স্বপন রায়-এর অনুবাদ

Spread This
Swapan Roy

স্বপন রায়

আফগানিস্থান : কিছু কবি, কয়েকটি কবিতা 
 
আফগানিস্থান আর হিন্দুকুশ পর্বতমালা সমার্থক।দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ায় আফগানিস্থানের পূর্বে এবং দক্ষিণে পাকিস্তান।পশ্চিমে ইরান। উত্তরে তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান আর তাজিকস্তান। সুদূর উত্তর-পূর্বে চীন। চারদিকেই স্থল। কোনও সমুদ্র নেই।পুস্তু এবং তাজিকরা মূলত সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় থাকলেও হাজারা, উজবেক, আইম্যাক, তুর্কমেনি, বালোচ ইত্যাদি ‘এথনিক’ গোষ্ঠিও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আফগানি শিখদের কাবুল ইত্যাদি শহরে নজরে পড়ার মত উপস্থিতি রয়েছে।
 
 
‘সিল্করুটে’ অবস্থিত থাকায় বারবার আফগানিস্থানকে সহ্য করতে হয়েছে বিভিন্ন সাম্রাজ্যের আগ্রাসন।অন্যদিকে ব্যবসায়িক কারণেই বিভিন্ন সংস্কৃতির আদান প্রদানে আফগানিস্তানে একটি মিশ্রিত সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট গড়ে ওঠে। খৃঃপূঃ ৫০০, অর্থাৎ ‘আখামেইন্দ সাম্রাজ্যের’ সময়ে প্রাথমিকভাবে আফগানি সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে ওঠে। তবে কবিতার মৌখিক এবং লৈখিক রূপান্তর শিখর পায় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ‘জালালুদ্দীন রুমি বাল্‌খি’র কবিতায়। ‘বাল্‌খ’ আফগানিস্তানের একটি অঞ্চল, এখানেই ‘রুমি’র জন্ম হয় ১২০৭ সালের, ৩০ সেপ্টেম্বর। পাঠকমাত্রই জানেন যে, ধার্মিকতা (ঐশ্লামিক সুফিয়ানা) আর দর্শন এক অপূর্ব ‘মিস্টিক’ আবহ সৃষ্টি করে চলে ‘রুমি’র কবিতায়। যা এখনও মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। রুমি’র জন্ম আফগানিস্তানে হলেও, ভ্রাম্যমান এই দরবেশ নানা জায়গায় ঘুরে শেষ বয়সে ‘আনাতোলিয়া’তে থিতু হন। ফার্সি ভাষায় রচিত তাঁর গজল এবং অন্যান্য সৃষ্টি এখন বিশ্ব সাহিত্যের সম্পদ। রুমি’র অফুরন্ত সৃষ্টির সমুদ্র থেকে একটি বিন্দু ছোঁয়ার চেষ্টা করা যাকঃ
 
জালালুদ্দীন রুমি’র একটি কবিতা
 
আমি মাঝে মাঝে ভুলে যাই, বন্ধুত্ব কাকে বলে?
অজ্ঞান এবং পাগল, আমি সব জায়গায় দুঃখ
ছড়াতে থাকি, আমার গল্পটাকে
নানাভাবে বলা যায়, প্রেমে ঢেলে, নোংরা রসিকতা বানিয়ে
একটা যুদ্ধ লাগিয়ে, এমনকি ফাঁকাতেও
 
আমার ক্ষমাকে ভাগ করে নাও যে কোন সংখ্যা দিয়ে
ক্ষমা ঘুরে বেড়াবে
এই অন্ধকার উপদেশগুলো, যা আমি অনুসরণ করি
তারা কি কোনও পরিকল্পনার অংশ
বন্ধুরা, সাবধান
চরম ঔৎসুক্য বা সমবেদনা নিয়ে আমার কাছে এসোনা
 
এই নিবন্ধে আমি চেষ্টা করবো আফগানিস্তানের কিংবদন্তি কবিদের সঙ্গে সমকালীন আফগান কবিদের কয়েকজনকে নিয়ে লেখার, যা অপর্যাপ্ত তো বটেই তবু এই আশায় লিখবো যে, আফগানি কবিতা নিয়ে যদি বাংলার কবিতামহলে আগ্রহ জন্মায়, কবিরা যদি আরো বড় লেখায় অনুপ্রাণিত হন। আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে নতুন প্রজন্মের কবিদের একটা বড় অংশ দেশের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, মৌর্য সাম্রাজ্য, মুসলিম আরব, মোগল, ইংরেজ, সোভিয়েত রাশিয়া এবং সবশেষে আমেরিকা এবং ‘ন্যাটো’র দেশগুলো এরা প্রত্যেকেই একে একে আফগানিস্তানে এসেছে। যুদ্ধ করেছে। হত্যা করেছে। একটি সমৃদ্ধ দেশকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ছিবড়ে করে দিয়েছে। আর এই হিংস্র বাতাবরণে জন্ম নিয়েছে প্রথমে ‘মুজাহিদিন’ এবং পরে ’তালিবান’-এর মত গোঁড়া ঐশ্লামিক সংগঠনগুলি। যাদের একমাত্র ভাষা ছিল সন্ত্রাস। অদ্ভুত ব্যাপার আমেরিকা ‘সোভিয়েত’ বিরোধিতার অজুহাতে এই সন্ত্রাসবাদী দলগুলিকে অর্থ এবং মারণাস্ত্র দিয়ে সংগঠিত করে পাকিস্তান আর সৌদি আরবের  সঙ্গে হাত মিলিয়ে। ‘ওসামা-বিন-লাদেন’ এই প্রক্রিয়ারই বাই-প্রোডাক্ট। এভাবেই বারেবারে  ক্ষত বিক্ষত হয়েছে আফগানিস্তান কিন্তু বেঁচে থেকেছে। কবিরাও, মরতে মরতে লড়তে লড়তে বেঁচে থেকেছে। আর তাই কবিতাও। আফগান কবিরা সাধারণত ‘পুস্তু’ এবং ‘দারি’(ফার্সি) ভাষায় কবিতা লেখেন। রুমি’র পরে আফগানিস্তানের আরেক কিংবদন্তি কবি হলেন, ‘কুশাল খান খট্টক’। খট্টক, সপ্তদশ শতাব্দীর কবি এবং আফগানিস্তানের জাতীয় কবিও বটে। খট্টকের কবিতায় দেশপ্রেম, বীরগাথা, প্রেম ইত্যাদির প্রাধান্য ছিল। রুমির রহস্যময়তার আবরণ ছিঁড়ে খট্টক কিছুটা কথ্য আঙ্গিকে আফগান কবিতাকে সমৃদ্ধ করেন।পড়া যাক তাঁর একটি কবিতাঃ
 
‘আমার বাষট্টি বছর বয়ে গেছে
আনন্দ ছিল, দুঃখও, মসৃণও ছিল
আর এখন আমার চুল আর কালো নয়
ধবধবে শাদা, তবে মনে মনে আমি এখনো তরুণ
পেরিয়ে এসেছি শোক, সংগ্রাম, বরফ, তুষার
আর এখনো দাঁড়িয়ে আছি, দেখছি চারদিকে
সোনালি গ্রীষ্ম হেসেখেলে বেড়াচ্ছে।’
 
আফগানিস্তানের মহিলা কবিদের (ফার্সি ভাষায়) মধ্যে প্রাচীনতমা হলেন রাবিয়া বাল্‌খি। সম্ভবত ৯১৪-৯৪৩ খৃঃ তিনি সক্রিয় ছিলেন। তখন সামানিন্দ এমির নাসের-২ এর রাজত্ব। রুদাকি ছিলেন ওই সময়কার রাজ-কবি। তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায় রাবিয়াও ওই সময়েই ফার্সি ভাষায় কবিতা লিখেছেন। অসামান্যা রূপসী ছিলেন রাবিয়া। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলা। তাঁর বাবা কা-আল-কুজদারি ছিলেন সামানিন্দ রাজসভার সম্মানিত গোষ্ঠিপতি। যাইহোক, কবিতা লেখার সূত্রেই রাবিয়া বাখতাস নামের এক তুর্কি দাসের সঙ্গে রোমান্টিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। বাখতাসও কবিতা লিখতেন। হ্যারিস, রাবিয়ার ভাই। বাবা  কা-আল-কুজদারি’র মৃত্যুর পরে হ্যারিস গোষ্ঠিপতি হয়। গোপনসূত্রে সে জানতে পারে বোনের প্রণয় সম্পর্কের কথা। ক্ষিপ্ত হ্যারিস বোন রাবিয়ার হাতের শিরা ছিন্ন করে তাকে স্নানাগারে আটকে দেয়। রক্তক্ষরণ হতে হতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রাবিয়া, ফার্সি কবিতার প্রথম মহিলা কবি! হ্যারিস একইসঙ্গে বাখতাসকে বন্দী করে একটি কুয়োয় ফেলে দেয়। বাখতাস কোনওমতে নিজের শক্তি আর বুদ্ধির প্রয়োগ করে কুয়ো থেকে উঠে আসে এবং হ্যারিসকে হত্যা করে। এরপর রাবেয়া’র খোঁজে বেরিয়ে পড়ে বাখতাস এবং জানতে পারে রাবেয়ার মর্মান্তিক মৃত্যুর কথা। তীব্র শোক আর হতাশায় আত্মহত্যা করে বাখতাস। চূড়ান্ত এই ‘রোমান্টিক ট্র্যাজেডি’ ফার্সি ভাষার প্রভাবাধীন অঞ্চলে বহু শতাব্দী ধরে ‘মিথ’ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আজ এতদিন পরেও চোখ নরম করে দেয় এমন মৃত্যুজেতা প্রেম। কবিতা বেঁচে থাকে শুধু, বেঁচে ওঠে এমনভাবেই। রাবিয়ার কবিতা এমনিতে দুষ্প্রাপ্য। একটি কবিতার ভাবানুবাদ পাঠকদের জন্য দিচ্ছিঃ
 
প্রেম
…….
 ভালবাসার এক মিথ্যে জালে জড়িয়ে আছি
ব্যর্থ আমি, সবকিছুতেই ব্যর্থ ভীষণ
প্রেম-জরজর রক্তচাপে বিদ্ধ আমি দেখতে পাচ্ছি
 যা কিছু  আমার খুব প্রিয় ছিল, হারিয়ে গেছে কোথায় কখন
ভালবাসা এক সমুদ্র তার বিশাল ঢেউয়ে
কেইবা পারবে সাঁতার দিতে, পারবে ঠিকানাবিদ্ধ হতে
প্রেমিক, সেতো চির বিশ্বস্ত , তার অনিত্য হাতের বেড়ে
ধরে রাখবে উথালপাথাল, ধরে রাখবে শপথ করেই
যা কিছু ভুল ছলনাবিভোর, মুছে দেবে সব নিভৃত কালো
প্রেমিক যদি, বিষ খেতে খেতে বলে উঠবে, কী যে মিষ্টি, কীই যে ভাল
 
কবিতা বহমান, কবিতা জায়মান তাই। আফগান কবিতা’র সমসাময়িকতা ওই দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে গড়ে উঠেছে। দেশের টালমাটাল অবস্থা এবং ‘বারবাক কারমাল’কে হত্যা করার পরে ধীরে ধীরে জেঁকে বসা ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সন্ত্রাস প্রায় অধিকাংশ সৃষ্টিশীল কবি, সাহিত্যিক, চিত্রকর, চলচ্চিত্র পরিচালককে দেশান্তরী হতে বাধ্য করে। যে কোনও স্বৈরাচারী শাসনেই এটা ঘটে থাকে। ‘পারতো নাদেরি’ আফগানিস্তানের অত্যন্ত সম্মানিত কবি। সোভিয়েত হস্তক্ষেপের সময় এঁকে তিন বছর ‘জেল-এ থাকতে হয়।১৯৫৩ সালে আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের ‘বড়কশান’-এ ‘নাদেরি’র জন্ম। কাবুল ইউনিভার্সিটির স্নাতক হন ১৯৭৬ সালে। জেল ইত্যাদি খাটার পরেও তাঁকে দেশান্তরী হতে হয়ে ছিল। ‘নাদেরি’ জেল থেকে বেরিয়ে কবিতা লিখতে শুরু করেন। মূলতঃ রোমান্টিক এবং ফ্রি-ভার্সে দক্ষ ‘নাদেরি’ এখন আফগানিস্তানের ‘পেন’  শাখার সভাপতি। ‘পারতো নাদেরি’র একটি কবিতা’র অনুবাদ দিচ্ছি পাঠকদের জন্যঃ
 
নির্জনতা
…………
তোমার হাতের রেখায়
তারা লিখে রেখেছে সূর্যের ভাগ্য
ওঠো
হাত তোলো
 
এই দীর্ঘ রাত আমার শ্বাসরোধ করে রেখেছে
 
শাকিলা আজিজ্জাদা’র জন্ম কাবুলে, ১৯৬৪ সালে। ফার্সিতে লেখেন। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই লেখালিখি শুরু। শাকিলাও আফগানিস্তানের যুদ্ধাক্রান্ত সময়ের কবি। তবে অপ্রত্যক্ষভাবে। কারণ কাবুল থেকেই আইনে স্নাতক হয়ে শাকিলা ‘নেদারল্যান্ডস’-এ চলে যান ‘ওরিয়েন্টাল ল্যাংগুয়েজ অ্যাণ্ড কালচার’ নিয়ে পড়াশোনার জন্য। এখন তিনি ওখানেই থাকেন। ‘নেদারল্যান্ডস’-এ থাকার ফলে শাকিলা উন্মুক্ত মনে তাঁর অনুভূতি কবিতায় প্রকাশ করতে পেরেছেন। শাকিলার কবিতা, নারীর শারীরিক এবং মানসিক অবস্থাকে উদারমনস্ক খোলামেলা ভঙ্গিতে লিপিত করেছে। প্রায় দু-দশক ধরে চলতে থাকা চরম রক্ষণশীল এবং মারমুখি ধর্মীয় গোঁড়াদের শাসনে যা সম্ভবপর ছিলনা। শাকিলা ‘প্রলিফিক রাইটার’। দুটি কবিতার বই আছে তাঁর। প্রথম বইটি দ্বিভাষিক, ডাচ এবং ফার্সি ভাষায় লেখা। নাম, স্মৃতিকথা, শূন্যতার। ২০১২ সালে আরেকটি সঙ্কলন শাকিলা ‘আজিজ্জাদার কবিতা’ প্রকাশিত হয়, ফার্সিতে লিখিত এবং সঙ্গে ইংরেজি অনুবাদ।। শাকিলার একটি কবিতার ভাবানুবাদ দিচ্ছি এবারঃ
 
একটি পালক
…………………..
আমার স্বপ্ন ঠিক যেভাবে
তোমার পায়ের শব্দ শোনে, সেই যে যখন তুমি
পা টিপে টিপে ভেতরে আসো
 
তুমি বেড়ালছানার মত ঢুকে যাও
চাদরের নিচে
তোমার চোখ আমায় নিতে থাকে
জেগে অথবা ঘুমিয়ে
তুমি আমার ঘুমের রেশমগুলো কোলে তুলে নাও
 
আর সেই মুহূর্তে যখন তোমার হাতদুটোর
আমার কাঁধে জড়িয়ে যাওয়ার কথা
তুমি ঘুমিয়ে পড়ো
বিছানায়
 
আর আধোঘুমে আধো জাগরণে
যখন আমার স্বপ্নরা
প্রায় শেষ
আমি তুমিময় হতে থাকি
পূর্ণ হতে থাকি আবার
 
‘মোহম্মদ বাঘহের কোলাহি আহারি’ জন্ম ১৯৫০ সালে খোরাশানের মাশশানে। তাঁর প্রথম ’অ্যাবভ দ্য ফোর এলিমেন্টস’ কবিতার বই ১৯৭৭ সালে প্রকাশিত হয়। ওই সময়ে আফগানিস্তানের পট পরিবর্তনের ভূমিকা লেখা হচ্ছে। পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি ১৯৭৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের সাহায্যে দাউদ খানকে ক্ষমতাচ্যুত করে।  দাউদ খান ১৯৭৩ সালে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েই আফগানিস্তানের শেষ সম্রাট জাহির শাহ’র অবর্তমানে ক্ষমতাসীন হন। দাউদ খানের জনবিরোধী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভূমি সংস্কার এবং ‘সিভিল ম্যারেজ অ্যাক্ট’-এ সংস্কার করতে গেলে গিয়ে গোঁড়া মুসলিম মোল্লাতন্ত্র ক্ষেপে যায়। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এরপরে। ‘আহারি’ এই গৃহযুদ্ধ প্রজন্মের কবি।‘আহারি’র কবিতা আফগানি লোকগল্পের আভাস থাকে, তিনি অসীম দক্ষতায় গল্পগুলোকে কবিতাময় করতে থাকেন। এখনো অবধি  ‘আহারি’র ছ’টি কবিতা’র বই প্রকাশিত হয়েছে। আহারি, যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান সমাজকে কবিতার শুশ্রূষা দিতে পেরেছেন। তাঁর কবিতায় পরাবাস্তবের খেলা মিশে গেছে সাধারণের কথ্য ভাষার চালে। একটি কবিতা পড়া যাকঃ
 
আবার ভ্রামক হব
……………
আমি আবার ভ্রামক হব
বুটের লেস যথাযথ
নখগুলো কাটবো না
গালে দাড়ির বহর বাড়বে এই গভীর ভোরের মত
যা
আমার এবং একটি সুন্দর মৃত্যুর মাঝে
দাঁড়িয়ে রয়েছে
 
আর এই সুন্দর মৃত্যুর কাছে যেতে যেতে
আমি ঘুরে বেড়াবো সেই মুখগুলোয়
ঘরকুনো তীর্থযাত্রী’র মত
আমি তখন সেই পাখিটা যে পৃথিবীর গাছ থেকে পড়ে যাচ্ছে
ভোরের শেষ তারা অস্ত যাচ্ছে যখন
পাখিটা পড়ে যাচ্ছে আপেলের বাস্কেটে, একদিন
একটি ভোরবেলায়
 
বয়সে অনেকটাই তরুণ ‘রেজা মোহাম্মেদি’র জন্ম ১৯৭৯ সালে, কান্দাহারে। ইরান এবং লণ্ডনে পড়াশোনা করা রেজা’র কবিতা আলোড়ন ফেলে দিয়েছে ফার্সি কবিতার অন্দরমহলে এটা বলা যায়। পুরস্কারও পেয়েছেন।তাঁর কবিতার বই তিনটি। তিনি ‘দ্য গার্ডিয়ান’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। রেজা’র কবিতায় সাধারণভাবে প্রায় অবধারিত এবং নিস্তরঙ্গ জীবনযাপনকে নৈর্বক্তিক উপস্থাপনায় পাওয়া যায়। তিনি জোর করে কিছু শোনাতে চান না।নীরবতার অসীম খেলায় রেজা মোহাম্মেদি একজন পটু খেলোয়াড়ের মত খেলে যাচ্ছেন। ভাবানুবাদে রেজা’র একটি কবিতা রইলোঃ
 
ভালবাসাকে
……………
ঘুম ভাঙেনি একসঙ্গে তাই আগেই এসেছি এই খালি ঘরটায় একলাই
সমুদ্র এই ঘরের হাতায়
অনেক পরে তুমি উঠেছিলে, স্নান করেছিলে, খুলে দিয়েছিলে জানলা
প্রসাধিতা তুমি, ঘর ছেড়ে দিয়ে বাইরে এলে রাস্তায়
 
এইতো তোমার দিন শুরু হল রাস্তা দিয়েই ঠিকানা খোঁজার
যা একখানি ঘর ছুঁয়ে আসে
একফালি স্ট্রিটে ঘুরন্ত হয়, বারবার, এই দিনগুলো নিয়ে যায় তোমাকে
শহরের লোভী সীমানায়
 
আমার কিন্ত দিনগুলো যেন করিডোর, তারা শিরায় শিরায় বাহিত
এবং বন্ধ
তাতে বোতাম লাগানো পেতলের, আমি আর তুমি আলাদাই
ফিরে আসি ফের, পথ খুঁজে নিয়ে
নিজেদের
 
তুমি পার্পল পোষাক পরেছ, ঘড়ি’র রঙে মিলিয়ে, আমি
আমি পরে আছি সান্ধ্য পোষাক
আর শুয়ে আছি বেশ হালকাই, এই তো সময়, এবারে
চা হয়ে যাক, একটু?
 
এবার আমাদের এক হতে হয়, চায়ের স্বার্থে, টিভির বাটনে
রাত্রির খাওয়া দাওয়ার কারণে
এক হতে থাকি আমরা 
আমি ভালবাসি, আগুন হয়ে হে চুল্লি তোমাকে খুবই
তুমি ভালবাসো আগুনকে যেভাবে ভালবাসা দেয়
চুল্লি
 
এরপরে আর কী হতে পারে পরস্পরকে জড়িয়ে আমরা স্বপ্নই দেখি, আমাদের
আলাদা আলাদা স্বপ্ন…
 
‘পীর মোহম্মদ কারবাঁ’, মধ্য চল্লিশের এই কবি ‘খোস্ত’-এ জন্মগ্রহণ করেন। তালিবান শাসনের সময় ১৯৯০ সালে তিনি পাকিস্তানের পেশোয়ারে আশ্রয় নেন। এক দশক সেখানে কাটিয়ে তালিবানি শাসন শেষ হলে তিনি কাবুলে ফিরে আসেন। ‘কারবাঁ’র প্রকাশিত বই তিনটি। ‘কারবাঁ’ ইঙ্গিতময় কবিতায় পারদর্শী।মুখের ভাষাকে মোচড় দিয়ে কবিতায় নিয়ে যান ‘কারবাঁ’। রইলো, ‘পীর মোহম্মদ কারবাঁ’র একটি কবিতার ভাবানুবাদঃ
 
ফুল এবং মানুষ
……………….
ফুল, মাটি আর ছাই নেয়
কিছু পরিষ্কার বাকিটা ময়লা জলও নেয়
আর পবিত্র থাকে
সুন্দর আর সুরভিত থাকে
ফুলের রং আমাদের চোখে আরাম দেয়
হৃদয়ে শুশ্রূষা
 
মানুষ যার কাছে একদিন দেবদূতও মাথা নত করেছিল
সেই মানুষেরা
ফুল দেখে
চোখের জলের চেয়েও পরিষ্কার জল পান করে
গভীর লাল আপেলে দাঁত বসায়
তারা 
কুৎসিত হতে থাকে, কেন হতে থাকে
কেন?
 
আফগান কবিতাকে একটি নিবন্ধে লিখে ফেলা অসম্ভব। আমি আভাসুটুকু দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আফগান কবিতা’র আধুনিক সময়ের পট পরিবর্তনে যেমন আন্তর্জাতিক কবিতাগত ভাবনার(ইমেজিস্ট, সিম্বলিস্ট, সু্ররিয়াল, পোস্ট স্ট্রাকচারাল, পোস্ট মর্ডান ইত্যাদি) একটি ভূমিকা ছিল, তেমনি ছিল আফগানিস্তানের যুদ্ধ, বিদ্রোহ, সন্ত্রাসের ভূমিকাও। এত বিশাল একটা কবিতার জগত, তাকে লিখতে গেলে আরো বড় পরিসর চাই। নিষ্ঠা চাই। আশাকরি ভবিষ্যতে কেউ না কেউ লিখবেন। আমি এই নিবন্ধ শেষ করছি সেই পঁচিশ বছরের মেয়েটির কবিতা দিয়ে যাকে কবিতা লেখা এবং কবিতার বই প্রকাশ করার অপরাধে তার স্বামী পিটিয়ে মেরে ফেলেছিল।
 
নাদিয়া আঞ্জুমান(১৯৮০-২০০৫)। আফগানিস্তানের হেরাটের মেয়ে নাদিয়া ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছিল। সাহিত্যের প্রতি ছিল তীব্র আকর্ষণ। বিশেষত কবিতার প্রতি। ১৯৯৬ সালে আফগানিস্তানের দখল নেয় তালিবানরা। মেয়েদের সমস্ত স্কুল বন্ধ করে দেয়া হয়। শুধু তাই নয় তাদের ঘরের বাইরে পা রাখাও কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়। ব্যতিক্রমের আওতায় ছিল সেলাই শেখার স্কুল। এরকমই একটি স্কুলে যার নাম ‘Golden Needle Sewing School’ নাদিয়া ভর্তি হয়ে যায়। এই স্কুলটিতে সেলাই-এর ক্লাস নেয়া হলেও গোপনে সাহিত্যের আলোচনা এবং ক্লাস ইত্যাদি হত। হেরাট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মহঃ আলি রেহাব এই আলোচনা/ক্লাস ইত্যাদিতে উপস্থিত থাকতেন। নাদিয়া ওঁর মাধ্যমেই ‘হাফিজ শিরাজ’ , বিদেল দেলহেভি’, ‘ফারা ফারোকজদের’ কবিতার সঙ্গে পরিচিত হয় এবং নিজেও লিখতে থাকে, গোপনে। এই স্কুলের বাইরে খেলায় ব্যস্ত ছেলেপুলেদের কাজ ছিল ধর্মীয় পুলিশদের দেখা পেলেই সাংকেতিক ভাষায় সজাগ করে দেয়া। দীর্ঘ পাঁচ বছর এভাবে সাহিত্যপাঠ নেওয়ার পরে ২০০১ সালে তালিবানদের পতন হয়। ২১ বছর বয়সে নাদিয়া ‘হেরাট বিশ্ববিদ্যালয়ে’ ভর্তি হয়। ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে। ইতিমধ্যে অধ্যাপক রেহাবের উৎসাহ এবং সাহায্যে নাদিয়ার কবিতার বই ‘গুল-এ-দোদি’ ( ধোঁয়াচ্ছন্ন ফুল) প্রকাশিত হয়। বইটি শুধু আফগানিস্তানে নয়, ইরান এবং পাকিস্তানেও পাঠকপ্রিয়তা পায়। নাদিয়ার নাম দেশের সীমার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। এই সময়েই নাদিয়ার সঙ্গে ফরিদ আহমেদ মজিদ নেইয়া’র বিয়ে হয়ে যায়। সাহিত্যে স্নাতক, লাইব্রেরিয়ান মজিদ নেইয়া কিন্তু নাদিয়ার কবিতাপ্রেম নিতে পারেনি। সে এবং তার পরিবার ধর্মের নামে তার কবিতা লেখার বিরোধিতা করতে থাকে। অদ্ভুত ব্যাপার, তাইনা? সব জায়গাতেই মহিলারা ধর্মের নামে নিপীড়ত হন। আমাদের দেশও ব্যতিক্রম নয়। ‘শবরিমালা’ মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তও মানতে রাজি নয় গোঁড়া হিন্দু সংগঠনগুলি। মহিলাদের জন্য অনেকগুলো ‘না’ পুরুষশাসিত ধর্ম এবং রাজনীতি নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, কোনও ধর্মই ব্যতিক্রম নয়। তুমুল লড়াই, আত্মবলিদানের মাধ্যমে মহিলারা শিক্ষা থেকে ভোট, চাকরি থেকে খেলাধুলো করার অধিকার পেয়েছেন। সতীদাহ সময়ের নিরিখে খুব একটা পুরনো ঘটনা কিন্তু নয়। যাইহোক, নাদিয়া ঠিক করে যে সে তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘এক শবদ দিলহোরে’ ( অফুরন্ত ভয়) প্রকাশ করবে। বইটিতে তার বিবাহিত জীবনের ব্যর্থতাজনিত বিষাদের ছায়া ছিল। স্বামী মাজিদ নেইয়া এবং তার পরিবারের সক্রিয় বিরোধিতা সত্ত্বেও নাদিয়া বই প্রকাশের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। অশান্তি বেড়ে চলে। ২০০৫ সালের ‘ইদ-উল-ফিতর’-এর দিন আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা নিয়ে মাজিদের সঙ্গে নাদিয়ার বাদানুবাদ হয়। কবিতা লেখার জন্য আগে থেকেই ক্ষিপ্ত মাজিদ নাদিয়াকে মারতে শুরু করে। মারতে মারতে মেরে ফেলে নাদিয়াকে। মারের চোটে নাদিয়া শেষ নিশ্বাস ফেলার আগে রক্ত বমি করে। মাজিদ পরে এই ঘটনাকে বিষক্রিয়া হিসেবে চালায় এবং বলে যে নাদিয়া আত্মহত্যা করেছে। মাত্র এক মাস জেল খেটে সে বেরিয়ে আসে। নাদিয়া মাত্র ২৫ বছর বেঁচেছিল। এই স্বল্প জীবনেই সে স্মরণযোগ্য বেশ কিছু কবিতা তার পাঠকদের জন্য রেখে গেছে। এই নিবন্ধের শেষে নাদিয়ার একটি কবিতা পড়া যাক, অবশ্যই ভাবানুবাদেঃ
 
গজল
…….
 
সুরা চাই তার সুন্দর থেকে, তৃপ্ততা চাই আমি
তার অগ্নিপ্রবণ প্রেমের শিখায় পুড়তে পুড়তে 
রানি হতে চাই হৃদয়ের
আমি হতে চাই শুধু একফোঁটা জল সুন্দর দুটি চোখের 
সেতো ফুলই, সেই ফুললিত মুখে হতে চাই আমি 
 কোঁকড়া চুলের সৌরভ
অথবা তার চলার পথেই ধুলো যদি হতে পারতাম
 
তীব্র গরমে গলতে গলতে আমি যদি হয়ে উঠতাম
 গোপন পঙ্ ক্তি, বিরল শব্দ ওর দুঠোঁটের সান্নিধ্যে
তার শ্বাসের ছায়া তারই পায়ে পায়ে হায় যদি হতে পারতাম
 আর থাকতাম যদি তার সঙ্গে এভাবে, এমনিই সারাদিন 
আমি বোঝাতে পারতাম এই বিচ্ছেদে তবে নিজেকেই
যে, আমি আমার মনের দরজা বন্ধ করেই দিচ্ছি
আমি হয়ে যাচ্ছি মাথা থেকে পা চাঁদের আলো ক্রমশ
……………………………………………………………