দিয়া দত্ত-র গদ্য

Spread This

দিয়া দত্ত

বিস্মৃত দ্বাপরকাল : 
 
অহং শেষো ভবিষ্যামি নিয়তামচিরেণ বৈ ! বাসবী 
      (দিনশেষের শেষ যাত্রী আমি তোমার, বাসবী )
 
ছলাৎ ছলাৎ শব্দে বয়ে চলেছে কালো যমুনার জল,তীরের কাছে জলের মধ্যে বাঁধা নৌকাটি ঢেউয়ের অবাধ্য ধাক্কায় মাঝে মাঝেই দুলে উঠছে | ঘাটে বসে আছে এক নারী, যমুনার জল ছুঁয়ে থাকা তার অঙ্গ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, নীল পদ্মের মতো দুই আয়তচোখ মেলে সে অপেক্ষারত, সুন্দরী সে… বর্ণের অগৌরবকে তুচ্ছ করা রূপ তার, যেন প্রস্ফুটিত নীল-পদ্ম !থেকে থেকেই সুন্দরীর গভীর টলটলে দু চোখে চকিত-চঞ্চলতা দেখা দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে, যেন কারুর প্রতীক্ষাতে বসে রয়েছে সে রমণী | এমন সময় নদী পারাপারের উদ্দেশ্যে ঘাটে এসে উপস্থিত হলেন এক মুনি ,মহর্ষি তিনি ! ভ্রুযুগলে সামান্য ভ্রুকুটি নিয়ে তিনি ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন সুন্দরীর কাছে, জানালেন পার করে দেওয়ার আর্জি | মুহূর্তে নৌকো ভাসলো যমুনার জলে, কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই নৌকো গিয়ে ঠেকলো সমীপবর্তী এক দ্বীপে | সেদিনের চরাচর-ব্যাপী অন্ধকার নেমে আসার ঠিক সন্ধিক্ষণে ঘন কুহেলিকার মায়াজালের আড়ালে নিঃশব্দে লেখা হয়ে গেলো এক অসম মিলনকাহিনি…উদ্ভিন্নযৌবনা কালী ও মহর্ষি পরাশরের মিলনকাহিনি , জন্ম হলো কৃষ্ণ-দ্বৈপায়নের | কিন্তু সেদিন শুধু ভারতভূমির এক মহাকবির জন্ম হয়নি, জন্ম হয়েছিল এক পদ্মগন্ধী নারীর, সৌরভ যার দিকে দিকে ছড়িয়ে গিয়েছিলো, সে হয়ে উঠেছিল যোজনগন্ধা, সে সুগন্ধ যত না তাঁর দেহের তার থেকে অনেক বেশি মননের, পরাশরের কর্ষিত মনের সান্নিধ্যে এসে যে জ্ঞান সে সেদিন লাভ করেছিল পরবর্তীকালে  তাই তার জীবনপথে চলার পাথেয় হয়ে উঠেছিল | যদিও সে প্রেম ছিল নিতান্তই দেহজ, একবার দেখা দিয়েই ক্ষণিকের লহমায় মিলিয়ে গিয়েছিলো মহাকালের গর্ভে , তবু সেই ক্ষণটুকু সে পদ্মগন্ধার জীবনে মিথ্যে ছিল না | পরবর্তীকালে যিনি কুরুকূলবধূ রূপে হস্তিনাপুর প্রবেশ করেন ; নাম হয় সত্যবতী, শান্তনু প্রেয়সী, আর্যাবর্তের এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের সম্রাজ্ঞী , পুত্র-ধনে ধনী |  তবু কখনো কোনো বিষণ্ণ  শারদরাতে প্রাসাদের প্রকোষ্ঠে দাঁড়িয়ে যদি তাঁর দৃষ্টি চলে যেত সম্মুখস্থ পদ্মসরোবর ছাড়িয়ে আরো গভীর অতলান্ত অতীতে… ঠিক যেখানে একান্ত নিভৃতে, মনের গভীরতম কক্ষে সন্তর্পণে ঢেকে রেখেছেন সেই ক্ষণিকপ্রেমের স্মৃতি, তখন তাঁর সে দেবনিন্দিত শরীর জুড়ে অন্তত একবার, আরো একবার কি বেজে উঠতো না শারদনিশির আগমনী-সুর?
 
 
 
বর্তমানকাল :
 
                   গো সখি,কাহে করে সাজ-শৃঙ্গার
                         না-পহিনা ভূষণ কাঞ্চনহার
                    খালি চন্দন লাগাও অঙ্গওয়া হামার
                               চন্দন গরল সমান
 
(মন আমার সাজের থেকে বিরতি চায় সখি, বিরতি চায়… সোনার বেশ আর আমার পরতে ইচ্ছে হয়না, যে চন্দন তোমরা আমার অঙ্গে লেপে দাও, তাও যেন বিষে জর্জরিত)
 
আমার এ বছরের অকালবোধন অন্য আর বছরের অকালবোধন অপেক্ষা অন্যরকম হয়ে উঠেছিল, যেন দীর্ঘ বিষাদকালের শীত-ঘুম কাটিয়ে এক অনাগত সুন্দর ভবিষ্যতের ধ্বনি আমি শুনতে পাচ্ছিলাম | শরীরের সমস্ত রোমকূপ জুড়ে বেজে চলছিল এক আগমনীর সুর | বরাবর উৎসবের ভিড় আমায় যতটা একা করে দিয়ে যায় , এবার যেন তার রেশমাত্র ছিল না, এক গভীর একাত্ববোধে আমার মন ছিল ভরপুর | সেরকমই একদিন ষষ্ঠীর সন্ধেতে রংবেরঙিন আলোর গুঁড়ো আবির দু গালে আর গায়ে মেখে যখন ফিরে আসছি, চোখ গেলো ফুলওয়ালাদের ঝুড়ির দিকে, সব পেয়ে যাওয়া আদুরে সম্রাজ্ঞীর মতো ঋজু গোলাপের পাশে সারি সারি শুয়ে রয়েছেন তিনি, ঈষৎ স্ফুরিত ওষ্ঠ দুখানি তার অভিমানী বৃন্দাবনী রাধিকার মতো জোড়া  | আজকাল তার বড়োই কদর | সন্ধিপুজোর সমগ্র আয়োজন, ভক্তের নিবেদন তার অনুপস্থিতিতে যে গোটাটাই বৃথা যেতে পারে, যেমন যেতে বসেছিল ত্রেতাযুগে, রাবন-বধের প্রাক্কালে… এ কথা মনে করেই যেন সে ঈষৎ অহংকারী  |
একটুক্ষণ ভেবে তুলে নিয়েছিলাম দুখানি পদ্ম | ফিরে এসেছিলাম, যত্ন করে তুলে রেখেছিলাম আমার সাজের সরঞ্জামে | শরীর জুড়ে আমার তখন বেজে চলেছে বৃন্দাবনী-সারং, বাদী -রে, সম্বাদী -পা | দেরি তর সইছে না আর এতটুকু| সঙ্গে সঙ্গে আলমারি খুলে বেছে নিয়েছিলাম নীলাম্বরী দুপাট্টা, জমিতে যার সোনালি-রুপালি সালমা-চুমকির কাজ, যেন ভ্যান গগের স্টারি নাইট | গয়নার বাক্স ঘেঁটে বের করে ফেলি সাধের সোনা রুপোর গয়না, বাজুবন্ধ,  কোমরবন্ধ, আর বড়ো প্রিয়  সোনার সিঁথি | মোবাইলের সাউন্ডপটে চালিয়ে দিলাম ভানুসিংহের পদাবলি | টিমটিমে আলোয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাজিয়ে নিলাম নিজেকে , চোখ আঁকলাম কাজলের কালিতে, মাথার খোঁপায় জড়িয়ে নিলাম সাধের সিঁথি… ঘর জুড়ে গমগমে গলায় হরিহরণ গেয়ে চলেছে
 
       মোতিম হারে বেশ বানা দে       সিনথী লাগা দে ভালে
       উড়াহী বিলুন্ঠিত লোল চিকুর মম বাদহ চম্পকমালে
 
আমার কল্পমানসে তখন ফুটে উঠছে দুই বিষাদপ্রতিমা, আজ মুখোমুখি তাঁরা  …
 
ক্যামেরা তুলে নিলাম হাতে, যান্ত্রিক কারণেই বন্ধ হয়ে গেলো গান |  আমার ঘরের আলো-আঁধারির প্রতিফলনে তখন দ্বাপরযুগের দুই নারী একে অন্যের অপরিণত প্রেমকাহিনির বিষাদসিন্ধুতে নিমজ্জিত হলেন, রেখে গেলেন আমাকে…
একা, সম্পূর্ণ একা !!
 
 
                  তুমারি রাধা অব পুরি ঘরওয়ালী
                  দুধ না আয়ানও গেহুঁ দিন ভর খালী
         বিরহ কে আঁনসু কব্ কে, হাঁ কব্ কে পোনছ ডালি
                        ফির কাহে দরদ জাগাওনি