছে পৌঁছবে আমারও জানা নেই। তবু তার হুকুমে প্রতি সপ্তাহে একটা করে চিঠি আমাকে পাঠাতেই হবে। উত্তর আসুক বা না আসুক।
বেশ কয়েক মাস হতে চলল নীলের কোনও খোঁজ নেই। কেমন যেন খটকা লাগছে, সব বিষয়েই। রোজই তো রৌনকদের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কই, তারা তো কিছুই বলছে না। অবশ্য বলবারই বা কী আছে। আমাকে নিয়ে মজা করা ছাড়া, কী আর করতে পারে। আমিও তাই বেশিক্ষন তাদের সঙ্গ পছন্দ করি না। বের হয়ে আসি চাতালের আড্ডা থেকে। কেমন একটা কান্না গুমরে মরে। ওরা আমার চুল কাটার স্টাইল, আমার হাঁটাচলা নিয়ে খোঁচা দেয়। আমি নীরবে সহ্য করি। নীল থাকলে দু-এক কথা তাদের শুনিয়ে দিত। সেও নেই তাই পার পেয়ে যাচ্ছে।
নীল… নীল… খুব মিস করছি তোমাকে।
চাতালের পাশ দিয়েই একটা রাস্তা ট্রেন লাইন ধরে বেরিয়ে গেছে। সেদিকে পা চালিয়ে একটু নির্জনতা খুঁজি। বাতাসে বৃষ্টির গুঁড়ি। অগোছালো ভাবে হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা দূর এক বস্তির ভেতর এসে পড়ি। লোকগুলো কেমন উগ্র মেজাজের। বেশ কয়েকটা জায়গায় উঠতি ছেলে-পিলেরা সাট্টা-জুয়ার আসর বসিয়েছে। এদের আর কাজ কী, ওই চুরি চামারি পকেটমার। মারপিট লেগেই আছে সারাক্ষণ এদের মধ্যে। এক অস্বস্তিকর পরিবেশ। আমি তাদের পাত্তা না দিয়ে আর একটু নির্জনতার আশায় রেল ব্রীজের ওপর হাঁটতে শুরু করি। তারপর বেশ খানিকটা এগিয়ে একটা সিমেন্ট বাঁধাই করা বসার জায়গা দেখতে পেয়ে বসে পড়ি। আকাশে মেঘগুলো বেশ রঙিন হয়ে আছে- শহরের আলোয়। এই বুঝি খাওয়া সেরে চরতে বেরিয়েছে। বৃষ্টি নামবে বোধহয়। মাঝে মাঝে মেঘের ডাক আর ট্রেনের হুইসল আমাকে পার্থিব জগতে ফিরিয়ে আনছিল। ভাবলাম এখানেই রাতটা কাটিয়ে দেবো।
ট্রেনলাইনের ধার ঘেঁষে আরও খানিকটা চলে গেলে হয়। কিম্বা আরও দূরে। একটা ট্রেন কেমন ঘুম ঘুম চোখে আসছে। যেন কত যুগ ধরে কত অসম্পূর্ণ মানুষকে নিয়ে চলছে। হ্যাঁ অসম্পূর্ণই তো। আমরা প্রত্যেকটা মানুষই অর্ধেক।
অনেক অনেকদিন কোনও চিঠি আসেনি। অভিমানে লিখিনি আর। চা খেয়ে তাই লিখতে বসলাম। বৃষ্টিটা আবার ধরে এলো। কলকাতায় এত বৃষ্টি বোধহয় আগে হয়নি কখনও।
প্রিয় নীল,
তুমি জানো, তোমার আসলে কোনও বাস্তবতা নেই। যেহেতু তুমি বিশ্বাস করো একটি মানুষের সারা জীবনের নির্মাণ ও ধ্বংসের ফল তার বাস্তবতা। যা নিজের থাকেনা। পায় তার সন্তান-সন্ততিরা। সেই সন্তানের বাস্তবতা পায় সন্তান জন্মগুলি। আর এভাবেই বাস্তবতার অর্থাৎ একটি মানুষের মৃত্যু নির্মাণের ইতিহাস লেখা হয়, কিন্তু জীবনের ইতিহাস লেখা হয়না। তুমি সেরকমভাবেই বাস্তবহীন হয়ে বেঁচে আছ। আমি তোমায় কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাইনা। তুমি শুধু একটা জীবন হয়ে ওঠো।
আজকাল বড়ো বেশি চুপচাপ থাকি। কারও সঙ্গে ভাব জমে না। আমার সব কথা তো তোমার সঙ্গেই। এতদিনকার বন্ধুত্ব- কী নাম দেবো এই সম্পর্কের বুঝতেই পারি না। এভাবে ছেড়ে যাওয়াকে নিশ্চয়ই স্বার্থপরতা বলে। তবু বলব, তোমার এই সহজ হয়ে যাওয়াটা নদীর প্রবাহের মতো, ভেসে যাওয়া মেঘের মতই হালকা। উদ্দেশ্য আছে কিন্তু তবুও উদ্দেশ্যহীন। তোমার মতো গুছিয়ে কিছু বলতে পারিনা। শুধু বলব- তুমি যাকে ছুঁয়ে আছ, সেই জীবনকে ছুঁয়ে দেখ, ঘুরে ঘুরে দেখ তার শোভা। আর তো কিছু চাই না।
         ইতি
          তোমার বিশেষ বন্ধু
চিঠি লেখার পর অনেকক্ষণ বসে থাকলাম পড়ার টেবিল-এ। সত্যি কি কিছু চাইনা আর! নীলের কাছ থেকে কীই বা চাওয়ার আছে, ভালোবাসা ছাড়া। ঘরের পশ্চিম দিকের আয়নাটাই তার রোজকার সঙ্গী। রাত যত বাড়ে রূপসার জৌলুস বেড়ে যায়। আরশিনগরে রূপম তখন কথার পর কথা মালা গাঁথতে থাকে। একটা নদী, একটা সমুদ্র আর গঙ্গার ঘাট। এই তার সম্পত্তি।
ভোরের দিকে স্বপ্ন দেখলাম আমি আর নীল একটা সর্ষে ক্ষেতের ভেতর আলপথ ধরে হাঁটছি। আমার আর নীলের ভেতর কথা হচ্ছে অগোছালোভাবে। কিছু কাঁচপোকা ঘাসের উপর পড়ে। সূর্যের প্রথম আলোয় তাঁদের শরীরে বিন্দু বিন্দু আশা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ক্রমাগত। যেন বহুযুগ ধরে এভাবেই আমরা হেঁটে চলেছি। নীল কথা বলছিল অদ্ভুত স্বরে। যেন একটা জলতরঙ্গ বাজছে কোথাও। এক অন্য স্তর থেকে ভেসে আসছে তার কথাগুলো। আর সে একের পর এক দস্তানা খোলার মতো স্বপ্নের কথা বলে চলেছে। যে স্বপ্নগুলো স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ। যার কোনও ফাঁক-ফোঁকর নেই। আলস্য নেই। আছে শুধু প্রখর বাস্তবতা।
-এই তুমি আবার কবে কবিতা লিখবে?
– যেদিন একটা শহর তোমার ভেতর জন্ম নেবে।
– কবে সেই সময়টা আসবে।
– যখন বন্দুকবাজরা বন্দুক নামিয়ে রাখবে। বন্দুকের আওয়াজ কমে আসবে। চারপাশের চিৎকারে আমার নীরব শব্দগুলো ফেটে পড়বে। যখন সত্যিকারের ভাষা আমায় ছুরির আঘাতে ফালাফালা করবে। আর আমি হয়ে পড়ব রক্তাক্ত।
আমি তার কথার মধ্যে ডুব দিতে দিতে ভাবছি- নীলটা কত কিছুই না জানে, আমি তার একটুও জানি না। শুধু অবাক হয়ে চেয়ে থাকি। স্বপ্নের মধ্যেই নীল হাত ছেড়ে দিয়ে সর্ষে ক্ষেতের ভেতর ভোরের সূর্যের দিকে হাঁটতে থাকে। ক্রমশ একটা হলুদ আলোর ভেতর মিলিয়ে যায়।
স্বপ্নগুলো সত্যি হতে পারে। যদি সত্যিগুলো স্বপ্ন হতে চায়।