শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ-এর গল্প

Spread This

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

চোর
 
গভীর অন্ধকারের মধ্যে রাধাবিনোদের ঘুম এতক্ষণ নিরুপদ্রবে চলছিল। অবশ্য তার বউ মেয়ের জন্য এ উপদ্রব। কেন না রাধাবিনোদের নাকডাকা কামান গর্জনের চেয়ে কম কিছু নয়। সে জন্য তার শোয়ার ঘর এখন আলাদা। আর তারা ফতোয়া দিয়েছে আগে তারা ঘুমোবে তারপর রাধাবিনোদ। অগত্যা তাই-ই হয়। খেয়েদেয়ে রাধাবিনোদ সামনের উঠোনে পায়চারি করে খানিকক্ষণ। ততক্ষণে মেয়ে এবং মেয়ের মা রান্নাঘর ও সংসারের অন্যান্য সব কাজ সেরে শুতে যায়। শুলেই তো ঘুম আসে না। তাই রাধাবিনোদকে আরো খানিক অপেক্ষা করতে হয়। সেই অপেক্ষা করার সময় সে রেশন দোকানের খাতা নিয়ে বসে। এ খাতা তার দোকানে থাকে না। এ খাতার লেনদেনগুলো সব সরকারি তো নয়! তার খাতা দেখা আর লেখার মধ্যে বউ এবং মেয়ে ঘুমোয়। একবার উঠে গিয়ে দেখে আসে রাধাবিনোদ। তারপরে নিজে শোয়। কিন্তু নাকডাকা যে কোনো রোগ হতে পারে এ কথা ভাবার মত কেউ তাদের পরিবারে নেই। অতএব নাক আর তার ডাক চলতেই থাকে।
আজ-ও চলছিল। উপর্যুপরি ধাক্কা, যা মৃদু থেকে খানিক জোরের দিকেই গেছে – আর শুনছো, ওগো, ইত্যাদি সম্বোধনে তার ঘুম গেল ভেঙে। রাধাবিনোদ বলতে কী, অনেকদিন পরে স্বপ্নও দেখছিল। লকডাউন শুরু হবার পর থেকে এই প্রথম। দেখছিল তার দোকানের সামনে সারি সারি ছাগল দাঁড়িয়ে আছে মাস্ক পরে। সে যত বলছে মাল নেই তত তারা চিৎকার করছে চোর বলে। এমনিতেই ছাগল, তায় তারা আবার চোর বলছে, এমন অপমান সহ্য করা দুষ্কর। সে রেগে চিৎকার করে ওঠে স্বপ্নে। সেই চিৎকার শুনে লাইন কন্ট্রোল করা আই সি ঘোলাদা দাম করে লাঠি চালিয়ে দিল সামনের ছাগলটার উপর। ছাগলটা ভয়ঙ্কর জোরে চিৎকার করে উঠলো।
ঘোলাদা এ অঞ্চলে আসা থেকে একটি কেসও সমাধান করেনি। বরং সমাধান করতে ঘুলিয়ে দেয় এমন যে থানার সবাই পেছনে ঘোলাদাই বলে ওকে। ঘোলা জলে মাছ ধরার কারবারে একেবারে ওস্তাদ। সব পক্ষের থেকে খেতে গেলে কেস জিইয়ে রাখাই কাজ বলে সে মনে করে। এবং এই লকডাউনের সময় ঘোলা ওর সবচেয়ে বড় সহায়। কাউন্সিলর থেকে এম এল এ সব সামলাচ্ছে। আর তারা কেউ এক দলের না। কিন্তু ঘোলা সকলকেই খাইয়ে এমন ব্যবস্থা চালাচ্ছে যে সবাই ভাবছে ঘোলা তাকেই দেখছে বটে। সেই ঘোলা লাঠি চালাতেই ছাগলটা চিৎকার করেছিল স্বপ্নে। বাকি ছাগলগুলোও সমস্বরে আবার চোর বলেছিল। ঘুম ভাঙলো রাধাবিনোদের। চোখ মেলে ঘুম আর স্বপ্নের খাটুনিতে হাঁফাতে হাঁফাতেই দেখল মোবাইলের টর্চের আলো তার মুখে।
কে কে বলে উঠতে যাচ্ছিল, এমন সময় মুখ চেপে ধরলো একজোড়া মেয়েলি হাত। আলো সরলো তার মুখ থেকে।
-আহ্‌ আস্তে আস্তে! ষাঁড়ের মত চেঁচিও না!
ধাতস্থ হল রাধাবিনোদ। আবার একটু অস্বস্তিই লাগলো। চারপাশে তো বেশ রাত এখন। এত রাতে শিউলি কেন? শিউলি তার বউ! কিন্তু রাত্রে তো সে আর বউ-তে অভ্যস্ত নয়। রাত্রে সে একাই থাকে। কবে যে শেষবার এমন রাত্রে এসেছিল শিউলি তাও তক্ষুণি তার মনে পড়ছিল না! খুব দ্রুত সে মাথার স্মৃতির খাতা ওল্টাচ্ছিল। ও মনে পড়েছে! মেয়ে যখন নার্সিং-এ ভর্তির পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল চেন্নাই, তখন! ওখানে নার্সিং পড়বে নাকি! মা আর মেয়ের সাঁড়াশি আক্রমণে রাধাবিনোদ তার শ্যালক গোবিন্দ’র সঙ্গে পরীক্ষা অবধি যেতে দিয়েছিল, কিন্তু ঠিক করেই রেখেছিল পড়তে দেবে না। মেয়েছেলে আবার চাকরি করবে কি? তলায় তলায় বিয়ের ব্যবস্থা করছিল। সেই সময় একদিন রাত্রে শিউলি এসেছিল। বুড়ো বয়সে খানিক ধীরেসুস্থে সব হয়। হওয়ার পর শিউলি আলতো করে খুলেছিল আসল ঝাঁপি। মেয়ের পড়া আর চাকরি এই দুই নিয়ে খেলতে এসেছিল শিউলি। রাধাবিনোদ তো রাধাবিনোদ। ঝাঁপি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই বন্ধ করিয়ে দিয়েছিল। শিউলিরও রাতে আর আসা নেই। বছর দুয়েকেরও বেশি হল। সেই শিউলি রাত্রে আবার?
-চিৎকার কোরো না শুনে, চুপচাপ শোনো শুধু।
আলো নিবিয়ে দিয়েছে শিউলি।
-চোর এসেছে মনে হচ্ছে!
চোর? চোর কেন? ভেবেই থমকালো রাধাবিনোদ। তাদের অঞ্চলে বাড়িতে চুরি অনেকদিন হয় না। কলকাতার লাগোয়া বলে সব এখনো হাইরাইজ হয়ে যায়নি। তার মতন কয়েকজন এখনো বাড়ি রেখে দিয়েছে কিছু। তাতে উঠোন আছে, শৌখিন কারো কারো বাগানও আছে। ফ্ল্যাটবাড়িগুলোতে চুরি বহুদিন শোনা যায় না। বাড়িগুলোতে বছর দু-তিনেক আগে অবধি হয়েছে। পাতাখোরদের কাজ। বালতি, মগ এই সব নিয়ে যেত। তাও বন্ধ হয়ে গেছে এলাকার আগের কাউন্সিলারের বাড়িতে একবার চুরি হবার পর থেকে। পাতাখোরগুলোকে তুলে এমন বাটাম দিয়েছিল পুলিশ যে…। বাইরে চুরি হয়। সাইকেল থেকে ইঁট, বালি, পারলে টাইলস কত কিছু চুরি হয়। কিন্তু বাড়িতে?
-ঠিক দেখেছ তুমি?
শ্বাস চেপে জানতে চায় রাধাবিনোদ।
-হ্যাঁ গো! বাথরুমে যাব বলে দরজা খুলে বেরিয়েছি, আর শুনতে পেলাম খুটখাট শব্দ।
তার পাশের ঘরেই মা মেয়ে শোয়। একতলা বাড়ি। লাগোয়া ঘরদুটোর সামনে একফালি বারান্দা। বারান্দা গ্রিলে ঘেরা। গ্রিলের দরজা। তাতে তালাও দেওয়া। চোর নিশ্চয়ই তালা ভেঙে আসেনি। তাহলে তো ডাকাত বলতে হত। আর তেমন হলে শিউলিই বা আসতো কেমন করে তার ঘরে। দুটো ঘরের দরজাই স্রেফ ভিজিয়ে দেওয়া থাকে। তাহলে চোর বাইরে। বাইরে মানে উঠোনে নাকি…?
-কোথায় শব্দ পেলে?
-রান্নাঘরে।
রান্নাঘর আর বাথরুম রাধাবিনোদই ভেতরে করেনি। সবার এখন ঘরের সঙ্গেই রান্নাঘর। কিন্তু রাধাবিনোদ এখনো এঁটোকাঁটা অশুচি মেনে চলে। শিউলি তো আগে রাত্রের রান্না করেও স্নান করত। শাশুড়ি ছিল তখনও। শাশুড়ি চলে যেতে একদিন বলে দিল পারবে না। বেশি সন্ধেতে স্নান করলে হাঁটুতে ব্যথা হয়! অত করতে হলে রান্নার লোক রাখুক। রাধাবিনোদ কথা বাড়ায়নি। রেশন ডিলার হয়ে সে ভালই কামিয়েছে এবং কামাচ্ছে। কিন্তু শখের জন্য না। মেয়ে আছে তার। মেয়ের বিয়েতেই কত চলে যাবে। তারপর নিজেদের অসুখ-বিসুখ। জামাই এসে দেখবে? না। তাই মেনে নিয়েছে। রান্নাঘর ভেতরে আনতে দেয়নি। সেই রান্নাঘরেই চোর?
-তালা ভেঙে ঢুকলো রান্নাঘরে? তবে তো বেশ শব্দ – ! আমি তো টের পেলাম না?
-দিইনি। লকডাউন তো!
-লকডাউন বলে চুরি বন্ধ থাকে? তুমি বউ না গাধা?
রাগে গরগর করতে করতে বলেই ফেললো রাধাবিনোদ। আগুপিছু ভেবে যে বলেছে তা নয়। রাগটাই বা কেন হল তা সে জিজ্ঞেস করলে ভাল বলতেও পারবে না। হতে পারে চুরির বিরুদ্ধে। কিন্তু চুরি তো সে নিজেও করে থাকে। রাগটা কি চোর ধরতে যাবার ভয়ে? মানে ধরতে গিয়ে চোর যদি কিছু করে বসে? পাড়ার লোক ডাকতে গেলে পালাতে পারে। ছুরি, ক্ষুর – কিম্বা বন্দুকও যদি- ! চুরি করা আর চোর ধরা তো এক কাজ না। এমন কিছু একটা রাগের কারণেই রাধাবিনোদ বউকে গাধা বলেছিল। দমদম করে বেরিয়ে গিয়েছিল শিউলি। রাধাবিনোদ লুঙ্গি সামলে উঠতে উঠতে শুনতে পেল গ্রিলের গেট খোলার শব্দ। তারপরেই ঝনাৎ। রান্নাঘরের শেকল খুলে দিল শিউলি। সর্বনাশ! চোর যদি -?
-একদম উঠবে না। ভাল করে বসে খাও। আজকে ডাল, ছেঁচকি আর ছোট মাছ। কালকে কাটাপোনা আর মাংস করে রাখব। সঙ্গে পায়েসও। রেশন ডাকাতের বাড়িতে চুরি করে শুধু ছোটমাছ খেলে তোমাদের রাধাবিনোদ বাবুর মাথা কাটা যাবে না?