অর্ণব সাহা-র গল্প

Spread This

অর্ণব সাহা

রেড করিডর
এখন পড়ন্ত বেলার আকাশ এসে মিশেছে সমুদ্রের ধূসর দিগন্তরেখায় । এই ছোট্ট দোতলা বাড়ির ব্যালকনিতে বসে দেখতে পাচ্ছি ওদের । মাধবী আর আমাদের মেয়ে তিতাস । বিশাল নোনা জলের ঢেউয়ের ভিতর ওদের কোমর অব্দি ডুবে গেছে । মায়ের গায়ে জল ছুঁড়ে দিচ্ছে তিতাস । মাধবীও হেসে উঠে আঁজলা ভরে জল ছুঁড়ে দিল মেয়ের গায়ে । দুজনেরই সালোয়ার ভিজে একশা । এতোদূর থেকে টেরও পাবে না কেউ,  মাত্র চল্লিশ পেরোনো বয়সেই কতোখানি বুড়িয়ে গেছে মাধবীর শরীর । তার মুখে আজ বলিরেখা, পরিশ্রম, অনটন আর অনিশ্চয়তার । উচ্ছল তিতাসের মেধাবী চোখের দীপ্তিও সেই ক্লান্তি ঢাকতে পারে না । দীর্ঘ পনেরো বছর আমাদের সংসারটা একলাই টেনে নিয়ে চলেছে মাধবী । তিতাসের এখন তেরো । ক্লাস এইট । মাঝে মাঝে পিছন ফিরে তাকালে অবাক লাগে, কীভাবে উত্তাল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ একটা গোটা জীবন আমি বয়ে নিয়ে এলাম । মাধবী পাশে না থাকলে হয়তো এটা অসম্ভবই হত । হয়তো আরও ঢের আগেই আমার থ্যাঁতলানো মৃতদেহ পড়ে থাকত মালকানগিরি বা অবুঝমাড়ের জঙ্গলে । তাতেও অবশ্য আমার কোনো আক্ষেপ ছিল না । আমি যেদিন এই পথে পা রেখেছিলাম, সেদিন তো জানতামই আর কোনোদিনই ঘরে ফেরা হবে না আমার । তবু যে আজ স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে এই তাজপুরের নির্জন সাগরসৈকতে সময় কাটাচ্ছি আমি, সেটাই কি আশ্চর্য নয় ? বোধহয় এই দুটো মানুষের অদৃশ্য বন্ধন আমায় মরে যেতে দেয়নি । আজও গড়পরতা বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ ও পরিবার মেনে নেয়নি, নেবেও না আমাকে । জানি । আমিও চাই না তাদের বিব্রত করতে । বরং যেকটা দিন বেঁচে থাকব, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান আর বুকের ভিতর জোর-করে নিবিয়ে দেওয়া আগুনপাহাড়টাকে জ্বালিয়ে রাখার এক শান্ত, নিঃশব্দ শপথ নিয়ে এভাবেই কেটে যাবে বাকি দিনগুলো । এইভাবেই ।
ওরা সেদিন এসেছিল রাত প্রায় সাড়ে দশটা নাগাদ । দুটো মোটরবাইকে মোট চারজন । অকথ্য খিস্তি দিচ্ছিল ডাকু নামের ছেলেটা । ওর ইশারায় দিলীপ আর আজিজুল ছুটে গিয়ে ঢুকল ঘরে । তাকের উপর  রাখা বাসনপত্র টেনে ছুঁড়ে ফেলল উঠোনে । বুকর‍্যাক থেকে টেনে নামিয়ে উঠোনে ডাঁই করতে লাগল আমার যাবতীয় বইপত্র । বাড়িওয়ালা ঘর ছেড়ে দেবার নোটিশ দিয়ে চলে গেছে অন্যত্র । বাকি দুজন ভাড়াটেও উঠে গেছে ছ’মাস আগে । এই তিনতলা বাড়ি প্রোমোটিং হবে, বাড়িওয়ালা সেকথা আগেই জানিয়েছিল । কিন্তু, মাধবীর উদয়াস্ত টিউশন-সম্বল আমাদের পরিবার এই অল্প ভাড়ার বাড়ি থেকে বলামাত্র উঠে যেতে পারেনি । তিতাসের স্কুলের পড়ার খরচ, টিউশন খরচ, আমার চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতেই মুখে রক্ত উঠে যায় মাধবীর । প্রোমোটারের সঙ্গে রফাও সম্পূর্ণ হয়নি আমাদের । যে টাকা আমাদের দেবার কথা, তার অর্ধাংশও আজ দেব-কাল দেব করতে করতে এখনও দিয়ে ওঠেনি সে । প্রোমোটারের খাস লোক দেবু মেইন গেটের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছিল । উঠোনে স্তূপীকৃত বইয়ের মধ্যে তখনও উঁকি  মারছে ধনঞ্জয় দাশের ‘মার্কসবাদী সাহিত্য বিতর্ক’, ‘এপ্রিল থিসিস’, ‘প্যারি কমিউন প্রসঙ্গে’, পল সুইজির ‘বিপ্লবোত্তর সমাজ’, বাংলা অনুবাদে ‘এমপিরিও ক্রিটিসিজম’, মাইকেল প্যারেন্টি-র ‘এগেইনস্ট এমপায়ার’, পাবলো নেরুদা-র ‘অনুস্মৃতি’, ‘ভেনেজুয়েলা—রূপান্তরের লড়াই’, বিনোদ মিশ্র-র লেখা ‘ফ্রম দ্য ফ্লেমিং ফিল্ডস অফ বিহার’, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’, ছেঁড়া ‘গীতবিতান’, ‘গল্পগুচ্ছ’, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ‘উপন্যাস সমগ্র’, জগদীশ গুপ্ত-র ‘শ্রেষ্ঠ গল্প’-সহ অজস্র বই । আর গত দু-দশক ধরে জমানো আমাদের পার্টির বিপুল ডকুমেন্টস, ‘পিপলস মার্চ’-এর পুরোনো সংখ্যা, আমার নিজের হাতে বিভিন্ন সময়ে ড্রাফট করা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ গোপন দলিলের ছাপা সংস্করণ । সেদিনের  রাতটার কথা ভাবতে গিয়ে চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল আরেকবার । আমি শূন্য বাতাসে ভর করে উঠে  দাঁড়াতে চাই । পরক্ষণেই মনে পড়ে ক্রাচ ছাড়া আজ এক-পাও হাঁটা সম্ভব নয় আমার পক্ষে । কারণ, আমার বাঁ পা-টা হাঁটুর নীচ থেকে নেই । বাসি মলিন পাজামা ঝুলছে ওখান থেকে । ২০১৪-র মার্চ মাসে ছত্তিশগড়ের জগদলপুরের এক রিমোট থানা আক্রমণ করেছিল আমাদের স্কোয়াড । আমরা ভাবতেই পারিনি পুলিশ আর সি.আর.পি.এফ এতোখানি প্রস্তুত ছিল আমাদের জন্য । সেই অসম লড়াইয়ে আমাদের চার মহিলা সদস্য সহ মোট সাতজন শহিদ হয় । আমরা তখন অবশিষ্ট কয়েকজন রিট্রিট করছি । স্পেশাল কমব্যাট ফোর্সের একটা বিরাট বাহিনী ঘিরে ফেলে আমাদের । আমার হাতের অটোমেটিক রাইফেল ছিটকে চলে যায় । ততোক্ষণে আমার ডান কাঁধ মারাত্মক জখম । পুলিশের ছোঁড়া গ্রেনেডে আমার বাঁ-পায়ের হাড় হাঁটুর নীচ থেকে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় । জ্ঞান হারাই আমি । দু’দিন পরে যখন চেতনা ফেরে আমি সদর হাসপাতালের বেডে আধশোয়া । আমার ডান হাত লোহার খাটের সঙ্গে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে বাঁধা । সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা । বারবার সংজ্ঞা হারাচ্ছিলাম আমি । সুস্থ হয়ে ওঠার পর কোর্টে চালান করে ওরা আমায় ।
পরের বছর, ২০১৫-র জুনে পার্টির কেন্দ্রীয় মিলিটারি কমিশনের আরও দুই সদস্যের সঙ্গে আমিও আত্মসমর্পণ করি ছত্তিশগড় সরকারের কাছে । আমার এক দশকের আন্ডারগ্রাউন্ড জীবনের সেই ইতি । যদিও নেতৃত্বের সঙ্গে একের পর এক প্রশ্নে ও বিতর্কে বিভাজনটা তৈরি হচ্ছিল অনেক আগে থেকেই ।  হয়তো এমনিতেও পার্টি ছাড়তে হত আমায় । ততোদিনে আমার মেয়ের বয়স দশ বছর হয়ে গেছে । মাধবী  আমার বা ওর বাপের বাড়ি—কোথাওই আশ্রয় পায়নি । ওরা থাকত রুবি বাইপাসের পিছনের একটা কলোনিতে । একদিনের জন্যও অনুযোগ করেনি  ও আমার বিরুদ্ধে । একবারের জন্যও বলেনি পার্টি ছেড়ে চলে এসো, সংসারের দায়িত্ব নাও । দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়ে গেছে । আয়ার কাজ, টিউশনি করে বড়ো করে তুলেছে তিতাসকে । আমাদের মেয়ে তিতাস সরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ে । বরাবর । ভাবলে আশ্চর্য লাগে, আমি আর মাধবী দুজনেই ছিলাম যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল ছাত্র-ছাত্রী । বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্ররাজনীতিতে হাতেখড়ি আমাদের । প্রথমদিকে ও আমার সঙ্গেই পার্টির কাজ করত । পরে, আমি ঘর ছাড়লাম । প্রথমে ওড়িশা, পরে বস্তারের  জঙ্গলে আমাকে  পাঠাল পার্টি । গেরিলা ট্রেনিং নিতে । ততোদিনে মাধবী গর্ভবতী । মেয়ের জন্মের সময় আমি ওর পাশে ছিলাম না । আমাদের পার্টির এক সিমপ্যাথাইজারের বাড়িতে ও ছিল তখন । সোদপুরে । মেয়ে জন্মানোর প্রায় এক সপ্তাহ বাদে আমার কাছে খবর পৌঁছয় । আমি তখন বাইলাডিলা খনি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরের কিরণডুল নামে এক শ্রমিক-বেল্টে, যেখানে কয়লাখনির আদিবাসী শ্রমিকদের নির্বিচারে উচ্ছেদ করা হচ্ছে । ইতিমধ্যেই ওই এলাকার অধিকাংশ খনি বিক্রি হয়ে গেছে বহুজাতিক  সংস্থাগুলোর কাছে । পাশেই ইন্দ্রাবতী নদী । মনে আছে নদী পেরিয়ে গ্রামের এক হতদরিদ্র পরিবারের ঘরে সেদিন রাতে আশ্রয় নিয়েছিলাম আমরা । চাটাই পেতে শুয়েছিলাম, যখন আমাদের স্কোয়াড কম্যান্ডার কৃষ্ণমূর্তির মোবাইলে খবরটা এল । গোটা ছত্তিশগড় জুড়ে আমাদের নিকেশ করার জন্য সরকার তখন সালওয়া জুড়ুম-এর অভিযান শুরু করেছে । গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যাচ্ছে, উচ্ছেদ হয়ে যাচ্ছে । আমার ঘরে ফেরার কোনো উপায় ছিল না । মেয়েকে প্রথম দেখতে পেলাম যখন ওর এক বছর বয়স । খড়দার এক পার্টি-কর্মীর বাড়িতে খুব গোপনে একরাতের জন্য এসে আমি দেখে গিয়েছিলাম আমার তিতাসকে । ওকে কোলে নিয়ে আমি যখন কেঁদে ফেললাম, মাধবীর চোখে তখন এক অভূতপূর্ব গর্ব । আমার কাছে কোনোদিন কোনো কিছু দাবি করেনি সে । যেন তার অন্তরাত্মা বুকের গভীর থেকে বলে উঠেছিল—“ভালো থেকো কমরেড । মেয়েকে নিয়ে ভেবো না । আমি তো আছিই”। পরদিন ভোররাতে যখন খড়দার শেল্টার ছেড়ে আমি বেরিয়ে আসছি, আমার হাতদুটো জড়িয়ে ধরেছিল মাধবী । তখনও ওর চোখের কোণে কালি পড়েনি । মুখের চামড়ায় ভাঁজ পড়েনি আজকের মতো । ওর ওই দুটো চোখ পরবর্তী কয়েক বছর ধরে ছিল আমার নিশ্চিত আশ্রয় । কতোবার, যখন সি.আর.পি.এফ-কোবরার জয়েন্ট অপারেশন চলছে, ক্রমাগত ব্রাশফায়ার করছে সরকারি বাহিনী, পিছু হটতে হটতেও আমি টের পেয়েছি, আমার পিছনে চালচিত্রের মতো দাঁড়িয়ে আছে সে, মাধবী । আমার সমস্ত শক্তির নেপথ্য উৎস । আমার মিউজ । বিপ্লব এক অসম্পূর্ণ ব্যর্থ মহাকাব্য । আর, আমরা সেই মহাকাব্যের পার্শ্বচরিত্র । আমাদের সকলের প্রেরণা হয়েই যেন শব্দ সাজিয়ে চলেছেন কবিতার অধিষ্ঠাত্রী দেবী । নিয়তি ।
সেদিন রাতের ঘটনার পর থানায় ছুটে যাওয়া, লোকাল কাউন্সিলারের কাছে দরবার করা, মানবাধিকার সংগঠনের বন্ধুদের জানানো, তাদের নিয়ে থানায় ডেপুটেশন দেওয়া—সব কাজই একা হাতে সামলেছে মাধবী । কলকাতায় ফিরে আসার পর একধরনের তীব্র ডিপ্রেশন শুরু হয় আমার । বিভিন্ন থার্ড ফ্রন্টের বন্ধুরা এসে আবার কাজ শুরু করতে বলে । কিন্তু আমি ভিতরে ভিতরে ফুরিয়ে গিয়েছিলাম । আমার চরম  নিঃসঙ্গতা, অবসাদ, শারীরিক অসহায়তা একা হাতে সামলেছে মাধবী । বিকেলবেলায় একটা কোচিং সেন্টারে পড়াতে যেত সে । আর আমি পাড়ার মোড়ে বুয়াদার চায়ের দোকানে চুপচাপ বসে থাকতাম ।  সকালের বাসি কাগজ পড়তাম । ফেরার পথে মাধবী আমায় নিয়ে ঘরে ফিরত । ওই রাস্তাটুকুও আমার একক জীবনে এক অনন্য অনুভূতির উদ্ভাস নিয়ে আসত প্রত্যেকটা দিন । রাতে মেঝেয় গোল হয়ে আমি, মাধবী, তিতাস যখন একসঙ্গে খেতে বসতাম, মনে হত, কোনো কিছুই ফুরোয়নি আমার জীবন থেকে । চোখের সামনে অসম্ভব ভালো রেজাল্ট করে নতুন ক্লাসে উঠছে তিতাস । এক চেনা সাংবাদিক বন্ধুর সৌজন্যে একটা ইংরেজি কাগজে সাপ্তাহিক কলাম লেখার বরাত জুটে গেল । সামান্য হলেও একটা অস্থায়ী রোজগার । যদিও পুলিসের কাছে প্রত্যেক মাসে হাজিরা দিতে হত আমায় । রুটিনমাফিক । নতুন বাসা দেখার চেষ্টা করছিলাম আমরা । এই বাড়িটা সত্যিই ছেড়ে দিতে হবে ।
পার্টির পুরোনো লোকজন মাঝেমধ্যে আসত । আমি অবশ্য আজ আর জানি না এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে পার্টির ঠিক কী অবস্থা । আমাদের সেকেন্ড-ইন-কম্যান্ড লালগড়ের জঙ্গলে পুলিশের গুলিতে মারা যাবার পর দক্ষিণবঙ্গে সংগঠন ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় । একদিন স্বপনদা এল । সন্ধের দিকে । আমি তখন সদ্য চায়ের দোকান থেকে ঘরে এসে বসেছি । বলল :
–আছিস কেমন অনিমেষ ?
–জানি না স্বপনদা । আমার আর কোনো কিছুতেই উৎসাহ নেই…
–খোঁজখবর রাখিস কিছু ?
–না গো । আমার সাথে কারো কোনো যোগাযোগ নেই আর…
–কৌশিককে মনে আছে ?
–লম্বা কৌশিক ? গড়িয়ায় থাকত ?
–হ্যাঁ । ও তো অ্যাবস্কন্ড করে ছিল…বাবা মারা যাবার পর একরাতের জন্য বাড়ি এসেছিল…
–আচ্ছা । এখন কোথায় সে ?
–এনকাউন্টারে মারা গেছে । গতমাসে…
–কোথায় মারা গেছে ? ও তো নর্থ বেঙ্গলে কাজ করত…
–খবরটা পুরো ব্লকড করা হয়েছে অনি…ও মারা গেছে ঝিটকার জঙ্গলে…
–এখনও ওখানে স্কোয়াড আছে নাকি ?
–ছিল না । দুটো স্পেশাল স্কোয়াড অনেক কষ্টে কাজ করছে গত একবছর…
মাধবী থামিয়ে দিল আমাদের । বলল—‘স্বপন-দা, ওকে আর এইসব বলে কী হবে ? আমি চাই না ও আর এসবের মধ্যে জড়াক । তার উপর খোঁড়া লোক । ওকে দিয়ে কিছুই হবে না কারো…ওকে ছেড়ে দিন আপনারা…”। চায়ের কাপ হাতে সে ততোক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে আমাদের মাঝখানে…। “তার উপর এই ভাড়াবাড়ির ঝামেলায় আমরা এমনিতেই নাকাল হচ্ছি স্বপন-দা । আপনি তো জানেন আমি কোনোদিন ওকে বাধা দিই নি”
–শুধু তাই নয় মাধবী । তুমি ছিলে পার্টির বহু নতুন ছেলে-মেয়ের চোখে আইডিয়াল…কী স্যাক্রিফাইসটাই না করেছ তুমি…আজও করে চলেছ…”
–ওসব কথা আজ থাক স্বপন-দা । বউদি কেমন আছে ? ছেলে কী করছে আপনার ?
–বউদির শরীর ভালো নেই । আর পলাশ তো এই সদ্য স্কুলের চাকরিটা পেল…
–বাঃ ! দারুণ খবর তো । আপনিও নিশ্চিন্ত হলেন তবে…
–এই নিশ্চিন্তি কি সত্যিই চেয়েছিলাম মাধবী ? এই জীবন কি চেয়েছিলাম ?
–কোনো কিছুই আমাদের মনের মতো হয় না স্বপন-দা—মাঝপথে বাধা দিয়ে বলে উঠি আমি । বাস্তবিক, এই কথাগুলোর কোনো মানেই খুঁজে পাচ্ছিলাম না আমি । স্বপন-দাও চা খেয়ে আস্তে আস্তে ব্যাগ কাঁধে বেরিয়ে গেল । খোলা দরজা দিয়ে দেখলাম, সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছে সে, বরাবরের মতো…
বাড়ি-সংক্রান্ত এইসব ঝুটঝামেলা কিছুটা মিটলে মাধবীই পরিকল্পনা করে তাজপুরে বেড়াতে আসার । আমাদের চেনা এক বন্ধুর দৌলতে এখানে একটা ফাঁকা বাড়ির উপরতলায় দু’রাত থাকার বন্দোবস্ত হল । ভাবতে অবাক লাগে, বিয়ের পর এই প্রথম আমি আর মাধবী একসঙ্গে কোথাও বেড়াতে এলাম । যখন আমাদের মেয়ে রীতিমতো বড়ো হয়ে গেছে । আকাশ আর একটু অন্ধকার হয়ে এসেছে এখন । আরও দূর  সমুদ্রের পেটের ভিতর ছুটে যাচ্ছে মা আর মেয়ে । বারান্দায় বসে অন্য টুরিস্টদের দেখছিলাম আমি । দু’জোড়া ছেলেমেয়ে ছুটতে ছুটতে এক ডাবওয়ালার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল । মেয়ে দুটোর টাইট হটপ্যান্ট আর শরীর-কামড়ে-ধরা স্লিভলেস গেঞ্জিতে উদ্ধত যৌবনের দাপট । ছেলেদুটোর পোশাকেও এই জগৎদুনিয়াকে তাচ্ছিল্য করার ঔদ্ধত্য আর দৃপ্ত অহংকার । আচ্ছা, ওরা কি জানে, এখান থেকে চোদ্দোশ-পনেরোশ কিলোমিটার দূরে ওদেরই বয়সি ছেলেমেয়েরা, যাদের পরিবার দৈনিক কুড়ি টাকাও রোজগার করতে পারে না, যাদের ভিটেমাটিটুকুও নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে বসেছে এই রাষ্ট্রের উন্নয়নের হাতছানিতে, তারা, কোন অসীম সাহসে এই দেশেরই বুকে কয়েকহাজার বর্গ কিলোমিটার জুড়ে বুনে চলেছে এক বিকল্প স্বপ্নের ভ্রূণ ? যারা, খোলামকুচির মতো টাকা ওড়ানোর কথা ভাবতেও পারে না, বরং তাদের শক্ত, কড়া-পড়ে-যাওয়া আঙুল নিশপিশ করে গরম ইনসাসের ট্রিগার ছুঁয়ে সেই স্বপ্নের কেল্লার এক একটা আলগা ইঁট গাঁথার কাজকে আরও একটু এগিয়ে নিয়ে যাবার কাজে । এতোক্ষণে মাধবী আর তিতাসকে বেশ স্পষ্ট দেখতে পাই আমি । গোটা শরীর জলে ভিজে ঝুপ্পুস হয়ে তারা দুজনে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে আসছে বালি ভেঙে । এখন অফ সিজন । মার্চের মাঝামাঝি । খুব শান্ত, নিরিবিলি সাগরসৈকত । আমি ক্রাচে ভর দিয়ে বারান্দার রেলিং-এ ঝুঁকে দাঁড়াই । মা-মেয়ে আমায় দেখতে পেয়ে হাত নাড়ে । আমিও পালটা হাত নেড়ে  সাড়া দিই তাদের । রান্নার জায়গাটা বেশ বড়ো । আমি চায়ের জল চাপাই । ওরা এসে পড়ে । তিতাস বলে—“আজ তুমি কী যে মিস করলে বাবা…”। আমি হেসে বলি—“জানি, আমি বারান্দায় বসেই দেখেছি তোদের মা-মেয়ের কীর্তি”। টাকা নেই আমাদের । মাথার উপর ছাদটুকুও স্থায়ী নয় এই মুহূর্তে । তবু, কোন অমোঘ মন্ত্রবলে এই অদম্য শক্তি অর্জন করেছে মাধবী ? কোন মন্ত্রে সে আমার মতো একটা বাতিল, ফসিল-হয়ে-যাওয়া লোককেও জুগিয়ে যাচ্ছে বেঁচে-থাকার রসদ ?
সন্ধেবেলা, ঘরে বসে টিভিটা অন করি আমি । ইংরেজি আর হিন্দি চ্যানেলগুলোয় চোখ আটকে যায় । মুহূর্তে মনে হয়, আমি কি স্বপ্ন দেখছি ? মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে কয়েকদফা দাবিসনদ নিয়ে পঞ্চাশ হাজার কৃষকের দৃপ্ত মিছিলটা ঢুকছে বাণিজ্যনগরী মুম্বাইতে । লালে লাল আজাদ ময়দান চত্বর । গোটা টিভি স্ক্রিন জুড়ে কেবল লাল পতাকার ঢেউ । লাল লহর । আমার শরীরে কাঁটা দেয় । চোখ ফেটে জল আসে । মাধবী  কখন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, টেরও পাইনি । আমার কাঁধে হাত রাখে সে । আমিও ডান হাতের মুঠোয় চেপে ধরি তার আঙুল । মারাঠা ডাব্বাওয়ালা, ধারাভি বস্তির গরিব জনতা, গোটা মুম্বাইয়ের মেহনতি মানুষ তৃষ্ণার জল আর কৃষকের ফাটা পায়ের শুশ্রূষার জন্য নতুন চপ্পল নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে । মাধবী বলে—“শোনো, রাস্তা থেকে খাবার কিনে আনব আজ…কেমন ?”। আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না । তিতাসকে নিয়ে আর একবারের জন্য বাইরে বেরিয়ে যায় মাধবী ।
#
আমি একদৃষ্টে টিভি স্ক্রিনের দিকে চেয়ে ঠায় বসে থাকি । লাল রঙের তেজ আর জৌলুস বাড়তেই থাকে…
মাসতিনেক কেটে গেছে । আমরা ওই বাড়ি থেকে উঠে এসেছি । চিংড়িহাটা অটো স্ট্যান্ডের কাছে ‘নবপল্লি’ বলে একটা কলোনিতে দেড় কামরার ঘর নিয়েছি একটা । মাধবী এর মধ্যে একটা ছোটো প্রাইভেট স্কুলের মন্টেসরি সেকশনে পড়ানোর চাকরি পেয়েছে । আমার জীবন কেটে চলেছে একইভাবে,  গতানুগতিক । বদল নেই কোনো । তবে বেশ কিছুদিন এই চত্বরে থাকতে থাকতে অনেক নতুন লোকজনের সঙ্গে চেনা-পরিচয় হয়েছে । তারা নিতান্তই সাধারণ এলাকাবাসী । বিশেষত এখানকার অটো ইউনিয়নের  ছেলেগুলো খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে আমার । যখন নিজেকে বাতিল, ছুঁড়ে-ফেলা আবর্জনা বলে মনে হত  এক একদিন, তখনই একটা লোকাল ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ি আমি । পাশেই ট্যাংরা পুলিশ স্টেশন । সেখান থেকে অটোচালকদের উপর হুজ্জোত করাটা একরকমের রেওয়াজ হয়ে গিয়েছিল এখানে । আর, বেআইনি অটোর সংখ্যা এই রুটে প্রচুর । আমিও পরম মমতায় জড়িয়ে যাচ্ছিলাম এই গরিব, কম-লেখাপড়া জানা ছেলেগুলোর সঙ্গে । এমনকি, তাদের পরিবারের লোকজনও আমার আত্মীয় হয়ে উঠছিল ক্রমশ । ইউনিয়ন সেক্রেটারি সাধন ছেলেটা গ্র্যাজুয়েট । এলাকায় দাপিয়ে শাসক দলের সংগঠন করে । অথচ, ওর বাড়িতেই  এক রাতে রেইড করল পুলিশ । সকলেই জানে কলকাতার প্রত্যেকটা অটো রুটে পুলিশকে নিয়মিত কমিশন দিতে হয় । এরাও দিত । কিন্তু বছরখানেক আগে সল্টলেক স্টেডিয়ামে যুব-বিশ্বকাপ চলাকালীন ইস্টার্ন বাইপাসের ওই এলাকা জুড়ে ব্যাপক বস্তি উচ্ছেদ হয় । সৌন্দর্যায়নের নামে এই বেপরোয়া উচ্ছেদে এলাকার গরিব মানুষ রীতিমতো বিরক্ত ছিল পুলিশ-প্রশাসনের উপরে । সাধনের বাড়িতে পুলিশ রেইডের  পর আমি থানায় গেছিলাম ওকে ছাড়িয়ে আনতে । আশ্চর্য লাগল, ওসি আমায় বেশ ভালোই চেনেন দেখে । কাগজপত্রে সইসাবুদ চুকে গেলে, সামান্য হেসে আমায় জিগেস করলেন—“ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে…আপনার পুরোনো নকশালি অভ্যেসগুলো এখনও ছাড়তে পারলেন না, তাই না ?” আমায় এখনও নিয়মিত লালবাজারে হাজিরা দিতে যেতে হয়, সেটাও উনি দেখলাম খুব ভালোই জানেন । যেভাবে কথা বলছিলেন, মনে হল প্রচ্ছন্ন হুমকির সুর মিশে আছে তাতে । আমি অবশ্য ভয় পাইনি একটুও ।  যে মারাত্মক জীবন কাটিয়ে এসেছি এতোদিন, তাতে ভয় পাবার কারণও নেই । আমার এই খতরনাক অতীতের জন্যই এখানকার মানুষ আমায় আজ এইটুকু সম্ভ্রম করে । আমার যদিও আজ আর কোনো স্বপ্ন অবশিষ্ট নেই । শুধু, চারপাশের মানুষের সঙ্গে জড়িয়ে থাকার আদিম ইচ্ছেটুকু মরেনি । তিনমাস আগে তাজপুরের সেই ফাঁকা বাড়িতে বসে টিভি-তে দেখা হাজার হাজার উত্তাল লাল পতাকার মিছিল এর মধ্যেও বেশ কয়েকবার স্বপ্নে দেখেছি ।  মাধবীর স্মার্টফোনে গুগল সার্চ করেও ওই সংক্রান্ত যাবতীয় ক্লিপিংস দেখি মাঝেমধ্যেই । এখানেও একটা ছোট্ট চায়ের দোকান আমার সারাদিনের অস্থায়ী ঠেক হয়ে উঠেছে । সকালে মাধবী আর তিতাস বেরিয়ে গেলে কিছুক্ষণ বইপত্র নাড়াচাড়া করি । তারপর আস্তে আস্তে ক্রাচে ভর দিয়ে হেঁটে আসি এই রঞ্জিতের চায়ের দোকানে । প্রথম প্রথম এই বস্তি-এলাকার বাচ্চাগুলো আমি রাস্তায় বেরোলেই আওয়াজ দিত—“ল্যাংড়া যাচ্ছে”। কেউ কেউ বলত “ল্যাংড়া নকশাল”। পাশের বাড়ির কুসুমের মা ওদের একটা বাচ্চার গায়ে হাত তোলে এই কথা শুনে । আমি আপত্তি করেছিলাম । কিন্তু, সেদিনের পর থেকে বাচ্চাগুলো আর পিছনে লাগার সাহস পায়নি । সেদিন পুরোনো বইপত্র নাড়াচাড়া করতে করতে আমারই নিজের একটা ডায়েরি খুঁজে পেলাম । বস্তারে থাকার সময় একটা টানা গদ্য লিখছিলাম । ভয় ছিল, পুলিশের হাতে যেন কোনোভাবেই এটা না পড়ে । অবশ্য কোনো গোপন সাংগঠনিক কথা বা তথ্যই লিখতাম না এখানে । আসলে এর বিরাট অংশ জুড়ে ছিল তিতাসকে লেখা আমার একটা লম্বা চিঠি । মনে আছে শুরু আর শেষের এন্ট্রির সময় তিতাসের বয়স মাত্রই তিন আর চার বছর । প্রত্যেক মুহূর্তে মনে হত যেকোনো দিন পুলিশের  বুলেট এসে বিঁধবে আমার বুকে । আমার যে সন্তানকে আমি কোনোদিন দেখতে পাব না, যার জন্য পার্থিব কোনো কিছুই রেখে যেতে পারব না আমি, তার জন্য আমার এই নিঃসঙ্গ, একক স্বপ্নের পাঠমালা, এটাই ওর জন্য ওর বাবার শেষ উপহার হয়ে থাকুক । পাতাগুলো কিছুটা হলেও আলগা হয়ে এসেছে । সেদিন একলা ঘরে বসে পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা নির্দিষ্ট এন্ট্রিতে চোখ আটকে গেল :
 তুই কী করছিস এখন ? আমি যে নদীটার কিনারে বসে আছি তার নাম শঙ্খিণী । আমার এই  লেখা যখন তোর কাছে পৌঁছবে, সেদিন হয়তো আর আমি বেঁচে থাকব না । আমায় চিনিস তুই ? সম্ভবত না । কেবল গল্প শুনেছিস আমার…তাও মায়ের মুখে । তোর বাবা একটা অসম্ভব স্বপ্নের পিছনে ছুটেছিল । এই স্বপ্নই আমায় পিষে মারবে একদিন…পাখি ডাকছে চারপাশে ।  জানিস, আজ প্রায় এক সপ্তাহ বাদে চুনো মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেলাম । আমি যে মাইলের পর মাইল হেঁটে যাই, যাদের মধ্যে কাজ করি, তারা এর চেয়েও কম খাবার খেয়ে বেঁচে  থাকে…মাথার উপর দিয়ে এইমাত্র উড়ে গেল একঝাঁক বুনো টিট্টিভ । তুই স্কুলে ভর্তি হয়েছিস আমি জানি । কী টিফিন নিয়েছিস আজ ? আমি যেখানে আছি, সেখানকার লোক ইলেকট্রিক লাইট দেখেনি, সিনেমা হলে যায়নি কোনোদিন । কিন্তু এদের আত্মসম্মানবোধ প্রবল । এরা গত দুশো বছর ধরে সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে । হেরে গেছে । তবু লড়েছে । তোর বাবাও আসলে একটা হেরে-যাওয়া লোক । যে জানে তার এই অসম যুদ্ধ শেষ অব্দি ব্যর্থ হবে । তবু মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আমি লড়ব । তোর মতো হাজার হাজার বাচ্চার জন্য আমায় এই লড়াইটা  চালিয়ে যেতে হবে । তুই কি আদৌ কোনোদিন বুঝবি আমায় ? হয়তো বড়ো হয়ে ঘেন্না করতে
শিখবি আমায় । যেরকম ঘেন্না আমি পেয়েছি আমার নিজের বাবা-মা-ভাইয়ের কাছ থেকে চিরকাল । তবু যদি কোনোদিন মনে হয় তোর বাবা সামান্য হলেও ঠিক পথে হাঁটার চেষ্টা করেছিল, মাঝে মাঝে মনে করিস আমায়…সূর্য ডুবে আসছে । আমিও এখন গাছের নিচে আমাদের অস্থায়ী ক্যাম্পে ফিরব এইবার । নীল ত্রিপল গাছের নিচে বিছিয়ে রাতে ঘুমোই আমরা । আমার কিন্তু একটুও খারাপ লাগে না । শুধু তোর আবছা মুখটা মনে পড়ে । শুধুই তোকে মনে পড়ে আমার…
জানি, এই লেখায় আবেগই বেশি । আবেগ ছাড়া এর কোনোই মূল্য নেই । কিন্তু, আমাকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে তিতাস একেবারেই অন্যরকম হয়েছে । সেটা হয়তো ওর মায়ের জীবনের কঠোর পরিশ্রম আর শিক্ষায় । আজও ওর বন্ধুরা প্রায় সকলেই এই বিরাট অঞ্চলের বস্তির ছেলে-মেয়েরা । ওর সঙ্গে প্রায়ই আমাদের বাসায় আসে পড়া বুঝতে যে মেয়েটা, সেই মালতী সন্ধেবেলা লোকের বাড়িতে রান্নার কাজ করে । মালতীকে দেখলেই আমার, কেন জানি না, বস্তারের স্বরূপার কথা মনে পড়ে । সেদিন যখন নদীর পাড়ে বসে ডায়েরি লিখছি একমনে, স্বরূপা আমার কাছ ঘেঁষে বসল । বলল : “কী লিখছ গো ?”। আমি বললাম চিঠি লিখছি মেয়েকে । একমুহূর্তে উদাস হয়ে গেল ও। জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে ? দেখলাম মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে । মনে হল কাঁদছে । বলল, ওরও একটা ছোট্ট মেয়ে ছিল, স্বামী ছিল । স্বামীকে মিথ্যে কেস দিয়ে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ, কারণ, সে গ্রামের জোতদারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল । লক-আপে পিটিয়ে মেরে ফেলে পুলিশ তার স্বামীকে । তারপর একদিন ছোট্ট মেয়েটার এল প্রবল জ্বর । হাতে-পায়ে ধরেও কয়েক  কিলোমিটার দূরের ডাক্তারকে আনতে পারল না স্বরূপা । বিনা চিকিৎসায় মারা গেল ওর ছোট্ট মেয়েটা । শ্বশুরবাড়ির লোকেরা অপবাদ দিল ও নাকি ডাইনি । বরকে খেয়েছে, মেয়েকে খেয়েছে । এবার পরিবারের বাকি সকলকে খাবে । সেখানেও ঠাঁই হল না ওর । বাড়ি ছেড়ে পালাল স্বরূপা । ঘুরতে ঘুরতে এই স্কোয়াডে যোগ দিল । এখানে এসেই শিখল রাইফেল চালাতে, শিখল সামান্য ডাক্তারি, যা সেদিন জানলে ওর মেয়েটা অকালে ওভাবে মারা যেত না । বস্তারের গভীর অরণ্যের ‘মুক্তাঞ্চল’-এ পৌঁছেও কয়েকদিন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আমি । কোবাড গান্ধির সঙ্গে কথা বলার সময় কখনও মনেও হয়নি এই নিরীহ লোকটারই মাথার দাম কেন্দ্রীয় সরকার ঘোষণা করেছে পঞ্চাশ লক্ষ টাকা । একটা ছড়ানো এলাকা  জুড়ে ক্যাম্প, ভলিবল আর ব্যাডমিন্টনের কোর্ট । একপাশে অস্ত্রাগার । সারি সারি কালাশনিকভ আর  অটোমেটিক রাইফেল । যে মেয়েটা কিশোরীর উচ্ছলতায় ভলিবল খেলছে, সে মুহূর্তের ভিতর ইনসাস রাইফেল হাতে হয়ে উঠতে পারে রাষ্ট্রের মৃত্যুদূত ।
এক পলকে ঘোর ভেঙে গেল আমার । দরজাটা ভেজানো ছিল । তিতাস এক ধাক্কায় দরজা খুলে ভিতরে ঢুকল । বলল : “খবর পাওনি বাবা ? শিগগির চলো বড়ো রাস্তায়…আমাদের স্কুল ছুটি দিয়ে দিয়েছে!” আমি চমকে উঠে জিজ্ঞেস করারও সময় পেলাম না, কী হয়েছে, ও আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টানতে টানতে
নিয়ে চলল চিংড়িহাটা মোড়ের দিকে । আমি তখনও হতচকিত, বুঝতেই পারছি না ঠিক কী ঘটেছে । নাবাভাঙার মাঠটা পেরিয়ে আমি আর তিতাস গলি-ঘুঁজি দিয়ে চলেছি বড়ো রাস্তার মোড়ের দিকে । বাঁদিকে ক্যাপ্টেন ভেড়ির দিক থেকে, মেট্রোপলিটন কো-অপারেটিভ সোসাইটি  আর চব্বিশ নম্বর কলোনি থেকে শ’য়ে শ’য়ে মানুষ ছুটে যাচ্ছে থানার সামনেটায় । কী ঘটেছে ওখানে ? তিতাসের অসংলগ্ন কথাবার্তা থেকে বুঝলাম একটা মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে । তিনটে স্কুলের বাচ্চা ছেলে-মেয়ে রাস্তা ক্রস করছিল । একটা সরকারি বাস ওদের পিষে দিয়েছে । গোটা এলাকায় বীভৎস জ্যাম । গোটা রাস্তা জুড়ে মানুষ নেমে এসেছে । ব্যারিকেড করে আটকে দেওয়া হয়েছে রাস্তা । থিকথিক করছে মানুষের মাথা আর পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ গোটা অঞ্চল ।
যখন একলা থাকি, প্রায়ই ভাবি, এই যে দেশের কয়েকটা প্রত্যন্ত পকেটে ঘন অরণ্য অঞ্চলের ঘেরাটোপে কিছু মানুষ হাতে রাইফেল নিয়ে একটা অবাস্তব স্বপ্নকে সাকার করার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, দেশের বিস্তীর্ণ খেটে-খাওয়া মানুষের মধ্যে তার কোনো প্রভাব আছে ? আমি নিশ্চিত ছিলাম, নেই । কেউ জানেই না, তাদের প্রাত্যহিক জীবনকে আরও একটু সহনীয়, সুন্দর করে তোলার জন্য কিছু নির্বোধ মানুষ আজও রাতের পর রাত মাইল মাইল পথ হেঁটে চলেছে, মৃত্যুকে বরণ করে নিচ্ছে স্বেচ্ছায় । কিন্তু আজ, বড়ো রাস্তায় পৌঁছে যখন দেখলাম উত্তাল জনতা একের পর এক সরকারি বাসে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছে, টের পেলাম কয়েক মাস আগে যুব বিশ্বকাপের জন্য গণহারে উচ্ছেদের দগদগে ঘা এখনও ওদের মন থেকে বাসি হয়ে মিলিয়ে যায়নি । জনগণ কোন অসতর্ক মুহূর্তে কীভাবে, কোন অচেনা পদ্ধতিতে নিজেদের ক্ষোভ জানায়, তা জানতে রাষ্ট্রযন্ত্রের এখনও ঢের দেরি আছে । উন্মত্তের মতো ছুটে আসছে হাজার হাজার মানুষ । পুলিশ অসহায় দর্শক । গণ-হিংসার এই অভূতপূর্ব চেহারা কেউই দেখেনি ইদানীং কালে । তাই, একে থামানোর পদ্ধতিও জানা নেই প্রশাসনের । এই কলকাতা শহরের নিচের তলায় যে আশি ভাগ মানুষ কোনোক্রমে বেঁচে থাকে, জন্তুর মতো, অবমানবের মতো, আজ তাদের সব অপমান যেন ফিরিয়ে দেবার দিন । আজ এই অপরিকল্পিত, খাপছাড়া বহ্নুৎসব সেই দিনের পর দিন ধরে চেপে রাখা  ক্ষোভের এক স্ফুলিঙ্গ, এক আকস্মিক বহিঃপ্রকাশ, যার কোনো সমাজতাত্ত্বিক বা দার্শনিক উৎস খুঁজে বের করা দুরূহ । প্রায় অসম্ভব বলেই মনে হয় ।
সাধনকে দেখলাম । সে এই গোটা অপারেশন লিড করছে আজ । আমার কেবলই মনে হচ্ছিল, এই আগুন যদি ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশ জুড়ে একদিন, যদি প্রত্যেকটা বড়ো শহরের মানুষ ঝান্ডা ছাড়া, ব্যানার, ফেস্টুন ছাড়াই নেমে আসে রাস্তায়, মুম্বাইয়ের আজাদ ময়দানে যে উত্তাল পঞ্চাশ হাজার কৃষকের মিছিলের দৃশ্য টিভিতে দেখে সেদিন শিহরণ জেগেছিল, সেরকমই একের পর এক সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে-পড়া নিচুতলার মানুষের মিছিল যদি একদিন হঠাৎ সবকটা মেগাসিটির প্রাণকেন্দ্রগুলো একযোগে দখল করে নেয়…১৯৭৪ সালে টানা চব্বিশ দিনের ঐক্যবদ্ধ রেল ধর্মঘটে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ, যা
অনিবার্য ভাবে ডেকে এনেছিল ’৭৫-এর ‘জরুরি অবস্থা’, যদি আর একবার, আর একটিমাত্র বার দেশের মানুষ জেগে উঠে নিজেদের জানান দেয় নিজেদের অস্তিত্ব, কোথায় থাকবে এই রাষ্ট্রের মিলিটারি আর আমলাতন্ত্র ?
#
তিতাস আমার হাত ছেড়ে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে । এলোপাথাড়ি ঢিল ছুঁড়ছে ছেলেমেয়েরা পুলিশকে লক্ষ করে । পুলিশ কাঁদানে গ্যাস আর লাঠিচার্জ করে এই উন্মত্ত জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে । স্বাভাবিক । এই উত্তাল জনসমুদ্রের সামনে গুটিকতক রাষ্ট্রের পাহারাদারও আজ অসহায় । দাউদাউ করে জ্বলছে পরপর তিনটে সরকারি বাস । আমার চেনা এলাকার মানুষগুলোকে এইভাবে এক ভয়ানক মারণ-খেলায় মেতে উঠতে দেখে আশ্চর্য লাগছিল সেদিন । ম্যাক্সিম গোর্কি যাদের ‘লোয়ার ডেপথ’ বলেছিলেন, সেই অবদমিত, প্রাত্যহিক জীবনে অপমান সহ্য-করে-বেঁচে-থাকা মানুষগুলোর ভিতর কি তবে আজও কোথাও লুকিয়ে আছে এক তীব্র প্রতিশোধের দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা ? যার হদিশ আমাদের শিক্ষিত মনে ধরা পড়ে না ? তিতাস এখন আরও সামনে এগিয়ে গেছে । আমার একবার হঠাৎ করে মাধবীর কথা মনে পড়ল । রাস্তার ধারের একটা দোকানের সামনে এসে মোবাইলে ধরলাম ওকে । মাধবী তখন ক্লাসে । ও দেখলাম  অলরেডি জানে সবটুকুই । আমায় বলল , তুমি কেন ওখানে গিয়েছ ? তিতাস ওখানে কী করছে ? ওকে নিয়ে এক্ষুনি বাড়ি ফিরে যাও । আমি সে কথায় আমল দিলাম না । কারণ, তিতাস ততোক্ষণে জ্বলন্ত বাসের একেবারে সামনের দিকে চলে গিয়েছে । আরও বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে তর্ক করছে ও । আমার আশ্চর্য লাগল । আমার রক্ত তবে কোথাও কথা বলছে ওর ভিতর দিয়ে ? আবছা হয়ে আসছিল আমার চারিপাশ ।
কল্পনায় আমি টের পাচ্ছিলাম, চিংড়িহাটা মোড় নয়, এটা আসলে আমাদের ক্রমাগত মানুষ-মেরে, উচ্ছেদ করে ‘উন্নয়ন’ আর ‘প্রগতি’-র দিকে ছুটে চলা শহরের বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা একচিলতে ‘রেড করিডর’ । দুপাশে খাড়াই আর মধ্যিখানে সরু খাত । সেই নিচু খাতে আটকে পড়েছে একটা আস্ত সি.আর.পি.এফ কনভয়ের সাত-আটটা গাড়ি । আর, ওই ঢালু খাত বেয়ে নেমে আসছে কয়েকশ জলপাই উর্দি-পরা রেড স্কোয়াডের সশস্ত্র একটা দল । এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়ছে তারা সেনা-কনভয় লক্ষ করে । নগান্না, অনিল, সুজাতা আক্কা, বিষ্ণু, পুষ্পা এক হিংস্র আক্রোশে ম্যাগাজিন খালি করে দিচ্ছে সেনা জওয়ানদের লক্ষ করে । পরপর ছোঁড়া দুটো রকেট লঞ্চারের আঘাতে বিকট বিস্ফোরণে শূন্যে উড়ে গেল দুটো সেনাবাহিনীর জিপ । মাত্রই দেড়ঘন্টার অ্যামবুশ । কমপক্ষে তিরিশজন মিলিটারি নিহত । হয়তো মিথ্যা আর অত্যন্ত সাময়িক এই বিজয়ের স্বস্তি । এরপর এলাকার গ্রামগুলোতে চিরুনি তল্লাশি চালাবে ‘গ্রে-হাউন্ড’ আর ‘কোবরা’ বাহিনী । আবার জঙ্গলে পালিয়ে বেড়ানোর অনিশ্চিত জীবনে চলে যেতে হবে আমাদের…কিন্তু, এই মুহূর্তে আমার রক্ত সচল হয়ে উঠছে আবার । আমার চোখের সামনে ক্রোধোন্মত্ত জনতা আর দাউদাউ জ্বলতে-থাকা তিনটে এয়ারকন্ডিশনড সরকারি বাসের কঙ্কাল…