তমাল রায়-এর গদ্য

Spread This

তমাল রায়

অমিত্রাক্ষর
বন্ধের দিন। বালি ব্রিজ হেঁটে পার হতে গিয়ে দেখলাম,ব্রিজের মাঝ বরাবর সামান্য জটলা। কাছে গিয়ে দেখলাম,এক যুবকের দেহ লাইনে পড়ে। ধড় থেকে মাথা আলাদা৷ বাকি শরীর অবিকল অক্ষত। যেন ঘুমিয়ে রয়েছে চুপটি করে। পাশ দিয়ে এক প্রৌঢ় মানুষ হেঁটে যাচ্ছিলেন,অস্ফুটে বললেন,বেঁচে গেল! অবাক হয়ে তাকাই তাঁর দিকে! আধ ময়লা পাঞ্জাবি,গালে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। জিজ্ঞেস করি,আপনি কি ঋত্বিক ঘটক? ক’দিন আগেই যুক্তি তক্কো গপ্পো দেখেছি। ক্যামেরার লেন্সে বাংলা মদ ছুঁড়ে দেওয়ার দৃশ্যটা মনে গেঁথে গেছে। প্রৌঢ় আমার কথার উত্তর না দিয়েই হাঁটতে থাকেন।
ফিরে এসে বাবাকে জিজ্ঞেস করি,মৃত্যু কীভাবে বাঁচায়?
বাবা খানিক চুপ থেকে উত্তর দেন,খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়! কিছু না বুঝে,বা বুঝে ভেবলার মত তাকিয়ে থাকি।
টনি মরিসনের বিখ্যাত উপন্যাস বিলাভেড এর পাতা উল্টোতে গিয়ে চমকে গেলাম,সংজ্ঞা কেবল সংজ্ঞাপ্রণেতাকেই ডিফাইন করে,সংজ্ঞায়িতকে নয়। সেই প্রথম সাদা পাতায় মা লিখে কেটে দিই৷ লিখি স্বপনমামা। স্বপন মামা,মার বিয়ের বারো বছর পরেও,জুলজুল করে চেয়ে থাকতেন মা’র ফিরে আসার অপেক্ষায়,স্বপনমামাকে দিয়ে কি মাকে ব্যাখ্যা করা যায়?
পাশাপাশি দুটি মাস্ক ঝুলছে,একটি সবুজ,অন্যটি গেরুয়া। জিন্নার আর নেহরু। কায়েদ এ আজম সেকুলার,মাস্ক পরলেন ধর্মের,পণ্ডিতজি ধার্মিক, মাস্ক পরলেন সেকুলারের।
মুখোশের বিনিময় হল৷ না’কি আত্মারও? সেটা ১৯৪৭। মৃত্যুর সংখ্যাতত্ত্ব জানিয়েছিল,৪কোটির মধ্যে ২লাখ। ০.৫ শতাংশ! তখন রুপি আর ডলার ছিল সমান। যেমন এলিনা,এলিনা নজুল্লা প্রীতির ঠাকুরদার বাপ আর আমার ঠাকুরদার বাপ।  বিনিময় করে নিয়েছিলো আত্মা! ঠাকুর বলেছিলেন টাকা মাটি মাটি টাকা। ঠাকুর বলেননি,মাটিই আত্মা। আত্মাই মাটি। আঁশ শেওড়ার ঝোপ,হিজল গাছ,ধলেশ্বরী নদী,কালি গাইএর হাম্বা ডাক,এসব কি তবে আত্মার অংশ ছিলোনা ?  সে কথা এলিনাকে যখন লিখি,এলিনা তখন হাপুস নয়নে কাঁদছে। আর বলেই চলেছে অবিশ্বাস এক ভাইরাসের নাম! বাইরে তখন ২০২০র এখানে পিঞ্জরে বৃষ্টি নেমেছে অঝোর,এ সময়েই নদীর জন্ম হয়! এলিনা বলেছিলো,এক নদীতে একজন মানুষ একবারই নামে৷ কারণ,পরের নিমজ্জনে হয় নদী বদলে গেছে,নয়তো মানুষ!
আত্মার বিনিময়ের পর, যখন ফের নদীতে নামলাম,আকাশ ঢেকেছে মুখোশ নামের রঙে। সে আকাশে ভেসে চলেছে ‘৪৭এর মেঘ। অবিশ্বাসের গাছে ঝুলছে এলিনার দেহ। এলিনা বলেছিল অবিশ্বাস এক ভাইরাসের নাম! খবরে প্রকাশ,অমৃতসর লাহোর রেললাইন ভেসে গেল,প্রবল নদী স্রোতে!
চার্চিল বলেছিলেন,কুকুর আমার দিকে তাকায়,মাথা উঁচু করে,তাই তার প্রতি আমার অসীম মায়া! শুয়োর আমার দিকে সোজা তাকায়,তাই আমি নিজেকে শুয়োর ভাবতে ভালোবাসি,আর বেড়াল তাকায় ওপর দিক থেকে। তাই আমি তাকে রহস্যময় ভাবি। সন্দেহও করি! যেদিন ইনা মিনা ডিকাকে আমার বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে যায় মেনি। সেদিন দিদির আইবুড়ো ভাত। বাকি পঁচিশ অতিথির সাথে ওরাও খেয়েছিলো দেদার। কারণ তিন রকম মাছ রাখা হয়েছিলো আইটেম লিস্টে। এভাবেই আমাদের বিয়েগুলো ফিশি হয়ে উঠতে শুরু করলে,বেড়ালের সংখ্যা বেড়ে যেত রোজই! মা গাইতেন,অন্ধজনে দেহ আলো। সেতারের তার ছেঁড়া। হারমোনিয়াম বেড়াতে গেছে দিদির শ্বশুরবাড়ি। রাতে ইনার চোখে চোখ পড়লে ঝলসে যেতাম।কারণ রড কোষ। তারও কিছু পরে,মনীষা বেড়াতে এলো আমার বাড়িতে। মা মনীষাকে চায়ের সাথে মাছ ভাজা দিলে,দেখেছিলাম মাথা পর্যন্ত গুঁড়িয়ে খেয়ে নেয় এক নিমেষে! তখনই বেড়াল গুণতে গিয়ে মনীষা আর নিজেকেও গুণে ফেলি। সেই শুরু।  যে রাতে খুব বৃষ্টি হল। মনীষা আটকে গেল আমার বাড়িতেই। খুব ঝগড়া হল। দেখি চারপাশে ঘিরে আছে চৌষট্টি বেড়াল। পরিবেশ হালকা করতে বলে উঠি,ও মনীষা। আমি…,তোমরা নিজেদের কোনো নাম দাওনা কেন?
উত্তর করে,তোমরা নিজেদের চিনতে পারোনা,তাই নাম দাও। আমরা নিজেদের চিনি।
মণীষাকে খুঁজতে বেরোই ঘন রাতে,বেড়াল ডাকের মাঝেই,দেখি কুমড়ো আর উচ্ছের দড়ির মাঝে ঝুলে আছে কেউ। মা গাইছেন অন্ধজনে দেহ আলো,মৃতজনে দেহ প্রাণ৷
যা পারি আর যা পারিনার তালিকা বানাতে গিয়ে দেখি,কিছুই পারিনা। বিস্কুট রেসে দৌড়তে মুখ থেকে বিস্কুট কেবল পড়েই যেত। পড়ে যাওয়া বিস্কুটে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই লেগে থাকতো লালা ও থুতু। কিন্তু উপস্থিত বন্ধুরা বলেছিলো বিস্কুট পড়ে যাবার পরেও নাকি আমার মুখ থেকে লালা ঝরতো। এ বিষয়ে বিশদ জানতে যখন বাবাকে জিজ্ঞেস করি,বাবা নিশ্চিত হয়েই জানিয়েছিলেন,আমার পরিবারে কোনো পূর্বজই কুকুর ছিলেন না। তবে কুকুর ভালোবাসত,ঠাকুরদার সেজ ভাই। প্রশ্নটা সে সময়ে মাথায় আসতেই ভুলুদার কাছে যাই। ভুলুদা  বিজ্ঞানের মাস্টার হলেও ধর্মে তার অগাধ আস্থা ছিলো। তিনিই বলেন কাউকে গভীর ভাবে ভালোবাসলে না’কি তার কিছুটা অংশ ভালোবাসার মানুষের শরীরেও চলে আসে। এই উত্তরের পরে আমার খুব ভয় হতে শুরু করে। মনীষাকে চুমু খেয়েছি একাধিকবার। মনীষার দাঁত ছিল উঁচু। আমারও কি তবে? লিস্টারিন দিয়ে বহুবার কুলকুচি করেছিলাম। সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে।  তখনই জানতে পারি এডুইনা আর নেহরুর সম্পর্কের কথা। আর ভাবতে শুরু করি স্বাধীন রাষ্ট্রের এই যে কলোনিয়াল হ্যাংওভার এও কি তবে ভালোবাসার অংশ বিশেষ?