শানু চৌধুরী-র গদ্য

Spread This
Shanu Chowdhury

শানু চৌধুরী

একটা ছাদ থেকে দেখা ঘি কারখানা: অ্যাবসার্ড গদ্য
পুরোনো বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে যাঁদের এখনও ঘি-কারখানার গন্ধ নাকে এসে লাগে এই গদ্য তাঁদের।
আঙুলের খাঁজ থেকে গড়িয়ে পড়া তরল বিকেল যখন কনুই ছাড়িয়ে যায় তখন জল ভেলায় ঠ্যাকে। স্মৃতিভারাতুর ছোটলোক! বাজারে কিছু ছোট মানুষের সাথে দেখা হোক। যাদের হৃৎপিণ্ড গলে গেলেও তর্জনীতে গন্ধ থেকে যায় সম্ভাব্য সুবাসের আর তরুণ বুকে দানার মতো ফোটে পচে যাওয়া নির্বোধের হাড়, চাকায় ঘষে যাওয়া পরাজয়। তোমাদের ভাবনার গরিমায় উঠতে বসতে গেলে গোপন রাখতে হয় যে সব গন্ধ তার ভারে ছোটবেলায় গড়িয়ে ঘি-য়ের মতো চমৎকার নেই। নেই লঙ্কা আর নুনের সাথে গরম ভাত আর জিভ পুড়ে যাওয়ার বিস্বাদ চিহ্ন। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, বীভৎস নাপাক হয়ে। ভাষা বুঝলে না,এমন উদাসীন তো নয় এ ছাদ। দ্বিধান্বিত এ সন্তান! যুদ্ধের সাথে ট্যারা হয়ে থাকা ত্রুটিগুলো মেখে নাও। চৌকস হও…বাঁক নিতে নিতে… জেনো, গন্ধেরও আধ্যাত্মিক বিভা আছে। এ প্রসঙ্গে আমাদের আলাপ শুরু হয়েছিল যখন তখন ভোজনের ধৈর্যই ছিল না আমার। তবু জল কোথায় পৌঁছয়! তা মাপিনি আজও। তুমি বলেছিলে হে কারখানা! মাতৃত্বের কারখানা! জল মাপতে হয় মৌনতায় অথচ লেবার রুমের অ্যাবসার্ড ভাবনায় কেন লঙ্ঘন এসে যায়?
– তোমাকে জানাই,দুটো চোখা আলো বেরিয়ে যাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার শুভ্রতা ভেঙে। চঞ্চল হয়ে উঠবে সফেদ পরিদের জাহানারা…
এত অনিয়ন্ত্রিত ঝংকার ও কথায় ধ্বনিপ্রবাহ ছিটকে এসে পড়ছে পাপোশের মাঝখানে আর হেঁ হেঁ করে এসে উঠছে মেরুদণ্ডহীন মানুষ। যাঁর মুখ চৌকো করে কাটা। এই মুখের উপসর্গ দেখা দিয়েছিল ভোরের গন্তব্যে। আমাদের শ্রমিক। খিদে খিদে করে নামকরণ করেছিল ঝিনুকের ভার। যে ভারে ঠোঁট কেটে দিয়েছিল রাগান্বিত মা তাঁর সন্তানের! নামকরণের আর কোনো উৎস নেই। এখন চেনা মানুষের সাথে দেখা হয়। আত্মফাঁকির ভিতরে কারও মা জ্বাল দেয় অপার স্বাদ। তবু মুখ কেন দেখা যাচ্ছে না? এমন পদদ্বয় সুস্বাদু শব্দের অর্থ ভেঙে দেয়। তিরতির করে কাঁপে চিবুকের ধার। সন্তান বলে-
– আমি তো স্নেহহীন
– বাৎসল্যের কোটর খুলে করেছি নিস্তব্ধ মন্ত্রোচ্চারণ
বাহু তুলে ডাকি… তোমাদের মা নেই? তারা শব্দ করে আর সেই ঘিয়ের সুবাস থেকে অজান্তে যেন বেরিয়ে আসে মায়ের হাত থেকে গড়িয়ে পড়া ঘিয়ের শিশি।
পিছনে সূর্য ডুবে যাওয়ার আগে আকাশে একবার স্থির হয়ে দাঁড়ায় এবং সমস্ত ঘটনার উপর আলো ছড়াতে থাকে। ওমনিই টুপ করে রুটির মাঝে পড়ে এক চামচ ঘি আর খেলার ভঙ্গিতে গলে যায় টলটলে আভায়! রুটিটি তখন গর্ভস্থ ভ্রূণের মতো গুটিয়ে যায় আর বলে-
-চলে যাই
-জ্বলে যাই
-চলে যাই
কতসময় বোধহয় এমন ঊষালগ্নে, উঠে আসতে চাইছে শনপাতা পেরিয়ে মায়ের হাতে। তাদের মনে নেই তাঁর দেহ সবুজ,নাকি গাছের ভ্রমে সৃষ্টি হওয়া গাছের কঙ্কাল! ছাদ থেকে আসা-যাওয়া দেখে বিভ্রম হয়। শীৎকার টুকরো করে কারখানা থেকে রোজ বেরিয়ে আসে তাদের মা। নাকে গন্ধ লাগছে আবার…যে সুবাস আর সম্ভাব্য নয়। মা খেটে আসছে অনিবার্য নিঃসঙ্গকে নিয়ে। বৃক্ষের গায়ে ঝোলানো টায়ার,মেহগনি বনের ভিতর চোরাপথ থেকে হেঁটে আসছে মা আর ছাদ থেকে ছেলেরা শুঁকছে ঘিয়ের গন্ধ ও অধিকার অর্জনের পালা।
এ গদ্য জানাবার নয়। জানাবার নয়, একে অপরকে, মা আর ছেলেকে, ছেলে আর মা’কে। এ গদ্য সেই সব মা আর ছেলেদের যাদের এই শ্রাবণে ঢেকে রাখবে মোহনীয় জয়।